অনলাইন ডেটিং অ্যাপ ও হানি ট্র্যাপ প্রতারণা, ব্যক্তিগত ঝুঁকি ও করণীয়

বর্তমানের এই ইন্টারনেট যুগে মানুষের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে উঠছে এক মুহূর্তেই। বন্ধুত্ব, প্রেম এমনকি বৈবাহিক সম্পর্ক খুঁজে পাওয়ার জন্য নতুন মাধ্যম হিসেবে আধুনিক তরুণ ও তরুণীদের মধ্যে ডেটিং অ্যাপের ব্যবহার বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। প্রযুক্তির এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কিছু অসাধু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ধরনের হানি ট্র্যাপ প্রতারণার ফাঁদ পেতে বসে থাকে। তারা সাধারণত নিরীহ ও আবেগপ্রবণ ব্যবহারকারীদের টার্গেট করে থাকে।
বাংলাদেশে জনপ্রিয় ডেটিং অ্যাপগুলোর মধ্যে রয়েছে টিনডার, বাম্বল, টানটান, বাদুসহ আরও কিছু র্যান্ডম লাইভ ভিডিও চ্যাট অ্যাপ। এগুলো অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ও আইফোন বা আইওএস অপারেটিং উভয় প্ল্যাটফর্মেই পাওয়া যায়।
এই অ্যাপগুলোর সবচেয়ে বড় সমস্যা এদের নিরাপত্তা ঘাটতি, বিশেষ করে ভুয়া প্রোফাইল। কারণ অধিকাংশ অ্যাকাউন্ট খুলতে আইডি বা ছবির সত্যতা যাচাই করে না। একটি ইমেইল বা মোবাইল নম্বর দিয়েই প্রোফাইল খুলে ফেলা যায়। এ ছাড়া ব্যবহারকারীরা যে কোনো নাম, পেশা, অবস্থান, স্কুল অথবা ভার্সিটির নামসহ ব্যক্তিগত তথ্য প্রোফাইলে দিতে পারে, যা প্রতারকরা টার্গেট করে কাজে লাগায়।
এই অ্যাপগুলোতে ব্যবহারকারীরা সাধারণত পরস্পরকে লাইক করলে পরবর্তীতে তারা ইনবক্সে একে ওপরের সঙ্গে চ্যাট করতে পারে। এখান থেকেই প্রতারণার ধাপ শুরু হয়।
প্রতারণার কৌশল ও ধরন
প্রেমের ফাঁদ: চ্যাট শুরু করে অল্প সময়ের মধ্যে প্রেমের নাটক সাজানো হয়। অনেক সময় প্রেমের নাম করে বাসায় বা নির্দিষ্ট কোনো জায়গায় যেতে বলে। এ ছাড়া অনলাইনে কিছু কিনে দিতে বা কোনো পার্সেল গ্রহণ করতেও বলে।
বিদেশ থেকে উপহার পাঠানোর নাটক: বলা হয় যে তারা ব্যাগ, ল্যাপটপ, গহনা পাঠিয়েছে। তবে কাস্টমস ছাড়াতে কিছু টাকা পাঠাতে হবে। একটি চক্র হিসেবে এই গ্রুপ কাজ করে এবং এর স্বপক্ষে অনেক প্রমাণও তারা দেখাবে। একবার বিশ্বাস করলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হয়ে যাবে।
শারীরিক সম্পর্কের নামে ব্ল্যাকমেইল: ইনবক্সে বা ভিডিও চ্যাটে অনৈতিক ছবি অথবা ভিডিও পাঠাবে, ব্যবহারকারীকে প্রলুব্ধ করবে এতে অংশগ্রহণ করতে এবং পবর্তীতে এগুলো তারা সংগ্রহ করে ব্ল্যাকমেইল করে। এ ছাড়া বিভিন্ন সার্ভিসের নাম করে যেমন- স্পা, রিসোর্টে ঘুরতে যাওয়া, প্রাইভেট পার্টি, সিসা লাউঞ্জ বা কোন ড্রিংকস খাওয়ার বারে যাওয়ার কথা বলে বিভিন্ন ঠিকানায় যাওয়ার জন্য প্রস্তাব দেবে।
ভুয়া বিনিয়োগ প্রস্তাব: প্রেমের সম্পর্ক তৈরি করে ফান্ডিং, ক্রিপ্টো বা বিভিন্ন অনলাইন ব্যবসার নামে টাকা চাওয়া হয়। বিভিন্ন ভুয়া অ্যাপে ব্যবহারকারীকে ইনভেস্ট করলে লাভ হয় সেগুলো দেখাবে। এই অ্যাপগুলো তারা প্রতারণার জন্য নিজেরাই তৈরি করে থাকে।
বিদেশ ভ্রমণের লোভ: বিয়ের কথা বলে ভালো কোনো দেশে যেতে চাইলে স্পনসর অথবা ভিসা প্রসেসিং-এর নামে টাকা দাবি করা হয়।
নিজেকে নিরাপদ রাখার উপায়
অপরিচিতদের সহজেই বিশ্বাস না করা। সামান্য কথোপকথনেই যদি কেউ প্রেম, বিয়ে, উপহার বা টাকার প্রসঙ্গ তোলে বা বড় ধরনের কোনো লোভ দেখায় তাহলে সাবধান হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার না করা
জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল নম্বর, ব্যাংক অথবা মোবাইল ফাইন্যান্স অ্যাকাউন্ট বা বাসার ও অফিসের ঠিকানা কখনোই শেয়ার না করা। এ ছাড়া সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট শেয়ার না করা ও পারিবারিক তথ্য গোপন রাখা।
ভিডিও চ্যাটে সতর্ক থাকা
নিজের ছবি বা ভিডিও আপত্তিকর না হলেও অপরিচিত কাউকে পাঠাতে সতর্ক থাকা। প্রতারকরা ছবি, ভিডিও বিভিন্ন এআই অ্যাপ দিয়ে এডিট করে অনলাইন ছড়িয়ে দিতে পারে বা ব্ল্যাকমেইল করতে পারে।
বিপদে পরামর্শ নেওয়া
যদি কখনও কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয় তাহলে বিশ্বস্ত বন্ধু, পরিবার, বা সহকর্মীর সঙ্গে আলাপ করা। এ ছাড়া প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো।
লেখক: আজিম ভূঁইয়া, আইটি ইঞ্জিনিয়ার ও অ্যাক্টিভিস্ট; ফাউন্ডার ও সিইও, নেপচুন ইনফরমেশন টেকনোলজি বাংলাদেশ।
[ প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের প্রতিফলন। এগুলো এশিয়া পোস্টের সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সঙ্গে সর্বদা মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখায় উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব; এ বিষয়ে এশিয়া পোস্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ। ]