logo
Advertisement

গার্ডিয়ানের কলাম/নেপাল-তিব্বতের ঘটনা সারা বিশ্বের জন্য এক বড় সতর্কবার্তা

বিল ম্যাকগুয়ার
বিল ম্যাকগুয়ার
নেপাল-তিব্বতের ঘটনা সারা বিশ্বের জন্য এক বড় সতর্কবার্তা
নেপাল-তিব্বত পার্বত্য অঞ্চলে উজানে হিমবাহ ধসের কারণে সৃষ্ট বিধ্বংসী আকস্মিক বন্যায় একাধিক বাড়ি ও স্থাপনা প্লাবিত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। ছবি: এপি

আপনি হয়তো টের পাননি, তবে আমাদের পায়ের নিচের পৃথিবী আগের চেয়ে অনেক বেশি অস্থির হয়ে উঠেছে। আর এর জন্য দায়ী বৈশ্বিক উষ্ণতা। তাপমাত্রা বাড়ছে। ত্বরান্বিত হচ্ছে জলবায়ু বিপর্যয়। এর ফলে জলবায়ু ও ভূগঠনের মধ্যকার সম্পর্ক এখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। গত সপ্তাহে নেপাল ও তিব্বতের ভয়াবহ ঘটনাগুলো তারই প্রমাণ। জলবায়ু পরিবর্তন যে পৃথিবীর ভূস্তরের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, সে বিষয়টি আমরা এখনো সেভাবে আমলে নিই না। কিন্তু বিজ্ঞানীদের কাছে এর অকাট্য প্রমাণ অনেক আগে থেকেই রয়েছে।

Advertisement

২০২১ সালে ভারতের হিমালয়-সংলগ্ন রাজ্য উত্তরাখণ্ডের পাহাড়ি উপত্যকায় এমন এক ভয়াবহ বন্যা দেখা যায়। এতে দুটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যাপক ক্ষতি হয়। প্রাণ হারান প্রায় ২০০ মানুষ। ২০২৫ সালের আগস্টে আলাস্কার একটি ফিয়র্ডে (হিমবাহ-সৃষ্ট উপত্যকা) বিশাল ভূমিধস হয়। ওই এলাকা দিয়ে নিয়মিত প্রমোদতরি যাতায়াত করত। ভূমিধসের ফলে সেখানে ৫০০ মিটার উঁচু ঢেউয়ের সৃষ্টি হয়। এর কয়েক মাস আগে সুইজারল্যান্ডের ভ্যালাইস ক্যান্টনে একটি হিমবাহ ধসে পড়ে। এতে পাথর ও কাদামিশ্রিত পানির স্রোতে ব্লাটেন নামের একটি গ্রামের বেশির ভাগ অংশ ধ্বংস হয়ে যায়। অবশ্য আগেই গ্রামটি থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

এই চারটি ঘটনার মধ্যে একটি বড় মিল রয়েছে। এগুলো ক্রায়োস্ফিয়ারের সঙ্গে যুক্ত। পৃথিবীর মোট বরফ-আচ্ছাদিত অঞ্চলকে ক্রায়োস্ফিয়ার বলা হয়। বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে বরফ, তুষার ও চিরহিমায়িত অঞ্চল যে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এর মানে হলো, পৃথিবীর দুই মেরু ও উঁচু পাহাড়ি অঞ্চলগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছে। সব জায়গাতেই বরফের স্তর দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে। এটি আমাদের জন্য এক বড় দুঃসংবাদ।

হিমবাহ গলে গেলে এর নিচে থাকা অস্থিতিশীল মাটি বেরিয়ে আসে। এসব এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে পাহাড়ের চিরহিমায়িত স্তর দ্রুত গলছে। ফলে পাহাড়ের গায়ে থাকা বিশাল পাথরের খণ্ডগুলো আলগা হয়ে যায়। এগুলো যেকোনো মুহূর্তে ধসে পড়ার অপেক্ষায় থাকে। একই সঙ্গে পাহাড়ের নিচু গর্ত বা খাদগুলো হিমবাহ-গলা পানিতে ভরে যাচ্ছে। এতে সেখানে তৈরি হচ্ছে বিশাল সব হ্রদ। এসব হ্রদের পানি যেকোনো সময় উপচে বা বাঁধ ভেঙে নিচের উপত্যকায় থাকা জনবসতি ভাসিয়ে দিতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আমাদের পায়ের নিচের মাটি নানাভাবে ভয়ংকর ও প্রাণঘাতী বিপদের কারণ হতে পারে। নেপাল ও তিব্বতের ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি, দুর্বল হয়ে পড়া হিমবাহ ধসে সরাসরি বন্যা হতে পারে। আবার ধসে পড়া বরফ নদীর গতিপথ আটকে প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি করতে পারে, যা একপর্যায়ে ভেঙে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি করে। চিরহিমায়িত স্তর গলা, ভারী বৃষ্টি বা ভূমিকম্পের কারণে বড় ধরনের ভূমিধস হতে পারে। এটিও নদীর গতিপথ আটকে দিতে পারে বা পুরো জনপদকে একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে।

আলাস্কা পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হওয়া অঞ্চলগুলোর একটি। সেখানে বিপুল পরিমাণ বরফ গলে যাওয়ায় ভূত্বকের ফাটলগুলোর ওপর চাপ কমেছে। ফলে সেখানে ভূমিকম্পের প্রবণতা বাড়ছে। হিমালয়, আন্দিজ, গ্রিনল্যান্ড এবং সম্ভবত ইউরোপের আল্পস পর্বতমালার মতো দ্রুত বরফ গলা অঞ্চলগুলোতেও একই ধরনের ভূমিকম্পের শঙ্কা রয়েছে। বরফ গলার কারণে হওয়া এসব ভূমিকম্প থেকে ভয়ংকর ভূমিধস বা হিমবাহ ধস ঘটতে পারে। এতে হিমবাহের হ্রদ ভেঙে আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে। একে ‘গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড’ বলা হয়। উঁচু পাহাড়ি অঞ্চলে বরফ ও তুষারগলা পানি যত বেশি জমবে, এ ধরনের বন্যার ঝুঁকিও তত বাড়বে। শুধু হিমালয় অঞ্চলেই কয়েক হাজার হিমবাহ হ্রদ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২০০ হ্রদকে নিচের জনবসতির জন্য বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এতে কোনো সন্দেহ নেই যে উঁচু পাহাড়ের বাসিন্দারাই জলবায়ু বিপর্যয়ের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। তবে পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চল নিরাপদ আছে, এমনটা ভাবা ভুল হবে। বাস্তবতা হলো, পৃথিবীর ভূস্তর অত্যন্ত সংবেদনশীল। পরিবেশের খুব সামান্য পরিবর্তনেও বড় ধরনের ভূতাত্ত্বিক বিপর্যয় ঘটতে পারে।

এ কারণেই বলা যায়, আগ্নেয়গিরিরও একটি নির্দিষ্ট ‘মৌসুম’ আছে। বছরের অন্যান্য সময়ের চেয়ে নভেম্বর থেকে এপ্রিলের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি অগ্ন্যুৎপাত হয়। সারা বিশ্বে পানির ভরের বার্ষিক স্থানান্তরের কারণে ভূত্বকে যে অতি ক্ষুদ্র পরিবর্তন ঘটে, এটি মূলত তারই ফল। এ বিষয়ে আমার এক ভূমিকম্পবিদ সহকর্মী প্রায়ই সতর্ক করে বলেন, ‘ভূত্বকের কোনো ভয়ংকর ফাটল যদি চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকে, তবে একটি করমর্দনের সমান চাপেই সেখানে বড় ভূমিকম্প শুরু হয়ে যেতে পারে।’ এর মানে হলো, বায়ুর চাপ, ভূত্বকের চাপ, বৃষ্টিপাত, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বা বরফের ভরের মতো পরিবেশগত উপাদানে সামান্য হেরফেরই বড় ধরনের ভূতাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়ার কারণ হতে পারে।

খেয়াল রাখতে হবে, তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতার মতো পরিবেশগত উপাদানগুলো এখন বেড়েই চলেছে। এই বাড়তি চাপই একটি সুপ্ত আগ্নেয়গিরিকে জাগিয়ে তুলতে পারে। বহুদিনের পুরোনো কোনো ফাটলকে সক্রিয় করতে পারে বা কোনো দুর্বল হিমবাহকে ধসিয়ে দিতে পারে। এর চূড়ান্ত ফল হতে পারে এক ধ্বংসাত্মক ভূতাত্ত্বিক বিপর্যয়, যা প্রাথমিক কারণের চেয়ে বহুগুণ বড় ও ভয়াবহ।

ঐতিহাসিকভাবে শান্ত এলাকাগুলোতেও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। গ্রিনল্যান্ড এর একটি বড় উদাহরণ। এখানকার দুই থেকে তিন কিলোমিটার পুরু বরফের স্তরের বিশাল ওজনের কারণে নিচের ফাটলগুলো হাজার হাজার বছর ধরে নড়াচড়া করতে পারেনি। তবে এখন বরফ গলে যাচ্ছে। ফলে ফাটলগুলোর ওপর চাপ কমছে। এর প্রভাবে সেখানে ভবিষ্যতে ভূমিকম্পের হার বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আইসল্যান্ডের দিকেও আমাদের নজর রাখা উচিত। সেখানে ভাটনাজোকুল বরফের স্তর দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে। ফলে সেখানকার চাপ কমে যাওয়ায় নিচে লুকিয়ে থাকা আগ্নেয়গিরিগুলো আরও সক্রিয় হতে পারে। ২০১০ সালে আইজাফিয়াতলায়োকুতল আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের কারণে বিমান চলাচলে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটেছিল। এটি যুক্তরাজ্য ও উত্তর ইউরোপে কতটা চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে, তা আমরা আগেই দেখেছি।

আমাদের পায়ের নিচের পৃথিবীর এই ক্রমবর্ধমান খামখেয়ালি আচরণ একটি শিক্ষাই দেয়—বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাব এখন সর্বব্যাপী। এটি আমাদের জীবন ও জীবিকার প্রতিটি স্তরে প্রবেশ করবে। পৃথিবীর কোনো অংশকেই এটি রেহাই দেবে না। নেপাল ও তিব্বতের ঘটনার ভয়াবহতা বিশ্ব এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এই চরম শিক্ষা উপেক্ষা করাটা আমাদের জন্যই বড় বিপদের কারণ হবে।


লেখক পরিচিতি: বিল ম্যাকগুয়ার ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের (ইউসিএল) জিওফিজিক্যাল ও ক্লাইমেট হ্যাজার্ডস বিষয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক। তাঁর লেখা সাম্প্রতিক বইয়ের নাম ‘দ্য ফেট অব দ্য ওয়ার্ল্ড: আ হিস্ট্রি অ্যান্ড ফিউচার অব দ্য ক্লাইমেট ক্রাইসিস’। লেখাটি দ্য গার্ডিয়ান থেকে সংক্ষেপিত ও অনুবাদ করা হয়েছে।