বিশ্ব শিক্ষক দিবস ২০২৬: আমাদের শিক্ষকের পাশে দাঁড়াতেই হবে

কথিত আছে, জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেলকে একবার তাঁর দেশের বিচারক, ডাক্তার, প্রকৌশলীরা শিক্ষকদের সমান বেতন দাবি করলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। বলেছিলেন, “How can I compare you to those who taught you?” কথাটা কী গভীর তাৎপর্যপূর্ণ, তা আমরা সহজেই উপলব্ধি করতে পারি। আমি, আপনি আজ যেখানে অবস্থান করছি, সেখানে পৌঁছাতে আমাদের শিক্ষকের সাহায্য নিতে হয়েছে। আবার আমাদের সন্তানদেরকেও আমরা শিক্ষকের কাছেই পাঠাচ্ছি যোগ্য মানুষ হতে। অথচ সেই শিক্ষকের প্রতি আমাদের উদাসীনতা সীমাহীন! জাতি হিসেবে আমাদের পশ্চাৎপদতার অন্যতম কারণ এই উদাসীনতা।
আমরা হয়তো ধরে নিয়েছি শিক্ষকতা খুব সহজ কাজ। সেজন্য নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতা-সম্পন্ন যেকোনো ব্যক্তিকেই আমরা শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ করছি শিক্ষার সকল স্তরে। একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে বিষয়জ্ঞান থাকলেই যে ভালো শিক্ষক হওয়া যায় না, এটা আজ প্রমাণিত। প্রাথমিক স্তরের একজন শিক্ষকের কথা ধরা যাক। যেকোনো বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি হলেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু প্রাথমিক স্তরে শিশুর শিক্ষাদানের মতো একটি সংবেদনশীল কাজের জন্য তার কোনো প্রস্তুতি নেই। এমনকি অধিকাংশই অনিচ্ছুক শিক্ষক। অর্থাৎ শিক্ষক তিনি হতে চাননি। নেহাত একটা চাকরির প্রয়োজনে অনিচ্ছুক হয়ে পড়েছেন শিক্ষকতা পেশায়। অতঃপর একটা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাকে শিক্ষক হিসেবে তৈরি করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেখানেও সীমাবদ্ধতা অপরিমেয়। কাজেই প্রস্তুতিহীন এই সকল অনিচ্ছুক শিক্ষক নিতান্ত জীবিকার প্রয়োজনে শিক্ষকতার চাকরিটি আঁকড়ে থাকেন জীবনভর। কিন্তু শেষতক শিক্ষক হয়ে ওঠা অধরাই থেকে যায়।
তদুপরি, শিক্ষক হিসেবে প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধা বা রাষ্ট্র নির্ধারিত সম্মানের ক্ষেত্রেও শিক্ষকগণকে রাখা হয়েছে নিচের কাতারে। ফলে শিক্ষক হয়ে ওঠার কোনো প্রেষণা আর শেষ পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকে না। অথচ শিক্ষার মান নিয়ে কথা বলার সময় আমরা ঠিকই এই সকল শিক্ষককেই দায়ী করি। একজন শিক্ষকের আন্তরিকতা ও কর্তব্যনিষ্ঠার মাধ্যমেই সুশৃঙ্খল ও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে তাঁর শ্রেণি কার্যক্রম। একজন শিক্ষক তাঁর নিজস্ব চিন্তা-চেতনা, ব্যক্তিত্ব, মেধা, যোগ্যতা, মননশীলতা আর আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা করেন। শ্রেণিশিক্ষক শিক্ষার্থীর নিকট কখনও হন একজন আদর্শ শিক্ষক, অভিভাবক, পিতা, কখনও হন রসিক, গম্ভীর। একজন শিক্ষককে হতে হয় দৃঢ়চেতা, উত্তম নৈতিক চরিত্রের অধিকারী, নিরপেক্ষ, অকুতোভয়, সত্যবাদী। তিনি তাঁর অনুপম চারিত্রিক মাধুর্য দিয়ে শিক্ষার্থীর মন জয় করে নেন। এক কথায় তিনি হয়ে ওঠেন তাঁর শিক্ষার্থীর নিকট এক অনুসরণীয় আদর্শ। একজন শিক্ষকের মধ্যে থাকতে হয় উদ্ভাবনী ক্ষমতা, নতুন কিছু সৃষ্টি করার নিরন্তর প্রচেষ্টা। তাঁকে হতে হয় শিক্ষার্থীর সুপ্ত প্রতিভা বিকাশ ও উন্নয়নের এক অনিবার্য মাধ্যম।
শিখন-শেখানো প্রকৃতিগতভাবেই স্বতঃস্ফূর্ত হতে পারে এবং শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক হতে পারে, যখন শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুমের চার দেয়ালের বন্দিদশা থেকে বাইরের মুক্ত বাতাসে নিয়ে আসা হয়। শিক্ষার্থীরা যখন কোনো বিষয় বাস্তবজীবনে অনুশীলন করার সুযোগ পায়, তখন শ্রেণিকক্ষের বাইরে এবং ভেতরে এক ধরনের সম্পর্ক সৃষ্টি করতে পারে এবং প্রাসঙ্গিকতা রক্ষা করতে পারে। বিদ্যালয় একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান। বিদ্যালয় ক্যাচমেন্ট এলাকার শিশুরা বিদ্যালয়ে শুধু লেখাপড়া শিখতে আসে না, তারা লেখাপড়ার পাশাপাশি সহপাঠীদের সঙ্গে খেলাধুলা, মতবিনিময়, ভাববিনিময়, দুষ্টুমি প্রভৃতি করে থাকে। শিশুর সার্বিকভাবে বেড়ে উঠতে একটি বিদ্যালয় অনন্য ভূমিকা পালন করে থাকে। আর তা করে থাকে যোগ্য শিক্ষকের নেতৃত্বে।
আমি প্রাথমিক শিক্ষার একজন সামান্য কর্মী। সম্প্রতি সারা দেশে প্রায় ১৪,০০০ নতুন শিক্ষক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়োগ লাভ করেছেন। উপজেলা প্রাইমারি এডুকেশন ট্রেনিং সেন্টারগুলোতে তাঁদের ৫ দিনব্যাপী ইনডাকশন ট্রেনিং চলমান। আমাদের উপজেলায় নিয়োগপ্রাপ্ত ৩৩ জন নতুন শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে এবং তাঁদের একাডেমিক পড়ালেখার বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে জানা গেল, তাঁরা সকলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পার হয়ে এসেছেন। নিয়োগ প্রক্রিয়ার তীব্র প্রতিযোগিতা তো ছিলই। অতএব বলা যায়, গড় বিচারে এঁরা বেশ মেধাবী। এই মেধাবী তরুণ-তরুণীরা শিক্ষক হয়েছেন জেনে-বুঝেই। অনেকেই হয়তো চেষ্টা করবেন ভালো সুযোগের, কিন্তু বেশির ভাগেরই সে চেষ্টা সফল হবে না। অতীতের পরিসংখ্যান তাই সাক্ষ্য দিচ্ছে। তাহলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যে মেধাবীরা আসছেন এবং থেকে যাচ্ছেন, তাঁদের পেশাগত দক্ষতা দিয়ে প্রাথমিক শিক্ষা এগোতে পারছে না কেন? এই প্রশ্নটির উত্তর খোঁজা জরুরি।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শিক্ষক দিবসের ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ইউনেস্কো/আইএলও সুপারিশমালার ৬০ বছর পূর্ণ হওয়ার এই মাহেন্দ্রক্ষণে, ২০২৬ সালের বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে: “Standing with teachers: 60 years of protecting the profession, advancing its status and shaping our futures” (শিক্ষকের পাশে দাঁড়ানো: পেশার সুরক্ষায়, মর্যাদার অগ্রগতিতে ও ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে ৬০ বছর)। বিশ্বজুড়ে যখন বদলে যাওয়া সমাজ, প্রযুক্তি ও শিক্ষাব্যবস্থার চ্যালেঞ্জের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জোর চেষ্টা চলছে, তখন এই প্রতিপাদ্যটি বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষাক্ষেত্র এবং শিক্ষকের সামগ্রিক অবস্থানের ওপর আলো ফেলার এক অসামান্য সুযোগ তৈরি করেছে। একটি দেশের সামগ্রিক শিক্ষাকাঠামোর শক্ত ভিত্তি তৈরি হয় প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শ্রেণিকক্ষে। অথচ বাংলাদেশে এই ভিত্তিমূল যারা গড়ে তোলেন, সেই প্রাথমিক শিক্ষকরা কি পর্যাপ্ত মর্যাদা ও পেশাগত সুরক্ষা পাচ্ছেন?
আইএলও এবং ইউনেস্কোর সুপারিশে শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা, উপযুক্ত বেতন স্কেল, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ এবং অব্যাহত পেশাগত উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে সম্প্রতি হাজার হাজার নতুন ও তরুণ শিক্ষক প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় যুক্ত হচ্ছেন, যা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু তাঁদের কাজের পরিবেশ, সামাজিক ও প্রশাসনিক স্বীকৃতি এবং ক্যারিয়ার গ্রোথের সুযোগ এখনও বহু প্রশ্নের জন্ম দেয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মূল কাজ শিশুকেন্দ্রিক ও আনন্দময় পরিবেশে শিখন-শেখানো কার্যক্রম পরিচালনা করা। তবে বাস্তব চিত্র হলো, শিক্ষকদের সময় ও মেধার একটি বড় অংশ ব্যয় হয়ে যায় অপ্রাসঙ্গিক প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কাজ সামলাতে। শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানো মানে কেবল আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছা জানানো নয়; বরং তাঁদের শ্রেণিকক্ষে কার্যকর ভূমিকা পালন করার মতো পরিবেশ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
প্রাথমিক শিক্ষার শিক্ষণ পদ্ধতির আধুনিকায়ন, প্রাক-প্রাথমিকে খেলার ছলে শিখন (Play-based learning) ও প্রারম্ভিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (STEM) শিক্ষার সঠিক প্রয়োগ ঘটাতে হলে শিক্ষকদের নিয়মিত, আধুনিক ও গবেষণানির্ভর পেশাগত উন্নয়ন প্রচেষ্টা ও প্রশিক্ষণ জরুরি। রূপান্তরমূলক শিখন বাস্তবায়নে শিক্ষকদের নীতি-নির্ধারণী আলোচনার অংশীদার করা প্রয়োজন। অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈষম্যহীন শ্রেণিকক্ষ তৈরিতে শিক্ষকরাই মূল ভূমিকা রাখেন। শ্রেণিকক্ষে উদ্ভাবনী কৌশল প্রয়োগে শিক্ষকের যেন কোনো বাধা বা ভয়ের মুখোমুখি হতে না হয়, তা নিশ্চিত করাই পেশাগত সুরক্ষা। এছাড়া, যোগ্য ও মেধাবী তরুণদের প্রাথমিক শিক্ষকতায় ধরে রাখতে হলে বেতন কাঠামো ও পদোন্নতির সুনির্দিষ্ট নীতিমালার সংস্কার সময়ের দাবি। শিক্ষাপ্রযুক্তির প্রসার এবং কারিকুলামের সংস্কার যা-ই হোক না কেন, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের বিকল্প অন্য কিছু হতে পারে না। শিশু কীভাবে চিন্তা করতে শিখবে, কীভাবে সহমর্মিতা ও স্ব-নিয়ন্ত্রণ চর্চা করবে—তা একজন শিক্ষকের প্রত্যক্ষ উপস্থিতিতেই ঘটে।
বিশ্ব শিক্ষক দিবসের এই প্রতিপাদ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিক্ষার কোনো সংস্কারই সফল হবে না, যদি আমরা শিক্ষককে কেন্দ্রে না রাখি। প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত রূপান্তর আনতে হলে রাষ্ট্র ও সমাজকে আজ অনতিবিলম্বে শিক্ষকের পাশে এসে দাঁড়াতে হবে—তাঁদের মর্যাদা নিশ্চিত করে, পেশাগত সুরক্ষা দিয়ে এবং একটি সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের সুযোগ তৈরি করে।
লেখক পরিচিতি: জগজ্জীবন বিশ্বাস শিক্ষা বিজ্ঞানে স্নাতক (ঢা.বি.), শিশু শিক্ষায় ডিপ্লোমা (জাপান), এম. এ. ইন এডুকেশন (যুক্তরাজ্য)
