দ্য গার্ডিয়ানের কলাম/ইসরায়েলে পরিবর্তনপ্রত্যাশীদের হতাশার রাত, আপাতত টিকে গেলেন নেতানিয়াহু

ইসরায়েলের রুদ্ধশ্বাস নির্বাচনের পর দেশটির প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক শিবিরই জয় আর চরম হতাশার দোলাচলের মধ্য দিয়ে গেছে। প্রথম প্রকাশিত বুথফেরত জরিপের ফলের সঙ্গে মূল ভোট গণনার হিসাবে বড় ধরনের ওলটপালট ঘটেছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অনুগত দলগুলোর জোট হয়তো আবারও সরকারে টিকে যাচ্ছে। এখন প্রতিটি পক্ষই ভাবছে তাদের রাজনৈতিক ভাগ্য এক সুতোয় ঝুলছে।
তবে একটি বিষয় নিশ্চিত। ইসরায়েলের সমাজের অভ্যন্তরীণ তিক্ত বিভাজন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন সবচেয়ে বেশি গভীর।
ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পরপরই বুথফেরত জরিপগুলোতে নেতানিয়াহুর ক্ষমতাসীন জোটের বড় ধরনের পরাজয় দেখা গিয়েছিল। পূর্বাভাসে বলা হয়েছিল, ১২০ আসনের পার্লামেন্টে নেতানিয়াহুর বর্তমান জোট বড়জোর ৫০টি আসন পাবে, আর বিরোধীরা পাবে ৭০টি আসন। নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি কেবল সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের দল ‘ইয়াশার’ থেকে সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে ছিল।
এই পূর্বাভাস দেখে বিরোধী দলগুলোর লাখ লাখ সমর্থক উল্লাসে ফেটে পড়েন। বিরোধীদের ভেতরের চারটি জায়নবাদী দল মিলিয়ে নেতানিয়াহুর জোটের চেয়ে এগিয়ে ছিল। যদিও কোনো একক জোটের সরকার গঠনের প্রয়োজনীয় ৬১ আসনের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না। আইজেনকোট এক আবেগঘন বক্তব্যে ‘ব্যর্থতার জোট’কে পরাজিত করার ঘোষণা দেন।
বিরোধী শিবিরের আরেক শীর্ষ নেতা নাফতালি বেনেট দাবি করেন, ‘সামরিক সেবাদানকারীদের জোট’ জয়ী হয়েছে। দীর্ঘ যুদ্ধের সময় নেতানিয়াহুর সরকার কট্টর অর্থোডক্স ইহুদিদের বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা থেকে ছাড় দিয়েছিল। বেনেট মূলত সেই সামরিক দায়িত্ব পালনকারী সাধারণ নাগরিকদের বিজয়ের কথাই বলেছিলেন।
প্রাথমিক জরিপগুলোতে দেশটির আরব ফিলিস্তিনি নাগরিকদের দলগুলোর জন্যও এক অভূতপূর্ব সাফল্যের আভাস ছিল। তাদের ১৭ বা ১৮টি আসন পাওয়ার কথা বলা হয়েছিল। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই আরব সম্প্রদায়। এবার তাদের রেকর্ড ৭৫ শতাংশেরও বেশি ভোটার ভোট দিয়েছেন। অতীতে রাষ্ট্রীয় বৈষম্য এবং পশ্চিম তীর ও গাজায় চলমান যুদ্ধ ও দখলদারির কারণে অনেক আরব নাগরিক ভোট বর্জন করে নির্বাচনকে এড়িয়ে চলতেন।
কিন্তু বর্তমান সরকারের কট্টর জাতীয়তাবাদী ও চরম আরববিদ্বেষীদের ক্ষমতা থেকে সরানোর তাগিদ এবার এই সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্রভাবে কাজ করেছে। ফলে ভোট বর্জনের ডাক এবার উবে যায়। প্রথমদিকের ফলাফলে মনে হচ্ছিল, নতুন সরকার গঠনে আরব দলগুলোই ক্ষমতার মূল নিয়ামক হতে যাচ্ছে।
কিন্তু মূল ভোট গণনা শুরু হতেই কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দৃশ্যপট নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। নেতানিয়াহুর জোট ভোটের হিসাবে অনেকটাই এগিয়ে যায় এবং প্রত্যাশার চেয়ে বেশি আসন পায়। বিরোধী জায়নবাদী দলগুলো পিছিয়ে পড়ে।
আরব দলগুলো ভালো অবস্থান ধরে রাখলেও পূর্বাভাস অনুযায়ী আসন পায়নি। কিন্তু বিরোধীদের বড় সংকট হলো, সরকার গঠনের ক্ষেত্রে চারটি জায়নবাদী বিরোধী দলের মধ্যে তিনটি দলই আরব দলগুলোকে জোটে নিতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানায়। ফলে সামগ্রিকভাবে বিরোধী ভোট বেশি পাওয়া সত্ত্বেও নেতানিয়াহু আবারও ক্ষমতায় টিকে থাকার সুযোগ পেয়ে যান।
এখনো কোনো নির্দিষ্ট জোট ৬১ আসনের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পৌঁছাতে পারবে কি না, তা পরিষ্কার নয়। আগামী দিনগুলোতে সরকার গঠনের আলোচনা জটিল রূপ নেবে। শেষ পর্যন্ত একটি ঝুলন্ত পার্লামেন্ট বা দুর্বল সংখ্যালঘু সরকারও গঠিত হতে পারে। কিন্তু একটি সত্য স্পষ্ট, ইসরায়েলের সমাজ কখনো এতটা বিভক্ত ছিল না। রাজনৈতিক শিবিরগুলোর দূরত্ব এখন একেবারেই অনতিক্রম্য। বিরোধীদের ভোট দেওয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ ইসরায়েলিরা ভেবে পাচ্ছেন না, নেতানিয়াহু ও তার কট্টর মিত্রদের নেতৃত্বাধীন একটি চরমপন্থী, গণতন্ত্রবিরোধী ও যুদ্ধবাজ সরকারের অধীনে তারা কীভাবে বসবাস করবেন।
অথচ বাস্তবতা হলো, দেশটির অধিকাংশ ভোটার আসলে কট্টর ডানপন্থী দলগুলোকেই বেছে নিয়েছেন। পার্লামেন্টে ডানপন্থীদের দখলে এখন অন্তত ৭৪টি আসন রয়েছে। এর মধ্যে নেতানিয়াহুর জোট যেমন আছে, তেমনি বিরোধী শিবিরের আভিগদোর লিবারম্যান ও নাফতালি বেনেটের মতো কট্টর ডানপন্থীরাও রয়েছেন। এখন যে সরকারই আসুক না কেন, পার্লামেন্টে এই উগ্র জাতীয়তাবাদী ও সামরিকবাদীদের নিরঙ্কুশ দাপটের মুখে মধ্যপন্থী ও বামপন্থীরা নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে চরম আতঙ্কে পড়েছেন।
সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে আরব নাগরিকদের ওপর। যে সরকার তাদের প্রতি বৈরিতা দেখিয়েছে, তাকে হঠানোর লক্ষ্য নিয়েই তারা রেকর্ড সংখ্যায় ভোটকেন্দ্রে গিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের সেই বিপুল অংশগ্রহণ কোনো ফল বয়ে আনল না।
মধ্যবামপন্থী দল ডেমোক্র্যাটস হয়তো ৯টির মতো আসন পেতে পারে। কিন্তু ইসরায়েলের যে প্রায় ২০ শতাংশ নাগরিক নিজেদের বামপন্থী ভাবেন, যারা ফিলিস্তিনিদের ওপর আধিপত্য কায়েম না করে একটি শান্তির দেশের স্বপ্ন দেখেন, তাদের জন্য আশা করার মতো কোনো ভবিষ্যৎ আর অবশিষ্ট রইল না।
ইসরায়েল বরাবরই বিভক্ত সমাজ ছিল, তবু কোনোমতে তারা একসঙ্গে টিকে ছিল। কিন্তু অতীতের সেই রাজনৈতিক বিতর্কগুলো এখন এক গভীর অস্তিত্বের সংকটে রূপ নিয়েছে। বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, ইসরায়েলের নাগরিকদের নিজেদের মধ্যে পরস্পরের মেলবন্ধনের কি আর কিছু বাকি আছে, নাকি অনেকে আশা হারিয়ে স্রেফ দেশ ছেড়ে চলে যাবেন?
লেখক পরিচিতি: ডালিয়া শিন্ডলিন, তেল আবিবভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।

