logo

আলজাজিরার কলাম /মক্কা চুক্তি: একটি নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা

খালিদ আল-জাবের
খালিদ আল-জাবের
মক্কা চুক্তি: একটি নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট তাইয়েপ এরদোয়ান, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। ছবি: সংগৃহীত

২০২৬ সালের ৭ আগস্ট মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তান যে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, তা জোট এবং ইশতেহারে ঠাসা এই অঞ্চলে কেবল আরেকটি সংযোজন নয়। এর তাৎপর্য চুক্তির ধারাগুলোর চেয়ে এটি কীসের সংকেত দিচ্ছে তার মধ্যে বেশি নিহিত। চুক্তিটি উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো তাদের নিজস্ব নিরাপত্তাকে কীভাবে দেখছে, সেই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন।

মার্কিন শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা থেকে সরে আসা

রিয়াদ এবং তার প্রতিবেশীরা তাদের কৌশলগত নিরাপত্তাকে একক কোনো নিশ্চয়তাদানকারীর সঙ্গে রাখতে ক্রমশ অনিচ্ছুক বলে মনে হচ্ছে। এর বিকল্প হিসেবে তারা অংশীদারিত্বের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে, যা তাদের বিকল্পসমূহ, সক্ষমতা এবং কৌশলগত সুযোগকে বহুমুখী করে। এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার সমাপ্তি চিহ্নিত করে না, বরং এটি একটি আরও বহুমাত্রিক ব্যবস্থার প্রস্তুতির শুরু—এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। এটি মূলত এমন একটি উদ্দ্যোগ যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি কম এবং অনির্দিষ্ট।

গত দশকের ঘটনাবলী উপসাগরীয় অঞ্চলের হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়েছে। প্রশ্নটি এখন আর মার্কিন শক্তির বিশালতা নিয়ে নয়, বরং এর ব্যবহার নিয়ে। একটি রাষ্ট্র কোটি কোটি ডলারের মার্কিন অস্ত্র কিনতে পারে, সামরিক ঘাঁটি ও সৈন্য রাখতে পারে এবং ওয়াশিংটনের সাথে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে; কিন্তু সংকটের সময় আবিষ্কার করতে পারে যে পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্তটি মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং ভূ-রাজনৈতিক হিসাব দ্বারা নির্ধারিত হচ্ছে, যার সাথে মিত্রদের নিরাপত্তার সম্পর্ক খুব সামান্য।

উপসাগরীয় রাজধানীগুলো এখন এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে অংশীদারিত্ব যতই গভীর হোক না কেন, তা সুরক্ষার কোনো স্বয়ংক্রিয় গ্যারান্টি নয়।

বর্তমান কৌশলটি স্পষ্ট: ওয়াশিংটনের সাথে জোট বজায় রাখা, তবে এর বাইরেও বিকল্প তৈরি করা। এটি আমেরিকান ক্যাম্প থেকে চীন, রাশিয়া বা তুর্কি ক্যাম্পে চলে যাওয়া নয়, বরং ‘ক্যাম্প’ বা দলভুক্ত হওয়ার যুক্তিকে পুরোপুরি অতিক্রম করার একটি প্রচেষ্টা। এটি ভবিষ্যতে সম্ভাব্য মার্কিন প্রত্যাহারের জন্য একটি অঞ্চলের প্রস্তুতির প্রতিফলন।

মার্কিন প্রভাব কমে গেলে অঞ্চলটি এমন এক ব্যবস্থার মধ্যে পড়তে পারে যেখানে নিয়মগুলো কেবল দুটি পক্ষ নির্ধারণ করবে। সেগুলো হলো, ইসরায়েল এবং ইরান। মক্কা চুক্তিকে একটি ‘তৃতীয় মেরু’ তৈরির প্রাথমিক প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে। এটি এমন একটি জোট যার এই দুই শক্তির সাথে যুদ্ধ করার প্রয়োজন নেই, কিন্তু যার কাছে কোনো একক শক্তির একাধিপত্য ঠেকানোর মতো যথেষ্ট সক্ষমতা রয়েছে। এর উদ্দেশ্য আধিপত্য প্রতিরোধ করা।

কয়েক দশক ধরে উপসাগরীয় অঞ্চল ছিল নিরাপত্তা সরঞ্জমাদির বড় ক্রেতা। যারা উন্নত অস্ত্র কিনত এবং বিদেশি বাহিনীর ওপর নির্ভর করত। মক্কা চুক্তি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার স্থানীয়করণকে ত্বরান্বিত করতে পারে। এই চুক্তি তিনটি আঞ্চলিক শক্তিকে একত্রিত করেছে যাদের সক্ষমতা একে অপরের পরিপূরক।

সৌদি আরবের রয়েছে পুঁজি, ভৌগোলিক অবস্থান, রাজনৈতিক গুরুত্ব এবং একটি বিশাল প্রতিরক্ষা সক্ষমতা। তুরস্কের রয়েছে উন্নত সামরিক-শিল্প ভিত্তি, বিশেষ করে ড্রোন, মিসাইল, নৌ-প্ল্যাটফর্ম এবং ইলেকট্রনিক সিস্টেমে সক্ষমতা। এদিকে পাকিস্তানের রয়েছে একটি বিশাল ও অভিজ্ঞ সামরিক বাহিনী এবং জোটের একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র।

সমন্বয় এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা

চুক্তির প্রকৃত সক্ষমতা এর সমন্বয়ের পর বলা যাবে। যৌথ আকাশ প্রতিরক্ষা, আগাম সতর্কবার্তা, গোয়েন্দা তথ্য, গোলাবারুদ, সাইবার প্রতিরক্ষা এবং যুদ্ধের সময় সক্রিয় থাকতে সক্ষম একটি যৌথ কমান্ড। এছাড়া সামুদ্রিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পেলে তা পশ্চিমা নৌবহরের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না হয়ে বন্দর ও জ্বালানি পথগুলোকে রক্ষা করার ভিত্তি হতে পারে।

একটি জোটের আসল পরীক্ষা

দেশগুলোকে একত্রিত করা আর তাদের স্বার্থগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করা এক কথা নয়। মক্কা চুক্তি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুতর ভিত্তি হতে পারে। এর ফলাফল প্রতিরক্ষা বাজেট বা সদস্য সংখ্যা দিয়ে নির্ধারিত হবে না। এটি নির্ধারিত হবে একটি প্রশ্নের উত্তরের মাধ্যমে আর তা হলো স্বাক্ষরকারী দেশগুলো কি একে অপরকে রক্ষা করার প্রকৃত খরচ বহন করতে সত্যিই ইচ্ছুক?

যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তবে এই অঞ্চল অবশেষে এমন এক ভারসাম্য তৈরি করতে পারে যা সমুদ্রের ওপার থেকে আসা শক্তির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল নয়।


লেখক পরিচিতি

ড. খালিদ আল-জাবের ‘মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স’-এর নির্বাহী পরিচালক। তিনি রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিষয়ক বিষয়াবলীতে বিশেষজ্ঞ একজন বিশিষ্ট পণ্ডিত ও পেশাজীবী।

আল-জাবের ‘আল-শার্ক স্টাডিজ অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার’-এর পরিচালক এবং কাতারের শীর্ষস্থানীয় ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য পেনিনসুলা’-র প্রধান সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।

[প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের প্রতিফলন। এগুলো এশিয়া পোস্টের সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সঙ্গে সর্বদা মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখায় উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব; এ বিষয়ে এশিয়া পোস্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ।]