আলজাজিরার কলাম/ ইয়েমেন যুদ্ধের সামনে দুটি দৃশ্যপট: কোন পথে যাবে সংঘাত?

দীর্ঘ চার বছর কিছুটা শান্ত থাকার পর ইয়েমেনের যুদ্ধ আবার নতুন করে জ্বলে উঠেছে। ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর দেশটি কার্যত একটি অমীমাংসিত স্থিতাবস্থার মধ্যে ছিল। কিন্তু সম্প্রতি লোহিত সাগরের কৌশলগত প্রবেশদ্বার বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং সৌদি আরবের ভেতরে হুতিদের ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এই সংঘাতকে আবার বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
ইয়েমেনের এই নতুন অস্থিরতার পেছনে আঞ্চলিক ভূরাজনীতির বড় প্রভাব রয়েছে। বিশেষ করে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই হুতিরা নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ পায়। সৌদি আরবের সমর্থিত ইয়েমেন সরকার যখন হুতিদের হটিয়ে দিতে পাল্টা অভিযান শুরু করল, তখন সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনাগুলোতেও।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে ইয়েমেন যুদ্ধ এখন এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। সংঘাতটি মূলত দুটি সম্ভাব্য দৃশ্যপটের (সিনারিও) দিকে মোড় নিতে পারে।
প্রথম দৃশ্যপট: সর্বাত্মক সংঘাতের বিস্তার
প্রথম আশঙ্কাটি হলো সংঘাতের চূড়ান্ত অবনতি এবং একটি সর্বাত্মক আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেওয়া। এই দৃশ্যপটে সৌদি আরব তার মিত্রদের সঙ্গে নিয়ে হুতিদের বিরুদ্ধে আগের মতো সর্বাত্মক বিমান হামলা ও অবরোধ শুরু করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো এতে গোয়েন্দা তথ্য ও নৌবাহিনীর সহায়তা বাড়াতে পারে।
এর বিপরীতে হুতিরাও তাদের দূরপাল্লার ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে সৌদি আরব ও উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রধান প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্র, বিমানবন্দর এবং তেল পরিশোধনাগারে হামলা আরও জোরদার করতে পারে। একই সঙ্গে হুতিরা লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল পুরোপুরি স্তব্ধ করে দিতে পারে।
এই পরিস্থিতি তৈরি হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। হরমুজ প্রণালির পর বাব আল-মান্দেব বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতি বড় ধরনের মূল্যস্ফীতির মুখে পড়বে।
তবে এই সর্বাত্মক সংঘাতের সবচেয়ে করুণ শিকার হবে ইয়েমেনের সাধারণ মানুষ। দেশটিতে ইতিমধ্যে জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। নতুন করে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ ও বন্দর অবরোধ শুরু হলে দেশটিতে চরম দুর্ভিক্ষ ও প্রাণহানি ঘটবে, যা গত এক দশকের বিপর্যয়কেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
দ্বিতীয় দৃশ্যপট: সামরিক অচলাবস্থা ও সমঝোতার পথ
দ্বিতীয় দৃশ্যপটটি হলো একধরনের সামরিক অচলাবস্থা এবং শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে ফিরে আসা। বাস্তবতা হলো, গত এক দশকের যুদ্ধ প্রমাণ করেছে যে কেবল বিমান হামলা চালিয়ে কিংবা বাইরে থেকে সমর্থন দিয়ে পাহাড়ঘেরা হুতি বাহিনীকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করা অসম্ভব।
একইভাবে হুতিরাও পুরো ইয়েমেনের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। কারণ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী ও সরকারের অনুগত বাহিনী নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর।
অন্যদিকে সৌদি আরবের ভবিষ্যৎ রূপকল্প ‘ভিশন ২০৩০’ সফল করতে হলে তাদের ভূখণ্ডে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। রাজধানীতে প্রতিনিয়ত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের আঘাত চলতে থাকলে দেশটিতে বিদেশি বিনিয়োগ ও পর্যটনের স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। ফলে সৌদি শাসকদের একটি পর্যায়ে বাস্তবতার মুখোমুখি হতেই হবে।
এই বাস্তবতায় ওমান বা জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় উভয় পক্ষ একটি নতুন অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি বা সমঝোতার পথে হাঁটতে পারে। এই দৃশ্যপটে হুতিরা তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকা শাসন করবে এবং দক্ষিণাঞ্চল সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। অর্থাৎ পূর্ণাঙ্গ কোনো চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি না হলেও দেশটিতে সাময়িক যুদ্ধবিরতি এবং ক্ষমতা ভাগাভাগির একটি অলিখিত বোঝাপড়া তৈরি হতে পারে।
চূড়ান্ত পরিণতি নির্ভর করছে আঞ্চলিক রাজনীতির ওপর
ইয়েমেনের এই দুটি দৃশ্যপটের কোনটি বাস্তবে রূপ নেবে, তা কেবল স্থানীয় পক্ষগুলোর ওপর নির্ভর করছে না। এর বড় অংশ নির্ভর করছে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার সামগ্রিক বৈরিতা এবং লোহিত সাগরের নিরাপত্তার ওপর।
যদি মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক সংঘাত আরও তীব্র হয়, তবে ইয়েমেন সর্বাত্মক যুদ্ধের প্রথম দৃশ্যপটেই পা বাড়াবে। আর যদি সৌদি আরব ও ইরান নিজ নিজ স্বার্থে উত্তেজনা প্রশমনের উদ্যোগ নেয়, তবে দ্বিতীয় দৃশ্যপট অনুযায়ী সংঘাত আবারও একটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য অচলাবস্থায় ফিরে যেতে পারে।
লেখক পরিচিতি:
হেলেন ল্যাকনার একজন প্রখ্যাত ব্রিটিশ গবেষক, সমাজবিজ্ঞানী এবং ইয়েমেন বিষয়ক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ। তিনি দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ইয়েমেনের রাজনীতি, সমাজ ও অর্থনীতি নিয়ে মাঠপর্যায়ে গবেষণা করেছেন। ইয়েমেন সংকট নিয়ে তার রচিত একাধিক গ্রন্থ আন্তর্জাতিকভাবে বহুল প্রশংসিত।
