ইরান যুদ্ধের ছায়ায় গাজায় আবারও নির্যাতনের ছক ইসরায়েলের

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর নতুন চিন্তার ভাঁজ পড়েছে গাজাবাসীর ওপর। অতীতে সীমান্ত ক্রসিং বন্ধ করে দেওয়ার কথা তাদের মনে আছে। কীভাবে ইসরায়েলি তৈরি দুর্ভিক্ষ গাজাবাসীর জীবনমান রুক্ষ করে তুলেছে তা বিশ্ব দেখেছে।
ক্রসিং যখন বন্ধ করে রাখা হয় বাজারে তখন খাদ্য এবং প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে ওঠে, তবুও বাজারে কিছু না কিছু কিনতে যেতে হয়। ইসরায়েলের যখন প্রয়োজন পড়ে হঠাৎ খবর আসে যে, সীমান্ত ক্রসিং বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
নিবন্ধনের শর্ত পূরণ না করায় ইসরায়েল গাজা থেকে ৩৭টি এনজিও সংস্থা অবৈধ ঘোষণা করেছে। তাও নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার ঠিক পরেই এই ঘটনা ঘটল। ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স (এমএসএফ), মেডিকেল এইড ফর প্যালেস্টাইনিস ইউকে, হ্যান্ডিক্যাপ ইন্টারন্যাশনাল: হিউম্যানিটি অ্যান্ড ইনক্লুশন, অ্যাকশনএইড, কেয়ার ইত্যাদি সংস্থাগুলোর গাজায় কার্যক্রম বন্ধ করার কথা ছিল।
শেষ মুহূর্তে এসে ইসরায়েলি সুপ্রিম কোর্টের একটি রায় এনজিওগুলোর নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে আপিল বিবেচনা না করা পর্যন্ত কাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু আদালতের এই সিদ্ধান্তের পরেও সংস্থাগুলো পুরোপুরি কাজ চালিয়ে যেতে পারছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। কারণ ইসরায়েলি দখলদারিত্ব তাদের সরবরাহ এবং বিদেশি কর্মীদের গাজায় প্রবেশে বাধা দিচ্ছে।
এনজিওগুলোর মতে, তারা একসঙ্গে গাজায় খাদ্য বিতরণের অর্ধেক এবং ফিল্ড হাসপাতালগুলোতে প্রদত্ত পরিষেবার ৬০ শতাংশের জন্য দায়বদ্ধ। গাজায় বসবাসরত অনেক পরিবারের জন্য এর অর্থ হলো ক্ষুধা—কারণ খাদ্য সহায়তা আর বিতরণ করা হবে না এবং জীবিকা হারিয়ে যাবে। এই নীতি এনজিওগুলোর নতুন নিবন্ধকরণ নিয়ম পালনে ব্যর্থতা নয়, ঠিক যেমন সীমান্ত পারাপার বন্ধ করা নিরাপত্তার বিষয় নয়। এগুলো ফিলিস্তিনিদের ওপর ‘যৌথ দণ্ড’ দেওয়ারই আরেক রূপ।
এমনকি সুপ্রিম কোর্ট যদি অলৌকিকভাবে এনজিও নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে রায় দেয়, তবুও ইসরায়েলি দখলদাররা গাজা থেকে এই বিদেশি সংস্থাগুলোকে বের করে দেওয়ার অন্য কোনো না কোনো পথ খুঁজে নেবে। ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেন গাজায় কয়েক ডজন খাবার পরিবেশনের কেন্দ্র পরিচালনা করছে। সংস্থাটি এই নিষেধাজ্ঞার তালিকায় নেই, তারাও তাদের কার্যক্রম স্থগিত করতে পারে বলে চলতি মাসে জানিয়েছে।
গাজার সরকারি মিডিয়া অফিসের তথ্যমতে, এর কারণ হলো ইসরায়েল এই সংস্থার বেশিরভাগ সরবরাহ ট্রাক প্রবেশে বাধা দিয়েছে। ফলে রান্না চালিয়ে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত উপকরণ নেই। ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেন আগে জানিয়েছিল, তারা প্রতিদিন ১০ লাখ মানুষকে খাবার পরিবেশন করে। ফলে এখন ইরান মার্কিন-ইসরায়েলের হামলায় আবারও লাখো পরিবার পর্যাপ্ত খাবার থেকে বঞ্চিত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এই সবকিছুর ওপর যোগ হয়েছে ইউএনআরডব্লিউএর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ। ১৯৪৯ সালের শেষদিকে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই জাতিসংঘ সংস্থাটি ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তার মেরুদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। জরুরি পরিস্থিতিতে সাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে এর সক্ষমতা সবচেয়ে বেশি এবং এটি সবথেকে বিস্তৃত পরিসরে সেবা প্রদান করে আসছে। তবে তা সত্ত্বেও, ইসরায়েল এই সংস্থার কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে এবং গাজায় সংস্থাটির ত্রাণ সরবরাহ প্রবেশে বাধা দিচ্ছে।
নিরলস তদবিরের মাধ্যমে ইসরায়েল ইউএনআরডব্লিউএর বাজেটে বড় ধরনের কাটছাঁট করতে সক্ষম হয়েছে। ফলে, গত মাসে ৬০০ কর্মচারীকে ছাঁটাই করা হয়েছে এবং বাকিদের বেতন ২০ শতাংশ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এনজিওগুলোর ওপর এই নিষেধাজ্ঞার ফলে সম্ভবত আরও হাজার হাজার মানুষ তাদের কর্মসংস্থান হারাবে। আর এটি এমন এক সময়ে ঘটছে যখন গাজায় বেকারত্বের হার ৮০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।
ওহুদ নাসার গাজার একজন সাংবাদিক এবং শিক্ষক। তিনি উই আর নট নাম্বারস, নিউ আরব, ইনস্টিটিউট ফর প্যালেস্টাইন স্টাডিজ, ইলেকট্রনিক ইন্তিফাদা এবং প্রিজমে লেখালেখি করে থাকেন। সংবাদমাধ্যম আলজাজিরায় নিজের নিবন্ধে ওহুদ নাসার তার পরিবারও এর ভুক্তভোগী বলে উল্লেখ করেছেন। বলেন, অতীতে আমরা এনজিও থেকে খাদ্য ও মৌলিক রসদ সহায়তা পেয়েছি এবং আমার ভাই একটি সংস্থায় পরিচালক হিসেবে অস্থায়ী কাজ পেয়েছিল। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সম্ভাব্য এই বন্ধ হয়ে যাওয়া লাখ লাখ বেসামরিক মানুষের জীবনের জন্য সরাসরি হুমকি, যারা এই সেবা ও কর্মসংস্থানের ওপর নির্ভরশীল। সীমান্ত পারাপার বন্ধ হওয়ার কারণে হতে পারে আরেকটি চরম খাদ্য সংকট।
ওহুদ নাসার জানান, এসব ইসরায়েলের ‘যৌথ দণ্ড’ বা কালেক্টিভ পানিশমেন্টের একটি রূপ, যা আবারও সংবাদে জায়গা পাবে না। ইসরায়েল প্রতিনিয়ত বিধ্বস্ত মাতৃভূমিতে আমাদের জীবনকে আরও অসহনীয়, আরও অসম্ভব করে তোলার জন্য নতুন নতুন উপায় ভাবছে। আড়াই বছরের ইসরায়েলি গণহত্যা হাসপাতাল, স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, রাস্তাঘাট, পয়ঃনিষ্কাশন ও খাবার পানি ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ গ্রিড এবং অসংখ্য জেনারেটর ও সোলার প্যানেল ধ্বংস করে দিয়েছে। জনসংখ্যার বিশাল অংশ তাবু বা অস্থায়ী আশ্রয়ে আদিম জীবনযাপন করছে, যা মানুষকে তীব্র গরম বা হাড়কাঁপানো শীত থেকে রক্ষা করতে পারছে না।
গাজা উপত্যকায় পানি দূষিত, খাবার অপর্যাপ্ত এবং জমি ধ্বংসে পরিণত ও গোলাবারুদে বিষাক্ত হয়ে গেছে। ওহুদ নাসার বলেন, এখন আমাদের যে সামান্য আন্তর্জাতিক সহায়তাটুকু অবশিষ্ট ছিল, তা থেকেও আমাদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। আর এই সবকিছুর লক্ষ্য কী? আমাদের চূড়ান্ত হতাশা ও আত্মসমর্পণের দিকে ঠেলে দেওয়া, যাতে আমরা নিজেরাই নিজেদের মাতৃভূমি ছেড়ে চলে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করি। এটি মূলত এক ধরনের ‘পারস্পরিক সম্মতির’ মাধ্যমে জাতিগত নিধন।
ইসরায়েল যেসব সংস্থাকে নিষিদ্ধ করতে চাইছে, তার সবগুলোই বিদেশি। এগুলোর বেশিরভাগই পশ্চিমা দেশভিত্তিক। অথচ ইসরায়েল যখন তাদেরই নিজস্ব সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে, তখন পশ্চিমা সরকারগুলোর পক্ষ থেকে তেমন কোনো নিন্দা দেখা যাচ্ছে না। দখলদার বাহিনী আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা ব্যবস্থা ধ্বংস করে ত্রাণের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইছে—এই নিয়ে কোনো ক্ষোভ বা প্রতিবাদ নেই।
‘যৌথ দণ্ড’ বা কালেক্টিভ পানিশমেন্ট আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্ব কেবল মৌখিক নিন্দার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে পদক্ষেপ নেওয়া। যতক্ষণ না তা ঘটছে, গাজায় আমরা দখলদারদের হাতে আরও নিষ্ঠুর সব যৌথ দণ্ডের শিকার হতে থাকব।
লেখক: গাজার সাংবাদিক ও শিক্ষক
আলজাজিরার মতামত বিভাগ থেকে অনূদিত
[ প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের প্রতিফলন। এগুলো এশিয়া পোস্টের সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সঙ্গে সর্বদা মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখায় উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব; এ বিষয়ে এশিয়া পোস্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ। ]