logo

আলজাজিরার কলাম/আফ্রিকার সবুজ বিপ্লব ঐতিহ্যবাহী খাবারের জন্য হুমকি স্বরূপ

ড. মিলিয়ন বেলা
ড. মিলিয়ন বেলা
টিমোথি এ. ওয়াইজ
টিমোথি এ. ওয়াইজ
আফ্রিকার সবুজ বিপ্লব ঐতিহ্যবাহী খাবারের জন্য হুমকি স্বরূপ
কেনিয়ার কোয়ালেতে নিজের খামারের একটি শুষ্ক ভুট্টা ক্ষেতের মাঝে দাঁড়িয়ে আছেন একজন কৃষক (২০০৯ সালের ২৭শে জানুয়ারী)। ছবি: রয়টার্স

চলতি বছর, দাতাদের অর্থায়নে পরিচালিত কৃষি উন্নয়ন উদ্যোগ 'আগ্রা' (AGRA— “অ্যালিয়েন্স ফর এ গ্রিন রেভোলিউশন ইন আফ্রিকা”) তাদের ২০তম বার্ষিকী উদযাপন করছে।

আগ্রার স্লোগান হলো "আফ্রিকার খাদ্য ব্যবস্থার টেকসই বৃদ্ধি", কিন্তু বছরের পর বছর ধরে গবেষক ও কৃষকেরা সতর্ক করে আসছেন যে সংস্থাটির প্রচারিত নীতিগুলো আফ্রিকান কৃষিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

নতুন গবেষণা এই সত্যের আরও প্রমাণ দেয়। এতে দলিলভুক্ত করা হয়েছে যে, কীভাবে বাণিজ্যিক বীজ, সার এবং অন্যান্য উপকরণের প্রচারের মাধ্যমে আগ্রার সবুজ বিপ্লব প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তাদের প্রতিশ্রুতি দেওয়া "উৎপাদনশীলতার বিপ্লব" ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছে।

আরও খারাপ বিষয় হলো, ভুট্টার মতো একফসলী চাষের প্রচারের ফলে এই ফসলগুলোর জন্য নির্ধারিত জমির ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। একই সময়ে, বাজরার মতো আরও স্থিতিস্থাপক ও পুষ্টিকর স্থানীয় ফসলগুলো তাদের অবস্থান হারাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন, মরুকরণ, দ্বন্দ্ব এবং আন্তর্জাতিক সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক সরবরাহ লাইনে বিঘ্ন ঘটায় আফ্রিকায় ক্ষুধা বেড়েই চলেছে, কিন্তু আগ্রা দ্বারা প্রচারিত সবুজ বিপ্লব এতে তেমন কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি।

আগ্রার উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি থাকা দেশগুলোতে অপুষ্ট মানুষের সংখ্যা প্রায় ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা মহাদেশের অবশিষ্টাংশের হারের প্রায় সমান।

জাতিসংঘ "সাশ্রয়ী মূল্যের স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস"-এর ওপর অধিক মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে। আফ্রিকার ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য, যারা তাদের পরিবার ও সম্প্রদায়ের খাওয়ার জন্য ফসল ফলান, এর অর্থ হলো ফসলের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি করা — যা সবুজ বিপ্লবের উৎপাদিত ফলাফলের ঠিক বিপরীত। আগ্রা প্রকল্পে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোতে ভুট্টার মতো ফসলকে বিলিয়ন ডলারের ভর্তুকি ও বিনিয়োগের মাধ্যমে উৎসাহিত ও অর্থায়ন করা হয়। তা সত্ত্বেও, ১৮ বছরে ভুট্টার ফলন মাত্র ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আগ্রার প্রতিশ্রুতি দেওয়া ১০০ শতাংশ উন্নতির চেয়ে অনেক কম।

তবে জলবায়ু-সহনশীল ও পুষ্টিকর দানা শস্য বাজরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০০৬ সালের আগে এসব দেশে ভুট্টার মতোই বাজরার প্রচলন ছিল। ২০০৬ সাল থেকে বাজরা উৎপাদন ২৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যেখানে ভুট্টার উৎপাদন দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। বিনিয়োগের অভাবে বাজরার ফলন ১৭ শতাংশ কমে গেছে। এছাড়া ভুট্টা চাষের জন্য বরাদ্দ জমি ৭১ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও বাজরার জমি ১২ শতাংশ কমেছে।

বাজরা কোনো অনগ্রসর ফসল নয় যা ভুট্টার দ্বারা প্রতিস্থাপিত হওয়ার অপেক্ষায় ছিল; এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আফ্রিকার শুষ্ক অঞ্চলের সম্প্রদায়গুলোকে খাইয়ে আসছে। এটি তাপ ও খরা সহ্য করতে পারে, তুলনামূলকভাবে কম বাহ্যিক উপাদানে জন্মায় এবং অন্যান্য ফসল যখন ব্যর্থ হয় তখনও পুষ্টিকর খাদ্য সরবরাহ করে। ২০২৩ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা পরিবেশ ও সামাজিক কল্যাণে এই ফসলের বহুমুখী সুবিধার কথা তুলে ধরে "আন্তর্জাতিক বাজরা বর্ষ" উদযাপন করেছে।

আফ্রিকার বহু ঐতিহ্যবাহী ফসল — সোঘাম, ফোনিও, কাউপি, কাসাভা, দেশীয় শাকসবজি এবং আরও অনেক ফসলের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এগুলো আফ্রিকান কৃষির জৈবিক বৈচিত্র্যের অংশ, পাশাপাশি রন্ধনপ্রণালী, জ্ঞান এবং সংস্কৃতিরও অংশ।

জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে এমন ফসলকে সরিয়ে দেওয়া একেবারেই যুক্তিহীন। খামারে কৃষকদের বেশি বিকল্প দরকার, কম নয়। একটি বৈচিত্র্যময় খামার ঝুঁকি হ্রাস করে: যখন একটি ফসল খরা, পোকা বা রোগে আক্রান্ত হয়, তখন অন্যটি টিকে থাকতে পারে, এবং ফসলের আবর্তন ও বৈচিত্র্য মাটি উর্বর রাখতে সাহায্য করে।

মুখে আগ্রা এখন স্বীকার করছে যে তারা সেই ফসলগুলোকে মূল্যায়ন করে যেগুলোকে তাদের সবুজ বিপ্লব প্রান্তে ঠেলে দিতে সাহায্য করেছিল। এটি বৈচিত্র্যময়, পুষ্টিকর এবং জলবায়ু-অনুকূল ফসলের কথা বলে এবং এর বীজ কর্মসূচির মধ্যে বাজরা, সোঘাম, কাউপি, চিনাবাদাম এবং অন্যান্য ফসল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই ফসলগুলোতে গুরুতর বিনিয়োগকে স্বাগত জানানো যায়, তবে আগ্রা এবং অন্যান্য সবুজ বিপ্লবের সমর্থকেরা যে তাদের পছন্দসই একফসলী চাষ (যেমন ভুট্টা) ত্যাগ করবে এমন কোনো ইঙ্গিত নেই।

আগ্রার বর্তমান বীজ কৌশল এখনও উন্নত জাত, প্রত্যয়িত বীজ, দ্রুত জাত পরিবর্তন, বাণিজ্যিকীকরণ এবং বাজারমুখী বীজ ব্যবস্থার ওপর জোর দেয়।

কৃষকদের নিজেদের বীজ সংরক্ষণ, ব্যবহার, বিনিময় এবং উন্নত করার অধিকারকে সমর্থন করা, ফসলের বৈচিত্র্য ও দেশীয় কৌশল রক্ষা করা এবং বীজ বাজারের বদলে কৃষক ও সম্প্রদায় যাতে নির্ধারণ করতে পারে কোন জাতটি টিকে থাকবে, সে ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন।

আফ্রিকান কৃষকদের রক্ষার প্রয়োজন নেই, তবে তাদের ফসল বাজরা, সোঘাম, কাউপি, ফোনিও এবং অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী ফসলগুলোকে সবুজ বিপ্লবের উদ্ভিদ-প্রজননকারীদের হাত থেকে উদ্ধার করা দরকার।

যখন খামার থেকে একটি ঐতিহ্যবাহী ফসল অদৃশ্য হয়ে যায়, তখন স্থানীয়ভাবে অভিযোজিত বীজের জাত, সেগুলো চাষ ও প্রস্তুতির প্রক্রিয়া এবং স্থানীয় খাদ্যাভ্যাস ও পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু খাদ্যগুলো হারিয়ে যায়।

এ কারণেই বাজরার অবক্ষয় নিয়ে উদ্বেগ থাকা উচিত। আফ্রিকা ইতিমধ্যেই জলবায়ু পরিবর্তন এবং অস্থির আন্তর্জাতিক খাদ্য ও সারের বাজারের ঝুঁকির মুখে রয়েছে, আর বৈচিত্র্যই এই ঝুঁকির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।

কিন্তু আমরা তার বিলুপ্তিতেই ভর্তুকি দিচ্ছি। সকলের জন্য পুষ্টিকর খাদ্যের সুযোগ বৃদ্ধির জন্য জাতিসংঘের আহ্বানী যথেষ্ট নয়; আফ্রিকার অধিকাংশ গ্রামীণ জনসংখ্যার জন্য, যারা সবচেয়ে কম খাদ্য-নিরাপদ, ফসলের বৈচিত্র্যই খাদ্যের বৈচিত্র্যের মূল চাবিকাঠি। তাই আগ্রা, আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, বিদেশী দাতা এবং আফ্রিকান সরকারগুলোর উচিত সেই ফসলগুলোতে ভর্তুকি ও প্রচার বন্ধ করা যা এই বৈচিত্র্য হ্রাসের কারণ হচ্ছে।


লেখক পরিচিতি

ড. মিলিয়ন বেলা (‘অ্যালিয়েন্স ফর ফুড সোভারেন্টি ইন আফ্রিকার সমন্বয়কারী)

টিমোথি এ. ওয়াইজ (টাফটস ইউনিভার্সিটির 'গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট ইনস্টিটিউট'-এর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো।)

[প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের প্রতিফলন। এগুলো এশিয়া পোস্টের সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সঙ্গে সর্বদা মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখায় উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব; এ বিষয়ে এশিয়া পোস্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ।]