হরমুজ বন্ধে কপাল খুলেছে কয়েকটি দেশের, আছে বিপরীত চিত্রও

হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকা এবং এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দামের ব্যাপক উল্লম্ফন উপসাগরীয় কয়েকটি দেশকে মোটা আর্থিক সুবিধা এনে দিয়েছে। সুবিধা পাওয়া দেশের তালিকায় ইরান ছাড়াও রয়েছে ওমান ও সৌদি আরব। তবে যেসব উপসাগরীয় দেশের বিকল্প শিপমেন্ট রুট নেই, বিলিয়ন ডলার লোকসানের মুখে পড়েছে তারা। মূলত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জন্য হরমুজ প্রণালি বন্ধের প্রভাব নির্ভর করছে তাদের ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর।
হরুমুজ প্রণালি ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ওমান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত পাইপলাইন ও অন্যান্য বন্দরের মাধ্যমে এটি এড়িয়ে তেল রপ্তানি করতে পারছে। বিপরীতে ইরাক, কুয়েত ও কাতারের তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কারণ, আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানোর জন্য তাদের কোনো বিকল্প রুট নেই।
বিশ্বের মোট তেল ও এলএনজি প্রবাহের প্রায় এক পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। গত ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার পর সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে প্রণালিটি কার্যত বন্ধ করে দেয় ইরান। অবশ্য পরে তারা জানায়, যেসব জাহাজের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সংশ্লিষ্টতা নেই, তারা হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করতে পারবে। এর ফলে কিছু তেলবাহী জাহাজ প্রণালিটি দিয়ে যাতায়াত করলেও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের নজিরবিহীন অস্থিরতা তাতে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি। গত মার্চে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে ৬০ শতাংশ। এক মাসে এই পরিমাণ বৃদ্ধি ইতিহাসে সর্বোচ্চ, বলছে সংবাদমাধ্যম।
এদিকে, তেহরানকে হুঁশিয়ারি দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, মঙ্গলবারের মধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করার বিষয়ে যদি কোনো চুক্তিতে না আসা হয়, তবে তিনি তেহরানের ওপর ‘নরক’ নামিয়ে আনবেন।
ট্রাম্পের সর্বশেষ হুমকির পর ইরানের একজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, ‘কোনো অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে ইরান এই প্রণালি খুলে দেবে না।’
কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধ তেহরানকে একদিক থেকে শক্তিশালী করেছে। থিঙ্ক ট্যাঙ্ক চ্যাথাম হাউসের সহযোগী ফেলো নিল কুইলিয়াম বলেন, ‘এখন যেহেতু হরমুজ একবার বন্ধ হয়েছে, এটি বারবার বন্ধ হতে পারে। বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এটি বড় হুমকি। পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।’
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) বর্তমান পরিস্থিতিকে এখন পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে বড় জ্বালানি সরবরাহ সংকট বলে অভিহিত করেছে। তাদের হিসাবে, বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন ১২ মিলিয়নেরও বেশি ব্যারেল তেল সরবরাহ বন্ধ রয়েছে এবং এখন পর্যন্ত প্রায় ৪০টি জ্বালানি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মার্চ মাসের রপ্তানি তথ্যের বিশ্লেষণে রয়টার্স দেখেছে, ইরাক ও কুয়েতের সম্ভাব্য তেল রপ্তানি আয় গত বছরের তুলনায় প্রায় তিন চতুর্থাংশ কমে গেছে। উল্টোদিকে, তেল বিক্রি থেকে ইরানের আয় ৩৭ শতাংশ এবং ওমানের আয় ২৬ শতাংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের আয় বেড়েছে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ। সংযুক্ত আরব আমিরাতের রপ্তানি ২ দশমিক ৬ শতাংশ কমলেও তেলের দাম বাড়ার কারণে তাদের কম রপ্তানির ক্ষতি পুষিয়ে গেছে।
সৌদি আরবের জন্য তেলের বাড়তি দামের অর্থ হলো রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকো থেকে প্রাপ্ত অতিরিক্ত রয়্যালটি ও ট্যাক্স। আরামকোর মালিকানা মূলত সরকার ও তাদের সার্বভৌম বিনিয়োগ তহবিলের হাতে। এই বাড়তি আয় সৌদি আরবের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক, কারণ দেশটি তেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে বিভিন্ন মেগা প্রজেক্টে প্রচুর ব্যয় করছিল, যার ফলে বাজেটে ঘাটতি দেখা দিয়েছিল।
এক হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ইস্ট-ওয়েস্ট লিংক সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় পাইপলাইন। ১৯৮০ এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে চলার জন্য তারা এটি নির্মাণ করেছিল। এটি দেশের পূর্বাঞ্চলীয় তেলক্ষেত্রগুলোর সঙ্গে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে সংযোগ স্থাপন করে। বর্তমানে বর্ধিত সক্ষমতা অনুযায়ী এটি দিয়ে প্রতিদিন ৭০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হচ্ছে।
শিপিং ডাটা অনুযায়ী, গত ২৩ মার্চ থেকে ইয়ানবু বন্দরে সপ্তাহে গড়ে ৪৬ লাখ ব্যারেল তেল লোড করা হয়েছে, যদিও ১৯ মার্চ সেখানে হামলা হয়। মার্চ মাসে সৌদি আরবের মোট তেল রপ্তানি গত বছরের তুলনায় ২৬ শতাংশ কমলেও, তেলের দাম বেশি থাকায় তাদের রপ্তানি আয় গত বছরের তুলনায় প্রায় ৫৫৮ মিলিয়ন ডলার বেড়েছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কমেছে ইরাকের আয়। প্রায় ৭৬ শতাংশ কমে দেশটির আয় দাঁড়িয়েছে মাত্র ১ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলারে। কুয়েতের আয় কমেছে ৭৩ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৮৬৪ মিলিয়ন ডলার।
ইরাকের রাষ্ট্রীয় তেল বিপণন সংস্থা সোমো জানিয়েছে, মার্চ মাসে তেল থেকে তাদের আয় ছিল প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার, যা রয়টার্সের হিসাবের কাছাকাছি। তবে এপ্রিল মাসে এই দেশগুলোর আয় আরও কমার আশঙ্কা রয়েছে।
মর্নিংস্টার ডিবিআরএসের সোভারেন রেটিংয়ের ভিপি আদ্রিয়ানা আলভারাডো বলেন, ‘উপসাগরীয় দেশগুলোর আর্থিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার বিকল্প আছে। তারা তাদের সঞ্চিত অর্থ ব্যবহার করতে পারে অথবা আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ঋণ নিতে পারে। বাহরাইন বাদে অন্য সব উপসাগরীয় দেশের এই ধাক্কা সামলানোর মতো আর্থিক সক্ষমতা রয়েছে।’
তবে যুদ্ধকেন্দ্রিক অস্থিরতার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হতে পারে, তা এখনও অস্পষ্ট। এই সংকট দেশগুলোর তেলের ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে। এবং সেই প্রক্রিয়া শুরুও হয়েছে। গত সপ্তাহেই ফ্রান্সের টোটালএনার্জিস এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মাসদার নয়টি এশীয় দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারের জন্য ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের একটি যৌথ উদ্যোগ ঘোষণা করেছে।
লেখকদ্বয়: রয়টার্সের সাংবাদিক