logo
Advertisement

আল–জাজিরার কলাম/বিশ্বকে যেভাবে বদলে দিচ্ছে ‘ট্রাম্পবাদ’

ফিরাস এন দাব্বাঘ
ফিরাস এন দাব্বাঘ
বিশ্বকে যেভাবে বদলে দিচ্ছে ‘ট্রাম্পবাদ’
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী যুগে আদর্শবাদের ব্যাপক দাপট ছিল। এই আদর্শবাদ থেকেই জন্ম নিয়েছিল বহুমুখী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এবং পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন শাসন কাঠামোর এক বিশাল নেটওয়ার্ক।

Advertisement

সেই চেনা বিশ্বব্যবস্থা এখন ইতিহাসের এক বড় সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দুই মেয়াদের প্রশাসনে গড়ে ওঠা পররাষ্ট্রনীতি আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক নতুন ধারার জন্ম দিয়েছে। এই নীতির মূল বৈশিষ্ট্য হলো একতরফাবাদ, স্বার্থভিত্তিক জাতীয়তাবাদ এবং ঐতিহাসিক মিত্রতার নতুন হিসাব-নিকাশ। এটি আগের যেকোনো আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। চাপ প্রয়োগের কূটনীতি এবং গণমাধ্যমের কৌশলগত ব্যবহার এই নীতিতে দেখা যায়। এই পরিবর্তন পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে এক নতুন বৈশ্বিক প্রবণতার জন্ম দিয়েছে, যার নাম ‘ট্রাম্পবাদ’।

জাতীয় সার্বভৌমত্বের দাবি এবং এস্টাবলিশমেন্ট-বিরোধী সুরকে একত্রিত করেছে ট্রাম্পবাদ। এর মাধ্যমে এটি যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা বৈশ্বিক শাসনের মূল ভিত্তিগুলোকে একের পর এক চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। মূলত, পশ্চিমা দেশগুলোর আধিপত্যে থাকা বৈশ্বিক নেতৃত্ব থেকে এটি এক সচেতন প্রস্থান। ট্রাম্পবাদ বিশ্বকে একটি বিকেন্দ্রীভূত, সুনির্দিষ্ট ইস্যু-ভিত্তিক এবং পুরোপুরি স্বার্থভিত্তিক বা লেনদেনমূলক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

লেনদেনমূলক কূটনীতির মূল ভিত্তি

ট্রাম্পবাদের মূল কৌশল প্রথাগত বহুমুখী চুক্তি ও প্রতিশ্রুতিকে বাদ দিয়েছে। এর বদলে তারা অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং জাতীয় স্বার্থের ওপর কঠোরভাবে জোর দিয়েছে। এই পররাষ্ট্রনীতি সরাসরি দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের সঙ্গে যুক্ত। এর লক্ষ্য হলো নিজস্ব শিল্পের পুনরুজ্জীবন, প্রতিরক্ষা খাতকে শক্তিশালী করা, জ্বালানি খাতে আধিপত্য বিস্তার, ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্য এবং আর্থিক খাতে নেতৃত্ব ধরে রাখা।

এই লক্ষ্যগুলো অর্জনে ট্রাম্প প্রশাসন বড় বড় বহুজাতিক চুক্তি এড়িয়ে চলেছে। এর বদলে তারা দ্বিপাক্ষিক চুক্তির দিকে মনোযোগ দিয়েছে। তারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে আগ্রাসী শুল্ক নীতি, জবরদস্তিমূলক বাণিজ্য ব্যবস্থা এবং নিষেধাজ্ঞাকে ব্যবহার করেছে।

ট্রাম্প প্রশাসন বড় পরিসরে নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং দেশের সীমানার বাইরে গিয়ে তা আগ্রাসীভাবে প্রয়োগের নীতি গ্রহণ করেছে। এই নীতি আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় এখতিয়ারের বৈধ সীমানা নিয়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

‘শক্তির মাধ্যমে শান্তি’ স্লোগানের আড়ালে ট্রাম্পবাদ আইনি, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে একত্রিত করেছে। এর মাধ্যমে তারা বন্ধু ও শত্রু উভয় পক্ষের ওপর সমানভাবে চাপ সৃষ্টি করেছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যক্রম এবং জাতীয় নিরাপত্তার উদ্দেশ্যগুলোকে তারা পররাষ্ট্রনীতির সরাসরি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে।

এই লেনদেনমূলক মনোভাব যৌথ প্রতিরক্ষা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে ন্যাটোর ওপর এর প্রভাব স্পষ্ট। ট্রাম্পবাদ পশ্চিমা বিশ্বের প্রতিরক্ষা ব্যয়ের অংশীদারত্বের বিষয়টিকে কঠোরভাবে যাচাই করেছে। এই নীতিতে তারা দেখিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘকাল ধরে খরচের একটি বড় অংশ এবং কৌশলগত ঝুঁকি একা বহন করেছে, যা ছিল চরম বৈষম্যমূলক।

প্রাতিষ্ঠানিক বিপর্যয় ও কাঠামোগত অচলবস্থা

ট্রাম্পবাদের প্রভাব বৈশ্বিক শাসন কাঠামোর প্রতিটি স্তরে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। বিভিন্ন বহুমুখী ফোরামে ট্রাম্প প্রশাসন চরম দ্বিধাদ্বন্দ্ব এবং অনিশ্চয়তা দেখিয়েছে। তারা প্রায়ই প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো থেকে সরে এসেছে এবং বহুমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখেছে।

নেতৃত্বের এই অস্থিরতা বৈশ্বিক শাসন ব্যবস্থার গভীর দুর্বলতাগুলোকে উন্মুক্ত করে দিয়েছে। এটি স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভাঙনকে ত্বরান্বিত করেছে।

এই প্রাতিষ্ঠানিক বিপর্যয়ের অন্যতম বড় শিকার হয়েছে জাতিসংঘ। বিশেষ করে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ বড় সংকটে পড়েছে। নিরাপত্তা পরিষদের বৈধতা, প্রতিনিধিত্ব এবং কার্যকারিতা নিয়ে চলমান বিতর্ককে ট্রাম্পের নীতি আরও উস্কে দিয়েছে।

পর্যবেক্ষকেরা মনে করেন, ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্ক্রিয়তা নিরাপত্তা পরিষদকে আগেই অচল করে দিয়েছিল। ঔপনিবেশিক আমলের মানসিকতায় আটকে থাকায় এই সংস্থা কোনো কাঠামোগত সংস্কার করতে পারেনি। এর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষ্ক্রিয়তা এই অচলাবস্থাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব এবং কর্তৃত্ব নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন তুলেছে।

ট্রাম্পের সমর্থকেরা অবশ্য দাবি করেন, প্রশাসন কিছু উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করতে চেয়েছে। যেমন সমমনা বন্ধুদের সঙ্গে কাজ করা কিংবা জাতিসংঘের মহাসচিবের সঙ্গে নির্দিষ্ট বিষয়ে সহযোগিতা করা। তবে সমালোচকেরা এই পদক্ষেপগুলোকে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার চেয়ে তাৎক্ষণিক জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার চেষ্টা হিসেবেই দেখছেন।

বহুমুখী ও আঞ্চলিক ব্যবস্থার উত্থান

বিশ্ব নেতৃত্ব থেকে যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। এর ফলে যে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হচ্ছে, তা আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে নতুন করে সাজাতে সাহায্য করছে। মাঝারি শক্তির দেশ এবং আঞ্চলিক জোটগুলো এখন বৈশ্বিক শাসন ব্যবস্থার শূন্যতা পূরণে এগিয়ে আসছে।

এই পক্ষগুলো এখন নিজস্ব আঞ্চলিক কাঠামো এবং নির্দিষ্ট ইস্যু-ভিত্তিক জোট গঠন করতে শুরু করেছে। তারা এগুলোকে পশ্চিমা দেশগুলোর আধিপত্যে থাকা প্রথাগত প্রতিষ্ঠানের বিকল্প বা সম্পূরক হিসেবে তুলে ধরছে।

ট্রাম্পের এই রাজনৈতিক পদক্ষেপগুলো আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ এবং নীতিনির্ধারকদের মধ্যে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

এক পক্ষ মনে করে, ট্রাম্পের তৈরি করা এই বিপর্যয় আসলে সংস্কারের জন্য একটি সুযোগ। এটি মাঝারি শক্তির দেশ এবং অ-পশ্চিমা দেশগুলোকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সমন্বয়ের দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে নিতে বাধ্য করছে। এর ফলে বিশ্ব এখন আরও বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং বাস্তবসম্মত ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যা আধুনিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা মোকাবিলা করতে সক্ষম।

অন্য পক্ষ অবশ্য সতর্ক করছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করার প্রবণতা যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছে। এটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈধতা নষ্ট করেছে। তাদের মতে, দুর্বল পশ্চিমা নেতৃত্ব দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রতিযোগিতা এবং আঞ্চলিক অস্থিরতার পথ তৈরি করে দিয়েছে। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে মারাত্মক শূন্যতা তৈরি হচ্ছে।

মহাশক্তির নতুন সংজ্ঞা

ট্রাম্পের এই পররাষ্ট্রনীতিকে একটি সাময়িক বিচ্যুতি বা ব্যক্তিগত রাজনৈতিক স্টাইল বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। একে ‘ট্রাম্পবাদ’ হিসেবেই চিহ্নিত করা উচিত। কারণ এটি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে একটি স্থায়ী ও অনুকরণযোগ্য মডেল তৈরি করতে পেরেছে।

অনিশ্চিত কূটনীতিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে এবং বৈশ্বিক শাসন ব্যবস্থার চেয়ে জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বকে গুরুত্ব দিয়ে ট্রাম্পবাদ কাজ করছে। এর মাধ্যমে ট্রাম্পবাদ আধুনিক যুগে একটি মহাশক্তির প্রভাব বিস্তারের কৌশলকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করছে।

ট্রাম্পের এই পররাষ্ট্রনীতি বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় এক গভীর ছাপ রেখে যাবে। এটি উদারনৈতিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তিগুলোকে চ্যালেঞ্জ করেছে। এর ফলে ক্ষমতার ভারসাম্য চিরতরে বদলে যাবে। বিশ্ব এখন এমন এক নতুন যুগে প্রবেশ করছে যেখানে ক্ষমতা নির্দিষ্ট কারও হাতে থাকবে না এবং প্রত্যেকে নতুন ধরনের শাসন ব্যবস্থা খুঁজতে বাধ্য হবে।


লেখক পরিচিতি

ফিরাস এন দাব্বাঘ জাতিসংঘের সাবেক কর্মকর্তা এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিবিষয়ক গবেষক। তিনি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। এছাড়া তিনি ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রিধারী। বর্তমানে তিনি লুসাইল ইউনিভার্সিটিতে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন এবং নাগরিক সমাজ খাতের একজন স্ট্র্যাটেজিস্ট হিসেবে কাজ করছেন।