logo
Advertisement

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কলাম/‘মধ্যপ্রাচ্যে আমি দ্বিরাষ্ট্র সমাধানে বিশ্বাসী, এই আশা বাঁচিয়ে রাখতে পদক্ষেপ নিচ্ছি’

অ্যান্ডি বার্নহ্যাম
অ্যান্ডি বার্নহ্যাম
‘মধ্যপ্রাচ্যে আমি দ্বিরাষ্ট্র সমাধানে বিশ্বাসী, এই আশা বাঁচিয়ে রাখতে পদক্ষেপ নিচ্ছি’
২০২৬ সালের ১ আগস্ট গাজার দেইর আল-বালাহতে আল-আকসা মার্টার্স হাসপাতালে চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধের গুদামে ইসরায়েলি হামলার পরবর্তী দৃশ্য। ছবি: গেটি ইমেজেস

আমাদের এই নিষেধাজ্ঞা সাধারণ ইসরায়েলিদের বিরুদ্ধে নয়। এটি ইসরায়েল সরকারের অগ্রহণযোগ্য নীতির বিরুদ্ধে। কারণ, তাদের এসব নীতির জন্যই ফিলিস্তিনিদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

ব্রেক্সিটের পর এক দশক পেরিয়ে গেছে। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি বেশ কঠিন ও বিপজ্জনক। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্যের নেতৃত্ব দেওয়ার আত্মবিশ্বাস হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। পাশাপাশি নিজেদের মূল্যবোধের পক্ষে দাঁড়ানোর সক্ষমতাও হারাতে পারে তারা। তবে আমি এমনটি হতে দিতে মোটেও প্রস্তুত নই। যুক্তরাজ্যের এখন নিজস্ব একটি শক্ত অবস্থান থাকা আগের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি।

আমরা বছরের পর বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু আমাদের একটি বিষয় অবশ্যই বুঝতে হবে। কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নিলে এসব কথার কোনো অর্থই থাকে না।

আমরা দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করেছি। ইসরায়েলবিরোধী হিসেবে অভিযুক্ত হওয়ার ভয় আমাদের আটকে রেখেছিল। তবে আজ আমরা অত্যন্ত ভেবেচিন্তে কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের ঘোষণা দিচ্ছি। এই পদক্ষেপগুলো ইসরায়েলের সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে নয়। বরং বর্তমান ইসরায়েল সরকারের অগ্রহণযোগ্য নীতিগুলোর বিরুদ্ধেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

ফিলিস্তিনি জনগণের এই দুর্দশা বিশ্ববিবেকের জন্য এক বড় কলঙ্ক। গাজায় শিশুসহ নিরীহ ফিলিস্তিনিদের হত্যা করা অব্যাহত রয়েছে। সেখানে এখনো ভয়াবহ মানবিক সংকট চলছে। কারণ, সেখানে খুব সামান্যই ত্রাণ পৌঁছাচ্ছে।

গাজার ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রা বোঝা সত্যিই কঠিন। সেখানে এরই মধ্যে ৭০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে অন্তত ২০ হাজারই শিশু। পরিবার ও সমাজগুলো একেবারে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। লাখ লাখ মানুষ আজ বাস্তুচ্যুত। ইসরায়েলি বাহিনী গাজার পুরো জনসংখ্যাকে এখন ভূখণ্ডটির মাত্র এক-তৃতীয়াংশ জায়গায় অবরুদ্ধ করে রেখেছে।

আমি জানি, এই বিষয়টি নিয়ে পুরো যুক্তরাজ্যের মানুষ গভীরভাবে ভাবছেন। আমিও বিষয়টি নিয়ে সমানভাবে উদ্বিগ্ন।

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগেই আমি একটি কথা বলেছিলাম। এই ইস্যুতে আমাদের দেশের প্রতিক্রিয়া অনেক ধীর ছিল। তা ছাড়া এই সাড়াদান একেবারেই পর্যাপ্ত ছিল না। আর এ কারণেই আমি সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম।

ফিলিস্তিনিদের এই ভয়াবহ দুর্দশা দিন দিন বাড়ছে। অন্যদিকে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের সম্ভাবনাও হুমকির মুখে পড়ছে। অথচ এই অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য এটিই সবচেয়ে বড় আশা। এসব দেখে আমি চুপ করে বসে থাকব না।

বর্তমান ইসরায়েল সরকার গত চার বছরে রেকর্ডসংখ্যক বসতি স্থাপনের অনুমোদন দিয়েছে। গত ২০ বছরেও এত বসতি নির্মাণ করা হয়নি। জাতিসংঘ জানিয়েছে, চলতি বছর ফিলিস্তিনিদের তাড়িয়ে দিতে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা দেড় হাজারেরও বেশিবার হামলা চালিয়েছে। আর সেখানকার পরিস্থিতি খুব দ্রুত আরও খারাপ হচ্ছে।

২০২২ সালের ডিসেম্বরে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বর্তমান ইসরায়েল সরকার এখন পর্যন্ত ১০৪টি নতুন বসতি স্থাপনের অনুমোদন দিয়েছে। ইসরায়েলে আগামী অক্টোবরের নির্বাচন সামনে রেখে তারা ‘ই-ওয়ান’ মেগা বসতি নির্মাণের দরপত্রেরও অনুমতি দিচ্ছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তা পশ্চিম তীরের একেবারে কেন্দ্রস্থলকে দ্বিখণ্ডিত করে ফেলবে। এর ফলে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের যে আশা রয়েছে, তা পুরোপুরি নিভে যাবে। আমরা কোনোভাবেই এমনটা হতে দিতে পারি না।

এ কারণেই আমরা ইসরায়েল সরকারের ওপর চাপ বাড়াতে একগুচ্ছ নতুন ও কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা দিচ্ছি:

প্রথমত, ফিলিস্তিনে গড়ে ওঠা অবৈধ বসতিগুলোর সঙ্গে আমরা সব ধরনের পণ্য বাণিজ্য নিষিদ্ধ করব।

দ্বিতীয়ত, ব্রিটিশ সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থানেও আমরা পরিবর্তন এনেছি। প্রথমবারের মতো আমরা বলছি, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের এই দখলদারি সম্পূর্ণ বেআইনি। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) রায়ের সঙ্গে সংগতি রেখেই আমরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

তৃতীয়ত, অবৈধ বসতি স্থাপনকে সমর্থন করা বা এতে সহায়তা করা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর আমরা নিষেধাজ্ঞা দেব। এমনকি যারা এসব বসতি থেকে লাভবান হচ্ছে, তারাও এর আওতায় পড়বে। এর মধ্যে ‘ই-ওয়ান’ বসতি নির্মাণে যুক্ত যে কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা বিনিয়োগকারীও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

পাশাপাশি, গাজায় অত্যন্ত প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তার একটি নতুন প্যাকেজও আমরা ঘোষণা করছি। আমরা মনে করি, এটিই এখন আমাদের সঠিক কাজ। তাই আমরা এসব পদক্ষেপ নিচ্ছি।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে চালানো ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার আমি তীব্র নিন্দা জানিয়েছি। পাশাপাশি হামাসের কর্মকাণ্ডেরও আমি নিয়মিত নিন্দা জানাই। তবে এর অজুহাতে গাজা বা পশ্চিম তীরে ইসরায়েল সরকারের বর্তমান কর্মকাণ্ডকে কোনোভাবেই বৈধতা দেওয়া যায় না।

আমরা মূলত অবৈধ বসতিগুলোকে লক্ষ্য করেই এই পদক্ষেপগুলো নিচ্ছি। আমাদের উদ্দেশ্য হলো ইসরায়েল সরকারের ওপর চাপ বাড়িয়ে তাদের এই পথ থেকে সরিয়ে আনা। আমরা পুরো ইসরায়েল রাষ্ট্রের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা চাপাচ্ছি না। কারণ, তেমন কিছু করলে ইসরায়েলের সাধারণ মানুষ শাস্তি পাবে। অথচ তাদের অনেকেই নিজের সরকারের এমন অবস্থানের সঙ্গে একমত নন।

ইসরায়েল সরকারের কর্মকাণ্ডের জন্য সেখানকার সাধারণ জনগণ দায়ী নয়। ঠিক একইভাবে যুক্তরাজ্যের ইহুদি সম্প্রদায়ও এর জন্য দায়ী নয়। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরকারের এমন কর্মকাণ্ডের জন্য ব্রিটিশ ইহুদিদের দোষারোপ করা পুরোপুরি ভুল। সহজ কথায়, এটি চরম ইহুদিবিদ্বেষ ছাড়া আর কিছুই নয়।

আমি গত সপ্তাহেই ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা করেছি। আমি জানি, প্রতিদিন তাদের কতটা ভয় ও উদ্বেগের মধ্য দিয়ে দিন কাটাতে হয়। আমার সরকার তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেবে। সমাজের প্রতিটি স্তর থেকে ইহুদিবিদ্বেষ নির্মূল করতে আমরা কোনো ছাড় দেব না।

ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিরা যেন শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে পাশাপাশি বসবাস করতে পারে, তার একমাত্র সমাধানকে রক্ষা করতেই আজ আমরা এসব ব্যবস্থা নিচ্ছি। যুক্তরাজ্যের আপামর জনসাধারণও ঠিক এমনটাই দেখতে চায়। আমার নেতৃত্বাধীন সরকার এই আশা বাঁচিয়ে রাখতে বিশ্বজুড়ে আমাদের অংশীদারদের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবে।


লেখক পরিচিতি

অ্যান্ডি বার্নহ্যাম যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী।

[প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের প্রতিফলন। এগুলো এশিয়া পোস্টের সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সঙ্গে সর্বদা মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখায় উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব; এ বিষয়ে এশিয়া পোস্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ।]