logo
Advertisement

নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ/ইরান-যুক্তরাষ্ট্র টানাপোড়েনে কে আগে পিছু হটবে

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র টানাপোড়েনে কে আগে পিছু হটবে
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পতাকা। ছবি: সংগৃহীত

কয়েক সপ্তাহ ধরে কোনো কূটনৈতিক অগ্রগতি নেই। আবার পুরোদমে লড়াইও চলছে না। উভয় পক্ষই মনে করছে, তারা একে অপরের চেয়ে বেশি দিন টিকে থাকতে পারবে। তারা গুরুত্ব দিয়ে কোনো আলোচনা করছে না। আবার একে অপরের দিকে গুলিও ছুড়ছে না। এর বদলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একটি অস্বস্তিকর মধ্যবর্তী অবস্থায় আটকে আছে। এই অবস্থা থেকে হয় আবার লড়াই শুরু হতে পারে, নয়তো অচলাবস্থা আরও জোরালো হতে পারে। এই অমীমাংসিত পরিস্থিতির মূলে রয়েছে উভয় পক্ষের হিসাব-নিকাশ। অবশ্য এটিকে ভুল হিসাব-নিকাশও বলা যেতে পারে।

Advertisement

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানি কর্মকর্তারা একটি বিষয় বিশ্বাস করেন। তারা মনে করেন, কোনো চুক্তিতে বড় ধরনের ছাড় দেওয়ার চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ সামলে ওঠা তাদের জন্য লাভজনক। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখাও তাদের জন্য বেশি সুবিধাজনক। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে, সামরিক হামলায় যা অর্জন করা যায়নি, সেটি অর্থনৈতিকভাবে ইরানের টুঁটি চেপে ধরলে সফল হবে। বুধবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটি কড়া বার্তা দিয়েছেন। যেসব দেশ ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করবে, তাদের ‘মারাত্মক অর্থনৈতিক পরিণতির’ মুখে পড়তে হবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান কেউই নিজেদের চাওয়া পূরণ করতে পারেনি।

দুই মাস আগে দেশ দুটি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল। তখন কথা ছিল, ৬০ দিনের মধ্যে তারা একটি বৃহত্তর চুক্তির পথে হাঁটবে। এতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকার কথা ছিল। চলতি সপ্তাহে সেই সময়সীমা পার হয়ে গেছে। মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প জানান, বর্তমানে কোনো ‘আলাপ বা আলোচনা’ চলছে না। এমনকি এমন কিছুর সময়সূচিও ঠিক করা হয়নি।

প্যারিসের সায়েন্সেস পো-এর সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের সহকারী অধ্যাপক নিকোল গ্রাজেউস্কি একটি মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, এর বদলে দেশ দুটি এখন ‘এক অন্তহীন অনিশ্চয়তার মধ্যে’ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, গত কয়েক মাসে মৌলিকভাবে খুব বেশি কিছু বদলায়নি। তবে ইরানের অবস্থান আরও শক্ত হয়েছে। আর যুক্তরাষ্ট্র এই পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার কোনো না কোনো পথ খোঁজার চেষ্টা করে গেছে। যদিও তাদের সেই চেষ্টা এখনো সফল হয়নি।

চলতি মাসে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার জন্য ওয়াশিংটনের কাছে বেশ কিছু দাবিদাওয়া তুলে ধরেছে তেহরান। প্রণালিটি ইরানের দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত। এটি বিশ্বের বেশির ভাগ জ্বালানি তেল পরিবহনের একটি প্রধান পথ। এসব দাবির মধ্যে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, আটকে থাকা সম্পদ ফেরত দেওয়া এবং যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ প্রদান। দুই পক্ষের মধ্যে ভবিষ্যৎ সম্ভাব্য চুক্তির অংশ হিসেবেও আগে একই ধরনের শর্তের কথা বলা হয়েছিল। জুনে একটি সমঝোতা স্মারকে এসব উল্লেখ ছিল। তবে সেটি খুব দ্রুতই ভেস্তে যায়।

হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে ওমানের সঙ্গে আলোচনা করছে ইরান। কিন্তু তেহরানের দেওয়া দাবির তালিকাটি একটি ভিন্ন ইঙ্গিত দেয়। এতে মনে হচ্ছে, কোনো চুক্তি হলেও ইরানি বাহিনী প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী নৌযানের ওপর হুমকি ও হামলা অব্যাহত রাখবে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতেও এই প্রণালিতে অন্তত দুটি জাহাজে হামলা হয়েছে।

মিসৌরি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির কলেজ অব আর্টস, সায়েন্সেস অ্যান্ড এডুকেশনের ডিন মেহরজাদ বোরুজেরদি একটি পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধের প্রাথমিক ধাক্কা সামলে উঠে তেহরান এখন নিজেদের শক্তি প্রদর্শনে বদ্ধপরিকর।’ তিনি আরও বলেন, হরমুজ প্রণালিকে তারা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ওমানের সঙ্গে সমান্তরাল আলোচনায় তারা কঠোর দরকষাকষি করছে। তাদের এই পদক্ষেপগুলোকে সেই শক্তি প্রদর্শনের প্রেক্ষাপটেই দেখা উচিত।

গত কয়েক মাসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কথাবার্তায় দুই ধরনের সুর পাওয়া গেছে। কখনো তিনি পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। আবার কখনো বলেছেন, একটি কূটনৈতিক চুক্তি খুব কাছাকাছি রয়েছে।

তার এই আচরণের উদ্দেশ্য যদি ইরানি কর্মকর্তাদের ভয় দেখিয়ে ছাড় আদায় করা হয়ে থাকে, তবে সেটি উল্টো ফল দিয়েছে বলে মনে হচ্ছে। ইরানি কর্মকর্তারা একটি বিষয়ে অনেকটা নিশ্চিত হয়ে গেছেন। তারা মনে করছেন, ট্রাম্প পুরোদমে যুদ্ধ শুরু করতে অনিচ্ছুক। কারণ এর ফলে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাছাড়া আমেরিকার জনগণের কাছেও যুদ্ধ জনপ্রিয় নয়। বিশেষ করে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তো নয়ই।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো অ্যালেক্স ভাটানকা বলেন, ‘ইরান সম্ভবত বিশ্বাস করে, এই ব্যয়বহুল ও অন্তহীন সংঘাত থেকে যুক্তরাষ্ট্র একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়বে।’

একই সময়ে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর দিকে জোর দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্পের জামাতা ও দূত জ্যারেড কুশনার সোমবার ফক্স নিউজকে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘আমাদের জন্য যৌক্তিক হয়, এমন কোনো কাজ করতে ইরানি কর্মকর্তারা কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।’ আলোচনা কোন পর্যায়ে আছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি একটি নৌ অবরোধের দিকে ইঙ্গিত করেন। তিনি জানান, ইরানের অর্থনীতিকে আরও পঙ্গু করে দেওয়ার লক্ষ্যে এই নৌ অবরোধ দেওয়াই এখন ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য।

মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প জানান, অবরোধ পুরোপুরি বহাল রয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, হরমুজ প্রণালিও পুরোপুরি খোলা আছে। যদিও নৌ কর্মকর্তারা সম্প্রতি সেখানে জাহাজে হামলার কথা উল্লেখ করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি (অর্থমন্ত্রী) স্কট বেসেন্ট সম্প্রতি নিউজম্যাক্সকে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তার দপ্তর এমন সব পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে, যা কোনো দেশকে ‘অর্থনৈতিকভাবে একঘরে করার ইতিহাসে আগে কখনো দেখা যায়নি’।

ইরানের শাসকরা আগেও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক চাপ সামলে উঠেছেন। তবে ওবামা প্রশাসনের সময় নিষেধাজ্ঞা কঠোর করার পর তারা ২০১৫ সালে নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচিতে ছাড় দিতে রাজি হয়েছিলেন।

তেহরানের এখন পর্যন্ত যে অবস্থান, তাতে নিষেধাজ্ঞার তাৎক্ষণিক মাশুল সম্ভবত ইরানের জনগণকেই গুনতে হবে। তারা এমনিতেই আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতির সঙ্গে লড়াই করছেন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন।

মিসৌরি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির অধ্যাপক বোরুজেরদি বলেন, আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার মুখে ইরান একটি বাজি ধরবে। তারা মনে করবে, ওয়াশিংটনই আগে হার মানবে। এই ভরসায় তারা নিষেধাজ্ঞার ফলে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক কষ্ট যতটা সম্ভব নিজেদের জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি সামরিক বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ পদে কট্টরপন্থীদের নিয়োগ দিয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি দেশটিকে যুদ্ধাবস্থায় রাখারই ইঙ্গিত দিয়েছেন। বিশ্লেষক ভাটানকা বলেন, নতুন করে কোনো সংঘাত শুরু হলে সম্ভবত আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামো, মধ্যপ্রাচ্যে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলও এর মধ্যে জড়িয়ে পড়বে।

আপাতত মনে হচ্ছে, এই অচলাবস্থা চলবে এবং মূল বিষয়গুলো অমীমাংসিতই থেকে যাবে। এর মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও হরমুজ প্রণালির বিষয়টিও রয়েছে।

নিকোল গ্রাজেউস্কি বলেন, ‘এই অনিশ্চয়তা যত বেশি দীর্ঘ হবে, পরিস্থিতি তত বেশি জটিল হবে। তখন এমন একটি সম্মানজনক উপায় বের করা কঠিন হবে, যেটিকে কোনো পক্ষই পরাজয় বা ছাড় দেওয়া হিসেবে না দেখে।’


লেখক পরিচিতি: ইয়েগানেহ তোর্বাতি নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদক। ইস্তাম্বুল থেকে তিনি ইরান বিষয়ে সংবাদ সংগ্রহ করেন।