আলজাজিরার কলাম /হ্যাঁ, ইহুদিবাদই বর্ণবাদ

রোববার, ব্রাইটনে অনুষ্ঠিত দলের বার্ষিক সম্মেলনে ব্রিটিশ গ্রিন পার্টি ইহুদিবাদকে বর্ণবাদ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পক্ষে ভোট দিয়েছে। এই প্রস্তাবে ইহুদিবাদকে একটি ‘জাতিগত-জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক প্রকল্প’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। পাশাপাশি পার্টির বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য ও সাবেক দলনেত্রী ক্যারোলিন লুকাসের বিরোধিতা সত্ত্বেও প্রস্তাবটি ১ হাজার ২২–৮১৩ ভোটে পাস হয়।
এই ভোটের ফলে ব্রিটিশ মূলধারার রাজনীতি ও সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়; বহু বিশ্লেষক ও মন্তব্যকারী এর তীব্র নিন্দা জানান, গ্রিন পার্টিকে ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগে অভিযুক্ত করেন এবং দাবি করেন যে, এটি ইহুদি জনগণকে ঝুঁকিতে ফেলছে।
তবুও, গ্রিন পার্টির এই প্রস্তাবটি অস্বাভাবিক বা বৈপ্লবিক কিছু ঘোষণা করেনি। ইহুদিবাদ একটি বসতি স্থাপনকারী-উপনিবেশবাদী মতাদর্শ ছিল এবং এখনও তা-ই রয়েছে, আর বসতি স্থাপনকারী উপনিবেশবাদ মৌলিকভাবেই বর্ণবাদী। ইহুদিবাদের মূল বিশ্বাস হলো বিশ্বের যে কোনো প্রান্তের ইহুদি জনগণের ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনে নিজেদের একটি জন্মভূমি পাওয়ার অধিকার রয়েছে, যা অন্য যে কোনো জনগণের অধিকারের চেয়ে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত।
এটি এমন একটি বিশ্বাস যা ভূখণ্ডের প্রতি বাইবেলীয় দাবি এবং ইতিহাসের এক অঐতিহাসিক উপলব্ধির ওপর প্রতিষ্ঠিত। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য আদিবাসী ফিলিস্তিনি জনগণকে উচ্ছেদ করা ও তাদের অধিকার হরণ করা অপরিহার্য।
ইহুদিবাদকে বসতি স্থাপনকারী-উপনিবেশবাদী মতাদর্শ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা মোটেও বিতর্কিত হওয়া উচিত নয়, বিশেষ করে ইহুদিবাদের প্রতিষ্ঠাতা পুরুষরা নিজেরাই গর্বের সাথে একে সেভাবে বর্ণনা করেছিলেন। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের একজন শীর্ষস্থানীয় রিভিশনিস্ট জায়োনিস্ট চিন্তাবিদ ভ্লাদিমির জাবোতিনস্কি লিখেছিলেন যে, ‘ইহুদিবাদি উপনিবেশায়ন ... অবশ্যই স্থানীয় বা আদিবাসী জনগণের ইচ্ছাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সম্পন্ন করতে হবে’।
রাজনৈতিক ইহুদিবাদের জনক হিসেবে পরিচিত থিওডোর হার্জেল জিম্বাবুয়েতে ব্রিটিশ উপনিবেশায়নে নেতৃত্ব দেওয়া সাম্রাজ্যবাদী সেসিল রোডসের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে চেয়েছিলেন।
একটি কুখ্যাত খসড়া চিঠিতে (যা হার্জেল শেষ পর্যন্ত পাঠাননি) তিনি রোডসকে ‘ইতিহাস গঠনে সাহায্য করার’ আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, ‘এটি আফ্রিকার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, বরং এশিয়া মাইনরের একটি অংশের সাথে সম্পর্কিত... কিন্তু কেন আমি আপনার কাছে আসছি, অথচ এটি আপনার জন্য একটি অপ্রাসঙ্গিক বিষয়? ... কারণ এটি এমন একটি বিষয় যা উপনিবেশকরণের সাথে সম্পর্কিত।’
ইহুদিবাদের প্রাথমিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নামও তাদের উপনিবেশবাদী পরিচয়কে তুলে ধরেছিল: যেমন জুয়িশ কলোনিয়াল ট্রাস্ট, প্যালেস্টাইন জুয়িশ কলোনাইজেশন অ্যাসোসিয়েশন, এবং জুয়িশ এজেন্সির কলোনাইজেশন ডিপার্টমেন্ট।
একটি মতাদর্শ হিসেবে ইহুদিবাদ কিন্তু ব্যতিক্রমী কিছু নয়। এটি প্রায়শই ‘ম্যানিফেস্ট ডেস্টিনি’ বা সুনির্দিষ্ট ভাগ্যের ধারণায় রোপিত অন্যান্য মতাদর্শের পথ অনুসরণ করে, যা বসতি স্থাপনকারী-উপনিবেশবাদী শক্তিগুলোকে রূপ দিয়েছে এবং তাদের উপনিবেশিক প্রকল্পের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গণহত্যা চালিয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে, ফিলিস্তিনে যা ঘটছে তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি আদিবাসী জনগণকে বিলুপ্ত করার এবং ভূখণ্ডের ওপর বসতি স্থাপনকারী-উপনিবেশবাদী নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত সহিংস ও উচ্ছেদকারী বৈশ্বিক ইতিহাসেরই একটি অংশ।
অফিসিয়াল কোনো প্রস্তাবে ইহুদিবাদকে বর্ণবাদ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার ক্ষেত্রে গ্রিন পার্টিই প্রথম নয়। ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৩৩৭৯ নম্বর প্রস্তাব গ্রহণ করে, যেখানে ইহুদিবাদকে বর্ণবাদ ও জাতিগত বৈষম্যের একটি রূপ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। প্রস্তাবটি ৭২–৩৫ ভোটে পাস হয় (৩২টি দেশ ভোটদানে বিরত ছিল) এবং এটি সেই বছরের শুরুতে অর্গানাইজেশন অব আফ্রিকান ইউনিটি ও জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন কর্তৃক গৃহীত বিবৃতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল।
গ্লোবাল সাউথের (বিশ্ব-দক্ষিণ) দেশগুলো, যারা উপনিবেশবাদী মতাদর্শের কর্মপদ্ধতি খুব ভালোভাবে জানত, তাদের মাধ্যমে এই প্রস্তাবটি উত্থাপিত হওয়া মোটেই আশ্চর্যজনক ছিল না। অনেকেই যুক্তিযুক্তভাবে ইহুদিবাদি শাসনব্যবস্থা এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থার মধ্যে তুলনা করেছিলেন।
অবশেষে ১৯৯১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্মতিতে প্রস্তাবটি বাতিল করা হয়। ওয়াশিংটন ও মস্কো আয়োজিত মাদ্রিদ শান্তি আলোচনায় অংশগ্রহণের শর্ত হিসেবে ইসরায়েলি শাসনব্যবস্থা এই প্রস্তাব বাতিলের দাবি জানিয়েছিল। এই প্রস্তাব বাতিল হওয়া ইহুদিবাদের প্রতি বৈশ্বিক উপলব্ধির কোনো পুনর্বিবেচনা প্রতিফলিত করেনি, বরং সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি এবং পূর্ব ব্লকের পতনের প্রেক্ষাপটে ভূ-রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যের পরিবর্তনকে প্রকাশ করেছিল।
পাঁচ দশক আগে বিশ্বমঞ্চে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর উত্থাপিত একটি অবস্থানের জায়গায় একটি মূলধারার ব্রিটিশ পার্টির ফিরে আসা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ব্রিটিশ রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে একটি জিয়নিস্ট রাষ্ট্র গঠনে সহায়তা করা এবং ১৯৪৮ সালের ফিলিস্তিন থেকে জাতিগত নিধন (নাকবা)-এ অবদান রাখার অন্ধকার অতীতকে মুখোমুখি করার ক্ষেত্রে এটি একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
গ্রিন পার্টি তাদের ওপর আসা প্রবল চাপের মুখে এই অবস্থান ধরে রাখতে পারবে নাকি আক্রমণকারীদের সন্তুষ্ট করতে কোনো ছাড় দেবে, তা এখনো দেখার বিষয়।
এদিকে, পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে এসব তোলপাড় চলার মাঝেই ফিলিস্তিনে গণহত্যা অব্যাহত রয়েছে, এবং এই শোরগোলের আড়ালে যা হারিয়ে যাচ্ছে তা হলো ফিলিস্তিনিদের জন্য মাঠপর্যায়ে ইহুদিবাদের প্রকৃত ও বস্তুগত বাস্তবতা। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এই মতাদর্শ ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য অবর্ণনীয় ধ্বংস ও বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। গ্রিন পার্টির প্রস্তাব এই ইতিহাস তৈরি করেনি – এটি কেবল ইতিহাসকে তার সঠিক নামে চিহ্নিত করেছে।
লেখক পরিচিতি
ইয়ারাহ হাওয়ারি ফিলিস্তিনি পলিসি নেটওয়ার্ক আল-শাবাকার সহ-পরিচালক। এর আগে ফিলিস্তিন নীতি ফেলো ও সিনিয়র অ্যানালিস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
ইয়ারাহ এক্সিটার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতিতে পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন। সেখানেই তিনি স্নাতক পর্যায়ে অধ্যাপনা করেছেন এবং বর্তমানে একজন সম্মানীয় গবেষণা ফেলো। আদিবাসী অধ্যয়ন ও মৌখিক ইতিহাসের ওপর একাডেমিক কাজের পাশাপাশি তিনি একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে নিয়মিত বিভিন্ন গণমাধ্যমে লেখেন।


