বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস ২০২৬: সুস্থতর ভবিষ্যতের জন্য ফার্মাসিস্টদের ক্ষমতায়ন

৬৫ বছর বয়সী কাওসার আহমেদ একজন ডায়াবেটিস রোগী। তিনি প্রতিদিন ইনসুলিন গ্রহণ করেন। রংপুরে বসবাসকারী কাওসার আহমেদ একমাত্র কন্যার সঙ্গে দেখা করতে ঢাকায় যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। ইনসুলিন তাপমাত্রা-সংবেদনশীল, তাই এটির পরিবহনের বিস্তারিত জানতে তিনি কাছের একটি মডেল ফার্মেসিতে গিয়ে নিবন্ধিত ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নেন। ফার্মাসিস্ট তাকে ইনসুলিন একটি ইনসুলেটেড কেসে বহন করার এবং তা যেন অতিরিক্ত তাপ ও সরাসরি সূর্যালোকের সংস্পর্শে না আসে, সে বিষয়ে পরামর্শ দেন।
কাওসার আহমেদের এই ঘটনা দেখিয়ে দেয়, দেশের কোটি কোটি রোগী কীভাবে কমিউনিটি ফার্মাসিস্টদের কাছ থেকে ওষুধ-সম্পর্কিত বিভিন্ন পরামর্শ ও সেবা পেতে পারেন।
উন্নয়নশীল দেশগুলোতে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় ফার্মাসিস্টদের সম্পৃক্ত করার ধারণাটি ধীরে ধীরে বিকশিত হচ্ছে। তবে বিদ্যমান অবকাঠামো, নিয়ন্ত্রক কাঠামো ও স্বাস্থ্যনীতি এখনো এই বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে ওঠেনি। এই ব্যবধানকে সামনে রেখে ২০২৬ সালের বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে “Empowering Pharmacists for Healthier Futures” বা “সুস্থতর ভবিষ্যতের জন্য ফার্মাসিস্টদের ক্ষমতায়ন।” এখানে ক্ষমতায়ন বলতে ফার্মাসিস্টদের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা প্রদান, সহায়ক আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন এবং বৃহত্তর স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সঙ্গে যথাযথভাবে সম্পৃক্ত করাকে বোঝানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০০৯ সাল থেকে প্রতি বছর ২৫ সেপ্টেম্বর বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস পালিত হয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক ফার্মাসিউটিক্যাল ফেডারেশন (FIP)-এর নেতৃত্বে পালিত এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো রোগ প্রতিরোধ, সকল স্তরের মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার টেকসই উন্নয়নে ফার্মাসিস্টদের গুরুত্বপূর্ণ অবদানকে তুলে ধরা ও সমর্থন করা।
২০২৬ সালের ফার্মাসিস্ট দিবসের প্রতিপাদ্য বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কারণ বাংলাদেশে ফার্মাসিস্টরা মূলত ওষুধ উৎপাদন ও বিপণন কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বিপরীতে কমিউনিটি ও হাসপাতাল ফার্মেসি সেবা একেবারেই প্রারম্ভিক পর্যায়ে এবং দেশের জনগণের স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন মেটানোর জন্য প্রয়োজনীয় পর্যায় থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে কমিউনিটি ফার্মাসিস্টরা স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় সবচেয়ে দ্রুত পৌঁছানো যায় এমন পেশাজীবীদের মধ্যে অন্যতম। দেশটির প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো ফার্মেসির এক মাইলের মধ্যে বসবাস করেন, যেখানে ফার্মাসিস্টরা বিভিন্ন মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করে থাকেন। বিপরীতে বাংলাদেশে হাসপাতাল বা কমিউনিটি ফার্মেসি ব্যবস্থায় কর্মরত নিবন্ধিত গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টের সংখ্যা ১০০-এরও কম।
ওষুধের যৌক্তিক ব্যবহার (Rational Use of Medicines) নিশ্চিত করার অর্থ হলো রোগীর নির্দিষ্ট প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক সময়ে, সঠিক মাত্রায়, নিরাপদ ও সাশ্রয়ীভাবে ওষুধ ব্যবহার নিশ্চিত করা। ওষুধের যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ফার্মাসিস্টরা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীল পেশাজীবী। হাসপাতাল ও কমিউনিটি-উভয় ক্ষেত্রেই এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার। তাই এসব সেবায় ফার্মাসিস্টদের সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে জনমিতিক পরিবর্তন (Demographic Change), বিশেষ করে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি, একাধিক ওষুধের কার্যকর ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে দিচ্ছে। বয়স্ক ব্যক্তিরা প্রায়ই একাধিক দীর্ঘমেয়াদি রোগের জন্য বিভিন্ন ওষুধ গ্রহণ করেন। ফলে তারা Polypharmacy বা একসঙ্গে একাধিক ওষুধ ব্যবহারের কারণে বিভিন্ন সমস্যার ঝুঁকিতে থাকেন। কমিউনিটি ফার্মাসিস্টরা ওষুধ পর্যালোচনা, একাধিক ওষুধের ব্যবহার পর্যবেক্ষণ এবং নিরাপদ ও যৌক্তিক ওষুধ ব্যবহারে উৎসাহ প্রদানের মাধ্যমে রোগ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন।
বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগ-এর ক্রমবর্ধমান বোঝা একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। এসব রোগের ক্ষেত্রে প্রতিরোধের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অনেক ক্ষেত্রেই দীর্ঘ সময় ধরে ওষুধ গ্রহণ করতে হয়। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে উৎসাহ দেওয়া, ওষুধ সেবনে রোগীর সঠিক নিয়ম মানা নিশ্চিত করা, চিকিৎসার ফলাফল পর্যবেক্ষণ এবং রোগীকে যথাযথ পরামর্শ প্রদানের মাধ্যমে ফার্মাসিস্টরা অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
ডিজিটাল রূপান্তরের অংশ হিসেবে ইলেকট্রনিক প্রেসক্রিপশন, রোগীর ডিজিটাল রেকর্ড, স্বয়ংক্রিয় ওষুধ বিতরণ ব্যবস্থা, টেলিফার্মেসি এবং বিভিন্ন মোবাইল অ্যাপ ভবিষ্যতে আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠবে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। এই নতুন বাস্তবতায় নিরাপদ, কার্যকর ও যথাযথ ওষুধ ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবায় রোগীকেন্দ্রিক সেবা প্রদানে ফার্মাসিস্টরা গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠবেন।
ওষুধের কার্যকারিতা বজায় রাখা, অনাকাঙ্খিত ফলাফল প্রতিরোধ, অনুপযুক্ত ব্যবহার রোধ এবং নষ্ট হয়ে যাওয়া থেকে ওষুধকে সুরক্ষিত রাখার জন্য যথাযথ সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওষুধের সঠিক সংরক্ষণ নিশ্চিত করা ফার্মাসিস্টের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। ওষুধ সংগ্রহ ও বিতরণ থেকে শুরু করে পরিবহন এবং রোগীর কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে নির্ধারিত তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরিবেশগত শর্ত বজায় রাখতে ফার্মাসিস্টরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন।
কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে রোগীর নির্দিষ্ট প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধের ফর্মুলেশন পরিবর্তন করার প্রয়োজন হতে পারে। হাসপাতাল ফার্মাসিস্টরা এ ক্ষেত্রে উপযুক্ত মাত্রা নির্ধারণ, ফর্মুলেশন তৈরি এবং রোগীর জন্য ব্যক্তিকেন্দ্রিক ওষুধ প্রস্তুতের মাধ্যমে নিরাপদ ও কার্যকর চিকিৎসা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ এবং তা রিপোর্ট করাও রোগীর নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফার্মাসিস্টরা প্রতিদিন রোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং ওষুধ সম্পর্কে তাদের বিশেষজ্ঞ জ্ঞান রয়েছে ফলে ওষুধের অনাকাঙ্খিত প্রতিক্রিয়া শনাক্ত, পর্যবেক্ষণ ও রিপোর্ট করার ক্ষেত্রেও তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ফার্মাসিস্টদের রোগী ব্যবস্থাপনায় বহুমুখী ভূমিকা থাকলেও বাংলাদেশে ফার্মেসি পেশা এখনো মূলত শিল্পকেন্দ্রিক। ফলে রোগীরা ফার্মাসিস্টদের ক্লিনিক্যাল জ্ঞান, রোগী কাউন্সেলিং এবং ওষুধ ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত সেবার পূর্ণ সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ছাড়া দেশে সুসংগঠিত হাসপাতাল ফার্মেসি সেবা খুবই সীমিত। সরকারি হাসপাতালগুলোতে ফার্মাসিস্টের পদ খুব কম, অনেক ক্ষেত্রে প্রায় নেই বললেই চলে। অথচ প্রচলিত হাসপাতাল ফার্মেসি ব্যবস্থাপনার মানদণ্ড অনুযায়ী, ১০০ শয্যার একটি হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টা সেবা নিশ্চিত করতে অন্তত ৪-৫ জন ফার্মাসিস্ট প্রয়োজন। সাম্প্রতিক সময়ে সরকার একটি পৃথক অধিদপ্তরের অধীনে হাসপাতাল ফার্মাসিস্ট নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছিল; তবে সেই উদ্যোগ এখনো পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হয়নি।
বর্তমান কমিউনিটি ফার্মেসি ব্যবস্থাতেও ওষুধ বিতরণ এবং রোগীদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার জন্য যোগ্যতাসম্পন্ন ফার্মাসিস্ট নিয়োগের সক্ষমতা সীমিত। কিছু মডেল ফার্মেসি এ ধরনের সেবা চালু করলেও সারা দেশে থাকা দুই লাখেরও বেশি কমিউনিটি ফার্মেসির তুলনায় এ সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য। তরুণ ফার্মেসি গ্র্যাজুয়েটদের উদ্যোক্তা হিসেবে এগিয়ে আসার সুযোগ সৃষ্টি, বিদ্যমান ফার্মেসিগুলোকে প্রণোদনা প্রদান, সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়ন এবং আইনের কার্যকর প্রয়োগের মাধ্যমে কমিউনিটি ফার্মেসিতে যোগ্য ফার্মাসিস্টদের সম্পৃক্ততা বাড়ানো সম্ভব।
আমাদের ফার্মেসি শিক্ষা ব্যবস্থাও এখনো অনেকাংশে পণ্যকেন্দ্রিক, যেখানে ক্লিনিক্যাল ও কমিউনিটিভিত্তিক এবং রোগীকেন্দ্রিক সেবার ওপর তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশে হাসপাতাল ও কমিউনিটি ফার্মেসি সেবা শক্তিশালী করার এখনই সময়। রোগীর চিকিৎসা ও ওষুধ ব্যবস্থাপনায় যোগ্যতাসম্পন্ন ফার্মাসিস্টদের যথাযথভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে। জনস্বাস্থ্যের বৃহত্তর স্বার্থে এ বিষয়ে সরকারকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
লেখক পরিচিতি
ড. মো. আবু জাফর সাদেক একজন ফার্মাসিস্ট এবং ইউনিমেড ইউনিহেলথ ফার্মাসিউটিক্যালস-এর উপ-মহাব্যবস্থাপক।