৮৫ নির্বাচন কর্মকর্তার রায় ও সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক শ্রেষ্ঠত্ব

দেশের সংবিধানের প্রস্তাবনায় রাষ্ট্র পরিচালনার যে মৌলিক আদর্শের অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে, এর মূল কথা হলো আইনের শাসন। আইনের শাসন শুধু শব্দমালা বা আদালতের রায়ের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রকৃত অর্থ হলো- আইন তার নিজস্ব স্বকীয় শক্তিতে চলবে এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গ, সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান ও নির্বাহী বিভাগ সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ বা রায় বিনা শর্তে পালন করবে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ৮৫ জন উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার চাকরিতে পুনর্বহাল, জ্যেষ্ঠতা ও চাকরিকাল গণনাসংক্রান্ত মামলায় আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়কে ঘিরে প্রশাসনিক পরিমণ্ডলে যে বিভ্রান্তি ও সময়ক্ষেপণের দৃশ্যপট তৈরি করা হয়েছে, তা সুশাসনের মূল ভিত্তিকে সরাসরি প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
বিশেষ করে, নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও নির্বাহী বিভাগের কোনো কোনো মহল আদালতের সুস্পষ্ট আদেশ বাস্তবায়ন না করে প্রশাসনিক জটিলতার ধুয়া তুলে যে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, তা স্রেফ আইনি অজ্ঞতাই নয়, বরং বিচারিক ক্ষমতার ওপর প্রশাসনিক আধিপত্য বিস্তারের এক বিপজ্জনক খেলা।
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু: শব্দার্থের সংকীর্ণতা বনাম বিচারিক প্রতিকার
বিতর্কের মূলে রয়েছে নির্ধারিত ছুটি বিধিমালা, ১৯৫৯ এর বিধির ৯(৩) ধারা এবং সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ব্যবহৃত অসাধারণ ছুটি শব্দবন্ধটি। নির্বাচন কমিশন ও আইন কর্মকর্তাদের একাংশ যুক্তি দাঁড় করাচ্ছেন যে, এই প্রবিধান অনুযায়ী কর্মকর্তা নিজে আবেদন না করলে বা পাওনা ছুটি না থাকলে এ ছুটি মঞ্জুর করা প্রশাসনিকভাবে অসংগতিপূর্ণ।
এই যুক্তিটি আইনের প্রাথমিক পাঠের আলোকেও সম্পূর্ণ অসার। কারণ, এটি প্রশাসনিক ছুটি এবং সর্বোচ্চ আদালতের বিচারিক প্রতিকারের মৌলিক ফারাক বুঝতে ব্যর্থতারই ফল।
আবেদনহীন বঞ্চনা ও প্রবিধান ৯(৩): চাকরিবিধির রোল ৯(৩) অনুযায়ী স্বেচ্ছায় বিনাবেতনে ছুটির আবেদনের বাধ্যবাধকতা সরকারি চাকুরিজীবীদের স্বাভাবিক ছুটির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অথচ, ভাগ্যবিড়ম্বিত এই ৮৫ জন কর্মকর্তা স্বেচ্ছায় কর্মক্ষেত্র ছাড়েননি বা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ছুটি চাননি। মহামান্য হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের রায়ে স্ফটিকের মতো পরিষ্কার যে, তাদের সম্পূর্ণ বেআইনি ও অন্যায়ভাবে দীর্ঘকাল দাপ্তরিক দায়িত্ব থেকে দূরে রাখা হয়েছিল।
আদালতের অন্তর্নিহিত ক্ষমতা: রায়ে অসাধারণ ছুটি বা এক্সট্রাঅরডিনারি লিভ শব্দটি প্রবিধানের সাধারণ ছুটির ফ্রেমে বন্দি করার বিষয় নয়। সর্বোচ্চ আদালত যখন কোনো বঞ্চনার প্রতিকার দেন, তখন আদালতের লক্ষ্য থাকে অন্যায়ভাবে বাদ পড়া সময়কে আইনিভাবে নিয়মিতকরণ করা। এটি সংবিধান প্রদত্ত অন্তর্নিহিত ক্ষমতা থেকে উদ্ভূত একটি বিশেষ প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা, যাতে কর্মকর্তাদের চাকরির ধারাবাহিকতা, জ্যেষ্ঠতা, পদোন্নতি ও অবসরভাতা অক্ষুণ্ণ থাকে।
নো ওয়ার্ক, নো পে নীতির অকার্যকারিতা: আইনের প্রতিষ্ঠিত নীতি হলো, যে অন্যায়ের জন্ম দিয়েছে, সেই অন্যায়ের সুযোগ নিয়ে সে লাভবান হতে পারে না। প্রশাসনিক ভুল বা বেআইনি আদেশের কারণে কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করতে না পারলে সেখানে ‘নো ওয়ার্ক, নো পে’ অজুহাত তোলা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। ছুটির শব্দাবলিকে কাল্পনিক অজুহাত বানিয়ে সিদ্ধান্ত ঝুলিয়ে রাখা আইনের মূল উদ্দেশ্যকেই নস্যাৎ করে।
নির্বাচন কমিশনের চুজ অ্যান্ড পিক নীতি ও অহেতুক চিঠি চালাচালি
আদালতের রায় বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন যে আচরণ প্রদর্শন করছে, তা গভীর উদ্বেগজনক। বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা: আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়ের পর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও তা অবিকৃত অবস্থায় কার্যকর না করে ফাইল স্থানান্তর, মতামত আহ্বান ও প্রশাসনিক ব্যাখ্যার নামে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে।
আংশিক গ্রহণের অপচেষ্টা: রায়ের সুবিধাজনক অংশ গ্রহণ করা আর জটিলতা বা আর্থিক-প্রশাসনিক অজুহাতে বাকি অংশ আটকে রাখা স্পষ্টতই খণ্ডিতাংশের নীতি। একটি বিচারিক আদেশকে টুকরো টুকরো করে নিজের সুবিধামতো গ্রহণ করার সুযোগ সংবিধান ও আইনের চোখে সম্পূর্ণরূপে অবৈধ।
সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে ঔদ্ধত্য: সর্বোচ্চ আদালত যেখানে কর্মকর্তাদের পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসনের নির্দেশ দিয়েছেন, সেখানে আমলাতান্ত্রিক চাতুরি দিয়ে রায় অকার্যকর রাখা সুপ্রিম কোর্টের মর্যাদার প্রতি সরাসরি অবমাননা।
তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও বিশ্বব্যাপী প্রশাসনিক আইনি নজির
বিচার বিভাগের রায় বাস্তবায়নে আমলাতান্ত্রিক বা প্রশাসনিক বিধিমালা কখনো প্রতিবন্ধক হতে পারে না, এই নীতি দেশি-বিদেশি আইনশাস্ত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত।
ক. তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি
বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার শ্রেষ্ঠত্ব: সংবিধানবিদ এ. ভি. ডাইসির আইনের শাসন তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনো প্রশাসনিক সংস্থা বা বিধিবদ্ধ কমিশন আদালতের আদেশের অভিভাবক হতে পারে না; তারা শুধু আদেশের বাস্তবায়নকারী।
পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসন নীতি: যখন কোনো ব্যক্তি বেআইনি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে অধিকারচ্যুত হন, তখন আইন তাকে এমন অবস্থানে ফিরিয়ে নেওয়ার আদেশ দেয়, যেন তার ওপর অন্যায়টি কখনোই ঘটেনি। ‘অসাধারণ ছুটি’ হিসেবে সময়কাল গণনা করা সেই পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসনেরই আইনি মাধ্যম।
খ. দেশ-বিদেশের নজির
মাসদার হোসেন মামলা (বাংলাদেশ বিচার বিভাগীয় সার্ভিস বনাম বাংলাদেশ): আপিল বিভাগ স্পষ্টভাবে রায় দেন যে, সংবিধিবদ্ধ বিধিমালার অজুহাতে প্রশাসনিক সংস্থা বিচার বিভাগের প্রদত্ত নির্দেশনায় কোনো পরিবর্তন বা শিথিলতা আনতে পারে না।
মারবেরি বনাম ম্যাডিসন (১৮০৩-মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট): প্রধান বিচারপতি জন মার্শাল উল্লেখ করেন, সংবিধানের নীতি ও বিচারিক সিদ্ধান্তের বিপরীতে যেকোনো পদক্ষেপ আইনত অকার্যকর।
ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া বনাম কে. ভি. জানকিরামন (১৯৯১-ভারতের সুপ্রিম কোর্ট): ভারতের সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দেন যে, প্রশাসনিক ভুলের কারণে কর্মচারীকে বঞ্চনায় রাখা হলে আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়াই চূড়ান্ত গণ্য হবে; প্রশাসনিক শিথিলতা দেখিয়ে তাকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।
(তবে এসব আন্তর্জাতিক নজির নির্দেশ করে, কোনো রাষ্ট্রই প্রশাসনিক ভুলকে নাগরিক বা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে না।)
সংবিধানের ১১১ ও ১১২ অনুচ্ছেদের অলঙ্ঘনীয় সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা
বাংলাদেশের সংবিধান কোনো বিধিমালার ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং সব প্রবিধানই সংবিধানের অধীনে পরিচালিত:
সংবিধান ও সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
১১১ অনুচ্ছেদ: আপিল বিভাগ কর্তৃক ঘোষিত আইন ও সিদ্ধান্ত দেশের সব আদালত, প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ এবং নির্বাহী বিভাগের জন্য বাধ্যতামূলক।
১১২ অনুচ্ছেদ: প্রজাতন্ত্রের সীমানার মধ্যকার সমস্ত নির্বাহী ও বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ সুপ্রিম কোর্টের সহায়তা কল্পে কাজ করতে বাধ্য।
যখন কোনো সংবিধিবদ্ধ কমিশন বা সরকারি দপ্তর আপিল বিভাগের আদেশ বাস্তবায়ন না করে সেটিকে সাংঘর্ষিক আখ্যা দিয়ে ফাইলবন্দি রাখে, তখন তারা সংবিধানের ১১১ ও ১১২ অনুচ্ছেদের বিধান সরাসরি লঙ্ঘন করে। এটি স্রেফ প্রশাসনিক গাফিলতি নয়, বরং আইনগতভাবে আদালত অবমাননা।
বিচারিক মর্যাদা সুরক্ষা ও জরুরি করণীয়
আদালতের রায় বাস্তবায়ন শুধু কিছু ব্যক্তির চাকরির বিষয় নয়; এটি বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার শেষ পরীক্ষা। দীর্ঘ লড়াই শেষে বিজয়ী হয়েও যদি কর্মকর্তাদের আমলাতান্ত্রিক লালফিতার দৌরাত্ম্যে ঘুরতে হয়, তবে বিচার বিভাগের চূড়ান্ততার ধারণাই দুর্বল হয়ে পড়ে।
আশু করণীয়
১. শর্তহীন বাস্তবায়ন: নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট বিভাগকে কোনো নিজস্ব ব্যাখ্যা না দাঁড় করিয়ে আপিল বিভাগের রায় অবিকৃত অবস্থায় দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।
২. প্রশাসনিক অজুহাত বন্ধ করা: প্রবিধান ৯(৩)-এর মতো বিধির সংকীর্ণ ব্যাখ্যার মাধ্যমে সর্বোচ্চ আদালতের বিচারিক প্রতিকারকে আটকে রাখার অপচেষ্টা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
৩. সমন্বিত সময়সীমা নির্ধারণ: জ্যেষ্ঠতা পুনর্নির্ধারণ ও চাকরিকাল গণনার জন্য সুস্পষ্ট সময়সীমাভিত্তিক প্রশাসনিক আদেশ জারি করা।
৪. সুপ্রিম কোর্টের স্বতঃপ্রণোদিত নজরদারি: সংবিধানের শ্রেষ্ঠত্ব রক্ষায় মহামান্য আপিল বিভাগ কর্তৃক এই রায় বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা এবং আদেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে অবমাননার কড়া ব্যবস্থা নেওয়া।
অতএব, রাষ্ট্রের কাছে প্রশ্ন একটাই, শেষ কথা বলবে কে? প্রশাসনিক বিধির সংকীর্ণ ব্যাখ্যা, নাকি সংবিধানসম্মত বিচারিক সিদ্ধান্ত?
উত্তর সুনির্দিষ্ট ও অস্পষ্টতাহীন। সংবিধান সর্বোচ্চ; সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত রায় বাধ্যতামূলক এবং কোনো প্রশাসনিক সংস্থা সেই রায়কে নিজের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করে স্থগিত বা খণ্ডিত করতে পারে না। প্রবিধান ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া আদালতের আদেশ বাস্তবায়নের সহায়ক উপকরণ মাত্র, প্রতিপক্ষ নয়। ৮৫ জন উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার মামলায় আপিল বিভাগের আদেশ কোনো আপসযোগ্য প্রশাসনিক মতামত নয়, এটি চূড়ান্ত সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত। আইনের শাসন টিকিয়ে রাখতে হলে কোনো অজুহাত বা চতুর খেলা ব্যতিরেকে এই সিদ্ধান্ত পূর্ণাঙ্গ কার্যকর করাই রাষ্ট্র ও সংবিধানের প্রতি অনুগত থাকার একমাত্র পথ।
লেখক: উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া; অপরাধবিজ্ঞান, সুশাসন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ।

