logo

আলজাজিরার কলাম/নিজেদের সমস্যায় ইউরোপ মুসলমানদের দোষারোপ করছে

ফরিদ হাফেজ
ফরিদ হাফেজ
নিজেদের সমস্যায় ইউরোপ মুসলমানদের দোষারোপ করছে
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডের লিয়েন ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ‘স্টেট অব দ্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন’ ভাষণ প্রদান করছেন। ছবি: রয়টার্স

গত সপ্তাহের শেষদিকে ফ্রান্সে বিক্ষোভ সহিংস রূপ নিলে ফরাসি উগ্র ডানপন্থীরা সহিংসতার জন্য মুসলিম তরুণদের দোষারোপ করতে দ্রুত বর্ণবাদী ভাষা ব্যবহার শুরু করে। এর কয়েক সপ্তাহ আগে, যখন হাজার হাজার অভিবাসী প্রতিবেশী মরক্কো থেকে স্পেনের সেউতা ছিটমহলে প্রবেশের চেষ্টা করেছিল, তখন স্প্যানিশ উগ্র ডানপন্থীরা এটিকে মরক্কোবাসীদের একটি সংগঠিত ‘আক্রমণ’ হিসেবে বর্ণনা করে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এতে সায় দিয়ে দাবি করেন যে, এটি নাকি ‘ইসলামের দখল নেওয়ার ইচ্ছা’ সম্পর্কিত বিষয়।

ইসলামবিদ্বেষ উসকে দিতে সংকটকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে উগ্র ডানপন্থীদের এই তৎপরতা প্রত্যাশিত হলেও, ইউরোপের ক্রমবর্ধমান দুর্ভোগের জন্য ইসলাম ও মুসলমানরাই দায়ী—এই ধারণাটি এখন আর ইউরোপীয় রাজনীতির কেবল চরমপন্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই।

গত সপ্তাহে, যখন ফ্রান্সে ছাত্র বিক্ষোভ উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল, তখন ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নিঃশব্দে ‘ইসলামপন্থী অনুপ্রবেশ এবং মুসলিম ব্রাদারহুড নেটওয়ার্কের প্রভাব মোকাবিলায় একটি ইইউ কৌশল তৈরির প্রয়োজনীয়তা’ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব পাস করে। এই প্রস্তাবটি পেশ করেছিল মধ্য-ডানপন্থী ইউরোপীয় পিপলস পার্টি (ইপিপি), যা পার্লামেন্টের বৃহত্তম দল। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেইনও এই দলের সদস্য।

প্রস্তাবটি ৩৮১টি পক্ষে, ১৬৭টি বিপক্ষে এবং ১৫টি বিরত ভোটের মাধ্যমে পাস হয়। আরও চারটি দল প্রায় সর্বসম্মতিক্রমে ইপিপিকে সমর্থন করেছিল: উগ্র ডানপন্থী ‘প্যাট্রিয়টস ফর ইউরোপ’ এবং ‘ইউরোপ অব সোভেরেন নেশনস’, উদারপন্থী ‘রিনিউ ইউরোপ’ এবং ‘ইউরোপিয়ান কনজারভেটিভস অ্যান্ড রিফর্মিস্টস’। অন্যদিকে, সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট, লেফট ও গ্রিনস দলের বেশিরভাগ সদস্য এর বিপক্ষে ভোট দিলেও প্রস্তাবটি ঠেকাতে পারেননি।

‘রাজনৈতিক ইসলামবাদ’ নিয়ে ফরাসি সরকারের একটি অত্যন্ত বিতর্কিত ও সমস্যাযুক্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই প্রস্তাবে বেশ কিছু ত্রুটিপূর্ণ দাবি করা হয়েছে, যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর।

এতে ‘ইসলামপন্থী অনুপ্রবেশ’কে ‘প্রভাব বিস্তার, ধারাবাহিক সামাজিক কাঠামো তৈরি, প্রাতিষ্ঠানিক অনুপ্রবেশ এবং আদর্শিক বৈধতা দেওয়ার একটি রাজনৈতিক কৌশল’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এতে আরও দাবি করা হয়েছে যে, ‘ইসলামপন্থী প্রভাব বিভিন্ন সমিতি, ফাউন্ডেশন এবং সাংস্কৃতিক, শিক্ষাগত, ধর্মীয়, জনকল্যাণমূলক, বিশ্ববিদ্যালয়, যুব, বৈষম্যবিরোধী বা সামাজিক কর্মকাঠামোর বিস্তৃত ও খণ্ডিত বাস্তুতন্ত্রের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।’

আরও নির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, ‘বৈচিত্র্য, সমতা, অন্তর্ভুক্তি ও বৈষম্যবিরোধী কাঠামোগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা পাওয়ার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে, যার মাধ্যমে সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার বৈধ দাবির ভেতর একটি রাজনীতিকৃত ধর্মীয় পরিচয় যুক্ত করা হয়।’ অন্য কথায়, মুসলিম ব্রাদারহুডের মতো নেটওয়ার্কগুলো ইসলামবিদ্বেষবিরোধী উদ্যোগের আড়ালে ইউরোপীয় সমাজে ‘অনুপ্রবেশ’ ঘটায়।

এই প্রস্তাবটি বাধ্যতামূলক নয় এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে এটি বাস্তবায়ন করতেই হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে সহিংসতা বর্জন করার কারণে পুরো ইউরোপজুড়ে মুসলিম ব্রাদারহুড এবং এর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি ও সংস্থাগুলোকে সন্ত্রাসী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার যে আহ্বান জানানো হয়েছে, তা বাস্তবায়িত হওয়ার সম্ভাবনা কম।

তা সত্ত্বেও, প্রস্তাবটি এমন একটি আদর্শিক কাঠামোকে বৈধতা দেয়, যা মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। এটি রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল নয়—এমন স্বাধীন মুসলিম প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলোকে সন্দেহের তালিকায় ফেলে এবং প্রকাশ্য সামাজিক কর্মকাণ্ডে মুসলিম নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণকে একধরনের অনুপ্রবেশ হিসেবে চিত্রিত করে।

প্রস্তাবে ব্রাসেলসভিত্তিক ‘ইউরোপিয়ান নেটওয়ার্ক অ্যাগেইনস্ট রেসিজম’ (ENAR)-সহ বেশ কয়েকটি সংস্থাকে এ ধরনের ‘ইসলামপন্থী’ আচরণ সমর্থনের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি, তাদের ইইউর অর্থায়ন বন্ধ করার এবং ইইউর অর্থায়নপ্রাপ্ত যেকোনো সংস্থাকে তাদের সঙ্গে কাজ করতে নিষেধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। ‘মুসলিম ব্রাদারহুড নেটওয়ার্ক’-এর এই অস্পষ্ট ধারণার কারণে প্রায় যেকোনো ব্যক্তি বা সংস্থাকে পরোক্ষ সম্পর্কের ভিত্তিতে দোষী সাব্যস্ত করা সম্ভব হতে পারে।

বহিরাগত শক্তিগুলো সহজেই এটিকে নিজেদের স্বার্থে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, এবং তা ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, সংযুক্ত আরব আমিরাত ইউরোপ ও অন্যত্র বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংস্থাকে মুসলিম ব্রাদারহুডের সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানোর জন্য একটি বিস্তৃত প্রচারণায় অর্থায়ন করেছে। মজার বিষয় হলো, প্রস্তাবটি পেশ করার কয়েক মাস আগে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে আয়োজিত ‘মুসলিম ব্রাদারহুড: ইউরোপের জন্য একটি বাস্তব হুমকি’ শীর্ষক একটি সম্মেলনে আমিরাতের এক রাষ্ট্রদূত অংশ নিয়েছিলেন। আমিরাতের প্রভাব স্পষ্ট থাকা সত্ত্বেও, প্রস্তাবটিতে কাতার বা তুরস্কের তথাকথিত ‘বিদেশি অর্থায়ন’কে সমস্যাজনক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা নাকি ‘ইসলামপন্থী অনুপ্রবেশ’কে সমর্থন করে। এটি নেপথ্যের ভূরাজনীতির আরেকটি নির্দেশক।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই প্রস্তাবে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের সুরক্ষার বিষয়টিকে ইসলামপন্থী অনুপ্রবেশের ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এটি ইউরোপীয় সমাজে ইসলামবিদ্বেষ মোকাবিলার লক্ষ্যে নেওয়া উদ্যোগ ও প্রকাশ্য আলোচনার ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রতীকীভাবে, এই প্রস্তাবটি ইউরোপের ডানপন্থী মুসলিমবিরোধী শক্তির জন্য একটি বড় বিজয়। এটি দেখায় যে, মধ্য-ডানপন্থীরা উগ্র ডানপন্থীদের যত কাছে আসছে, ইউরোপীয় পার্লামেন্টে উগ্র ডানপন্থীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রাচীর ততই ভেঙে পড়ছে। ইপিপি উগ্র ডানপন্থীদের এজেন্ডাকে প্রায় পুরোপুরি নিজেদের করে নিয়েছে বলে মনে হচ্ছে। তবে তারা সেটিকে জাতীয় নিরাপত্তার ভাষার আড়ালে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছে।

মধ্য-ডানপন্থীদের জন্য এই ইসলামবিদ্বেষী কাঠামোটি রাজনৈতিক সুবিধা নিয়ে আসে। এর মাধ্যমে তারা কেবল মুসলিমবিরোধী ভীতি ছড়িয়ে নির্বাচনী সুবিধা নিতে পারছে না, বরং বামপন্থীদের মধ্যে যারা বর্ণবাদ প্রত্যাখ্যান করে মুসলিম সম্প্রদায়ের পাশে দাঁড়ায়, তাদের ওপর আঘাত হানতেও সক্ষম হচ্ছে।

তাই ফ্রান্সে ‘ইসলামো-বামপন্থা’ (ফরাসি ভাষায় Islamo-gauchisme) ধারণাটি রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রচার পাওয়া মোটেও আশ্চর্যজনক নয়। বামপন্থী দল ‘লা ফ্রঁস আনসুমিজ’-এর জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ প্রান্তিক সম্প্রদায়গুলোর কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং প্রেসিডেন্ট পদের একজন শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী। এখন তাঁর বিরুদ্ধে ‘বিক্ষোভকারীদের’ উৎসাহিত করার অভিযোগ আনা হচ্ছে, যাদের পরোক্ষভাবে মুসলিম হিসেবে ইঙ্গিত করা হচ্ছে।

বামপন্থী ও মুসলমানদের ওপর এই দ্বৈত আক্রমণ পুরোনো ‘ইহুদি-বলশেভিক’ ষড়যন্ত্রতত্ত্বের প্রতিচ্ছবি। সেই তত্ত্বে পশ্চিমা সভ্যতা ধ্বংসের লক্ষ্যে কমিউনিজম ছড়ানোর জন্য ইহুদিদের দোষারোপ করা হতো।

আজ ‘ইসলামো-বামপন্থা’ রক্ষণশীল, উদারপন্থী ও উগ্র ডানপন্থীদের কাছে বলির পাঁঠা হিসেবে কাজ করছে। এর উদ্দেশ্য হলো, ১৯৬০-এর দশক থেকে বর্ণবাদ ও বৈষম্য মোকাবিলায় পশ্চিমারা যে সামান্য অগ্রগতি অর্জন করেছিল, তার বিরুদ্ধে একটি পাল্টা-বিপ্লব সম্পন্ন করা। তাদের মূল পরিকল্পনাটি যেন মুসলমানদের বাদ দিয়ে একটি ‘দুর্গ ইউরোপ’ (Fortress Europe) গড়ে তোলা।

ভীতি ছড়ানো ব্যক্তিরা সামাজিক সমস্যা এবং কৃচ্ছ্রসাধনের বিরুদ্ধে ন্যায্য প্রতিবাদের জন্য ইসলামকে দোষারোপ করতেই থাকবে। আর রাজনীতিবিদেরা নিজেদের শাসনের ব্যর্থতা থেকে জনগণের দৃষ্টি সরাতে জনরোষকে মুসলিম সম্প্রদায়ের দিকে পরিচালিত করতে থাকবেন।

এখন প্রয়োজন হলো, সবার নাগরিক স্বাধীনতা দৃঢ়ভাবে রক্ষার মাধ্যমে এই রক্ষণশীল পাল্টা-বিপ্লবের একটি বলিষ্ঠ জবাব দেওয়া।


লেখক পরিচিতি:

ফরিদ হাফেজ জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির 'দ্য ব্রিজ ইনিশিয়েটিভ'-এর সিনিয়র গবেষক।

[প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের প্রতিফলন। এগুলো এশিয়া পোস্টের সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সঙ্গে সর্বদা মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখায় উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব; এ বিষয়ে এশিয়া পোস্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ।]