ছাগল খুঁজতে গিয়ে স্বর্ণের সন্ধান, খবর পেয়ে হাজির ১০ হাজার মানুষ

ছাগল খুঁজতে গিয়ে নদীর তীরে স্বর্ণ অনুসন্ধানরত একদল নারীর সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন কেনিয়ার এক ছাগলপালক। সেখানেই মেলে স্বর্ণের সন্ধান। পরে মাত্র ৩ গ্রাম সোনা বিক্রি করে তিনি পান ৩৬ হাজার কেনিয়ান শিলিং বা প্রায় ২৮০ ডলার।
এরপরই পশ্চিম কেনিয়ার প্রত্যন্ত চেপোরোর গ্রামে তোলপাড় শুরু হয়। গত কয়েক সপ্তাহে সেখানে ছুটে আসেন হাজার হাজার মানুষ। স্থানীয় কর্মকর্তাদের হিসাবে, একপর্যায়ে প্রায় ১০ হাজার মানুষ সোনার সন্ধানে সেখানে জড়ো হয়েছিলেন।
গত মাসেও যে এলাকায় ছিল ঝোপঝাড় ও পশুচারণের জমি, সেখানে এখন তৈরি হয়েছে অসংখ্য গর্ত, মাটির স্তূপ ও অস্থায়ী খনিশিবির।
৩৩ বছর বয়সী মানাসে লোমাচার পেশায় ছাগলপালক। হারিয়ে যাওয়া একটি ছাগল খুঁজতে গিয়ে তিনি নদীর তীরে কয়েকজন নারীকে সোনা খুঁজতে দেখেন।
তাদের সঙ্গে কাজে যোগ দেওয়ার পরই তিনি সোনার সন্ধান পান। পরে সেই সোনা বিক্রি করে ভালো অঙ্কের অর্থ পাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে গ্রামজুড়ে।
তবে লোমাচারের পাওয়া সোনাই যে এই ‘গোল্ড রাশ’ শুরু করেছে, তা নিশ্চিত নয়। স্থানীয় কর্মকর্তাদের মতে, একই সময়ে ওই এলাকায় আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য স্বর্ণের সন্ধান পাওয়া যায়। সেসব খবর ছড়িয়ে পড়ার পরই মানুষের ঢল নামে।
ওয়েস্ট পোকট কাউন্টির ডেপুটি কমিশনার স্যামুয়েল কিয়ারি জানান, আগস্টের শুরুতে একদল তরুণ তুলনামূলক বড় পরিমাণের স্বর্ণ খুঁজে পান। পরদিন একই এলাকায় কয়েকজন নারীও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ স্বর্ণ পান।
এরপর মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া খবর অনেকটাই অতিরঞ্জিত হয়ে যায়। ফলে স্বর্ণের সন্ধানে এমন লোকজনও সেখানে আসতে শুরু করেন, যাদের আগে খনির কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না।
প্রথম দিকের প্রায় ১০ হাজার মানুষের ভিড় এখন কমে প্রায় ২ হাজার ৫০০ জনে নেমে এসেছে। তবে স্বর্ণের সন্ধান এখনো চলছে।
ওই এলাকায় সত্যিই স্বর্ণ সোনা পাওয়া গেছে—এ বিষয়ে খুব একটা সন্দেহ নেই। কিন্তু মাটির নিচে কী পরিমাণ স্বর্ণ রয়েছে কিংবা বাণিজ্যিকভাবে খনন করা কতটা লাভজনক হবে, তা এখনো জানা যায়নি।
স্থানীয় কর্মকর্তাদের মতে, এখন পর্যন্ত পাওয়া স্বর্ণের পরিমাণের মূল্য কয়েকশ কেনিয়ান শিলিং থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ প্রায় ৭৮ হাজার শিলিং বা ৬০০ ডলার পর্যন্ত হয়েছে।
এই অঞ্চলের নদীর তীরে স্থানীয় নারীরা বহু বছর ধরে বিভিন্ন সময় স্বর্ণ খুঁজে থাকেন। সাধারণত এতে সপ্তাহে ৮ থেকে ২৩ ডলারের মতো আয় হয়।
কেনিয়ার পশ্চিম পোকট কাউন্টির সঙ্গে উগান্ডার সীমান্ত রয়েছে। দুই দেশের সীমান্তবর্তী মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের সামাজিক ও পারিবারিক যোগাযোগ থাকায় সোনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর উগান্ডা থেকেও অনেকে সেখানে ছুটে এসেছেন।
উগান্ডার বুসিয়া থেকে আসা কারিগরি খনিশ্রমিক মুগিশা গডফ্রে জানান, বন্ধুর কাছ থেকে সোনার সন্ধানের খবর পেয়ে তিনি চেপোরোরে আসেন। সেখানে পৌঁছাতে তাঁর প্রায় ২৭ ডলার খরচ হয়েছে।
তবে এখন পর্যন্ত তিনি এক টুকরো সোনাও পাননি। তিনি বলেন, সোনা না পাওয়া পর্যন্ত বাড়ি ফিরবেন না।
শুধু খনিশ্রমিকরাই নয়, সোনার খোঁজে আসা মানুষের ভিড় ঘিরে সেখানে গড়ে উঠেছে নতুন ব্যবসা।
স্থানীয় কর্মকর্তাদের হিসাবে, খনিস্থলের আশপাশে এরই মধ্যে ২০০টির বেশি ব্যবসা গড়ে উঠেছে। খাবার, পানি, পানীয়, রুটি, দুধসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা।
প্রতিবেশী বারিঙ্গো কাউন্টি থেকে আসা আইরিন আমেজা সেখানে বোতলজাত পানি, কোমল পানীয়, রুটি, দুধ ও অন্যান্য খাবার বিক্রি করছেন। তার আশা, এখান থেকে আয় করে নিজের ব্যবসা আরও বড় করবেন।
তবে হঠাৎ করে হাজার হাজার মানুষের আগমনে স্থানীয় অবকাঠামোর দুর্বলতাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সেখানে পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা কিংবা থাকার সুবিধা নেই।
নারীদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন। রাতে নিরাপদে থাকার জায়গার অভাব রয়েছে এবং সেখানে থাকা অধিকাংশ মানুষই পুরুষ।
এ কারণে যৌন সহিংসতাসহ বিভিন্ন নিরাপত্তাঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে স্থানীয় প্রশাসন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা টহল বাড়ানোর পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তাদেরও সেখানে মোতায়েন করা হয়েছে।
স্বর্ণের খোঁজে শিশু-কিশোররাও জড়িয়ে পড়তে পারে বলে উদ্বিগ্ন কর্তৃপক্ষ। সেপ্টেম্বর থেকে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ার কথা। তাই শিশুদের যেন খনিস্থলে থেকে যেতে না হয়, সে জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে যারা এখনো স্বর্ণের সন্ধান করছেন, তারা ক্রমেই মাটির আরও গভীরে গর্ত খুঁড়ছেন। ইতোমধ্যে কয়েক ট্রাক মাটি ও পাথর কাছের ওর্তুম শহরে নিয়ে প্রক্রিয়াজাত করা হয়েছে। এর ফলাফল পাওয়া গেলে মাটির নিচে থাকা স্বর্ণের প্রকৃত পরিমাণ সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
মানাসে লোমাচার চান না এই খনন বন্ধ হয়ে যাক। বরং তিনি চান সরকার স্থানীয় খনিশ্রমিকদের নিরাপদ ও কার্যকরভাবে স্বর্ণ উত্তোলনের সুযোগ করে দিক।
তিনি সরকারকে ধাতু শনাক্তকারী যন্ত্রসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, এতে এলাকায় আরও কী ধরনের খনিজ সম্পদ রয়েছে, তা শনাক্ত করা সম্ভব হবে এবং স্থানীয় মানুষের জীবনও বদলাতে পারে।
কারণ চেপোরোরের মানুষের দারিদ্র্য চোখে পড়ার মতো। গ্রামের বেশিরভাগ বাড়িই টিনের ছাউনি দেওয়া নয়; অনেক বাড়ি এখনো খড়ের তৈরি।

