logo

প্রযুক্তি নয়, অনুপস্থিত অভিভাবকত্বই বড় সংকট

প্রদীপ্ত মোবারক
প্রদীপ্ত মোবারক
প্রযুক্তি নয়, অনুপস্থিত অভিভাবকত্বই বড় সংকট
প্রতীকী ছবি। ড্রিমসটাইমের সৌজন্যে

একটি শিশু যখন পৃথিবীতে আসে, তখন সে শুধু একটি পরিবারে জন্ম নেয় না; সে জন্ম নেয় একটি স্বপ্নের মধ্যে। বাবা-মা তার ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখেন, তাকে মানুষের মতো মানুষ করার প্রত্যয় নেন। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই স্বপ্নের পথে নতুন কিছু চ্যালেঞ্জও যুক্ত হয়েছে। আজকের শিশুর হাতে বইয়ের পাশাপাশি আছে স্মার্টফোন, খেলাধুলার মাঠের পাশাপাশি আছে ভার্চুয়াল জগৎ, পরিবারের গল্পের পাশাপাশি আছে অসংখ্য অচেনা মানুষের প্রভাব।

প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে আমরা কি অভিভাবক হিসেবে নিজেদের প্রস্তুত করতে পেরেছি? সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কিছু মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের আবারও ভাবতে বাধ্য করছে—সন্তানের বেড়ে ওঠার পথে পরিবার কতটা উপস্থিত? আমরা কি শুধু সন্তানের চাহিদা পূরণ করছি, নাকি তার মানসিক বিকাশের দায়িত্বও নিচ্ছি? একটি শিশুর হাতে দামি মোবাইল, একটি কিশোরের হাতে অত্যাধুনিক গ্যাজেট, কিংবা তার জন্য সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা—এসব নিঃসন্দেহে ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হতে পারে। কিন্তু ভালোবাসার সবচেয়ে বড় প্রকাশ কি শুধুই বস্তুগত সুবিধা, নাকি সন্তানের পাশে বসে তার কথা শোনা, তার বন্ধুত্ব সম্পর্কে জানা, তার চিন্তা ও অনুভূতিকে বোঝা?

আমাদের সমাজে একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে। অনেক বাবা-মা সন্তানের জন্য অর্থ ব্যয় করতে প্রস্তুত, কিন্তু সময় দিতে পারছেন না। তারা সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য নিজেদের কর্মজীবনে ব্যস্ত, কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ মানুষটি প্রতিদিন কীভাবে গড়ে উঠছে, সেদিকে নজর দেওয়ার সুযোগ হারিয়ে ফেলছেন। একজন বাবা হয়তো বড় ব্যবসা দাঁড় করাচ্ছেন, একজন মা হয়তো গুরুত্বপূর্ণ পেশাগত দায়িত্ব পালন করছেন, পরিবার হয়তো সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু সেই পরিবারের সন্তান কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে, কোন পরিবেশে যাচ্ছে, কী ধরনের চিন্তা গ্রহণ করছে—এসব প্রশ্নের উত্তর না জানা একটি বড় শূন্যতা তৈরি করে। কারণ সন্তানকে বড় করা শুধু তার স্কুলের ফি দেওয়া নয়; সন্তানকে বড় করা মানে তার জীবনের অংশ হয়ে ওঠা।

প্রযুক্তি এসেছে, কিন্তু অভিভাবকত্ব কি বদলেছে?

বর্তমান প্রজন্ম ডিজিটাল প্রজন্ম। প্রযুক্তিকে তাদের জীবন থেকে দূরে রাখা সম্ভব নয়, প্রয়োজনও নেই। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—এসব তাদের শেখার, সৃজনশীলতা প্রকাশের এবং পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে। কিন্তু সমস্যা প্রযুক্তিতে নয়; সমস্যা হলো প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে সচেতনতার অভাব। একজন কিশোর যখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনলাইনে থাকে, তখন সে কী দেখছে? কী ধরনের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করছে? কোন ধরনের আচরণকে স্বাভাবিক মনে করছে? এসব বিষয়ে পরিবারের সচেতন থাকা জরুরি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক কিশোর নিজের একটি আলাদা পরিচয় তৈরি করতে চায়। প্রশংসা, অনুসারী, জনপ্রিয়তা—এসব অনেক সময় তাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। তারা বুঝতে পারে না, অনলাইনে একটি মুহূর্তের প্রদর্শন বাস্তব জীবনে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। এখানেই দরকার অভিভাবকের উপস্থিতি। নজরদারি নয়, বন্ধুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা।

কৈশোর: সবচেয়ে বেশি যত্নের সময়

কৈশোর জীবনের এমন একটি সময়, যখন একটি শিশু ধীরে ধীরে নিজের পরিচয় খুঁজতে শুরু করে। সে স্বাধীন হতে চায়, নিজের সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। একই সঙ্গে এই সময়ে সে বন্ধুদের দ্বারা প্রবলভাবে প্রভাবিত হয়। এই সময়ে বাবা-মায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি কিশোর অনেক সময় নিজের ভুল বুঝতে পারে না। সে ঝুঁকিকে সাহস মনে করতে পারে, অসংযত আচরণকে আধুনিকতা ভাবতে পারে, আর ভুল বন্ধুত্বকে নিজের পরিচয়ের অংশ মনে করতে পারে। তাই সন্তানের সঙ্গে সম্পর্ক যদি শুধু আদেশ আর নিষেধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সে ধীরে ধীরে পরিবার থেকে দূরে সরে যেতে পারে। কিন্তু বাবা-মা যদি সন্তানের বন্ধু হতে পারেন, তাহলে সন্তান নিজের সমস্যাগুলোও পরিবারের সঙ্গে ভাগ করে নিতে শেখে।

আমরা কি সন্তানকে স্বাধীনতা দিচ্ছি, নাকি একা ছেড়ে দিচ্ছি?

স্বাধীনতা একটি শিশুর বিকাশের জন্য জরুরি। কিন্তু স্বাধীনতা আর অবহেলার মধ্যে পার্থক্য আছে। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে যাচ্ছে—এটি জানতে চাওয়া তার স্বাধীনতা হরণ নয়। বরং এটি একজন অভিভাবকের দায়িত্ব। আজ অনেক পরিবারে দেখা যায়, সন্তান যা চায়, তাই দেওয়া হচ্ছে। কারণ বাবা-মা মনে করেন, “আমরা তো ছোটবেলায় যা পাইনি, সন্তানকে তা দেব।” এই চিন্তার মধ্যে ভালোবাসা আছে, কিন্তু এর সঙ্গে যদি মূল্যবোধের শিক্ষা না থাকে, তাহলে সেই ভালোবাসাই কখনো কখনো সমস্যার কারণ হতে পারে। একটি শিশুর হাতে অর্থ দেওয়ার আগে তাকে অর্থের মূল্য শেখাতে হয়। হাতে প্রযুক্তি দেওয়ার আগে প্রযুক্তির দায়িত্ব শেখাতে হয়। স্বাধীনতা দেওয়ার আগে সিদ্ধান্তের পরিণতি বোঝাতে হয়।

কিশোর অপরাধের আলোচনায় পরিবারকে সামনে আনতে হবে

আমরা যখন কোনো কিশোরের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার খবর দেখি, তখন সাধারণত আমরা অপরাধী খুঁজি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা সমাজের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করি। কিন্তু এর আগে আমাদের নিজেদের ঘরের দিকে তাকাতে হবে। একটি শিশু কোথা থেকে মূল্যবোধ শেখে? কোথা থেকে ভালো-মন্দের পার্থক্য বোঝে? কোথা থেকে সহানুভূতি, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতা শেখে? উত্তরটি হলো—পরিবার।

পরিবার যদি সন্তানের মানসিক পরিবর্তন বুঝতে ব্যর্থ হয়, তার আচরণের পরিবর্তনকে গুরুত্ব না দেয়, তার কষ্ট বা বিভ্রান্তিকে উপেক্ষা করে, তাহলে সেই শিশুর ভেতরে তৈরি হওয়া সংকট একসময় বড় আকার নিতে পারে।

নতুন ধরনের অভিভাবকত্বের প্রয়োজন

সময় বদলেছে। তাই অভিভাবকত্বের ধরনও বদলাতে হবে। আগের মতো শুধু “পড়াশোনা করো”, “ভালো ফল করো”—এই নির্দেশনা দিয়ে বর্তমান প্রজন্মকে গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে, তাদের পৃথিবী বুঝতে হবে, তাদের অনলাইন জগত সম্পর্কেও জানতে হবে।

একজন সফল বাবা-মা তিনি নন, যিনি শুধু সন্তানকে ভালো স্কুলে পড়াতে পারেন বা দামি জিনিস কিনে দিতে পারেন। প্রকৃত সফলতা হলো এমন একজন মানুষ তৈরি করা, যিনি নিজের সিদ্ধান্ত নিতে জানেন, অন্যকে সম্মান করতে জানেন এবং জীবনের কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারেন।

আজকের শিশুরা আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়বে। তাই তাদের হাতে শুধু স্মার্টফোন নয়, দিতে হবে স্মার্ট চিন্তা। শুধু স্বাধীনতা নয়, দিতে হবে দায়িত্ববোধ। শুধু সুযোগ নয়, দিতে হবে সঠিক পথের নির্দেশনা। কারণ একটি সন্তানের ভবিষ্যৎ শুধু তার নিজের ভবিষ্যৎ নয়; তার ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং একটি দেশের ভবিষ্যৎ।

তাই আজ আমাদের নিজেদের কাছে প্রশ্ন করতে হবে, আমরা কি শুধু সন্তানের জন্য অর্থ উপার্জন করছি, নাকি সন্তানের জন্য সময়ও তৈরি করছি? আমরা কি শুধু তার হাতে প্রযুক্তি তুলে দিচ্ছি, নাকি তাকে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার শেখাচ্ছি? কারণ শেষ পর্যন্ত একটি শিশুর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন দামি কোনো বস্তু নয়; তার সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো এমন একজন অভিভাবক, যিনি তাকে দেখেন, বোঝেন এবং পাশে থাকেন।


লেখক: প্রদীপ্ত মোবারক, কলামিস্ট ও জনসংযোগ প্রধান, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ।