logo

ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটতে পারে যেভাবে

ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটতে পারে যেভাবে

ওয়াশিংটন ও তেহরান ‘গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছে’ বলে গত ২৩ মার্চ ঘোষণা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর এর পরপরই তিনি দাবি করেন, তেল, গ্যাস ও হরমুজ প্রণালির মতো কৌশলগত কিছু ইস্যুতে বড় ধরনের ছাড় দিতে রাজি হয়েছে ইরান।

ট্রাম্পের এই বক্তব্য এবং ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা স্থগিতের সিদ্ধান্তটি কূটনৈতিক মহলে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এমনকি সম্ভাব্য উত্তেজনা প্রশমনের আভাস বৈশ্বিক বাজারেও দ্রুত ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।

তবে এই আশাবাদ দুটি ভিন্ন বাস্তবতাকে গুলিয়ে ফেলছে। প্রথমটি হলো পারস্পরিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাব-নিকাশ, যেখানে যুদ্ধের ব্যয়ভার অসহনীয় হয়ে ওঠায় অনিচ্ছাসত্ত্বেও উভয় পক্ষই সংলাপে বসতে বাধ্য হয়। আর দ্বিতীয়টি, কার্যকর দরকষাকষির কাঠামো, যা নির্ধারণ করে কোনো স্থায়ী চুক্তি আদৌ সম্ভব কি না।

বর্তমান সংঘাতে প্রথমটির লক্ষণ দেখা গেলেও, দ্বিতীয় বিষয়টি এখনও অনুপস্থিত।

মার্কিন গবেষক উইলিয়াম জার্টম্যানের ধারণা, যুদ্ধ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা তখনই তৈরি হয়, যখন উভয় পক্ষই বুঝতে পারে যে, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষতি সম্ভাব্য সামরিক লাভ দিয়ে পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।

এই অবস্থার লক্ষণ এখন দুই পক্ষেই স্পষ্ট। ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে গেছে, নৌ সক্ষমতা দুর্বল হয়েছে এবং সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির হত্যাকাণ্ড তাদের নিরাপত্তা কাঠামোয় বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে।

অন্যদিকে, বিশ্বের এক পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনের পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে, যা ১৯৭৩ ও ১৯৭৯ সালের তেল সংকটের সম্মিলিত প্রভাবের চেয়েও বেশি গুরুতর বলে জানাচ্ছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে, বিশেষ করে মূল্যস্ফীতিতে।

এই চাপগুলোই কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধির নেপথ্যে। কিন্তু এগুলো আসল সমস্যার সমাধান করে না। আসল সমস্যাটি হলো পরস্পরের প্রতি অনাস্থা।

যুদ্ধ অবসানের ক্ষেত্রে ‘কমিটমেন্ট’ কেন্দ্রিক জটিলতা একটি বড় বাধা হিসেবে বিবেচিত। অর্থাৎ কোনো কার্যকর গ্যারান্টর না থাকলে পক্ষগুলো চুক্তি বাস্তবায়নের বিশ্বাসযোগ্য প্রতিশ্রুতি দিতে পারে না।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পারমাণবিক আলোচনা চলার মধ্যেই যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘সমঝোতা হাতের নাগালে।’ কিন্তু এরই মধ্যে সংঘাত শুরু হওয়ায় কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার ভিত্তি নষ্ট হয়ে যায়। আলোচনায় হওয়া সমঝোতা যে একতরফা পদক্ষেপে ভেস্তে যাবে না, সেই বিশ্বাস আর থাকে না।

এই বাস্তবতার কারণেই ইরান যুদ্ধবিরতির প্রথম প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, ইরান যুদ্ধবিরতি চায় না বরং যুদ্ধ স্থায়ীভাবে অবসান এবং ভবিষ্যৎ হামলার বিরুদ্ধে কার্যকর গ্যারান্টি চায়। কারণ আগের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দুই দফা গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক আলোচনার পরও ইরান হামলার মুখে পড়েছে।

যদি শুধু যুদ্ধবিরতি হয়, তাহলে এ সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল নিজেদের শক্তি পুনর্বিন্যাস করতে পারবে, কিন্তু ইরান তা পারবে না। ফলে ভবিষ্যতে আলোচনা ভেঙে গেলে ইরান আরও দুর্বল অবস্থানে পড়বে।

এই কারণে ইরানের কৌশল হলো, আগেই গ্যারান্টি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত চাপ বজায় রাখা।

এদিকে পাকিস্তানের মাধ্যমে পাঠানো ট্রাম্পের ১৫ দফা প্রস্তাব—যেখানে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ থামানো এবং হরমুজ প্রণালি স্থায়ীভাবে খোলা রাখার দাবি রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এসব চাওয়া কতটা বাস্তবায়নযোগ্য, তা আলোচনাযোগ্য। তবে এই ১৫ দফা প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ চাহিদার সীমা স্পষ্ট করে।

সাম্প্রতিক বক্তব্যে ট্রাম্প বলছেন, ইরানে সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্য পূরণ হয়েছে এবং তাদের সামরিক কাঠামো পরিবর্তনের মাধ্যমে যুদ্ধের প্রধান লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে। এ ধরনের কথা বলে তিনি মূলত ‘সম্মান নিয়ে’ যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার একটি পথ তৈরি করেছেন।

এই মুহূর্তের পরিস্থিতি অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসন তাদের আগের কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসার সুযোগ পাচ্ছে। এর ফলে যে কোনো সমঝোতাকে তারা নিজেদের দেশের মানুষের কাছে একটি ‘সামরিক বিজয়’ হিসেবে তুলে ধরতে পারবে।

কেমন হতে পারে যুদ্ধ অবসানের কার্যকর কাঠামো
একটি টেকসই চুক্তির জন্য ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন। প্রথম ধাপে হরমুজ প্রণালি চালু রাখা এবং তৃতীয় পক্ষের দেশগুলোর ওপর হামলা বন্ধের মতো বিষয়গুলো সমাধান করা যেতে পারে, যা তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক সংকট কমাবে।

পারমাণবিক ইস্যুর মতো বিষয়গুলো পরে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যেতে পারে।

তবে স্মর্তব্য, এখানে মূল সমস্যা রাজনৈতিক। চুক্তি টেকসই হবে কি না, সেটিই এখানে বড় প্রশ্ন।

এদিকে বর্তমানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে পাকিস্তান, তুরস্ক ও মিশর। কিন্তু ইরানের দৃষ্টিতে তারা নিরাপত্তা গ্যারান্টর হওয়ার সক্ষমতা রাখে না।

এক্ষেত্রে সবচেয়ে যৌক্তিক পক্ষ হতে পারে চীন। বিশ্বের বৃহত্তম তেল আমদানিকারক হিসেবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকা চীনের জন্য সরাসরি হুমকি। ইরানের সঙ্গে তাদের কৌশলগত সম্পর্ক এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রভাব—দুটিই তাদের বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।

আঞ্চলিক অংশগ্রহণের গুরুত্ব
চলমান সংঘাতে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও বাহরাইন সরাসরি প্রভাবিত হয়েছে। তারা একদিকে মার্কিন ঘাঁটির স্বাগতিক, অন্যদিকে ইরানের হামলার লক্ষ্য। তাদের বাদ দিয়ে কোনো চুক্তি করলে তা টেকসই হবে না। কারণ, যেসব পক্ষ চুক্তির অংশ নয়, তারা সেটি রক্ষায় আগ্রহীও থাকে না।

এরই মধ্যে রিয়াদ ও আবুধাবি ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে বাস্তববাদী অবস্থান দেখিয়েছে। কাতারও যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যানেল হিসেবে রয়ে গেছে। সুতরাং, তাদের অন্তর্ভুক্তি কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য নয়, বরং কাঠামোগত প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, বর্তমান পরিস্থিতিতে উভয় পক্ষই আলোচনায় আগ্রহী হওয়ার দিকে এগোচ্ছে। কিন্তু এখনও যে বিষয়টি অনুপস্থিত, তা হলো একটি টেকসই চুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো, বিশ্বাসযোগ্য গ্যারান্টর এবং আঞ্চলিক অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা।

এই সংঘাত বন্ধে ‘কমিটমেন্ট সমস্যা’ সমাধান করতে হলে সেই কাঠামো তৈরি অপরিহার্য। আর সেই আলোচনাই এখনো শুরু হয়নি। সম্ভবত এখনও পর্যন্ত এটিই সবচেয়ে জরুরি অনিষ্পন্ন বিষয়।

লেখক: সিনিয়র গবেষক, সেন্টার ফর কনফ্লিক্ট অ্যান্ড হিউম্যানিটারিয়ান স্টাডিজ, কাতার।