logo

বাংলাদেশের আধুনিক পশুসম্পদ নীতির ভিত্তি স্থাপনকারী প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান

মো. আব্দুর রহমান
মো. আব্দুর রহমান
বাংলাদেশের আধুনিক পশুসম্পদ নীতির ভিত্তি স্থাপনকারী প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান
মো. আব্দুর রহমান

বাংলাদেশের পশুসম্পদ খাতের আধুনিক উন্নয়নের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়কালকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার শাসনামলে (১৯৭৭-১৯৮১) প্রথমবারের মতো লাইভস্টক খাতকে একটি বিজ্ঞানভিত্তিক, উৎপাদনমুখী এবং বিকেন্দ্রীভূত উন্নয়ন খাত হিসেবে গড়ে তোলার সুস্পষ্ট নীতিগত ভিত্তি তৈরি হয়।

কৃষি ও পশুসম্পদকে জাতীয় অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করে তিনি মাঠ পর্যায়ে সেবা সম্প্রসারণের ওপর জোর দেন এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। উপজেলা পর্যায়ে ভেটেরিনারি সেবা সম্প্রসারণ, টিকাদান কর্মসূচি, কৃত্রিম প্রজনন এবং উন্নত জাতের পশু বিস্তারের মাধ্যমে একটি আধুনিক লাইভস্টক উন্নয়ন কাঠামো গড়ে ওঠে। এই সময়েই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ধারণার উদ্ভব হয়-বিভাজন নীতি (Bifurcation Policy) I এর মূল উদ্দেশ্য ছিল পশুসম্পদ খাতের দুটি ভিন্নধর্মী কার্যক্রম-প্রাণী স্বাস্থ্য (চিকিৎসা ও রোগ নিয়ন্ত্রণ) এবং প্রাণী উৎপাদন (উৎপাদন, পুষ্টি ও প্রজনন)-কে আলাদা প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনে পরিচালনা করা।

বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছিল, একই দপ্তরের অধীনে এই দুই ভিন্ন প্রকৃতির কাজ পরিচালনা করতে গিয়ে দক্ষতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সেবার মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। তাই ‘এক কাজের জন্য এক ইউনিট’ নীতির ভিত্তিতে বিশেষায়ন বৃদ্ধি এবং মাঠ পর্যায়ে কার্যকারিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে এই বিভাজনের ধারণা গুরুত্ব পায়। ১৯৮০ সালের দিকে O&M Wing-এর রিপোর্টে এই বিভাজনের সুপারিশ আনুষ্ঠানিকভাবে উঠে আসে, যা পরবর্তীতে লাইভস্টক খাতের আধুনিকায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।

এই সময় পশুসম্পদ উন্নয়নে বেশ কিছু আধুনিক ধারণা চালু হয়—যেমন প্রতিরোধমূলক ভেটেরিনারি সেবা, জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি, কৃত্রিম প্রজনন, উন্নত জাত সম্প্রসারণ এবং দুধ, মাংস ও পোল্ট্রি উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিদের উৎসাহিত করা, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ জোরদার করা এবং পশুখাদ্য ও চারণভূমি উন্নয়নের মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। এসব উদ্যোগ পরবর্তীকালে বাংলাদেশের পশুসম্পদ নীতির ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

বাংলাদেশে পশুসম্পদ খাতে বিভাজন নীতি (bifurcation policy) এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ডিগ্রি পরিবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও একাডেমিক সংস্কারের ফল, যার ভিত্তি গড়ে ওঠে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে। ১৯৮০ সালে ওএন্ডএম উইং-এর প্রতিবেদনে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরকে ‘প্রাণী স্বাস্থ্য’ এবং ‘উৎপাদন ও উন্নয়ন’-এই দুই ভাগে বিভক্ত করার সুপারিশ করা হয়, যা ‘বিভাজন নীতি’ (Bifurcation Policy) নামে পরিচিত। এর প্রভাব বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষায়ও পড়ে। ব্রিটিশ আমলে সীমিত ডিপ্লোমা পর্যায়ের শিক্ষা থাকলেও পাকিস্তান আমলে ১৯৬১ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা শুরু হয়। তখন বি.এসসি ইন ভেটেরিনারি সায়েন্স এবং বি.এসসি ইন অ্যানিমেল হাসবেন্ড্রি নামে পৃথক প্রোগ্রাম চালু ছিল।

স্বাধীনতার পরও এই দুই ধারা চলমান থাকলেও সময়ের সঙ্গে বোঝা যায় যে ভেটেরিনারি চিকিৎসা এবং প্রাণী উৎপাদন সম্পূর্ণ ভিন্ন দক্ষতার ক্ষেত্র। ফলে ১৯৮০-এর দশকে প্রশাসনিক বিভাজনের ধারণা একাডেমিক ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলে এবং ধীরে ধীরে ডিভিএম (চিকিৎসাভিত্তিক পেশাগত ডিগ্রি) ও এএইচ (উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনাভিত্তিক ডিগ্রি) আলাদা ও সুসংগঠিত রূপ পায়।

যদিও বিভাজন নীতি একটি দূরদর্শী উদ্যোগ ছিল, বাস্তবে তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। জিয়াউর রহমানের পরবর্তী সময়ে নীতিগত ধারাবাহিকতার অভাব, প্রশাসনিক জটিলতা এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে প্রাণিসম্পদ খাতে পৃথক স্বাস্থ্য ও উৎপাদন অধিদপ্তর সম্পূর্ণভাবে গড়ে ওঠেনি। ফলে আজও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অধীনে চিকিৎসা ও উৎপাদন কার্যক্রম একসঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে। এর ফলে দায়িত্ব বণ্টনে অস্পষ্টতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতি এবং মাঠ পর্যায়ে সমন্বয়ের ঘাটতি দেখা যায়। একই সমস্যা শিক্ষা ও কর্মসংস্থান ক্ষেত্রেও প্রতিফলিত হয়েছে, যেখানে ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল হাসবেন্ড্রি গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে ভূমিকা ও সুযোগ নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে এবং বিভিন্ন সময়ে ছাত্র আন্দোলনের জন্ম দিয়েছে।

এই নীতিগত অসম্পূর্ণতার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে গ্রামীণ পশুসম্পদ খাতে। ক্ষুদ্র খামারিরা পর্যাপ্ত ভেটেরিনারি সেবা, প্রযুক্তি ও বাজার সহায়তা থেকে বঞ্চিত হওয়ায় ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ছে। অন্যদিকে বড় করপোরেট খামারগুলো উন্নত প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের মাধ্যমে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে পশুসম্পদ খাতে একটি কাঠামোগত বৈষম্য তৈরি হচ্ছে, যেখানে ক্ষুদ্র খামার ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং করপোরেট খামার ব্যবস্থা শক্তিশালী হয়ে উঠছে।

এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে গ্রামীণ কর্মসংস্থান, খাদ্য নিরাপত্তা এবং বাজারের ভারসাম্য-সবকিছুই ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। সবশেষে বলা যায়, জিয়াউর রহমানের সময় প্রবর্তিত পশুসম্পদ উন্নয়ন নীতিগুলো আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তবে এই নীতির পূর্ণ সুফল পেতে হলে প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর প্রশাসনিক সংস্কার এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বাস্তব প্রয়োগ। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই দীর্ঘদিনের অসম্পূর্ণ বিভাজন নীতি (bifurcation policy) বাস্তবায়নের আশা করা যায়। এখন সময় এসেছে ঐতিহাসিক এই ধারণাকে কার্যকর রূপ দিয়ে একটি দক্ষ, আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পশুসম্পদ খাত গড়ে তোলা-যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানিযোগ্য মানসম্পন্ন প্রাণিজ পণ্য উৎপাদনের পথ সুগম করবে।

লেখক: মো. আব্দুর রহমান, এনিম্যাল নিউট্রিশনিস্ট; নির্বাহী সদস্য (ইন্ডাস্ট্রি),ওয়ার্ল্ড পোল্ট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ শাখা।