পুজায় খাবার নিয়ে ধর্মগুরুর ফতোয়া ঘিরে পশ্চিবঙ্গে তীব্র ক্ষোভ

পশ্চিমবঙ্গে শারদীয় দূর্গাপূজার সময় পূজা মন্ডপ গুলির আশেপাশে মাছ মাংস সহ আমিষ খাবার বিক্রি নিয়ে আগেই কার্যত ফতোয়া জারি করেছিল বিশ্ব হিন্দু পরিষদ। এবার পশ্চিমবঙ্গ সফরে এসে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সহ একাধিক বিজেপি নেতৃত্বের সামনেই দুর্গাপূজায় বাঙালির মাছ মাংস খাওয়ার তীব্র সমালোচনা করেছেন সনাতনী ধর্মগুরু বাগেশ্বর বাবা ওরফে মধ্যপ্রদেশের ‘বাগেশ্বর ধাম’-এর বিতর্কিত কথক ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী।
আসন্ন দুর্গাপূজার দিনগুলিতে সবাইকে সম্পূর্ণ নিরামিষ আহারের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তাঁর দাবি, যারা দুর্গাপুজোর সময়ে আমিষ খান তারা পাষণ্ড। আমিষ খাবার কে নোংরা খাবারও বলেন তিনি।
হাওড়ার লিলুয়ায় ওই বাগেশ্বর বাবার ধর্ম সভায় উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও। তিনি বাগেশ্বর বাবাকে প্রণাম করে হাতে মাকালী মূর্তি ও গদা তুলে দেন। তাঁকে ব্রিগেডে এসে ধর্মসভা করার আহ্বানও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
ধর্মসভা থেকে বাগেশ্বর বাবা বলেন, "পশ্চিমবঙ্গে একটা জিনিসই খুব খারাপ লাগে, দুঃখ হয়, নবরাত্রির সময় মণ্ডপের আশেপাশে আমিষ খাওয়া হয়। যত সব খারাপ খাবার তৈরি হয়। যা আমার একেবারেই পছন্দ নয়।" পশ্চিমবঙ্গবাসীর কাছে তাঁর আর্জি, "আমি বলব এবার পুজোয় সব হিন্দুরা জেগে উঠুন। যারা আমিষ খায় তাদের বহিষ্কার করা হোক। ওরা মোটেও ধার্মিক নয়। পাখণ্ডী (ভেকধারী)।"
আমিষাশীদের ধর্মপ্রেম নিয়ে প্রশ্নও তুলেছেন বাগেশ্বর বাবা। তাঁর বক্তব্য, "ওরা পিঁয়াজ খায়। আবার ধার্মিক বলে। বাংলায় থাকা হিন্দুরা জেগে উঠুন। আমার কিছু এমন লোকজনের সঙ্গে দেখা হয়েছে যারা মদ্যপান করেন কিনা জিজ্ঞেস করলে বলেন, হ্যাঁ খাই। হনুমানজির দিন বলে মঙ্গলবার খাই না। কেন? মঙ্গলবার ছাড়া অন্য দিন কী হনুমানজি ছুটিতে থাকেন?"
অনুষ্ঠানে উপস্থিত যাঁরা দুর্গাপুজোয় আমিষ খাওয়ার বিরোধী তাঁদের মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে জানান দিতে বলেন। সেই মতো অনুষ্ঠানে উপস্থিত প্রায় সকলেই ধর্মগুরুকে সমর্থন করেন।
সনাতনী ধর্মগুরুর এমন ফতোয়ায় রীতিমতো আলোচনা সমালোচনার দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষ সহ রাজনীতিবিদদের মধ্যেও।
ধীরেন্দ্র শাস্ত্রীর মন্তব্যে বিজেপি ও আরএসএস-কে একহাত নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেস। প্রদেশ কংগ্রেসের মুখপাত্র সুমন রায়চৌধুরীর বলেন, বিজেপি, আরএসএস-এর স্লিপার সেল এঁরা। তাঁর কথায়, 'দুর্গাপুজোয় নবমীর দিনি পাঁঠা বলি। সরস্বতী পুজোর দিন জোড়া ইলিশ। এটা শুধু আমাদের ধর্মীয় আচার নয়, এগুলো আমাদের সংস্কৃতির মধ্যে মিশে গিয়েছে।
তিনি আরও বলেন,আরএসএস এর সমস্যা হল, পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর থেকে যে কাজ নিজেরা করতে পারছে না, তার জন্য বিভিন্ন ধরনের স্লিপার সেল তৈরি করেছে। সনাতনী মহাসভা, হিন্দু জাগরণ মঞ্চ ইত্যাদি। রাস্তার বিভিন্ন জায়গায় ফ্লেক্স লাগিয়ে বিভিন্ন প্রোগ্রাম করছে। জেপি ভাবছে, এই কথাগুলি বললে আগামী বিধানসভা নির্বাচনে ভোট হাতছাড়া হবে। তাই বিভিন্ন ধরনের স্লিপার সেল তৈরি করে ওই কথাগুলি বলাচ্ছে। হঠাত্ দেখলাম কোন এক বাবা এসে উপস্থিত হলেন, বাগেশ্বর ধাম থেকে, তিনি এসে বাঙালিদের জ্ঞান দিচ্ছেন। দুর্গাপুজোয় আমিষ খাওয়া উচিত নয়, মণ্ডপের আশপাশে আমিষ নিয়ে যাওয়া উচিত নয়। নবমীতে পাঁঠা বলি হবে কিনা, তা বাগেশ্বর ধামের বাবা ঠিক করে দেবেন?'
তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক তথা সাবেক মন্ত্রী মদন মিত্র জানান এক বাবা বলছেন বাংলায় আমিষ খাওয়া যাবে না। অষ্টমীতে আমরা ভোগ খাই। মাছ মাংস তারপর খাওয়া হয়। মাছ মাংস তারাপীঠ থেকে শুরু করে বহু জায়গায় দেওয়া হয়। পুজোয় চিকেন রোল, সেদ্ধ ডিম খাবে না ? এগুলো মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে খর্ব করছে। নিশ্চয়ই আমি এমন কিছু করব না যাতে আবেগে আঘাত লাগে। মন্ত্র বলতে তো আর নোংরামি করব না ? ধর্ম আর রাজনীতি কেন একসাথে আসছে। এটাতে আমাদের তীব্র আপত্তি রইল।
পুজো মানে উৎসব, শুধু মূর্তি পুজো নয়। এবার তো বলবে বিয়ে বাড়িতে মাছ মাংস চলবে না। সংখ্যালঘুদের বিরিয়ানি চলবে না। আমি নাগরিক ও বিধায়ক হিসাবে এর তীব্র প্রতিবাদ করছি।
তবে বাগেশ্বর ধামের ওই বক্তব্য গুরুত্ব দিতে নারাজ বিজেপি নেতৃত্ব। রাজ্য বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমিক ভট্টাচার্য , তিনি স্পষ্ট বলেন, বহিরাগত কোনও সাধু-সন্তের পরামর্শে বাঙালির আবহমানকালের খাদ্যাভ্যাস কিংবা সংস্কৃতি বদলে যাবে না। শমীক বলেন, “অষ্টমীর দিন লুচি আর নবমীর দিন কচি পাঁঠার মাংস খাওয়া বাঙালির খাঁটি রীতিনীতি, আর বাঙালি সেই ঐতিহ্যই লালন করবে।
ধীরেন্দ্র শাস্ত্রীর প্রতি ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা ও সৌজন্য বজায় রেখেও শমীক সাফ জানান, স্বামী বিবেকানন্দের ধর্মদর্শনের ওপরে অন্য কোনও মত চাপিয়ে দেওয়ার কোনও সুযোগ নেই। বাংলায় মা কালীকে পাঁঠার মাংস নিবেদন করার যে সুপ্রাচীন প্রথা রয়েছে, তাকে অস্বীকার করার কোনও কারণ নেই।
তবে সাধারণ আমিষ আহারিদের ‘পাষণ্ড’ বলার বিষয়ে বিজেপি সভাপতি স্পষ্ট করেন যে, এই ধরনের শব্দপ্রয়োগকে তিনি কখনওই সমর্থন করেন না। শমীকের কথায়, যার ধুতি পরার ইচ্ছে সে ধুতি পরবে, যে লুঙ্গি পরে সে লুঙ্গি পরবে—বাঙালির নিজস্ব জীবনযাত্রা ও রুচিবোধের ওপর রাজনীতি বা অন্য কোনও প্রেসক্রিপশন খাটবে না।
এর আগে তৃণমূল জমানায় অনুমতি না মিললেও বিজেপি রাজ্য সরকারের আমলকালে সাড়ম্বরে এসে রাজ্যজুড়ে নিজের ধর্মীয় অনুষ্ঠান করেছেন বাগেশ্বর বাবা। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর আতিথেয়তায় আপ্লুত হয়েছেন ধীরেন্দ্র শাস্ত্রী। বলেছেন, 'পশ্চিমবঙ্গ এখন সুরক্ষিত হাতে রয়েছে। এখানে এবার রামরাজ্য প্রতিষ্ঠা হবে।' নাম না করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে কটাক্ষ করে বলেন, 'আমায় বলা হয়েছিল বাংলায় ঢুকতে দেওয়া হবে না। কিন্তু এখন আমার দাদা সত্তায় এসেছেন। এখন ক্ষমতায় কোনও বাবরওয়ালি নেই, রঘুবীরওয়ালে আছেন।'
