logo
Advertisement

কিশোর অপরাধ: পরিবার থেকে রাষ্ট্র, উত্তরণের সমন্বিত পথ

কাজী জিয়া উদ্দিন
কিশোর অপরাধ: পরিবার থেকে রাষ্ট্র, উত্তরণের সমন্বিত পথ
কাজী জিয়া উদ্দিন। ছবি: সংগৃহীত

‘শিশুই ভবিষ্যতের মানুষের নির্মাতা’-কবিতার এই চিরন্তন উপলব্ধির মধ্যেই লুকিয়ে আছে একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের দর্শন। আজকের কিশোরই আগামী দিনের নাগরিক, নেতা, বিজ্ঞানী, শিক্ষক, বিচারক, উদ্যোক্তা কিংবা রাষ্ট্রনায়ক। কিন্তু সেই কিশোর যখন অপরাধ, মাদক, সহিংসতা, কিশোর গ্যাং, সাইবার অপরাধ কিংবা উগ্রবাদী চিন্তার ফাঁদে আটকে পড়ে, তখন বিপন্ন হয় শুধু একটি পরিবার নয়-সমাজ ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎও।

Advertisement

কিশোর অপরাধ তাই নিছক আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবার, শিক্ষা, অর্থনীতি, সামাজিক মূল্যবোধ, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, মানসিক স্বাস্থ্য এবং রাষ্ট্রীয় নীতির প্রশ্ন। একবিংশ শতাব্দীতে এসে কিশোর অপরাধের ধরন যেমন বদলেছে, তেমনি বদলেছে এর বিস্তার ও ঝুঁকিও। অপরাধ এখন শুধু রাস্তা, মহল্লা কিংবা অপরাধী চক্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর বিস্তার ঘটেছে মুঠোফোনের পর্দায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং ভার্চুয়াল জগতে। বাংলাদেশও এই বাস্তবতার বাইরে নয়।

পরিবারই প্রথম প্রতিরোধের দুর্গ হতে পারে। কারণ একটি শিশুর প্রথম বিদ্যালয় পরিবার। মা-বাবাই তার প্রথম শিক্ষক। ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়, দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা ও মানবিকতার প্রথম পাঠও সে পরিবার থেকেই শেখে। তাই কিশোর অপরাধ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর ও শক্তিশালী জায়গা হচ্ছে পরিবার।

যে পরিবারে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ নেই, মা-বাবার মধ্যে নিয়মিত দ্বন্দ্ব হয়, সন্তানকে সময় দেওয়ার সুযোগ বা আগ্রহ থাকে না, কিংবা সন্তান লালনের চেয়ে অর্থ উপার্জনই হয়ে ওঠে প্রধান অগ্রাধিকার-সেখানে শিশুর মধ্যে ধীরে ধীরে একাকিত্ব, হতাশা ও পরিচয়সংকট তৈরি হতে পারে।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সন্তান পরিবারের কাছে প্রয়োজনীয় স্বীকৃতি না পেয়ে বন্ধুদের মধ্যে সেই স্বীকৃতি খুঁজতে শুরু করে। আর সেখান থেকেই ভুল বন্ধুত্ব, অপরাধী চক্র কিংবা কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

অভিভাবকত্ব তাই শুধু সন্তানের খাবার, পোশাক, শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করার নাম নয়। সন্তানের সঙ্গে কথা বলা, তার বন্ধুদের সম্পর্কে জানা, তার মানসিক পরিবর্তন বুঝতে চেষ্টা করা এবং তার ডিজিটাল জগতের সঙ্গে পরিচিত থাকা-সবই দায়িত্বশীল অভিভাবকত্বের অংশ।

কৈশোর এমন একটি সময়, যখন আবেগ অনেক ক্ষেত্রে যুক্তির ওপর প্রভাব বিস্তার করে। এ বয়সে নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা বাড়ে, অন্যের স্বীকৃতি পাওয়ার তীব্র প্রয়োজন তৈরি হয় এবং ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের প্রবণতাও দেখা দিতে পারে।

মনোবিজ্ঞানী এরিক এরিকসনের মতে, কৈশোরের অন্যতম প্রধান মানসিক সংকট হলো ‘পরিচয় বনাম ভূমিকা-সংকট’। এই সময় একজন কিশোর নিজেকে আবিষ্কার করতে চায়-সে কে, তার অবস্থান কোথায় এবং সমাজে তার ভূমিকা কী।

এই সন্ধিক্ষণে পরিবার, শিক্ষক ও সমাজ যদি তাকে ইতিবাচক পরিচয় নির্মাণের সুযোগ দিতে না পারে, তবে অপরাধী গোষ্ঠী, মাদকচক্র, সহিংস সংস্কৃতি কিংবা উগ্র মতাদর্শ তার কাছে বিকল্প পরিচয়ের উৎস হয়ে উঠতে পারে।

অতএব কিশোরকে শুধু ‘অপরাধী’ হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরে পৌঁছানো যাবে না। জানতে হবে-সে কেন অপরাধে জড়াল, তার পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ কেমন ছিল এবং কোথায় গিয়ে তার জীবনের গতিপথ বদলে গেল।

একসময় পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজ সম্মিলিতভাবে শিশুর নৈতিক চরিত্র নির্মাণে ভূমিকা রাখত। এখন সেই কাঠামো অনেকটাই দুর্বল হয়েছে। ভোগবাদ, দ্রুত সাফল্য পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, অর্থ ও বাহ্যিক চাকচিক্যকে সামাজিক মর্যাদার প্রধান মাপকাঠি হিসেবে দেখা, সহিংস বিনোদনের বিস্তার-এসব কিশোরদের মানসিক জগতে প্রভাব ফেলছে।

শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা নয়; মানুষ তৈরি করাও শিক্ষার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু বাস্তবে আমরা অনেক সময় ভালো ফল, ভালো চাকরি ও অর্থনৈতিক সাফল্যের দিকে এত বেশি মনোযোগ দিই যে নৈতিকতা, সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ ও নাগরিক মূল্যবোধের বিষয়গুলো আড়ালে পড়ে যায়।

প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ কিন্তু নৈতিকভাবে দুর্বল একজন মানুষ সমাজের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই শিক্ষা ব্যবস্থায় চরিত্র ও মূল্যবোধ নির্মাণকে নতুন করে গুরুত্ব দিতে হবে।

কিশোর অপরাধের সঙ্গে মাদকের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। মাদক শুধু একটি স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়; এটি সামাজিক ও নিরাপত্তাগত সমস্যাও তৈরি করে।

মাদকাসক্তি একদিকে কিশোরের শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে, অন্যদিকে অর্থের প্রয়োজন তৈরি করে। সেই অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে কেউ কেউ চুরি, ছিনতাই, প্রতারণা কিংবা অন্যান্য অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। মাদক উৎপাদন ও পাচারের আন্তর্জাতিক পথের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে দেশটি নানা ধরনের মাদক পাচারের ঝুঁকিতে রয়েছে। ইয়াবা, আইস, ফেনসিডিল, গাঁজা এবং বিভিন্ন ধরনের কৃত্রিম মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

মাদক প্রতিরোধকে তাই শুধু অভিযাননির্ভর করলে হবে না। প্রয়োজন সরবরাহ বন্ধের পাশাপাশি চাহিদা কমানো, পরিবারকে সচেতন করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিরোধমূলক শিক্ষা এবং আসক্ত কিশোরদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা।

সীমান্তবর্তী অঞ্চলে মাদক, অস্ত্র ও মানবপাচারের সঙ্গে যুক্ত অপরাধী চক্র কখনো কখনো অল্পবয়সীদেরও ব্যবহার করে। তাদের ব্যবহার করা হতে পারে বাহক, তথ্য সংগ্রাহক কিংবা অপরাধী নেটওয়ার্কের ছোটখাটো কাজে।

এ ক্ষেত্রে কিশোরকে কেবল অপরাধের অংশ হিসেবে দেখলে চলবে না। দেখতে হবে, তাকে কে ব্যবহার করছে এবং এর পেছনে থাকা বড় অপরাধী নেটওয়ার্ক কোথায়।

আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সীমান্তবর্তী এলাকার কিশোরদের শিক্ষা, কর্মদক্ষতা, খেলাধুলা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে।

উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো দীর্ঘদিন ধরেই তরুণদের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। কৈশোরের আবেগ, পরিচয় অনুসন্ধান, একাকিত্ব এবং স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষাকে কাজে লাগিয়ে উগ্রবাদী প্রচারণা চালানো সম্ভব।

ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থা এই ঝুঁকিকে আরও জটিল করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন গোষ্ঠী, বার্তা আদান-প্রদানের সুরক্ষিত মাধ্যম এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর ও উগ্রবাদী বক্তব্য ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।

তবে এর সমাধান শুধু নজরদারি বাড়ানো নয়। পরিবারকে সচেতন হতে হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ডিজিটাল সাক্ষরতা শেখাতে হবে এবং কিশোরদের যুক্তিনির্ভর চিন্তা ও তথ্য যাচাইয়ের দক্ষতা বাড়াতে হবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহপাঠীর দ্বারা অপমান, ভয় দেখানো, সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা কিংবা শারীরিক ও অনলাইন হয়রানিকে অনেক সময় আমরা ‘ছেলেমানুষি’ বলে এড়িয়ে যাই। কিন্তু এর প্রভাব একজন কিশোরের ওপর দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

বুলিংয়ের শিকার শিশুর আত্মবিশ্বাস কমে যেতে পারে, হতাশা তৈরি হতে পারে এবং সে নিজেকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন মনে করতে পারে। কখনো কখনো প্রতিশোধপরায়ণতা ও সহিংস আচরণও তৈরি হতে পারে।

তাই প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত পরামর্শদাতা এবং বুলিং প্রতিরোধের কার্যকর কাঠামো থাকা প্রয়োজন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জ্ঞান, যোগাযোগ ও সৃজনশীলতার অসাধারণ মাধ্যম। কিন্তু এর অপব্যবহার কিশোরদের জন্য নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে।

অনলাইন হয়রানি, ভুয়া পরিচয়, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, অশালীন কনটেন্টের সংস্পর্শ, অনলাইন জুয়া, অপরাধী নেটওয়ার্কের সঙ্গে যোগাযোগ এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ভিডিও ছড়িয়ে জনপ্রিয় হওয়ার প্রবণতা-এসব বিষয় উদ্বেগের।

অনেক কিশোর এখন ‘ভাইরাল’ হওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। ফলে কিছু ক্ষেত্রে বিপজ্জনক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডও বিনোদনের উপাদানে পরিণত হচ্ছে।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ডিজিটাল অভিভাবকত্ব। সন্তান কোন ওয়েবসাইটে যাচ্ছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে, কী ধরনের কনটেন্ট দেখছে-এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। তবে নজরদারির নামে সন্তানের ব্যক্তিগত পরিসর সম্পূর্ণ ধ্বংস করাও সমাধান নয়। প্রয়োজন আস্থা, সংলাপ ও দায়িত্বশীল প্রযুক্তি ব্যবহার শেখানো।

শিক্ষাজীবন শেষ করার পর সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকলে তরুণদের মধ্যে হতাশা তৈরি হতে পারে। অর্থনৈতিক বৈষম্যও এই হতাশাকে বাড়িয়ে দিতে পারে।

যে তরুণ প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের সাফল্য, ভোগ ও বিলাসিতা দেখছে কিন্তু নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চিত, তার মধ্যে ক্ষোভ ও বঞ্চনার অনুভূতি তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

তাই কিশোর অপরাধ প্রতিরোধের অর্থনৈতিক কৌশলের মধ্যে থাকতে হবে দক্ষতা উন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষা, শিক্ষানবিশ কর্মসূচি, উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ এবং শিক্ষাজীবন শেষে কর্মসংস্থানের বাস্তব সুযোগ।

কিশোরদের রাজনৈতিক সহিংসতার হাতিয়ার করা বন্ধ করতে হবে

কিশোরদের রাজনৈতিক সংঘাত, মিছিল-মিটিংয়ের সহিংসতা কিংবা ক্ষমতার লড়াইয়ে ব্যবহার করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। এতে অপরাধ ও সহিংসতার প্রতি তাদের ভয় কমে যায় এবং রাজনৈতিক পরিচয় কখনো কখনো আইনের ঊর্ধ্বে থাকার ভ্রান্ত ধারণা তৈরি করে।

রাজনীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত নেতৃত্বের বিকাশ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা ও জনকল্যাণে অংশগ্রহণ। কিশোরদের কোনোভাবেই সংঘাতের হাতিয়ার বানানো উচিত নয়।

কিশোর অপরাধ প্রতিরোধের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের কেন্দ্রে থাকতে হবে শিক্ষা।

শুধু পরীক্ষার ফল নয়, শিক্ষাব্যবস্থায় যুক্ত করতে হবে- সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি, আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও মানসিক সক্ষমতা, নৈতিক নেতৃত্ব, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, নাগরিক দায়িত্ববোধ, সহনশীলতা ও সামাজিক সম্প্রীতি এবং ডিজিটাল সাক্ষরতা।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে শিক্ষাকে শুধু চাকরির প্রস্তুতি হিসেবে দেখলে চলবে না। এমন মানুষ তৈরি করতে হবে, যারা প্রযুক্তি ব্যবহার করবে কিন্তু প্রযুক্তির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে না; যারা স্বাধীনভাবে চিন্তা করবে কিন্তু দায়িত্বহীন হবে না।

কিশোর অপরাধীর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- শাস্তি দিয়ে কি আমরা একজন কিশোরকে সমাজের জন্য নিরাপদ করতে পারছি, নাকি তাকে আরও কঠিন অপরাধের দিকে ঠেলে দিচ্ছি?

প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীর সঙ্গে কিশোর অপরাধীর আচরণগত ও মানসিক পার্থক্য রয়েছে। একজন কিশোরের ব্যক্তিত্ব ও আচরণ পরিবর্তনের সম্ভাবনা অনেক বেশি।

তাই কিশোর বিচারব্যবস্থায় প্রয়োজন- মানসিক পরামর্শ, পারিবারিক পুনর্মিলন, শিক্ষা অব্যাহত রাখার সুযোগ, কারিগরি প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন, খেলাধুলা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ড, প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা ও মাদক পুনর্বাসন এবং সমাজে পুনঃএকীভূত হওয়ার ব্যবস্থা।

একজন সংশোধিত কিশোর ভবিষ্যতের সম্পদ। কিন্তু একজন কিশোরকে দীর্ঘদিন অপরাধী পরিচয়ের মধ্যে আটকে রাখলে সে আরও বড় অপরাধের দিকে যেতে পারে।

১৮ বছর বয়সসীমা নিয়ে বিতর্কের বদলে প্রয়োজন প্রমাণভিত্তিক আলোচনা। কারণ ১৮ বছর বয়সকে প্রাপ্তবয়স্কতার সীমা হিসেবে বিশ্বের বহু দেশে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশেও শিশু ও কিশোরদের বিচারব্যবস্থায় বয়স একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিষয়।

ডিজিটাল যুগে সাইবার অপরাধ, সংঘবদ্ধ অপরাধ ও পরিকল্পিত সহিংসতার ধরন পরিবর্তিত হওয়ায় বয়সসীমা নিয়ে আলোচনা উঠতেই পারে। কিন্তু কোনো পরিবর্তনের আগে আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার মানদণ্ড, সংবিধান, বিদ্যমান আইন, অপরাধের প্রকৃতি এবং কিশোরের পুনর্বাসনের সম্ভাবনা-সবকিছু বিবেচনা করা জরুরি।

শুধু কঠোর শাস্তির দাবি দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। বরং প্রমাণভিত্তিক নীতি ও পুনর্বাসনমূলক বিচারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।

কিশোর অপরাধ মোকাবিলায় পুলিশি অভিযান অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন-

আধুনিক কিশোর বিচারব্যবস্থা: কিশোরবান্ধব আদালত ও বিচারপ্রক্রিয়া আরও কার্যকর করতে হবে।

বিকল্প নিষ্পত্তি: ছোটখাটো অপরাধে কিশোরকে সরাসরি কঠোর বিচারপ্রক্রিয়ায় না নিয়ে সংশোধন, পরামর্শ ও সামাজিক পুনর্বাসনের সুযোগ দিতে হবে।

পুনরুদ্ধারমূলক বিচার: অপরাধী কিশোর, ভুক্তভোগী ও সমাজের মধ্যে দায়বোধ, সংশোধন ও পুনর্মিলনের সুযোগ তৈরি করতে হবে।

সমাজভিত্তিক পুলিশিং: পুলিশকে শুধু অপরাধের পর ঘটনাস্থলে নয়, অপরাধ প্রতিরোধের আগের ধাপেও সক্রিয় হতে হবে।

সাইবার নজরদারি: কিশোরদের লক্ষ্য করে পরিচালিত অপরাধী নেটওয়ার্ক শনাক্ত করতে প্রযুক্তিনির্ভর সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

কিশোর অপরাধ মোকাবিলায় একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন, যেখানে পরিবার, শিক্ষা, সমাজ, অর্থনীতি ও রাষ্ট্র-সব পক্ষের দায়িত্ব নির্দিষ্ট থাকবে।

পরিবার

  • অভিভাবকদের জন্য সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ
  • পরিবারভিত্তিক পরামর্শকেন্দ্র
  • ডিজিটাল অভিভাবকত্ব বিষয়ে প্রশিক্ষণ
  • সন্তান ও অভিভাবকের মধ্যে নিয়মিত সংলাপ।

নৈতিক ও নাগরিক শিক্ষা

  • বুলিং প্রতিরোধ ব্যবস্থা
  • মানসিক সহায়তা ও পরামর্শ
  • খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড
  • ডিজিটাল নিরাপত্তা ও তথ্য যাচাইয়ের শিক্ষা।

ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র

  • যুব ক্লাব
  • স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ড
  • স্থানীয় পর্যায়ে কিশোরদের ইতিবাচক কাজে সম্পৃক্ত করা।

কারিগরি ও দক্ষতা উন্নয়ন

  • শিক্ষানবিশ কর্মসূচি
  • তরুণ উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ
  • শিক্ষা শেষে কর্মসংস্থানের সেতুবন্ধ তৈরি।

মাদকবিরোধী কার্যক্রম

  • সীমান্ত ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা
  • অপরাধী নেটওয়ার্ক শনাক্ত ও দমন
  • উগ্রবাদ প্রতিরোধে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করা।

আধুনিক কিশোর বিচারব্যবস্থা

  • উন্নত পুনর্বাসনকেন্দ্র
  • মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা
  • অপরাধের কারণ ও প্রবণতা নিয়ে নিয়মিত গবেষণা
  • তথ্য ও গবেষণাভিত্তিক নীতি প্রণয়ন।

কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে।

কিশোর অপরাধের ক্ষেত্রে আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল হতে পারে-শুধু অপরাধটিকে দেখা, অপরাধীর পেছনের শিশুটিকে না দেখা।

একজন কিশোর অপরাধ করেছে-এটি সত্য। কিন্তু সে কেন অপরাধ করল, তার পরিবার কোথায় ছিল, বিদ্যালয় কী করেছে, সমাজ তাকে কী দিয়েছে, রাষ্ট্র তার জন্য কী সুযোগ তৈরি করেছে-এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

কোনো কিশোরের অপরাধকে প্রশ্রয় দেওয়ার কথা এখানে বলা হচ্ছে না। বরং অপরাধের দায় নির্ধারণের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ অপরাধ প্রতিরোধের কথাও ভাবতে হবে।

কারণ কিশোর অপরাধের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর লড়াই আদালত থেকে শুরু হয় না; শুরু হয় পরিবার থেকে। তারপর বিদ্যালয়, সমাজ এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র সেই লড়াইকে শক্তিশালী করে।

একটি শিশুকে বাঁচানো মানে একটি ভবিষ্যৎকে বাঁচানো।

একটি সমাজ তার শিশুদের সঙ্গে কেমন আচরণ করে, তার মধ্যেই সেই সমাজের মানবিকতার পরিচয় পাওয়া যায়। কিশোর অপরাধ তাই আমাদের সামনে একটি বড় আয়না তুলে ধরে। সেই আয়নায় শুধু অপরাধী কিশোরের মুখ দেখা যায় না; দেখা যায় পরিবার, বিদ্যালয়, সমাজ, অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্রেরও প্রতিচ্ছবি।

যদি পরিবার হয় প্রথম প্রতিরোধের প্রাচীর, বিদ্যালয় হয় মূল্যবোধ গঠনের কেন্দ্র, সমাজ হয় নিরাপদ আশ্রয় এবং রাষ্ট্র হয় ন্যায়বিচার ও সম্ভাবনার অভিভাবক—তাহলে কিশোর অপরাধের বিস্তার অনেকটাই ঠেকানো সম্ভব।

আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি কিশোরকে কেবল শাস্তি দিয়ে থামানো যায়, কিন্তু তাকে ভালোবাসা, শিক্ষা, নৈতিকতা, দক্ষতা ও সুযোগ দিয়ে বদলে দেওয়া যায়।

আজকের কিশোরকে আমরা কী দিচ্ছি-অবহেলা, ভয় ও বঞ্চনা, নাকি শিক্ষা, নিরাপত্তা, ভালোবাসা ও সম্ভাবনার দরজা—তার ওপরই নির্ভর করবে আগামী দিনের বাংলাদেশ কেমন হবে।

একজন কিশোরকে হারানো মানে শুধু একটি জীবনকে হারানো নয়; হারানো একটি পরিবারের স্বপ্ন, একটি সমাজের সম্ভাবনা এবং একটি জাতির ভবিষ্যতের অংশ।

সুতরাং কিশোর অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াইকে শুধু আইনশৃঙ্খলার অভিযান হিসেবে নয়, জাতীয় ভবিষ্যৎ রক্ষার আন্দোলন হিসেবে দেখতে হবে। পরিবার থেকে রাষ্ট্র—সবাইকে একই লক্ষ্যে এগিয়ে আসতে হবে।

কারণ একটি শিশুকে বাঁচানো মানে একটি ভবিষ্যৎকে বাঁচানো; আর একটি প্রজন্মকে সঠিক পথে রাখা মানে একটি জাতির ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করা।


লেখক: কলামিস্ট ও সাবেক ডিআইজি।