logo

যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধেও কেন ভেঙে পড়ছে না ইরানের অর্থনীতি

যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধেও কেন ভেঙে পড়ছে না ইরানের অর্থনীতি

পাকিস্তানে ২১ ঘণ্টার সমঝোতা সংলাপেও কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে না পারায় যুদ্ধবিরতি ভেস্তে যাওয়া নিয়ে সংশয় দেখা যায়। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র এ জন্য একে অন্যকে দোষারোপ করে। যদিও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে হাল না ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে পাকিস্তান। তবে ভিন্ন চিত্র দেখা যায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আচরণে। সংলাপ চলাকালে তিনি মেতে ছিলেন খেলা দেখায়। আলোচনা শেষে খালি হাতে মার্কিন প্রতিনিধিদল ইসলামবাদ ত্যাগ করার পর নিজের চিরাচরিত রূপ দেখান ট্রাম্প।

বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে উঠে আসে, ইরানে পুনরায় হামলার কথা ভাবছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। যদিও সে খবর বাস্তব না হলেও ওমান উপসাগরে ঠিকই নৌ অবরোধ করে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী। আর এই অবরোধরের আওতায় রয়েছে ইরানের উপকূলে থাকা সকল বন্দরে আসা-যাওয়া করা জাহাজ। মূলত ইরানের অর্থনীতি ধসিয়ে দেওয়াই এই অবরোধের লক্ষ্য। যাতে দেশটির আয়ের উৎস ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং আর্থিক সংকটের মুখে নতি স্বীকার করে হরমুজ প্রণালি সচল করতে বাধ্য হয়।

ইরানের হাতে বিকল্প

তবে ইরান কোনো অবস্থায় নতি স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নৌ অবরোধের প্রভাব মোকাবিলা করতে সক্ষম। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ফোয়াদ ইজাদি বলেছেন, ইরানের অর্থনীতি দেশটির ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ সহ্য করতে সক্ষম হবে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অর্থনৈতিক জীবনকে নিংড়ে নিচ্ছে—হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলারের এই মন্তব্যের পাল্টা জবাব দিতে গিয়ে তিনি এ কথা বলেন।

ইজাদি আলজাজিরাকে বলেছেন, মিলার সম্ভবত ভুলে গেছেন যে ইরান প্রায় ৬ হাজার কিলোমিটার (৩ হাজার ৭০০ মাইল) স্থল সীমান্ত দিয়ে ঘেরা। ইরানকে তার ‘বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশীরাও’ সাহায্য করছে… দেশটির উত্তরে ও পূর্বে থাকা প্রতিবেশীরা, তাই তারা (যুক্তরাষ্ট্র) ইরানকে শ্বাসরুদ্ধ করতে পারবে না। নৌ অবরোধ আরোপ করা আসলে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অবৈধ। কারণ, বৈদেশিক নীতি বাস্তবায়নের জন্য বেসামরিক নাগরিকদের শাস্তি দেওয়া উচিত নয়। তারা বহু ইরানি বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করে ইতোমধ্যেই সুস্পষ্টভাবে তা করেছে।

এই ইরানি বিশ্লেষকের মতে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী নৌ অবরোধকে আগ্রাসনমূলক কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। বিশেষত যদি তা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক অনুমোদিত না হয়, যে কারণে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর বর্তমান মার্কিন নৌ অবরোধটি অত্যন্ত বিতর্কিত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানে অন্তত ২ হাজার ৭৬ জন নিহত এবং ২৬ হাজার ৫০০ জন আহত হয়েছেন।

ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি

গত ২৮ ফেব্রুয়ারির পর থেকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় প্রায় ২৭০ বিলিয়ন ডলারের অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছে ইরান। দেশটির অসংখ্য সেতু, বন্দর, রেললাইন, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাকেন্দ্র, বিদ্যুৎকেন্দ্র, পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে; ধ্বংস হয়েছে বিপুল সংখ্যক হাসপতাল, স্কুল, বেসামরিক বাড়িঘরও। ক্ষয়ক্ষতি পরিমাণের কাজ এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি বলে জানিয়েছে শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির সরকার।

এদিকে ইরানি এয়ারলাইনস অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক মাকসুদ আসাদি সামানি ইরানি গণমাধ্যমকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামরায় তাদের ২০টি বেসামরিক উড়োজাহাজ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে ৬০টি উড়োজাহাজ ব্যবহারের অনুপযোগী হয়েছে। এখন ১৬০টির মতো যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ আছে। ৪১ দিনের যুদ্ধে তাদের মোট ক্ষতির পরিমাণ ৩০০ ট্রিলিয়ন রিয়াল (প্রায় ১৯ কোটি ডলার)।

আরও সংঘাতের অপেক্ষা

অন্যদিকে তেহরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এখনও মতবিরোধ বিদ্যমান। শান্তিচুক্তির আলোচনার ক্ষেত্রে দুই প্রতিপক্ষের মধ্যে এখনও আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে। তেহরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ নিয়ে আলোচনা ওবামা আমলের জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশনকে (জেসিপিওএ) পুনরায় সামনে এনেছে বলে একজন বিশ্লেষক জানিয়েছেন।

দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক মোহাম্মদ এলমাসরি আলজাজিরাকে বলেন, তারা ইতোমধ্যেই জেসিপিওএ’র মতো একটি অত্যন্ত কঠোর চুক্তিতে সম্মত হয়েছে, যা তাদের পারমাণবিক বোমা অর্জন থেকে বিরত রাখত। এখন ট্রাম্পের ইরানবিরোধী যুদ্ধে মার্কিন অর্থনীতির শত শত কোটি ডলার ক্ষতি হওয়ায় এবং এই সংঘাত বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করায়, মার্কিন প্রেসিডেন্টের পক্ষে জেসিপিওএ’র ‘উন্নত সংস্করণ’ নিয়ে ভোটারদের কাছে ফিরে যাওয়া কঠিন হবে।

তিনি আরও বলেন, আমি এই সবকিছু বলছি এটা বোঝাতে যে, আমাদের সামনে এখনও আরও সংঘাত ও লড়াই অপেক্ষা করছে।