Advertisement

দ্য গার্ডিয়ানের মতামত/আমেরিকা নির্ভর না হয়ে ইউরোপকে নিজস্ব ‘যুদ্ধকৌশল’ গড়তে হবে

নাতালি তোকচি
আমেরিকা নির্ভর না হয়ে ইউরোপকে নিজস্ব ‘যুদ্ধকৌশল’ গড়তে হবে
২০২২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি রুমানিয়ায় মোতায়েনের পূর্বে জার্মানির ভিলসেক এলাকায় সাঁজোয়া সামরিক যানবাহন প্রস্তুত করছেন মার্কিন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়া অথবা তাদের সামান্য সহায়তায় ইউরোপ কীভাবে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিজেকে রক্ষা করবে? এই প্রশ্নটিই এখন পুরো ইউরোপ মহাদেশের জন্য এক অস্তিত্ব সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাশিয়ার সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতা কেবল ইউক্রেনেই সীমাবদ্ধ নয়। মস্কোর হাইব্রিড আক্রমণ ও রাশিয়া-বান্ধব দলগুলোকে রাজনৈতিক সহায়তা দিন দিন বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে তাদের সামরিক ক্ষমতার আস্ফালন। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের উপকূল থেকে মাত্র ৪৫ মাইল দূরে রুশ যুদ্ধজাহাজ তাজা বুলেট ছুড়ে মহড়া চালিয়েছে। এসব ঘটনা একই সংকটের ইঙ্গিত দেয়।

আগামী মাস বা বছরগুলোতে রাশিয়ার আক্রমণ ঠেকাইতে সরাসরি যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কাও এড়িয়ে যাওয়া যাচ্ছে না। তাই পুরো ইউরোপজুড়ে সামরিক বাজেট বাড়ানো হচ্ছে। বিশেষ করে যুদ্ধক্ষেত্রের কাছের দেশগুলো প্রতিরক্ষা খাতকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় আসার পর থেকে ইউরোপে প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির গতি আরও বেড়েছে। ট্রাম্পের মন্তব্যের চেয়ে ইউরোপীয়দের কড়া বাস্তবতাবোধই এর মূল কারণ। তারা বুঝতে পেরেছে, রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো তাদের পাশে থাকবে না।

মার্কিন পারমাণবিক সুরক্ষা শেষ পর্যন্ত বজায় থাকতে পারে। তবে ফ্রান্স তা ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কায় ইতোমধ্যে নিজেদের পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ইউরোপীয়করণের উদ্যোগ নিয়েছে। ইউরোপীয় সরকার ও সংস্থাগুলো এখন চরম ঝুঁকির হিসাব কষছে। মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রথাগত সাহায্য ছাড়া বা সামান্য সহায়তায় কীভাবে একা রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করা যাবে, তারা এখন সেই প্রস্তুতি নিচ্ছে।

আর এটিই বর্তমানে অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে ‘ন্যাটো ৩.০’ নামে পরিচিত ব্যবস্থার উত্থানের প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করে। কয়েক সপ্তাহ আগে তুরস্কের আংকারায় ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উদ্যোগটি বেশ সাড়ম্বরে প্রচার করা হয়। ডোনাল্ড ট্রাম্পকে শান্ত রাখা এবং ভ্লাদিমির পুতিনকে একটি বার্তা দেওয়া ছিল এর প্রধান লক্ষ্য। বার্তাটি হলো—যুক্তরাষ্ট্র নিষ্ক্রিয় হলেও ইউরোপীয়করণ করা ন্যাটো নির্ভরযোগ্য থাকবে।

এই উদ্যোগের সমর্থকরা একটি স্লোগান ব্যবহার করছেন। তা হলো—‘একটি শক্তিশালী ন্যাটোতে আরও শক্তিশালী ইউরোপ’। তবে এই স্লোগানটি বিভ্রান্তিকর। ইউরোপীয়রা সামরিকভাবে আগের চেয়ে শক্তিশালী হবে ঠিকই, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের আংশিক নিষ্ক্রিয়তার কারণে সামগ্রিকভাবে ন্যাটো দুর্বল হয়ে পড়বে। তবুও ইউরোপীয় কেন্দ্রিক ন্যাটোর লক্ষ্যে কাজ করা বুদ্ধিমানের কাজ। জোটটি দুর্বল হলেও আগ্রাসী রাশিয়ার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর মতো যথেষ্ট ক্ষমতা তাদের থাকবে।

তবে এখানেই সবাইকে সতর্ক হতে হবে এবং একই সঙ্গে বিকল্পগুলো নিয়ে কাজ করতে হবে। ধরা যাক, আগামীতে রাশিয়ার কোনো ইউরোপীয় ন্যাটো সদস্য দেশের ওপর আক্রমণের মতো খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হলো। সে ক্ষেত্রে ওই দেশটির ইউরোপীয় ন্যাটো মিত্ররা সম্ভবত তাদের রক্ষায় এগিয়ে আসবে। পূর্ব ও উত্তর ইউরোপের দেশগুলো অবশ্যই একে অপরের পাশে দাঁড়াবে। এমনকি জার্মানিও মানসিকভাবে এই বড় ধাক্কাটি সামলে নিয়েছে। তারা মেনে নিয়েছে যে তাদের সৈন্যদের আবারও রুশদের বিরুদ্ধে লড়তে হতে পারে। লিথুয়ানিয়ায় স্থায়ীভাবে ৫ হাজার সদস্যের সামরিক ব্রিগেড মোতায়েন করার জার্মান পরিকল্পনা সেই ইঙ্গিত দেয়।

জার্মানি সাড়া দিলে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যও সম্ভবত এগিয়ে আসবে। আর এই মূল দেশগুলো এগিয়ে এলে ইতালি ও স্পেনও তাদের অনুসরণ করবে। ভালো খবর হলো, ইউরোপীয়রা সম্ভবত শেষ পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ থাকবে। কিন্তু খারাপ খবর হলো, ইউরোপকে রক্ষা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সাড়া না-ও মিলতে পারে। আর এটি ঘটলে মুহূর্তের মধ্যে ন্যাটো ভেঙে যাবে।

ন্যাটোর মূল প্রতিশ্রুতির ভিত্তি হলো ‘অনুচ্ছেদ ৫’। এই নিয়ম অনুযায়ী, যেকোনো একটি সদস্য দেশের ওপর আক্রমণ মানে সবার ওপর আক্রমণ। যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫-এর আহ্বানে সাড়া না দিলে কিংবা এই ভয়ে অনুচ্ছেদ ৫ কখনো সক্রিয়ই করা না হলে—উভয় ক্ষেত্রেই জোটটির ভাঙন হবে অবধারিত।

দ্বিতীয় ও তুলনামূলক কম বিপর্যয়কর আরেকটি পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। যেখানে রাশিয়ার কোনো উসকানি থাকবে না এবং ন্যাটো ৩.০ আন্তরিকভাবে এগিয়ে যাবে। এর ফলে কয়েক বছরের মধ্যে এই জোটটি সম্পূর্ণ নতুন রূপ নেবে। সেখানে তুরস্ক ও কানাডার পাশাপাশি ইউরোপীয়রাই সিংহভাগ দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র বাদে অন্য মিত্ররা যদি দায়িত্বের সিংহভাগ বহন করে, তবে তারা নীতি নির্ধারণের অধিকারও বেশি দাবি করবে।

এর ফলে ইউরোপের প্রতিরক্ষা বাজার মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য সংকুচিত হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে ন্যাটোর অগ্রাধিকারগুলো ইউরোপের স্বার্থকে প্রতিফলিত করতে শুরু করবে। ইউরোপীয়রা কেবল আদেশ মেনে নিয়ে অনন্তকাল ধরে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য মেনে নেবে না। তবে ট্রাম্প প্রশাসন কিংবা যেকোনো মার্কিন প্রশাসনের পক্ষেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসব অধিকার ছেড়ে দেওয়া কল্পনা করা কঠিন।

১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ন্যাটো মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা, প্রযুক্তি ও কৌশলের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। ইউরোপীয়রা এতদিন মার্কিন কমান্ড কাঠামোর সঙ্গেই যুক্ত ছিল এবং তাদের যুদ্ধকৌশলকেই নিজেদের বলে মেনে নিয়েছিল।

ইউরোপীয় দেশগুলোর কাছে যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, পর্যাপ্ত জনবল ও সুসংগঠিত কমান্ড কাঠামোর ঘাটতি রয়েছে। ফলে অদূর ভবিষ্যতে কোনো সশস্ত্র আক্রমণের মুখোমুখি হলে তারা ন্যাটোর বিদ্যমান মডেলটি হুবহু ব্যবহার করতে পারবে না। তারা যেভাবে হোক একটি বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করবেই। তবে যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোর আনুষ্ঠানিক সদস্য হিসেবে বহাল থাকলে এবং সাহায্য না বাড়ালে জোটের ভেতরে থেকে এমন বিকল্প গড়ে তোলা কঠিন হবে।

তবে সম্ভাব্য বিকল্পগুলোর কোনটিই পুরোপুরি আদর্শ নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) প্রতিরক্ষা খাতের সহযোগিতায় কাজ করছে এবং তাদের চুক্তিতে একটি ‘পারস্পরিক সহায়তা ধারা’ রয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে সামরিক সুরক্ষায় এটি খুব বেশি কার্যকর নাও হতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে ‘কোয়ালিশন অব দ্য উইলিং’ বা স্বেচ্ছাসেবী সামরিক জোটের ধারণাটি আবারও সামনে আসছে। অতীতে জাতিসংঘ বা ন্যাটোর অনুমোদন এড়াতে যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের জোটের নেতৃত্ব দিয়েছিল। ২০০৩ সালে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ইরাক আক্রমণের ঘটনা এর সবচেয়ে বিতর্কিত উদাহরণ।

তবে বর্তমানে দৃশ্যপট বদলেছে। এখন ইউক্রেন, গ্রিনল্যান্ড ও হরমুজ প্রণালিসহ স্পর্শকাতর নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলায় নতুন ধরনের স্বেচ্ছাসেবী জোট গড়ে উঠছে। জাতিসংঘ, ন্যাটো ও ইইউ কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় এই উদ্যোগ নিতে হচ্ছে।

মজার বিষয় হলো, এবারের জোটগুলো কোনো মার্কিন নেতৃত্বাধীন পদক্ষেপ নয় এবং এগুলো আন্তর্জাতিক আইন ভেঙে গঠিত হচ্ছে না। এগুলো সম্পূর্ণ ইউরোপের নিজস্ব উদ্যোগে তৈরি এবং ওয়াশিংটনকে এড়িয়ে আন্তর্জাতিক আইন মেনেই মহাদেশের সম্মিলিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করছে।

তবে এ ধরনের স্বেচ্ছাসেবী জোটগুলো মূলত সাময়িক ও নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যভিত্তিক হয়ে থাকে। এগুলোতে স্থায়ী কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যবস্থা বা সুনির্দিষ্ট সামরিক কমান্ড কাঠামো থাকে না। বিভিন্ন দেশের সামরিক বাহিনীগুলো যৌথ পরিকল্পনার জন্য বৈঠক করলেও দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধকৌশল গ্রহণ, আইনি ধারাবাহিকতা ও জনগণের আস্থা অর্জনে এই সাময়িক জোট যথেষ্ট নয়। তাই রাজনৈতিক স্তরে এই উদ্যোগগুলোকে একটি স্থায়ী রূপ দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।

এর একটি সমাধান হতে পারে ‘ইউরোপীয় নিরাপত্তা পরিষদ’ গঠন করা। ব্রেক্সিটের পর নিরাপত্তা বিষয়ে যুক্তরাজ্যকে সঙ্গে রাখতেই মূলত এই ধারণার সৃষ্টি হয়েছিল। পুরো মহাদেশের সুরক্ষা নিশ্চিতে ইউরোপ কীভাবে পদক্ষেপ নেবে, তা নির্ধারণে এখন ধারণাটি আবারও আলোচনায় আসছে।

এসব আলোচনার অর্থ কিন্তু ন্যাটোর গুরুত্ব কমানো নয়। তবে ‘ন্যাটো ৩.০’ উদ্যোগ যদি শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ বা বাধাগ্রস্ত হয়, তবে এই স্বেচ্ছাসেবী সামরিক জোটই হতে পারে ইউরোপের প্রধান বিকল্প নিরাপত্তা ব্যবস্থা।


লেখক: নাতালি তোকচি দ্য গার্ডিয়ানের ইউরোপবিষয়ক একজন নিয়মিত কলাম লেখক। এছাড়া তিনি রোমভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইস্টিটিউট অ্যাফেয়ারি ইন্টারন্যাশনাল’-এর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।