দ্য প্রিন্টের কলাম/আন্দোলন নিয়ে ভারতের টিভি মিডিয়ার ভেলকি: লাইভে এক, প্রাইম টাইমে আরেক

চলুন কিছু সোজাসাপটা কথা বলা যাক... থুড়ি, লেখা যাক।
ভারতের টিভি নিউজ ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) বিক্ষোভ সরাসরি সম্প্রচার করেছে। তারপর প্রাইম টাইমে গল্পটাই বদলে দিচ্ছে। পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে যে সহিংসতা হয়েছিল, টিভি নিউজ তার দায় ছাত্রদের ওপর চাপিয়ে দেয়। কিছু নিউজ চ্যানেল লুকিয়ে থাকা ‘টুলকিট’ এবং আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র খুঁজতে শুরু করে।
গত ২০ জুন ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিবাদ মিছিলের সংবাদমাধ্যমের কভারেজ বেশ বিভ্রান্তিকর ছিল। টেলিভিশন নিউজ তার সেরা ফর্মে ছিল, যখন তারা বিক্ষোভটি সরাসরি সম্প্রচার করছিল। ২১ জুলাই বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলোর প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে ‘ধরনার’ সরাসরি দৃশ্যও তারা দেখিয়েছে।
তারপর, পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে যে সহিংসতা তৈরি হয়, টিভি নিউজ তার দায় ছাত্রদের ওপর চাপানোর সিদ্ধান্ত নেয়। কিছু নিউজ চ্যানেল আবার লুকানো ‘টুলকিট’ এবং আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের খোঁজ শুরু করে।
এটা তখন হচ্ছে, যখন আমরা সবাই দেখেছি যে, বিক্ষোভের শুরু থেকে ওই একই টিভি চ্যানেলগুলোতে পুলিশকে লাঠিচার্জ করতে এবং ভিড়ের ওপর কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়তে দেখা গেছে।
বিভ্রান্তিকর এক কুণ্ঠা
অধিকাংশ শীর্ষস্থানীয় ইংরেজি সংবাদপত্র বিক্ষোভের ব্যাপক কভারেজ দিয়েছে। তবে, অনেকেই বিক্ষোভকারীদের ছাত্র বা ককরোচ জনতা পার্টির সমর্থক হিসেবে উল্লেখ করতে অনিচ্ছুক ছিল, যারা ফাঁস হওয়া নিট পরীক্ষার পেপার এবং এর পেছনের ‘মাফিয়া’ চক্রের বিরুদ্ধে এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছিল। তারা ‘সিজেপি-পরিচালিত বিক্ষোভ’ বলতে পারত, কিন্তু বলেনি।
একইভাবে, ২২ জুলাই, এই সংবাদপত্রগুলো প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে অন্যান্য কংগ্রেস নেতাদের সঙ্গে রাহুল গান্ধীর ‘অবস্থান বিক্ষোভ’ এবং তাকে মাটি থেকে তোলার জন্য দিল্লি পুলিশের চেষ্টার প্রথম পাতার খবরে তার নাম উল্লেখ করেনি। যদিও বেশিরভাগ পত্রিকাই এই ধস্তাধস্তির ছবি ছাপিয়েছিল। এর মধ্যে, বিদেশি সংবাদমাধ্যমগুলো এই ফাঁক পূরণ করেছে। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের পাতা-১ তার প্রমাণ।
এই অদ্ভুত কুণ্ঠা কেন, যখন আমরা সবাই টিভি নিউজ বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘটনাগুলো দেখেছি? সরকার কি সংবাদমাধ্যমগুলোকে কভারেজ পরিবর্তন করার জন্য যোগাযোগ করেছিল, নাকি এটা সেলফ সেন্সরশিপ বা স্ব-সেন্সরশিপ?
যাই হোক না কেন, এর কোনো অর্থ হয় না।
টিভি নিউজ সিজেপির ‘মুখোশ খুলেছে’
গত সোমবার টিভি নিউজ দিল্লি পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় বিক্ষোভকারী ছাত্র এবং তাদের সমর্থকদের বিশৃঙ্খলা, সহিংসতা এবং আবেগকে ভালোভাবে তুলে ধরেছিল। সাংবাদিকরা বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন এবং পুলিশের লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস বা ড্রোনে তোলা দৃশ্য, যা মধ্য দিল্লির ভেতর দিয়ে যাওয়া বিক্ষোভের বিশালতাকে তুলে ধরছিল, তা দেখাতে পিছপা হননি।
অনেক সাংবাদিক বলেছিলেন, এটি কৃষক আন্দোলনের পর গত পাঁচ বছরে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ।
কিন্তু সোমবার বিকেলের দিকে বিক্ষোভ স্তিমিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই টিভি নিউজ হঠাৎ করে তাদের ট্র্যাক বদলে ফেলে। ‘পুলিশ পে হামলা (পুলিশের ওপর হামলা)’ (আজ তক)-এর মতো শিরোনাম দেখা যেতে থাকে, যেখানে বলা হয় পুলিশ ‘মৃদু বলপ্রয়োগ’ করেছে (ইন্ডিয়া টিভি)।
আহত পুলিশকর্মী এবং ছাত্রদের পাথর ছোঁড়ার দৃশ্য হঠাৎ করেই সমস্ত টিভি নিউজ চ্যানেলের স্ক্রিনে ছেয়ে যায়। সারাদিনের ঘটনাগুলো নিট পেপার ফাঁসকারী ‘মাফিয়া’-দের বিরুদ্ধে ছাত্রবিক্ষোভের বদলে পুলিশের ওপর সহিংসতার একটি ‘রিপোর্ট কার্ডে’ পরিণত হয়।
সিএনএন নিউজ ১৮ এবং বিশেষ করে রিপাবলিক ভারত ও রিপাবলিকের মতো কিছু নিউজ চ্যানেল একটি সুপরিকল্পিত ‘ষড়যন্ত্র টুলকিট’-এর কথা বলতে থাকে, যা দিল্লি পুলিশের দাবি বলে অভিযোগ। অবধারিতভাবেই, পাকিস্তান সম্ভবত এর ‘মাস্টারমাইন্ড’ ছিল, নাকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র?
‘সিজেপি আনমাস্কড’ ছিল রিপাবলিকের একটি শিরোনাম।
এই সব কিছুই মাঠে থাকা টিভি সাংবাদিকদের কথার সম্পূর্ণ বিপরীত, যারা বলছিলেন যে এই বিক্ষোভ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। ইন্ডিয়া টুডের জন্য প্রীতি চৌধুরী এবং মৌসুমী সিংয়ের একটি চমৎকার প্রতিবেদনে, দুজনই বারবার বলেছিলেন যে, এই বিক্ষোভ ‘অর্গানিক’ (স্বতঃস্ফূর্ত)।
এরপর মঙ্গলবার সন্ধ্যায়, টিভি নিউজ সিদ্ধান্ত নেয় যে, একটি ভালো খবর এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয়, এমনকি যদি তাতে রাহুল গান্ধীও থাকেন। তাই প্রায় সমস্ত হিন্দি এবং ইংরেজি নিউজ চ্যানেল কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ধরনা সরাসরি সম্প্রচার করে এবং পুলিশের বাড়ানো হাত এড়াতে রাহুল মাঠে যা যা করছিলেন, সব দেখায়।
তারা সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদব এবং কংগ্রেস সাংসদ প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর আটক হওয়ার দৃশ্যও দেখায়।
প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো, বিদেশি টিভি নিউজ চ্যানেল এবং সংবাদপত্রগুলো তাদের সংবাদ প্রতিবেদন এবং ভিডিও কভারেজে এই বিক্ষোভটি কভার করেছে এবং সহিংসতা ঠিক যেমন ছিল, তেমনভাবেই দেখিয়েছে।
সংবাদপত্রের কভারেজ
শীর্ষস্থানীয় ইংরেজি সংবাদপত্রগুলোর অনলাইন পোর্টালগুলো সোমবার সিজেপি-র নেতৃত্বে বিক্ষোভের সময়কার সহিংসতার নিয়মিত আপডেট, ভিডিও এবং ছবি দিয়েছে।
মঙ্গলবার দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া, হিন্দুস্তান টাইমস, দ্য হিন্দু, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এবং দ্য ট্রিবিউন-এর মতো দৈনিকগুলো সিজেপির বিক্ষোভ এবং সংসদে এর রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন ছাপে। তারা বিক্ষোভের সময়কার ঘটনার ক্রম বিস্তারিতভাবে জানায় এবং দিল্লি পুলিশ যে বিক্ষোভকারীদের প্রত্যাশিত সংখ্যা বুঝতে ভুল করেছিল, তা চিহ্নিত করে।
দ্য হিন্দু লিখেছিল, ‘দিল্লি পুলিশ এবং অন্যান্য নিরাপত্তা কর্মীরা জন্তর মন্তর এবং এর আশেপাশে আসা হাজার হাজার বিক্ষোভকারীর কাছে সংখ্যায় হেরে গিয়েছিল এবং হতবাক হয়েছিল।’
সংবাদপত্রগুলো এই ‘ককরোচ’ আন্দোলনের নাম নিতে নারাজ ছিল। তাই, এটি কোনো ছাত্রবিক্ষোভ বা ককরোচ জনতা পার্টির নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভ ছিল না, বরং ছিল ‘বিক্ষোভকারীদের মার্চ’ (দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া) বা ‘আন্দোলনকারীদের ব্যূহ’ (হিন্দুস্তান টাইমস)।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, যারা সবচেয়ে বিস্তারিত এবং ব্যাপক কভারেজ দিয়েছিল, তারাও তাদের প্রথম পাতার ৬-কলামের প্রধান শিরোনামে বিক্ষোভকারীদের নাম প্রকাশ করতে সমানভাবে লাজুক ছিল—‘বিক্ষোভকারীরা দিল্লির হৃদকেন্দ্রে আছড়ে পড়ল, মিছিল থামাতে পুলিশের লাঠি ও কাঁদানে গ্যাস’।
দ্য হিন্দু অবশ্য তাদের ‘সিজেপির সংসদ মার্চে ক্র্যাকডাউনে কয়েকজন আহত’ শিরোনামে বিক্ষোভকারীদের স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করেছে। দ্য ট্রিবিউনও তাদের শিরোনামে সিজেপির নাম রেখেছে।
কখনও কখনও, ছবি আপনাকে এমন কিছু বলে যা শব্দ বলে না বা বলতে চায় না।
ছবিগুলো সম্পাদকীয় দৃষ্টিভঙ্গিরও ইঙ্গিত দিতে পারে। মঙ্গলবার, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের ছয়-কলামের ছবিতে পুলিশকে ভিড়ের ওপর লাঠিচার্জ করতে দেখা যাচ্ছে, যেখানে একজন বিক্ষোভকারী মাটিতে পড়ে আছেন। অন্যদিকে, টাইমস অব ইন্ডিয়া পুলিশ এবং বিক্ষোভকারীদের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছে দুটি এক-কলামের ছবির মাধ্যমে—একটি ছবি বিক্ষোভকারীদের পাথর ছোঁড়ার এবং অন্যটি পুলিশের একজনকে আটক করার।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসই একমাত্র সংবাদপত্র যারা মঙ্গলবার এই বিক্ষোভ নিয়ে একটি সম্পাদকীয় প্রকাশ করেছে। ‘কাঁদানে গ্যাস এবং লাঠি দিয়ে ‘সবকা বিশ্বাস’ অর্জন করা যায় না’ শীর্ষক একটি কঠোর লেখায় তারা বলেছে যে, সেই দিনের ছবিগুলো ছিল ‘নির্মম এবং হতাশাজনক’। তরুণ বিক্ষোভকারীদের প্রতি সরকারের মনোভাব ‘কঠোর এবং অনমনীয় বলে মনে হচ্ছে... সরকার তাদের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে রেখেছে, চোখ বন্ধ করে রেখেছে’।
তাদের কভারেজের সুরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে, মঙ্গলবার কংগ্রেসের ধরনা সংক্রান্ত বেশিরভাগ সংবাদপত্রের শিরোনামেও রাহুল গান্ধীর নাম ছিল না। শুধুমাত্র এক্সপ্রেস তাকে এওপি বা বিরোধী দলনেতা হিসেবে উল্লেখ করেছে।
হিন্দি সংবাদমাধ্যমের দৃষ্টিভঙ্গি
দৈনিক ভাস্কর, দৈনিক জাগরণ, রাজস্থান পত্রিকা, জনসত্তার মতো হিন্দি সংবাদপত্রগুলো অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে এই বিক্ষোভ কভার করেছে এবং তারা সতেজভাবে জোরালোও ছিল। তারা নাম প্রকাশ করতে পিছপা হয়নি।
‘ককরোচ জনতা পার্টির সংসদ মার্চ যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে,’ দৈনিক ভাস্কর তাদের প্রথম পাতায় লিখেছে।
গত বুধবারের শিরোনামে রাহুল গান্ধীর নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল। রাহুলকে মাটি থেকে তোলার একটি ছবি দিয়ে রাজস্থান পত্রিকা লিখেছে, ‘রাহুল গান্ধীর ধরনার পর সরকার পেপার-ফাঁস ইস্যুতে আলোচনা করতে প্রস্তুত।’
‘প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের বাইরে অবস্থানের পর রাহুল, প্রিয়াঙ্কা এবং অখিলেশ আটক,’ এটি ছিল দৈনিক জাগরণের পরিবেশনা। সংবাদপত্রটি একটি ছবিতে রাহুলকে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য এবং অন্য একটি ছবিতে মঙ্গলবার এনডিএ সাংসদদের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীকে আরামে বসে থাকার দৃশ্য দেখিয়েছে।
লেখক: শৈলজা বাজপেয়ী ভারতের একজন প্রখ্যাত সাংবাদিক, মিডিয়া কলামিস্ট এবং সাংবাদিকতা শিক্ষাবিদ, যিনি ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রিন্ট মিডিয়ায় কাজ করছেন। তিনি বর্তমানে 'দ্য প্রিন্ট'-এর রিডার্স এডিটর।
.png)





