আলজাজিরার মতামত/হরমুজ যুদ্ধের অবসান কীভাবে সম্ভব

যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানের সঙ্গে নিজের শুরু করা যুদ্ধের চোরাবালিতে এমনভাবে আটকে গেছে যে, সেখান থেকে বের হওয়ার কোনো পথ তাদের জানা নেই। গত পাঁচ মাসেরও বেশি সময় ধরে দফায় দফায় বোমাবর্ষণ করেও তেহরানকে আত্মসমর্পণের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারেনি ওয়াশিংটন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে ইরানে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর হুমকি সত্ত্বেও মাথা নত করছে না তেহরান।
এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুদ হ্রাস পাওয়া, আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে জনপ্রিয়তা হ্রাস পাওয়া এবং অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালির কারণে বিশ্বব্যাপী তেল ঘাটতি থেকে তৈরি হওয়া আসন্ন অর্থনৈতিক সংকট মার্কিন প্রশাসনকে যুদ্ধ শেষ করার জন্য রাজনৈতিক চাপে ফেলছে।
ইরান যুদ্ধ থেকে হরমুজ যুদ্ধ
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে ট্রাম্প প্রশাসন যখন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে, তখন এর পেছনের যুক্তিগুলো বারবার বদলাতে থাকে।
তবে এর অন্যতম মূল কারণ ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। এর আগে আলোচনা চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র জোর দিয়ে বলেছিল, ইরান কোনো অবস্থাতেই নিজেদের মাটিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ করতে পারবে না এবং তাদের কাছে থাকা ৪৪০ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সমর্পণ করতে হবে। ইরান তাতে অস্বীকৃতি জানায় এবং শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার শিকার হওয়ার পর ইরান তাৎক্ষণিকভাবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী সামুদ্রিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়। যদিও এই প্রতিক্রিয়া আগে থেকেই অনুমিত ছিল। যুদ্ধের প্রস্তুতি পর্ব থেকে ইরান বারবার এমন হুমকি দিয়ে আসছিল। তবুও মার্কিন প্রশাসন সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়ে যায় এবং এর কোনো কার্যকর জবাব দিতে পারেনি।
মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি পরিবহনের কৌশলগত পথ হিসেবে এই প্রণালির গুরুত্ব অপরিসীম। ফলে, প্রণালিটি বন্ধ থাকার কারণে গত পাঁচ মাস ধরে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক নেতিবাচক প্রভাব বেড়েই চলেছে।
এমন পরিস্থিতিতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর আর চাপ সৃষ্টি করা মার্কিন প্রশাসনের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার নেই, বরং যত দ্রুত সম্ভব প্রণালিটি পুনরায় সচল করতে চায় ওয়াশিংটন।
মার্কিন প্রশাসনের সামনে মূল সংকট
এই লক্ষ্য অর্জনে গিয়ে ওয়াশিংটন একটি বড় সংকটের মুখে পড়েছে। একদিকে, ইরানের নতুন নেতৃত্ব মনে করছে, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে প্রণালির ওপর অপারেশনাল নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি এবং ভবিষ্যৎ মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা প্রতিরোধে এটি একটি মোক্ষম কৌশলগত প্রতিরোধক। অন্যদিকে, মার্কিন সামরিক বাহিনী এই জলপথ খুলে দিতে এবং তা সচল রাখতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
বিস্ময়কর হলেও সত্য, ইরানের তুলনায় একশ গুণেরও বেশি বিশাল সামরিক বাজেট থাকা সত্ত্বেও মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রণারি দিয়ে চলাচলকারী সামুদ্রিক বাণিজ্যের ওপর স্থায়ী হুমকি সৃষ্টি করার মতো ইরানের সামরিক শক্তিকে থামাতে পারছে না।
মার্কিন সমাজে যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি করে ইরানের নেতাদের মার্কিন দাবির মুখে আনতে ট্রাম্প বারবার দেশটিতে ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর হুমকি দিয়ে চলেছেন। সম্প্রতি তিনি ইরানের বেসামরিক জ্বালানি অবকাঠামোকেও মার্কিন হামলার লক্ষবস্তুতে পরিণত করার হুমকি দেন। গত ৩১ জুলাই এক মন্ত্রিসভার বৈঠকে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা তাদের ওপর খুব কঠোর আঘাত হানব এবং এক পর্যায়ে তারা বলবে যে, আমরা আর এটি সহ্য করতে পারছি না।’
তবে এর একদিন পরেই ট্রাম্প তার অবস্থান থেকে সরে আসেন। সম্ভবত তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, কেবল ‘কঠোর আঘাত’ হেনে ইরানকে নমানো সম্ভব নয়।
এর কারণ কী?
কারণ ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) নতুন নেতৃত্ব মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মূলত ইরানের অস্তিত্ব মুছে ফেলতে চায়। তাদের ধারণা, মার্কিন চাপের মুখে সামান্য ছাড় দিলে তারা আরও বেশি চাপে পড়বে।
তাই মার্কিন আগ্রাসন বাড়িয়ে দিলে ইরানের পক্ষ থেকে কোনো আত্মসমর্পণ দেখা যাবে না। উল্টো উপসাগরীয় অঞ্চলের অবকাঠামোর ওপর বড় ধরনের প্রতিশোধমূলক হামলা আসতে পারে।
সুতরাং, মার্কিন সামরিক বাহিনীকে বহুগুণ বিস্তৃত পরিসরে বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করে ইরানকে একটি ‘ব্যর্থ রাষ্ট্রে’ পরিণত করার প্রস্তুতি নিতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে সামরিক শক্তির ব্যবহার কোনো ফল বয়ে আনবে না।
সবচেয়ে কম ক্ষতিকর বিকল্প পথ
ভবিষ্যতের বাস্তবসম্মত উপায়গুলো বিবেচনা করার সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, বর্তমান মার্কিন প্রশাসন ইরানের সঙ্গে কূটনীতিতে বিশ্বাস করে না এবং কখনোই করেনি। তারা কেবল বলপ্রয়োগে বিশ্বাস করে, সেটা হোক শাস্তিমূলক শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞা অথবা ধ্বংসাত্মক বোমাবর্ষণ।
যখন তারা ইরানের সঙ্গে ‘অর্থপূর্ণ কূটনীতির’ কথা বলে, তখন এর আসল অর্থ হলো—‘মার্কিন দাবি মেনে নেওয়া’।
যুক্তরাষ্ট্রের এই গুরুতর ও দীর্ঘমেয়াদী কূটনীতিতে অনীহার কারণে, যদি মার্কিন প্রশাসন কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতেও পারে, তবে তারা পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত একটি কার্যকর এবং স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হবে।
সর্বশেষ পারমাণবিক আলোচনাটি শেষ হতে মোট পাঁচ বছর (২০১০-২০১৫) সময় লেগেছিল, যার মধ্যে দুই বছর (২০১৩-২০১৫) ছিল অত্যন্ত তীব্র ও গুরুতর আলোচনা। কিন্তু বর্তমান মার্কিন প্রশাসন এই ব্যর্থ যুদ্ধে ক্লান্ত এবং তাদের অন্যান্য অগ্রাধিকার রয়েছে। তাই তারা এ ধরনের কোনো দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় জড়াতে ইচ্ছুক নয়।
হরমুজ প্রণালি সংকট সমাধানের জন্য কূটনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের এই অনীহা ও অক্ষমতার প্রেক্ষাপটে, গত জুনে স্বাক্ষরিত ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের ৫ অনুচ্ছেদে উল্লেখিত প্রক্রিয়াটিকে চলতে দেওয়া উচিত।
ওই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরান হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ প্রশাসন এবং সামুদ্রিক পরিষেবাগুলো নির্ধারণের জন্য ওমানের সঙ্গে সংলাপ করবে, যা পরস্য উপসাগরীয় অন্যান্য তীরবর্তী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে এবং আন্তর্জাতিক আইন ও হরমুজ প্রণালির উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌম অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।’
ইরান ও ওমানের মধ্যে এই আলোচনা বর্তমানে চলমান রয়েছে এবং এই সমস্যার একটি ন্যূনতম ক্ষতিকর সমাধানের জন্য এটিই সর্বোত্তম সুযোগ।
এই পরিস্থিতিতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের কাজ হবে প্রয়োজন অনুযায়ী ওমানকে পরামর্শ বা নির্দেশনা দেওয়া এবং উভয়পক্ষের চূড়ান্ত সমঝোতাকে অনুমোদন করা।
এই ধরনের যেকোনো চুক্তির মধ্যে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়ার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে, কারণ ইরানের ওপর অবরোধ তুললেই কেবল তারা হরমুজ প্রণালি আবার খুলতে রাজি হবে।
ইরান-ওমান আলোচনার ফলাফল কী হবে তা আগাম বলা অসম্ভব। তবে যা স্পষ্ট, তা হলো—ওমান এবং উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের বাকি সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ইরানের সঙ্গে আলোচনা করার ক্ষেত্রে অনেক বেশি দক্ষ এবং বেশি আগ্রহী।
উভয়পক্ষের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে: উপসাগরীয় দেশগুলো যুদ্ধপূর্ব স্থিতাবস্থায় ফিরে যেতে চায়, অন্যদিকে ইরান একটি ‘নতুন স্বাভাবিক অবস্থা’ চায় যেখানে ওমানের সঙ্গে সমন্বয় করে হরমুজের সামুদ্রিক জাহাজ চলাচল তারাই নিয়ন্ত্রণ করবে।
দুর্ভাগ্যবশত, প্রণালির ওপর ইরানের কৌশলগত ক্ষমতার কারণে, অন্তত স্বল্পমেয়াদে তাদের ইচ্ছাই প্রাধান্য পাবে। এর ফলে প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী সামুদ্রিক জাহাজের ওপর ইরানের পক্ষ থেকে ‘টোল’ আদায়ের মতো ঘটনাও ঘটতে পারে।
প্রণালি নিয়ে যদি এমন কোনো চুক্তি হয়ও, তবে তা হবে অত্যন্ত ভঙ্গুর। যুদ্ধপূর্ব সামুদ্রিক বাণিজ্যের পরিমাণ সহসা ফিরে আসবে না, কিংবা হয়তো আর কখনোই আগের অবস্থায় ফিরবে না। অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলো বহাল থাকবে এবং ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞাগুলোও বলবৎ থাকবে।
অন্যদিকে, ইরান পরবর্তী মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার প্রস্তুতি নিতে নিজেদের প্রতিরক্ষা শিল্পভিত্তি পুনর্গঠনের চেষ্টা চালিয়ে যাবে। আর এটিই হতে পারে এই সংকটের সবচেয়ে ভালো সম্ভাব্য পরিণতি।
একটি নির্বোধ যুদ্ধের এই হলো সম্ভাব্য পরিণতি। যে যুদ্ধ শান্তি ও স্থিতিশীলতা আনতে পারেনি, বরং ডেকে এনেছে অর্থনৈতিক দুর্দশা, আঞ্চলিক অস্থিরতা এবং মার্কিন শক্তি ও প্রতিপত্তির বড় পতন।
লেখক: অ্যালেন আয়ার মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের একজন কূটনৈতিক ফেলো এবং আয়ারঅ্যানালিটিক্স এলএলসি-এর প্রেসিডেন্ট ও ফউন্ডার।
.png)




