Advertisement

দ্য গার্ডিয়ানের কলাম/ট্রাম্পের মতোই বিপজ্জনক মার্কো রুবিও

ট্রাম্পের মতোই বিপজ্জনক মার্কো রুবিও
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। ছবি: সংগৃহীত

ওয়াশিংটন ডিসির মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তাকালে মনে হবে বিশ্বজুড়ে আগুন জ্বলছে। তবে রেকর্ড দাবদাহের জন্য এই আগুন লাগেনি। অমিমাংসিত ইরান যুদ্ধ ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বেশ পুড়িয়েছে। তার সামরিক অভিযান পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম এখনও বাড়ছে।

Advertisement

আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় পরাজয় ঘনিয়ে আসছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে ‘ঐতিহাসিক যুদ্ধবিরতির’ কৃতিত্ব দেওয়ার কয়েক দিন পরেই ইসরায়েল তার গাজা শান্তি প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। এটি ট্রাম্পের জন্য চরম অপমানজনক ছিল।

অন্যদিকে ইউরোপে ন্যাটো মিত্রদের ওপর রাশিয়ার হামলা ক্রমশ বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এটি বড় যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে। ট্রাম্প যে ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা এখন পঞ্চম বছরে পা দিয়েছে। দুই দেশের সীমান্ত জুড়েই সাধারণ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। এগুলো কেবল কয়েকটি বড় উদাহরণ মাত্র। বিশ্বজুড়ে এমন আরও অনেক সংকট রয়েছে।

কার্যকর ও পেশাদার কূটনীতির প্রয়োজনীয়তা অতীতে কখনোই এতটা জরুরি ছিল না। এই সংকটময় সময়ে সামনে এসেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধান কূটনীতিক মার্কো রুবিও। ফ্লোরিডার সাবেক এই সিনেটরের বয়স এখন ৫৫ বছর।

রুবিও কিউবান অভিবাসী দম্পতির সন্তান। এসব আন্তর্জাতিক সংকট যদি তিনি সফলভাবে মোকাবেলা করতে পারেন, তবে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকানদের মনোনয়নের দৌড়ে তিনি সবার চেয়ে এগিয়ে যাবেন। সমালোচকেরা তাকে ট্রাম্পের চাটুকার ও সেবাদাস বলে কটাক্ষ করেন।

রুবিওর সামনে এখন সেই সমালোচকদের মুখ বন্ধ করার দারুণ সুযোগ। তিনি নিজেকে একজন শ্রদ্ধেয় বিশ্বনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন। ২০১৬ সালে নির্বাচনের সময় ট্রাম্প তাকে ‘ছোট মার্কো’ এবং ‘পরাজিত’ বলে উপহাস করেছিলেন। জবাবে রুবিও ট্রাম্পকে ‘প্রতারক’ বলেছিলেন। এখন রুবিওর সামনে সাহসী হওয়ার এবং নিজেকে বিজয়ী প্রমাণ করার সুযোগ এসেছে।

কিন্তু বাস্তবে কি তা ঘটছে? সম্ভবত না।

রুবিও সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন, অ্যান্টনি ব্লিংকেন কিংবা জন কেরির মতো হেভিওয়েট কূটনীতিবিদদের মতো নন। তাদের মতো নিরলস কূটনীতির ধৈর্য বা সময় রুবিওর কাছে নেই। রুবিওর কাছে ‘শান্তি প্রক্রিয়ার’ কোনো মূল্য নেই। এর বদলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের চরম শক্তি প্রদর্শন করতে পছন্দ করেন। ট্রাম্পের নির্ধারিত মার্কিন স্বার্থ হাসিলের জন্য তিনি অন্য দেশের ওপর নিজেদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেন। এটি আধুনিক সাম্রাজ্যবাদের এক নতুন রূপ।

লক্ষ্যবস্তু হওয়া দেশগুলোর সামনে দুটি পথ খোলা থাকে। হয় ভেনেজুয়েলা, কিউবা কিংবা গ্রিনল্যান্ডের মতো যুক্তরাষ্ট্রের আজ্ঞাবহ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া, না হয় ধ্বংস হওয়া। ইরানের ক্ষেত্রে তাদের নীতি কোনো শাসন পরিবর্তন বা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা নয়। তারা কেবল ইরানকে নিজেদের বশে আনতে চায়। রুবিও কোনো শান্তি আলোচক নন। তিনি ঔপনিবেশিক ভাইসরয়ের মতো আচরণ করছেন। তিনি অন্য দেশের কাছ থেকে অন্ধ আনুগত্য দাবি করছেন।

গত ফেব্রুয়ারিতে মিউনিখে দেওয়া এক বক্তৃতায় রুবিও মার্কিন আধিপত্যের পুরনো নীতি উসকে দেন। তিনি ‘মহান পশ্চিমা সাম্রাজ্যগুলোর’ পতনের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি দাবি করেন, উপনিবেশবিরোধী আন্দোলন ও কমিউনিস্ট বিপ্লব এই পতন ত্বরান্বিত করেছে। তিনি হুঁশিয়ারি দেন, ইউরোপ এখন ‘সভ্যতা বিলুপ্তির’ ঝুঁকিতে রয়েছে।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এমন কোনো দুর্বল মিত্র চায় না যারা নিজেদের সাম্রাজ্যবাদী অতীতের জন্য অনুশোচনায় ভোগে। তিনি এমন মিত্র চান যারা নিজেদের ঐতিহ্য নিয়ে গর্বিত এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তা রক্ষায় যুদ্ধ করতে প্রস্তুত। এটি মার্কিন আধিপত্য বিস্তারের এক নগ্ন রূপ। এতে কোনো মেকি উদারতা ছিল না। এই নীতি কূটনীতির কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছে। ট্রাম্প গত এক বছরে আটটি দেশে হামলা চালিয়েছেন। রুবিওর প্রিয় কিউবা হয়তো পরবর্তী লক্ষ্যবস্তু হতে যাচ্ছে।

রুবিওর শান্তি প্রক্রিয়া থেকে দূরে থাকার একটি বড় কারণ হতে পারে তার অপর দায়িত্বটি। তিনি একই সঙ্গে ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাও বটে। এই দ্বিমুখী ভূমিকা বেশ সাংঘর্ষিক। ইউক্রেন ও ফিলিস্তিন সংকটের মতো জটিল আলোচনাগুলো হোয়াইট হাউসের অনভিজ্ঞ মধ্যস্থতাকারীদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং ব্যবসায়ী বন্ধু স্টিভ উইটকফ এই আলোচনাগুলো চালাচ্ছেন। রুবিও নিজেও এতে সায় দিয়েছেন।

তিনি ইরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা থেকেও নিজেকে দূরে রেখেছেন। ২০২৮ সালের নির্বাচনে তার সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী ও বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে তিনি এই আলোচনার সমালোচনা ও ঝক্কি সামলানোর দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন। রুবিওর এই দূরত্ব বজায় রাখার পেছনে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ রয়েছে। অথবা হয়তো তিনি এই দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ অযোগ্য। কোনো আন্তর্জাতিক বিষয়ে তার নিজস্ব কোনো সুনির্দিষ্ট চিন্তাভাবনা নেই। তিনি কেবল ট্রাম্পের খামখেয়ালি আদেশ মেনে চলেন।

রুবিও একজন রাজনৈতিক বহুরূপী। তার কোনো দৃঢ় নীতি, ধারাবাহিক মতামত বা নৈতিক দিকনির্দেশনা নেই। তার অতীতই এর প্রমাণ দেয়। তার জীবনীকার ম্যানুয়েল রগ-ফ্রাঞ্জিয়া মনে করেন, রুবিওর এই রাজনৈতিক দোলাচল তার শৈশব থেকেই তৈরি হয়েছে। যেকোনো মূল্যে বিজয়ী দলের সঙ্গে থাকাটাই তার অভ্যাস। তিনি একসময় মরমন ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন, পরে আবার রোমান ক্যাথলিক ধর্মে ফিরে যান। সিনেটর থাকার সময় রুবিও চীনের কঠোর সমালোচক ছিলেন।

এখন তিনি বেইজিংয়ের ব্যাপারে ট্রাম্পের তোষণ নীতি মেনে চলছেন। একসময় রাশিয়ার তীব্র সমালোচনা করলেও এখন তিনি রাশিয়ার মন জুগিয়ে চলছেন। অতীতে তিনি আন্তর্জাতিক সাহায্যের পক্ষে ছিলেন। অথচ ক্ষমতায় এসে তিনি ইউএসএআইডি–এর বাজেট কেটে দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ভেঙে দেওয়ার চেষ্টায় লিপ্ত হয়েছেন।

বারাক ওবামার ইরান পারমাণবিক চুক্তির তিনি তীব্র বিরোধী ছিলেন। অথচ এখন তিনি তেহরানকে অতিরিক্ত ছাড় দেওয়ার এক চুক্তিকে সমর্থন করছেন। ভ্যাটিকান যখন মার্কিন যুদ্ধকে অনৈতিক বলেছিল, তখন তিনি রোমে গিয়ে স্বয়ং পোপকেও জ্ঞান দিতে ছাড়েননি।

মর্মান্তিক বিষয় হলো, রুবিওর সামনে ইতিবাচক পরিবর্তনের অনেক বড় ক্ষমতা রয়েছে। রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিন এখন যুদ্ধক্ষেত্রে ও নিজ দেশে ২০২২ সালের পর সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছেন। ইউক্রেনের ভলোদিমির জেলেনস্কি ক্ষেপণাস্ত্র, সৈন্য ও রাজনৈতিক সমর্থনের সংকটে ভুগছেন। যুক্তরাষ্ট্র চাইলে এই দুই পক্ষকে চাপ দিয়ে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে পারত।

ইসরায়েলেও একই পরিস্থিতি। গাজায় গণহত্যা এবং হামাস, ইরান ও হিজবুল্লাহর সঙ্গে সর্বনাশা যুদ্ধের মূল কারিগর বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আগামী অক্টোবরের নির্বাচনে নিশ্চিত পরাজয়ের মুখে দাঁড়িয়েছেন। এটি ট্রাম্পের অবাস্তব শান্তি পরিকল্পনাগুলো বাতিল করার বড় সুযোগ। পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বন্ধের সুযোগ রয়েছে। জাতিসংঘ প্রস্তাবের ভিত্তিতে মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন সমাধান সূত্র বের করা যেত।

রুবিও চাইলে ইরানের সঙ্গে ঝুলে থাকা শান্তি আলোচনার দায়িত্ব নিতে পারতেন। হরমুজ প্রণালীর অচলাবস্থা কাটানোর একমাত্র পথ তেহরানের সঙ্গে সমঝোতা করা। এটি করা গেলে মধ্যপ্রাচ্য, বিশ্ব অর্থনীতি ও মার্কিন ভোক্তারা শান্তি পেত। আমেরিকান নাগরিক, ইউরোপ ও পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সরকার এবং ব্যবসায়ীরা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাত।

এমনকি ট্রাম্পের কট্টর সমর্থকেরা (মাগা সমর্থক), যারা আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের আশঙ্কা করছেন, তারাও এতে খুশি হতেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেও হয়তো এর জন্য কৃতজ্ঞ থাকতেন। কারণ তিনি জানেন যে তিনি এখন বড় বিপদে আছেন। এই বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে তার একজন দক্ষ মানুষের দরকার।

রুবিও অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে থেকেও এগুলোর কিছুই করছেন না। এই কারণে ট্রাম্পের পর তিনিই মার্কিন প্রশাসনের সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যক্তি। তিনি ট্রাম্পের খামখেয়ালি সিদ্ধান্তগুলোকে সমর্থন করছেন এবং নিজের দায়িত্ব অবহেলা করছেন। তিনি কট্টর ডানপন্থীদের মার্কিন আধিপত্যের অবাস্তব স্বপ্নগুলোকে যুক্তি দিয়ে জাস্টিফাই করছেন।

ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সস্তা ঝগড়া করেন। অন্যদিকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ একজন উগ্র জাতীয়তাবাদী। তবে রুবিও তাদের চেয়ে বেশি বিপজ্জনক। কারণ তিনি যুক্তিপূর্ণ ভাষায় কথা বলতে পারেন। ট্রাম্পের উত্তরসূরি এবং ‘মাগা’ (মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন) ব্র্যান্ডের উত্তরাধিকারী হওয়ার দৌড়ে তিনি সবচেয়ে এগিয়ে আছেন।

হয়তো পরিস্থিতি বদলালে তিনি আবার নিজের অবস্থান পরিবর্তন করবেন। হয়তো তিনি নিজের নীতি ও কূটনৈতিক মেরুদণ্ড ফিরে পাবেন। তিনি অনেক বড় সংকট দূর করার ক্ষমতা রাখেন। অতীতে তিনি বারবার নিজের অবস্থান পরিবর্তন করেছেন। রুবিও চাইলে ভালো কিছু করতে পারেন। অথবা তিনি ট্রাম্পের চেয়েও বড় সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেন।


লেখক: সাইমন টিসডল যুক্তরাজ্যের শীর্ষস্থানীয় ও ঐতিহ্যবাহী সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’ এর একজন জ্যেষ্ঠ আন্তর্জাতিক বিষয়ক কলামিস্ট ও বিশ্লেষক। দীর্ঘকাল ধরে তিনি বিশ্ব রাজনীতি ও মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ও প্রভাবশালী লেখালেখি করে আসছেন।