logo

ইসরায়েলের পারমাণবিক নীতি: নীরবতার আড়ালে সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রশ্ন

ইসরায়েলের পারমাণবিক নীতি: নীরবতার আড়ালে সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রশ্ন

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে এখন শুধু যুদ্ধবিমান উড়ছে না—উড়ছে এক অনুচ্চারিত আতঙ্কও। প্রতিদিনের ক্ষেপণাস্ত্র, পাল্টা হামলা আর হুমকির ভিড়ে একটি প্রশ্ন ক্রমশ ভারী হয়ে উঠছে: এই সংঘাত কি সেই সীমার দিকে এগোচ্ছে, যেখান থেকে আর ফিরে আসা যায় না?

বিশ্বের চোখ এখন গাজা, তেহরান বা তেল আবিবে। কিন্তু ছায়ার মতো পাশে দাঁড়িয়ে আছে আরেকটি বাস্তবতা—ইসরায়েলের পারমাণবিক সক্ষমতা। এমন এক শক্তি, যার অস্তিত্ব সবাই জানে, কিন্তু কেউ খোলাখুলি স্বীকার করে না। এমন এক নীতি, যা ইচ্ছাকৃতভাবে অস্পষ্ট রাখা হয়েছে, যাতে প্রয়োজনের সময় সেটি হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

দশকের পর দশক ধরে এই ‘নীরবতা’ কাজ করেছে—ভয় তৈরি করেছে, আবার সরাসরি জবাবদিহি এড়িয়ে গেছে। কিন্তু যুদ্ধের বাস্তবতায় সেই নীরবতা এখন আর নিরাপদ নয়। বরং যত সংঘাত বাড়ছে, ততই প্রশ্নটা স্পষ্ট হচ্ছে—ইসরায়েল আসলে কতদূর যেতে প্রস্তুত?

দশকের পর দশক ধরে বিশ্ব এক অদ্ভুত নীরবতা মেনে নিয়েছে—ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার আছে কি নেই, সে প্রশ্নের কোনো আনুষ্ঠানিক উত্তর নেই, তবু সবাই জানে বাস্তবতা কী। এই নীরব সমঝোতাকেই বলা হয় “নিউক্লিয়ার অপাসিটি”—এক ধরনের কৌশলগত অস্পষ্টতা, যা ইসরায়েলকে একদিকে দায় এড়াতে, অন্যদিকে শক্তি প্রদর্শনে সুবিধা দেয়।

কিন্তু আজ, যখন মধ্যপ্রাচ্য আবার বড় আকারের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে, এই নীরবতা আর নিরাপদ মনে হচ্ছে না। বরং প্রশ্নটা এখন আরও সরাসরি—ইসরায়েল আসলে কতদূর যেতে প্রস্তুত?

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থার হিসেবে, ইসরায়েলের হাতে অন্তত ৮০টির মতো পারমাণবিক ওয়ারহেড থাকতে পারে। সেগুলো বহনের জন্য রয়েছে বিমান, ক্ষেপণাস্ত্রসহ নানা সক্ষমতা। কিন্তু আসল বিষয় সংখ্যায় নয়—বরং ব্যবহারের সীমা কোথায়।

বিশ্বের অধিকাংশ পারমাণবিক শক্তিধর দেশ তাদের নীতিতে একটি বিষয় পরিষ্কার করে—পারমাণবিক অস্ত্র শেষ অবলম্বন, এবং সেটি মূলত অন্য পারমাণবিক শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ হিসেবে রাখা। কিন্তু ইসরায়েলের নিরাপত্তা দর্শন ভিন্ন। তাদের কৌশল একটাই—রাষ্ট্রের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা, যেকোনো মূল্যে।

এই জায়গাতেই সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। কারণ, যদি কোনো রাষ্ট্র নিজেকে ‘অস্তিত্বগত হুমকির’ মুখে মনে করে, তাহলে তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সীমা অনেকটাই নেমে আসে।

এই প্রেক্ষাপটে বহুদিন ধরে আলোচিত একটি ধারণা আবার সামনে আসে—“স্যামসন অপশন”। সরাসরি কোনো সরকারি নীতি নয়, কিন্তু ধারণাটা সহজ: যদি ইসরায়েল পরাজয়ের মুখে পড়ে, তাহলে সে এমন আঘাত হানতে পারে, যাতে প্রতিপক্ষের সঙ্গে নিজেও ধ্বংস হয়। এটি কেবল সামরিক কৌশল নয়, বরং মানসিক প্রস্তুতির ইঙ্গিত।

বর্তমান বাস্তবতায় এই প্রশ্নগুলো আর তাত্ত্বিক নয়। ইরানের সঙ্গে সংঘাত, একাধিক ফ্রন্টে উত্তেজনা, গাজা থেকে লেবানন—পুরো অঞ্চল যেন ধীরে ধীরে বিস্ফোরণের দিকে এগোচ্ছে। ডিমোনা, যেখানে ইসরায়েলের পারমাণবিক কর্মসূচির কেন্দ্র বলে মনে করা হয়, সেখানে হামলার ঘটনা দেখিয়েছে—এখন আর কিছুই ‘অস্পৃশ্য’ নয়।

আরেকটি অস্বস্তিকর সত্য হলো—ইসরায়েলের পারমাণবিক কর্মসূচি কার্যত আন্তর্জাতিক নজরদারির বাইরে। দেশটি পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (NPT)-এর সদস্য নয়। ফলে অন্য দেশগুলোর মতো নিয়মিত পরিদর্শন বা জবাবদিহির কাঠামো এখানে কার্যকর নয়।

অর্থাৎ, এমন একটি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র, যার অস্ত্রভাণ্ডার আছে—কিন্তু যার নীতি, সীমা এবং সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিশ্ব জানে খুবই সামান্য।

এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কোথায়? ঝুঁকি অস্ত্রে নয়—ঝুঁকি সিদ্ধান্তে।

কারণ ইতিহাস বলছে, যুদ্ধ যত দীর্ঘ হয়, চাপ তত বাড়ে। আর চাপ যত বাড়ে, ততই সিদ্ধান্তগুলো হয়ে ওঠে অপ্রত্যাশিত।

আজকের মধ্যপ্রাচ্য সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে—যেখানে একটি ভুল হিসাব, একটি ভুল সংকেত, অথবা একটি ‘শেষ অবলম্বন’-এর সিদ্ধান্ত পুরো অঞ্চল নয়, বরং বিশ্বকেই এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

এখন প্রশ্নটা আর কেবল ইসরায়েলের নয়। প্রশ্নটা—বিশ্ব কি প্রস্তুত সেই সম্ভাবনার জন্য? 

লেখক: ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নাট্যকার