logo
Advertisement

আলজাজিরার কলাম /গাজায় স্বাস্থ্যসেবার অধিকার এখন একটি বিশেষাধিকার

হদিল আওয়াদ
গাজায় স্বাস্থ্যসেবার অধিকার এখন একটি বিশেষাধিকার
গত ৩১ জুলাই গাজা শহরের বাস্তুচ্যুতদের একটি তাঁবুতে শিশুরা খেলাধুলা করছে। ছবি: আলজাজিরা

আজকাল গাজার স্বাস্থ্যসেবা সংবাদ শিরোনামে নেই। হাসপাতালে কোনো সহিংস অভিযান চালানো হচ্ছে না, যেমনটি ২০২৩ সালের নভেম্বরে আল-শিফা হাসপাতালে ঘটেছিল যখন আমি সেখানে কর্মরত ছিলাম। হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলোতে কোনো বোমা হামলা হচ্ছে না বা তাদের প্রাঙ্গণে স্নাইপার দিয়ে হত্যা করা হচ্ছে না। চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোর নিচে গোপন টানেলের কোনো নতুন দাবিও করা হচ্ছে না।

Advertisement

তা সত্ত্বেও গাজার চিকিৎসা ব্যবস্থার অবনতি ও পতন অব্যাহত রয়েছে। সম্ভবত এটি সবচেয়ে বেশি বাস্তুচ্যুতদের শিবিরগুলোতে, যেখানে সবচেয়ে দরিদ্র এবং ঝুঁকিপূর্ণ মানুষেরা বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে। সেখানে এই বিধ্বস্ত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা তাদের কাছে পৌঁছাতে পারছে না যাদের এটি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। অসুস্থ ও আহত ব্যক্তিরাও এর অল্প কয়েকটি চালু থাকা কেন্দ্রে আসতে পারছে না।

স্যানিটেশন বা স্বাস্থ্যসম্মত পয়ঃনিষ্কাশনের অভাব, নিরাপদ সুপেয় পানির সংকট এবং ক্রমাগত অসহ্য গরম বা ঠাণ্ডার মুখোমুখি হওয়া এই স্বাস্থ্য সংকটকে আরও মারাত্মক করে তুলেছে।

গত মাসে আমি একটি অনানুষ্ঠানিক শিবির পরিদর্শন করার সুযোগ পেয়েছিলাম, যা গাজা সিটির নাসর এলাকায় হাসান সালাহ স্কুলের ধ্বংসাবশেষে গড়ে উঠেছে।

২০২৪ সালের আগস্টে প্রতিবেশী নাসর স্কুলের সঙ্গে এই স্কুলটিতেও বোমা হামলা চালিয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়েছিল, যার ফলে অন্তত ৩০ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।

আজ, যুদ্ধের কারণে গৃহহীন ও নিঃস্ব হয়ে পড়া শত শত মানুষ স্কুলের প্রাঙ্গণে এবং স্কুল ভবনের অবশিষ্ট অংশে তাঁবুতে বসবাস করছে। কোনো সংস্থা এই শিবিরটি পরিচালনা করছে না, তাই চিকিৎসা সুবিধাসহ কোনো ধরনের সেবা প্রদানের ব্যবস্থাও সেখানে নেই।

আমি একটি স্থানীয় বেসরকারি ক্লিনিকের কয়েকজন চিকিৎসাকর্মীর একটি দলের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলাম, যারা ওই শিবিরে একদিনের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষার সেবা দিয়েছিলেন। আমাদের আগমনকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানানো হয়েছিল। আমরা কমপক্ষে ১৫০ জন রোগী দেখেছি।

রোগীদের সমস্যার মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ থেকে শুরু করে ডায়াবেটিস ও কিডনির সমস্যার মতো দীর্ঘস্থায়ী রোগ এবং হেপাটাইটিস ও চুলকানির মতো সংক্রমণ অন্তর্ভুক্ত ছিল। আমরা অনেক শিশুর মধ্যে জলবসন্ত, গ্যাস্ট্রোএন্টারটাইটিস, ডায়রিয়া এবং শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণও দেখেছি।

যদিও আমরা কেবল মৌলিক চিকিৎসাসেবা প্রদান করেছি, তবুও আমরা যে কৃতজ্ঞতা পেয়েছি তা ছিল অপরিসীম।

বাস্তুচ্যুত শিবিরের অনেক রোগীর জন্য চিকিৎসকের কাছে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব এক যাত্রায় পরিণত হয়েছে, যার জন্য প্রচেষ্টা, শক্তি এবং সম্পদের প্রয়োজন যা সবার পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব নয়। যাতায়াত খরচ, দীর্ঘ দূরত্ব এবং বাস্তুচ্যুতি ও তীব্র গরমের কারণে সৃষ্ট ক্লান্তি—সব মিলিয়ে রোগীরা তাদের জরুরি প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসাসেবা নিতে বিলম্ব করছে।

আমাদের একজন রোগী, যার বয়স ৪৬ বছর, বোমার স্প্লিন্টারের আঘাতে তার পায়ে গুরুতর জখম হয়েছিল এবং চলাফেরা করার জন্য ক্রাচের প্রয়োজন হতো। তার উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা ছিল কিন্তু তিনি কাছের আল-রানতিসি হাসপাতালে যেতে পারেননি, কারণ সেই চিকিৎসাকেন্দ্রটি আংশিকভাবে সচল এবং বেশিরভাগ সেবা কেবল শিশু ও ক্যানসার রোগীদের জন্য বরাদ্দ রয়েছে।

অন্য কোনো হাসপাতালে দীর্ঘ পথ হেঁটে যাওয়া নিশ্চিতভাবেই তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। একজন চিকিৎসকের কাছে গিয়ে বিনামূল্যে তার উচ্চ রক্তচাপ পরীক্ষা করাতে এবং ওষুধের প্রেসক্রিপশন পেতে হলে, নিকটবর্তী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়ার জন্য তাকে যাতায়াত ভাড়া বাবদ অন্তত ৮ ডলার খরচ করতে হতো।

বাস্তুচ্যুত শিবিরে থাকা বেশিরভাগ মানুষের কাছে এটি একটি বড় অংকের টাকা, যারা এমনকি তাদের প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খাচ্ছে। ওষুধের অভাব এবং কঠিন জীবনযাত্রার সাথে চিকিৎসার এই বিলম্ব রোগগুলোকে আরও মারাত্মক করে তুলতে পারে এবং এমনকি তা মৃত্যুর কারণও হতে পারে।

গাজায় যদি মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা ফিরিয়ে আনা যায়, বিশেষ করে ইউএনআরডব্লিউএর মতো কোনো বড় সংস্থার অধীনে, তবে এই সমস্ত কিছুই প্রতিরোধ করা সম্ভব।

নাকবার পর, গাজায় আসা ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ইউএনআরডব্লিউএ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। সংস্থাটি প্রতিটি শরণার্থী শিবিরে ক্লিনিক স্থাপন করেছিল, যা বিনামূল্যে মৌলিক স্তরের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সহায়তা করেছিল।

যুদ্ধের আগে, গাজা উপত্যকা জুড়ে ইউএনআরডব্লিউএ ২২টি ক্লিনিক পরিচালনা করত। সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদন অনুসারে, আজ তাদের মধ্যে কেবল ছয়টি চালু রয়েছে। গাজার ৩৪টি হাসপাতালের মধ্যে মাত্র ১৯টি আংশিকভাবে কাজ করছে এবং এখানে ‘আংশিক চালু’ শব্দটাই মূল বিষয়। এই হাসপাতালগুলোর বেশিরভাগ ওয়ার্ডই ধ্বংসযজ্ঞের কারণে অচল হয়ে পড়েছে।

আজ, পুরো গাজা উপত্যকায় ২০ লক্ষ মানুষের সেবার জন্য মাত্র ২,২০০টি শয্যা রয়েছে। অথচ যুদ্ধের আগে শুধু আল-শিফা হাসপাতালেই ৭০০টি শয্যা ছিল।

পরীক্ষাগার, অস্ত্রোপচার এবং চিকিৎসা সহ বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা সেবা এখন আর সহজলভ্য নেই, কারণ সেগুলোর জন্য কোনো সরঞ্জাম নেই অথবা সেগুলো করার মতো কোনো জীবিত চিকিৎসাকর্মী অবশিষ্ট নেই।

চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোর ধ্বংস এবং গাজার বাসিন্দাদের সর্বস্বান্ত হওয়া স্বাস্থ্যসেবার অধিকারকে একটি বিশেষাধিকারে পরিণত করেছে।

আমাদের জরুরি ভিত্তিতে এমন একটি স্বাস্থ্যসেবামূলক পদক্ষেপ প্রয়োজন যা কেবল হাসপাতাল পুনর্নির্মাণের ওপরই নজর দেবে না, বরং মৌলিক চিকিৎসা ক্লিনিকগুলো পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং বাস্তুচ্যুত শিবিরগুলোর সবচেয়ে দুর্বল মানুষের কাছে পৌঁছানোর ওপরও গুরুত্ব দেবে।


লেখক পরিচিতি

গাজাভিত্তিক একজন লেখক ও নার্স।

[প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের প্রতিফলন। এগুলো এশিয়া পোস্টের সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সঙ্গে সর্বদা মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখায় উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব; এ বিষয়ে এশিয়া পোস্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ।]