logo

দুঃসময়ের ত্যাগী নেতা কি বঞ্চিত থেকে যাবেন

দুঃসময়ের ত্যাগী নেতা কি বঞ্চিত থেকে যাবেন

দুই দশক পর ক্ষমতায় ফিরেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এই সময়জুড়ে দলকে এগিয়ে নিতে রাজপথে সোচ্চার থাকতে হয়েছে নেতাকর্মীদের। জোরালো ভূামিকা পালন করেছেন হেভিওয়েট নেতারা। তাদের অনেকে নানা কৌশলে তৃণমূলে দলের শক্ত অবস্থান টিকিয়ে রেখেছিলেন। দীর্ঘ সময় বিরোধী রাজনীতি করার কারণে অনেক নেতাকেই ব্যক্তিগত কিংবা পারিবারিক স্বার্থ বিসর্জন দিতে হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় পেয়ে সরকারে এলেও এমন ত্যাগী নেতাদের বঞ্চিত থেকে যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

দলীয় সূত্রমতে, বিএনপির ত্যাগী নেতাদের মধ্যে একজন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য কবীর আহমেদ ভূঁইয়া। রাজনৈতিক প্রতিকূল অভিজ্ঞতার মধ্যেও তিনি দলের আদর্শে অবিচল থেকেছেন এবং আছেন। দলের দুঃসময়ে নেতাকর্মীদের প্রতি দায়িত্বশীলতা, সাহসিকতা ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখায় তার ভূমিকা স্থানীয়ভাবে প্রশংসিত। বিশেষ করে ১/১১-এর পর বিএনপির ঐক্য ধরে রাখার জন্য নিরলস কাজ করে গেছেন কবীর আহমেদ ভূঁইয়া।

নির্বাচনের আগে দলের দোটানা
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অন্যতম প্রধান দল হিসেবে বিএনপি ক্ষমতায় আসার নিশ্চয়তা নিয়ে কার্যক্রম চালাতে থাকে। দলের প্রার্থী হিসেবে আসনগুলোতে সম্ভাব্য তালিকা প্রণয়ন করা হয়। এই তালিকায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ (কসবা-আখাউড়া) আসনে ছিলেন না কবীর আহমেদ ভূঁইয়া।

এই আসনে কবীর আহমেদ ভূঁইয়াকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার দাবিতে উত্তাল হতে শুরু করে কসবা ও আখাউড়া উপজেলা। নেতাকর্মীদের কর্মসূচির মুখে পরে দল থেকে কবীর আহমেদ ভূঁইয়াকে মনোনয়ন দেওয়ার কথা জানানো হয়। আগের মনোনীত প্রার্থী দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মুশফিকুর রহমানকে বহাল রেখেই কবীর আহমেদ ভূঁইয়াকে মনোনয়ন দেওয়ার কথা জানা যায়।

তখন দল থেকে বলা হয়েছিল প্রথম প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হলে দ্বিতীয় মনোনীত প্রার্থী যেন দলের পক্ষ থেকে নির্বাচন করতে পারেন, সে জন্য ব্যাকআপ হিসেবে কবীর আহমেদ ভূঁইয়াকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। যদিও শেষ পর্যন্ত দলের হয়ে নির্বাচনে লড়ে বিজয়ী হন মুশফিকুর রহমান।

দলের প্রতি আনুগত্য এবং নির্বাচনে কবীর আহমেদ ভূঁইয়াকে মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তার প্রসঙ্গে টেনে কসবা পৌর বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক মামুন মিয়া বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন চলাকালে জাতিসংঘের সেক্রেটারির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রেখেছিলেন কবীর আহমেদ ভূঁইয়া। সে সময় তিনি আন্দোলনের তথ্য জাতিসংঘের সেক্রেটারির তাছে অবহিত করেন। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের কার্যালয় এ বিষয়ে অবগত আছে। দেশের জন্য তার অবদান বলে শেষ করা যাবে না।

নির্বাচন-পরবর্তী বাস্তবতা
রাজনীতিকদের মতে, বর্তমানে দেশে এক ধরনেরে অর্থনৈতিক অচলাবস্থা আছে। এই সময়ে সরকরের কবীর আহমেদ ভূঁইয়াকে প্রয়োজন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিদেশ থেকে দেশে বিনিয়োগ এনে কাজ করে যাচ্ছেন। তাকে কোনো কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হলে বিদেশি দাতা সংস্থাগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবে। দেশের অর্থনীতিতে গতিশীলতায় নতুন মাত্রা যোগ করা সম্ভব হবে। 

কবীর আহমেদ ভূঁইয়া প্রতিষ্ঠা করেছেন সামাজিক উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠান ভূঁইয়া গ্লোবাল ফাউন্ডেশন। এই প্রতিষ্ঠান থেকে যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা দুঃসময়ে মানুষের সহায়তায় পাশে থাকেন। প্রতি বছর দরিদ্র মানুষের জন্য বস্ত্র বিতরণ করেন। কৃষি, মৎস্য ও স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, যুব উন্নয়ন এবং খেলাধুলার প্রসারে তিনি অনন্য ভূমিকা রেখেছেন।

এ প্রসঙ্গে আখাউড়া পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আক্তার খান বলেন, তিনি দলের মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তার কাজের যথাযথ মূল্যায়ন হওয়া উচিত। দল বর্তমানে ক্ষমতায় আছে। হাইকমান্ড চাইলে, তাকে আরও উপরে দেখতে পাব। তিনি আমাদের হয়ে সংসদে কথা বলুক। তাকে মন্ত্রিত্ব দেওয়া সময়ের দাবি। আশা করি, প্রধানমন্ত্রী আমাদের দাবি পূরণ করবেন। 

হাইকমান্ডের প্রতি তৃণমূলের আহ্বান
স্থানীয় নেতাকর্মীরা জানান, দলের দুঃসময়ে কবীর আহমেদ ভূঁইয়া নেতাকর্মীদের পাশে থেকেছেন। মামলা-হামলা, নির্যাতন এবং জেলে থাকা কর্মীদের পরিবারকে অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে সহায়তা করেছেন। আন্দোলন-সংগ্রামের বিভিন্ন পর্যায়ে মাঠে থেকে নেতাকর্মীদের পাশে থেকেছেন তিনি। সাংগঠনিক কার্যক্রম সুসংহত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। নেতাকর্মীদের উজ্জ্বীবিত করার পাশাপাশি সার্বিক সহযোগিতা করেছেন তিনি।

সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন না পেলেও কবীর আহমেদ ভূঁইয়া এলাকায় নিয়মিতভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। এরই অংশ হিসেবে সহস্রাধিক পরিবারকে অসন্ন ঈদ উপলক্ষে উপহার বিতরণ করেছেন। সম্প্রতি এলাকাবাসীকে নিয়ে তিনি ইফতার মাহফিলের আয়োজন করেন। সেখানে সর্বস্তরের মানুষের উপস্থিতি ছিল।

নেতাকর্মীরা মনে করেন, দলের প্রতি আনুগত্য, ত্যাগী কর্মীদের মূল্যায়ন এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগের কারণে কবীর আহমেদ ভূঁইয়া কসবা ও আখাউড়ায় একজন গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয় নেতা হিসেবে পরিচিত। দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়ন, সভা-সমাবেশে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিকভাবে হয়রানির শিকার নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়ানোই তার রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য।

এ প্রসঙ্গে কসবা উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বারের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট ফখরুদ্দিন আহমেদ খান বলেন, দলের কঠিন সময়ে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের পাশে থেকে সাহস জুগিয়েছেন কবীর আহমেদ ভূঁইয়া। তিনি বিএনপির তৃণমূল সংগঠনকে নতুন করে উজ্জীবিত করছেন। দলের নেতাকর্মীরা তাকে ভালোবেসে বলেন, দুর্দিনের কান্ডারি।

তিনি আরও বলেন, গত ১৭ বছর ধরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ১৪টি সাংগঠনিক ইউনিটে বিএনপি এবং এর অঙ্গসহযোগী সংগঠনগুলোকে সুসংগঠিত রেখেছেন কবীর আহমেদ ভূঁইয়া। দলের ইউনিটগুলো তার নেতৃত্বে সক্রিয় ও কার্যকর হয়ে ওঠে। তার অনুপ্রেরণায় শত শত নতুন নেতাকর্মী দলে যুক্ত হন। দলীয় যেকোনো আন্দোলন-সংগ্রামে ছিল তার সক্রিয় উপস্থিতি। এত কিছুর পরেও তিনি গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের পক্ষ থেকে মনোনয়ন পাননি।

কসবা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরিফুল হক স্বপন বলেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে কবীর আহমেদ ভূঁইয়া বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনের একজন অগ্রণী মুখ হিসেবে দুঃসময়ে দলীয় কার্যক্রম চালিয়ে গেছেন নির্ভীকভাবে। এত শ্রমের বিনিময়ে দল তাকে সেভাবে মূল্যায়ন করেনি, এটা হতাশার।

আখাউড়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি জয়নাল আবেদীন আব্দু বলেন, তৃণমূলের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক এবং সৎ, ত্যাগী ও মানবিক রাজনৈতিক চেতনার জন্য কবীর আহমেদ ভূঁইয়া একজন গ্রহণযোগ্য নেতা হিসেবে পরিচিত। তার সক্রিয় নেতৃত্বে বিএনপি কসবা-আখাউড়া অঞ্চলে শক্ত ভিত্তি ফিরে পেয়েছে। এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে আজকের ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসন। কবীর আহমেদ ভূঁইয়া বরাবরই বঞ্চিত ছিলেন। আর কতকাল তিনি এমন বঞ্চিত হয়ে থাকবেন, এটিই দলের হাইকমান্ডের কাছে প্রশ্ন?

আখাউড়া পৌর বিএনপির সভাপতি সেলিম ভূঁইয়া বলেন, কবীর আহমেদ ভূঁইয়া কসবার তরুণ প্রজন্মকে মাদকমুক্ত রাখতে বিভিন্ন টুর্নামেন্টের আয়োজন করেন, যা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। পাশাপাশি তিনি বিদেশগামী শ্রমিকদের সহায়তায় কাজ করেছেন। বিএনপি ঘোষিত রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের ৩১ দফা কর্মসূচি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছেন। সেই কাজে এখনো নিয়োজিত আছেন তিনি। তিনি মন্ত্রী হলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসন, তথা দেশের আমূল পরিবর্তন ঘটবে।

আখাউড়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ডা. খোরশেদ আলম ভূঁইয়া বলেন, দলের দুঃসময়ে যে মানুষটি পাশে ছিলেন, সেই কবীর আহমেদ ভূঁইয়াকে আমরা এলাকার হয়ে সংসদে দেখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কসবা-আখাউড়াবাসীর দুর্ভাগ্য সেই আশা পূরণ হয়নি। তাই এই ত্যাগী নেতাকে আগামী দিনে টেকনোক্রেট মন্ত্রী হিসেবে দেখতে চাই।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক বেলাল উদ্দিন সরকার তুহিন বলেন, দলের চরম দুর্দিনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা যখন নেতৃত্বশূন্য ছিল, নেতারা যখন বিদেশে, ঢাকা কিংবা চট্টগ্রামে অবস্থান করতেন-তখন কবীর আহমেদ ভূঁইয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ১৪টি ইউনিটকে সুসংঘটিত করে সশরীরে উপস্থিত থেকে আন্দোলন বেগবান করেন। দলের প্রতিটি নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটি সফল সম্মেলন করেন। সেখানে দলের চেয়ারম্যান ভার্চুয়ালি উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন। কিন্তু কবীর আহমেদ ভূঁইয়াকে বঞ্চিত করা হয়। সবাই আশা করেছিল কবীর আহমেদ ভূইয়া কসবা-আখাউড়া থেকে এমপি হবেন। দলের কাছে কবীর আহমেদ ভূইয়ার যথাযথ মূল্যায়ন চাই। এতে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের কাছে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছবে।

আখাউড়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও সাবেক বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার মুসলিম উদ্দীন বলেন, কবীর আহমেদ ভূঁইয়াকে মূল্যায়ন না করলে তৃণমূল হতাশ হবে। দলের দুঃসময়ে তিনি বিএনপিকে উজ্জীবিত করেছেন। তার নেতৃত্বে এখনও পুরো জেলার বিএনপি ও সব সহযোগী সংগঠন ঐক্যবদ্ধ। দলের বিপদের সময় এত সক্রিয়ভাবে কাজ করতে কলিজা লাগে। তাকে গুম করা হয়েছিল। আর ওপর নির্মম নির্যাতন করা হয়েছিল। যে কারণে তার হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল। তার হার্টের ধমনিতে দুইটি রিং পরানো হয়। জীবন বাজি রেখে যে নেতা মাঠে ছিলেন, তাকে বঞ্চিত করলে ভবিষ্যতে দল কোনো বিপদে পড়লে দলের জন্য ঝুঁকি নিতে কোনো নেতাকর্মী এগিয়ে আসবেন না। কসবা ও আখাউড়া বিএনপিকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে কবীর আহমেদ ভূইয়াকে যে কোনো দপ্তরের মন্ত্রিত্ব দেওয়া এখন সময়ের দাবি।