logo
Advertisement

আলজাজিরার কলাম/উপসাগরের নিরাপত্তাহীনতায় যেভাবে বাড়ছে মার্কিন জ্বালানি আধিপত্য

সুলতান বারাকাত
সুলতান বারাকাত
উপসাগরের নিরাপত্তাহীনতায় যেভাবে বাড়ছে মার্কিন জ্বালানি আধিপত্য
ভেনেজুয়েলার একটি তেল পাম্পজ্যাক। ছবি: এপি

বিশ্বের জ্বালানি খাতে বড় ধরনের বদল আসছে। অতি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সামাজিক মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ একটি বড় চুক্তি উদ্‌যাপন করেছেন। একে তিনি ‘ইতিহাসের সর্ববৃহৎ তেল চুক্তি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। শত বছরের এই চুক্তির আওতায় ভেনেজুয়েলার ১৭টি তেল খনির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হবে। এর ফলে প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল তেল মার্কিন জ্বালানি খাতের আওতায় আসবে।

ঠিক একই সময়ে কাতার এনার্জি তাদের অন্যতম বড় ইউরোপীয় গ্রাহক ইতালির এডিসন কোম্পানিকে একটি জরুরি বার্তা দেয়। তারা জানায়, অনিবার্য কারণে (ফোর্স মেজার) গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং এই সমস্যা আগামী নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত চলবে। এই নিয়ে তাদের মোট ২৯টি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) চালান বাতিল হলো। এর পরিমাণ প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনমিটার গ্যাস। ২০০৯ সাল থেকে চলা এই চুক্তির আওতায় ইতালির বার্ষিক চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশ মেটাত কাতার। কিন্তু সরবরাহ বন্ধ থাকায় এডিসন এখন বিকল্প উৎস খুঁজছে। তারা মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে এই ঘাটতি পূরণ করছে।

কয়েক দশক ধরে ওয়াশিংটন ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যকার সমীকরণটি ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলের নিরাপত্তা দেবে এবং সমুদ্রপথ উন্মুক্ত রাখবে। এর বিনিময়ে উপসাগরীয় তেল উৎপাদকেরা বিশ্ব অর্থনীতি সচল রাখতে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ করবে। এই তেল কেনাবেচা হবে ডলারে, যা মার্কিন অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করবে।

কিন্তু এখন সেই সমীকরণ পুরোপুরি উল্টে গেছে। আমেরিকা এখন আর কেবল উপসাগরীয় জ্বালানির সুরক্ষাদাতা নয়। তারা এখন উপসাগরের অন্যতম বড় প্রতিযোগী। উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তাহীনতার কারণে তেল-গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।

চলমান ছয় মাসের যুদ্ধ কাতারের এলএনজি রপ্তানিকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করেছে। কুয়েত, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের তেল রপ্তানিও উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। এই শূন্যস্থান পূরণ করেছে মার্কিন তেল ও গ্যাস। মার্কিন জ্বালানি জায়ান্ট কোম্পানিগুলো এখন রেকর্ড পরিমাণ মুনাফা ঘরে তুলছে।

এখানে মার্কিন সরকার এবং তার চারপাশে গড়ে ওঠা বেসরকারি স্বার্থের মধ্যে পার্থক্য বোঝা প্রয়োজন। ওয়াশিংটন চায় ইরানের ওপর ভূরাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর প্রভাব ধরে রাখতে। অন্যদিকে, বেসরকারি জ্বালানি কোম্পানিগুলো চায় তেল-গ্যাসের রিজার্ভ ও নতুন গ্রাহক। ট্রাম্প তাঁর ‘জ্বালানি আধিপত্য’ নীতির মাধ্যমে এই দুই পক্ষকে এক সুতোয় বেঁধেছেন। এখানে সরকারি ক্ষমতা পথ তৈরি করছে, আর বেসরকারি পুঁজি সেই সুযোগ লুফে নিচ্ছে।

এই সমীকরণে ইসরায়েল আরেকটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। মার্কিন জ্বালানি জায়ান্ট শেভরন ইসরায়েলের লেভিয়াথান গ্যাসক্ষেত্রের প্রায় ৪০ শতাংশ এবং তামার গ্যাসক্ষেত্রের ২৫ শতাংশের মালিক। শেভরন এখন লেভিয়াথান থেকে মিসরে গ্যাস রপ্তানি বাড়াতে কাজ করছে।

ইসরায়েলের ভূমিকা মূলত মার্কিন অপারেটরের স্বার্থের সঙ্গেই যুক্ত। এটি ইসরায়েল, মিসর ও জর্ডানকে যুক্ত করে মার্কিন সমর্থিত একটি আঞ্চলিক ব্যবস্থার অংশ।

এই পুরো ঘটনায় শেভরন কোম্পানিটি এক বড় অনুঘটক। যুক্তরাষ্ট্রে তাদের বড় বিনিয়োগ রয়েছে। ইসরায়েলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্যাসক্ষেত্রগুলো তারা নিয়ন্ত্রণ করছে। আবার ভেনেজুয়েলাতেও তাদের ব্যবসার বিস্তার ঘটছে। এর মানে এই নয় যে শেভরন একাই মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি ঠিক করছে। তবে এটি স্পষ্ট যে, মার্কিন রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রয়োগ কীভাবে মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য বড় বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে।

ইসরায়েল কোনোভাবেই ইরানের সঙ্গে তাদের সংঘাত এমন কোনো শর্তে শেষ করতে চায় না, যা তাদের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তা ইসরায়েলের যুদ্ধকালীন লক্ষ্যের ধারেকাছেও ছিল না। তাই ইসরায়েল ওই চুক্তি মানতে অস্বীকৃতি জানায়। তারা লেবাননে সামরিক অভিযান চালানোর স্বাধীনতা বজায় রাখে এবং মার্কিন আলোচনার চেষ্টা চলাকালেই হামলা অব্যাহত রাখে।

ইসরায়েলের কাছে যুদ্ধবিরতি মানে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি নয়। এটি মূলত শক্তি সঞ্চয়ের সাময়িক বিরতি। এর পেছনে কৌশলগত কারণ রয়েছে। ইসরায়েল চায় না ইরান তাদের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা পুনরুদ্ধার করুক। এছাড়া ইসরায়েলি নেতারা আশঙ্কা করেন, এখনই চুক্তি মেনে নিলে নির্বাচনের আগে তাঁদের দুর্বল মনে হতে পারে।

ইসরায়েল যেভাবে সংঘাত জিইয়ে রাখছে, তা মার্কিন জ্বালানি খাতের স্বার্থের সঙ্গে মিলে যায়। ইরানের ওপর ক্রমাগত চাপ থাকায় হরমুজ প্রণালী সবসময়ই অনিরাপদ থাকে। ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলের রপ্তানি ঝুঁকিতে পড়ে এবং জ্বালানি পরিবহনের ঝুঁকিজনিত খরচ বা রিস্ক প্রিমিয়াম বাড়ে। ইসরায়েল ও মার্কিন কোম্পানিগুলো যৌথ পরিকল্পনা না করেও একে অপরের স্বার্থ রক্ষা করছে।

তেলের দামের দিকে তাকালে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। ট্রাম্প সারাক্ষণ সস্তা তেলের কথা বললেও মার্কিন তেল উৎপাদকেরা তেল অতিরিক্ত সস্তা হওয়া পছন্দ করে না। মার্কিন কোম্পানিগুলোর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে ব্যারেল প্রতি গড়ে ৪৩ ডলার প্রয়োজন। আর নতুন কূপ খনন করে লাভজনক হতে হলে দাম অন্তত ৬৬ ডলার হওয়া দরকার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান পারমিয়ান অববাহিকাগুলোতে তেলের দাম বর্তমানে ৬১ থেকে ৬২ ডলারের কাছাকাছি।

তাহলে ট্রাম্পের এমন একটি দাম প্রয়োজন যা খুব বেশিও নয় আবার খুব কমও নয়। অর্থাৎ তেলের দাম এমন হতে হবে যা মার্কিন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখবে, আবার যুক্তরাষ্ট্রের শেল তেল ও ফ্র্যাকিং ব্যবসায় বিনিয়োগকারীদের টিকিয়ে রাখবে। উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তাহীনতা ঠিক এই ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করছে। এর জন্য কোনো মহাবিপর্যয়ের প্রয়োজন নেই। ছোটখাটো বিঘ্নই দামকে এমন এক জায়গায় ধরে রাখছে যাতে মার্কিন কূপগুলোতে খননকাজ লাভজনক থাকে।

এ কারণেই হয়তো বর্তমান পরিস্থিতিতে ‘না-যুদ্ধ, না-শান্তি’র একটি চমৎকার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। এখানে বড় কোনো আঞ্চলিক যুদ্ধ হলে হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। তাতে তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে এবং ইসরায়েলে শেভরনের কার্যক্রম ব্যাহত হবে। আবার স্থায়ী কোনো শান্তি চুক্তি হলে ঝুঁকির মাশুল কমে যাবে এবং উপসাগরীয় জ্বালানির ওপর মানুষের আস্থা ফিরবে।

তাই ‘নিয়ন্ত্রিত নিরাপত্তাহীনতা’ একটি সুবিধাজনক মধ্যপন্থা। এতে মার্কিন উৎপাদন সুরক্ষিত থাকে, আবার উপসাগরীয় জ্বালানি নিয়ে বিশ্ব বাজারে এক ধরনের অনিশ্চয়তা বজায় থাকে।

ইসরায়েল এখানে ইরানকে চাপে রাখছে, ওয়াশিংটন তার মিত্রদের ওপর প্রভাব বজায় রাখছে এবং মার্কিন তেল উৎপাদকেরা নতুন নতুন গ্রাহক পাচ্ছে। বিপদ এখানেই যে, প্রভাবশালী প্রতিটি পক্ষই এখন এই সংকটের স্থায়ী সমাধান না হওয়ার মধ্যে নিজেদের লাভ খুঁজে পাচ্ছে।

উপসাগরীয় অঞ্চলের বিশাল তেলের মজুদ রয়েছে। তাদের তেল তোলার খরচও মার্কিন কোম্পানিগুলোর চেয়ে অনেক কম। কিন্তু কেবল তেলের মজুদ দিয়ে এখন আর বাজারের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। এর জন্য নির্ভরযোগ্যতা জরুরি। হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে সৌদি ও আমিরাতের পাইপলাইনের মাধ্যমে দিনে মাত্র ৩৫ থেকে ৫৫ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করা সম্ভব। বাকি তেল এখনো চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

উপসাগরের জ্বালানি খাতের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি তেল ফুরিয়ে যাওয়া নয়। আসল হুমকি হলো, বিশ্ব বাজার হয়তো একদিন উপসাগরের তেল ছাড়াই চলতে শিখে যাবে। প্রতিটি বিলম্বিত তেলবাহী জাহাজ আটলান্টিক মহাসাগরীয় বিকল্পের পথ প্রশস্ত করছে। কাতারের প্রতিটি বাতিল হওয়া এলএনজি চালানের জায়গায় যে মার্কিন এলএনজি ঢুকছে, তা দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরি করছে।

একটা সময় ছিল যখন মার্কিন শক্তি মূলত উপসাগরীয় জ্বালানি প্রবাহের সুরক্ষার ওপর নির্ভর করত। এখন সেই শক্তির ভিত্তি দিন দিন উপসাগরীয় জ্বালানিকে প্রতিস্থাপনের ওপর নির্ভর করছে।


সুলতান বারাকাত হামাদ বিন খলিফা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক পলিসি বিষয়ের অধ্যাপক। তিনি রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (RUSI) সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট ফেলো এবং জোহানেসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিস্টিংগুইশড ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে যুক্ত আছেন।