Advertisement

মিডল ইস্ট আইয়ের কলাম/মক্কা চুক্তি কেন ইসরায়েল-ইউএই জোটের বুকে কাঁপন ধরিয়েছে

ডেভিড হার্স্ট
মক্কা চুক্তি কেন ইসরায়েল-ইউএই জোটের বুকে কাঁপন ধরিয়েছে
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। ছবি: সংগৃহীত

নিজেদের ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের মাধ্যমে নেতানিয়াহু এবং ট্রাম্প পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছেন। এই পরিস্থিতিতে তাদের বেপরোয়া আচরণের বিরুদ্ধে একটি যৌক্তিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে সদ্য স্বাক্ষরিত ‘মক্কা চুক্তি’।

Advertisement

গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সাধারণত কোনো আকস্মিক চমক পছন্দ করে না। বিশেষ করে যারা বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের যেকোনো কথোপকথন আড়ি পেতে শোনার ক্ষমতা নিয়ে অহংকার করে, তাদের ক্ষেত্রে এটি আরও বেশি প্রযোজ্য।

গত ৭ আগস্ট স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে এক মস্ত বড় চমক হিসেবে হাজির হয়েছে। আমিরাত এই চুক্তির খবর পায় এটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার মাত্র দুই সপ্তাহ আগে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।

গাজায় ইসরায়েলের চালানো গণহত্যার জবাবে একটি শক্তিশালী মুসলিম জোট গঠন করার ইচ্ছা আগেই প্রকাশ করেছিলেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। তিনি বিষয়টি গোপন রাখেননি। মাঝপথে তাকে কিছু বাধার সম্মুখীন হতে হলেও এই প্রকল্পের আশা তিনি কখনো ছেড়ে দেননি।

তবে সৌদি আরবের প্রকৃত শাসক যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস) তাঁর পরিকল্পনা অত্যন্ত গোপনে এগিয়ে নিয়েছেন। তিনি এমন কিছু চাল চেলেছেন যা ইরান যুদ্ধের সঙ্গে জড়িত সব পক্ষই তাদের নিজেদের অনুকূলে মনে করেছে।

গত মাসে ওয়াশিংটনে সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী যুবরাজ আবদুল আজিজ বিন সালমান একটি শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করেন। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পরবর্তীতে সৌদিকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার শর্ত জুড়ে দিয়ে সেই চুক্তি নস্যাৎ করার চেষ্টা করেন।

দক্ষিণ ইরাকে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) ‘উপদেষ্টাদের’ অধীনে পরিচালিত পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সের মিলিশিয়াদের লক্ষ্য করে যৌথ বিমান হামলা চালায় সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র। মধ্যপ্রাচ্যের বিশ্বস্ত সূত্রগুলো জানায়, ওই মিলিশিয়ারা কুয়েতে সীমান্ত পেরিয়ে বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা করছে বলে জানতে পেরেছিল সৌদি গোয়েন্দা সংস্থা।

একই সময়ে সৌদি আরবের তেলের স্থাপনায় রকেট ও ড্রোন হামলা চালায় ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ বা হুথি বিদ্রোহীরা। এর ফলে তাদের সঙ্গে চলা যুদ্ধবিরতি ভেঙে যায় এবং সৌদি যুদ্ধবিমানগুলো ইয়েমেনের সানায় আবার বোমাবর্ষণ শুরু করে।

মৌলিক পরিবর্তন। ইরান ও গাজার বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি জোটে অংশ নেওয়া দেশগুলোর কাছে মনে হয়েছিল, প্রথম দিকে কিছুটা সন্দিহান থাকলেও যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান শেষ পর্যন্ত হয়তো তাদের পক্ষ নিচ্ছেন। উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য নেতাদের মতো মোহাম্মদ বিন সালমানও হয়তো নানা বিপরীতমুখী পরামর্শ পেয়েছিলেন। তবে ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার সামরিক অভিযানে যোগ দেওয়ার কোনো চিন্তাই তাঁর মাথায় ছিল না।

প্রকৃত সত্য হলো, ইরান ও গাজার বিরুদ্ধে চলা প্রধান দুটি সামরিক অভিযান এখন স্থবির হয়ে পড়েছে। এই সংঘাতগুলো দীর্ঘকাল একই অবস্থায় থাকবে। তবে এই সংঘাতগুলোর সমান্তরালে পুরো অঞ্চলে কিছু মৌলিক ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটতে শুরু করেছে।

ইরান, গাজা ও লেবাননের বিরুদ্ধে তিনটি ফ্রন্টে যুদ্ধ শুরু করে কোনোটিতেই জয়ী হতে পারেনি ট্রাম্প-নেতানিয়াহু জোট। আবার তারা যুদ্ধ থেকে পিছু হঠতেও রাজি নয়। এই অনমনীয় জেদ মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লালনকারী মিত্র দেশগুলোর ওপর বড় প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে এটি সৌদি নীতিনির্ধারকদের চিন্তা-ভাবনায় বিশাল পরিবর্তন এনেছে।

পশ্চিমে উচ্চশিক্ষা নেওয়া সৌদি আরবের পররাষ্ট্র নীতি বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশের জন্য এটি ছিল একটি বিশাল ধাক্কা। তারা পর পর দুই মার্কিন প্রেসিডেন্টকে গাজায় ইসরায়েলের চালানো গণহত্যায় অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করতে দেখেছেন। ফলে তারা আর নিজেদের পশ্চিমা শিবিরের অংশ বলে মনে করতে পারছেন না। তদুপরি, আমেরিকা যখন এই অঞ্চলে স্বাগতিক দেশের কৌশলগত সম্পদ রক্ষা করা তো দূরের কথা, নিজেদের বিমান ঘাঁটির সুরক্ষাই নিশ্চিত করতে পারছে না, তখন সৌদি বিশ্লেষকদের মনে চরম অসন্তোষ ভীষণভাবে দানা বেঁধেছে।

সৌদি শুরা কাউন্সিলের সাবেক সদস্য ড. আহমেদ আলতুওয়াইজেরি স্পষ্ট করে বলেছেন, তিনি সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিত্ব করছেন না। তবে তিনি আমার উল্লিখিত সৌদি বুদ্ধিজীবী মহলের একজন ভালো প্রতিনিধি। তিনি আমাকে বলেন, ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিটি একটি অত্যন্ত জটিল সময়ে দৃশ্যপটে এসেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর সবাই এখন বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। এই চুক্তি কেবল তিনটি দেশের নয়, বরং পুরো অঞ্চলের স্বার্থ রক্ষা করবে। এটি এই অঞ্চলের ভূরাজনীতিকে নতুন আকার দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত রাখবে।’

ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর যুদ্ধের লক্ষ্যগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে পারেননি। এই ব্যর্থতা তাঁর সাবেক আঞ্চলিক মিত্রদের কাছে তাঁকে পুরোপুরি উন্মোচিত করে দিয়েছে। ক্ষমতা বদলের জন্য যুদ্ধ শুরু করার নির্বুদ্ধিতা তো ছিলই, কিন্তু তাতে জিততে না পেরে পুরো যুদ্ধকে স্থবির করে দেওয়াটাই এখন ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় ভুল হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইরানের মধ্যস্থতাকারীরা এই দুর্বলতা ধরতে পেরেছেন। তাই তারা হরমুজ প্রণালীর বর্তমান অচলাবস্থাকে ট্রাম্পের মধ্যবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে চান। তাদের হিসাব অনুযায়ী, এই নির্বাচনের পর ট্রাম্প কংগ্রেসে নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারেন। ফলে পরবর্তীতে তাকে আরও দুর্বল অবস্থানে থেকে আলোচনার টেবিলে ফিরতে হবে।

মক্কা চুক্তির প্রতিষ্ঠাতা তিন সদস্যেরই এখানে ব্যক্তিগত অনেক কিছু পাওয়ার আছে। ড. আলতুওয়াইজেরি বলেন, ‘এই চুক্তি ভারতের বিরুদ্ধে দ্বন্দ্বে পাকিস্তানকে সাহায্য করবে। তুরস্কের ক্ষেত্রে এটি বিশেষ কার্যকর। কারণ আঙ্কারা দেখেছে যে ইসরায়েলের প্রকাশ্য হুমকির মুখে তাদের ন্যাটোর সদস্যপদ কোনো কাজে আসছে না। তেল আবিব প্রকাশ্যেই বলেছিল যে ইরানকে সামলানোর পর তুরস্কই তাদের পরবর্তী লক্ষ্য হবে। আর এই চুক্তি সৌদি আরবকে তুরস্ক ও পাকিস্তানের যৌথ সামরিক শক্তি ও গোয়েন্দা সহায়তার সুযোগ দেবে।’

ছায়া থেকে প্রকাশ্যে। ইসরায়েলের কূটনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকরা দীর্ঘদিন ধরেই একটি ‘সুন্নি’ মুসলিম জোটের বিরুদ্ধে নিজস্ব অক্ষ তৈরি করতে চাইছিলেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে তাদের সামরিক সহযোগিতা ছিল এই পরিকল্পনার মূল কেন্দ্রবিন্দু। ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে এই গোপন জোট ছায়া থেকে প্রকাশ্যে উঠে এসেছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদের (এমবিজেড) ব্যাপক উৎসাহে স্বাক্ষরিত হওয়া ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ অগ্নিপরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়েছে। ওই সময়ে যখন আবুধাবিতে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন একের পর এক আঘাত হানছিল, তখন ইসরায়েল তাদের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও উচ্চপ্রযুক্তির সামরিক সরঞ্জাম আবুধাবিতে মোতায়েন করেছিল।

ইসরায়েল সেখানে একটি আইরন ডোম ব্যাটারি ও সৈন্য পাঠায়। পাশাপাশি যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য আইরন বিম লেজার প্রযুক্তি এবং ড্রোন শনাক্ত করার জন্য ‘স্পেকট্রো’ নামক অপটিক্যাল ব্যবস্থা মোতায়েন করে। কোনো আরব দেশে ইসরায়েলি কমান্ডের অধীনে এই ধরনের আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েনকে তৎকালীন সময়ে অত্যন্ত যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে দেখা হয়েছিল। তবে এটি ছিল তাদের আরও বড় আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার কেবল শুরু মাত্র।

ইসরায়েলের পরিকল্পনা ছিল তাদের সমস্ত শত্রুকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর তারা ভারত থেকে পূর্ব ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত একটি জোট তৈরি করবে। এই জোটের মাধ্যমে তারা নিজেদের তেল, গ্যাস, অর্থায়ন এবং উচ্চপ্রযুক্তির বাণিজ্যের মোড়ে স্থাপন করবে। ফলস্বরূপ, আমেরিকা ও পশ্চিমারা অবশেষে এই অঞ্চল থেকে বিদায় নিতে পারবে এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক চাবিকাঠি থাকবে তেল আবিবের হাতে।

এই পরিকল্পনার অধীনে মিসর বা সিরিয়ার মতো আরব বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী পরাশক্তিগুলোকে দেউলিয়া করে দেওয়া অথবা জাতিগত ও ধর্মীয় কোন্দলে খণ্ড খণ্ড করে দেওয়ার ছক কষা হয়েছিল। এমনকি আহমেদ শারার বর্তমান সিরিয়া নিয়েও ইসরায়েলের এই একই নীল নকশা রয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইয়েমেন, সুদান ও লিবিয়ায় গৃহযুদ্ধ বাঁধিয়ে রাখছিল। একই সঙ্গে তারা সোমালিল্যান্ডের মতো বিচ্ছিন্ন রাজ্যগুলোকে ব্যবহার করে একটি বিশাল নৌ-সাম্রাজ্য এবং সামরিক ঘাঁটি গড়ে তোলার কাজ শুরু করেছিল।

সদ্য স্বাক্ষরিত ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’ এই অশুভ নীল নকশার বিরুদ্ধে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। এই চুক্তির প্রথম প্রভাব হিসেবে রিয়াদ এবং তার ছোট কিন্তু অত্যন্ত সক্রিয় প্রতিবেশী দেশ আবুধাবির মধ্যকার কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও তীব্র হবে। উভয় দেশের সমাজমাধ্যমে সক্রিয় ইনফ্লুয়েন্সারদের পোস্টগুলো পর্যবেক্ষণ করলেই এই রেষারেষি স্পষ্ট বোঝা যায়।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ইয়েমেন থেকে আমিরাতি বাহিনী বিতাড়িত হওয়ার পর সংযুক্ত আরব আমিরাত বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. আবদুলখালেক আবদুল্লাহ পোস্ট করেছিলেন, ‘ইয়েমেন নিয়ে আমাদের মধ্যে শতভাগ দ্বিমত রয়েছে। তবে আমাদের অংশীদারিত্ব এর চেয়েও মজবুত।’ কিন্তু গত জানুয়ারি নাগাদ তাঁর সুর পাল্টে যায়। তিনি লেখেন, ‘সৌদি ও আমিরাতের মধ্যকার ফাটল ইয়েমেন সংকটের চেয়েও অনেক বেশি গভীর।’

সেই সময় সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল-সাউদ বলেছিলেন, দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ পারস্পরিক সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি শ্রদ্ধাবোধের ওপর নির্ভর করছে। এরপরই সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের দেশে ‘আল আরাবিয়া’র এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট নিষিদ্ধ করে এবং তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোট ওপেক ত্যাগ করে।

মক্কা চুক্তির পর আমিরাতি অধ্যাপক আবদুলখালেক আবদুল্লাহ ক্ষোভ উগরে দিয়ে লেখেন, ‘এটি যদি সামরিক জোট না হয়, তবে এর নাম কী? এই চুক্তি কি জিসিসি দেশগুলোর মতামত নিয়ে করা হয়েছে?’ জবাবে সৌদি যুবরাজ আবদুর রহমান বিন মুসায়েদ লেখেন, ‘সমস্যাটা কোথায়, ডাক্তার সাহেব? নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী যেকোনো দেশের সঙ্গে চুক্তি করার অধিকার কি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের নেই? এই নিয়ম কি সৌদি আরবের ক্ষেত্রে খাটবে না?’

সৌদি আরবের আরেক বুদ্ধিজীবী ড. আহমেদ আল-সানি পোস্ট করে বলেন, ‘পাঁচ বছর আগে কোনো আমিরাতি অ্যাকাউন্ট সৌদি আরবের কৌশলগত গভীরতা নিয়ে এভাবে কথা বলবে, তা ছিল কল্পনাতীত। মক্কা চুক্তি আমাদের সামনে তিতা সত্য এনে দিয়েছে। আমরা বুঝতে পেরেছি যে রিয়াদ এখন আর অন্যদের স্বপ্ন পূরণের জন্য টাকা ঢালতে রাজি নয়। তারা নিজেরাই এখন উপসাগরীয় অঞ্চলের সিদ্ধান্তের মূল কেন্দ্রবিন্দু হতে চায়।’

সৌদি নীতিনির্ধারকরা এখন নিশ্চিত যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ (এমবিজেড) ইয়েমেন ও সুদানে তাদের জন্য বড় ধরনের ঝামেলা তৈরি করবেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বিশ্লেষক বলেন, ‘সৌদি ও আমিরাতের সম্পর্ক আরও খারাপ হবে। আমিরাত উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সুদান ও ইয়েমেনের সংকটগুলোকে জটিল করে তুলবে।’ সংশ্লিষ্ট মহল আমাকে জানিয়েছে যে, পরিস্থিতি যদি এই পর্যায়ে পৌঁছায়, তবে আবুধাবির শাসনব্যবস্থা বদলে দেওয়ার মতো কঠিন পথেও হাঁটতে পারে সৌদি আরব। স্থানীয় এই ঝামেলা চিরতরে মেটানোর জন্য এটিই তাদের কাছে সবচেয়ে সহজ পথ হতে পারে।

সৌদি আরব এখন নিজেদের কৌশলগত সিদ্ধান্তের চাবিকাঠি নিজেদের হাতে রাখতে অত্যন্ত দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। এই কারণেই তারা মক্কা চুক্তিতে মিসরকে অন্তর্ভুক্ত করার তীব্র বিরোধিতা করেছিল। প্রথমত, সৌদি আরব এবং পাকিস্তান উভয়েরই নিজেদের সামরিক জোটের তথ্য ফাঁসের বিষয়ে আশঙ্কা ছিল। তারা মনে করছিল যে মিসর এই জোটের গোপন তথ্য ইসরায়েল অথবা আমেরিকার কাছে ফাঁস করে দিতে পারে।

তবে গত সপ্তাহে মিসর সফরের সময় তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান আশা প্রকাশ করে বলেন, মিসরও যেন এই মক্কা চুক্তিতে পাকিস্তান ও সৌদির সঙ্গে যোগ দেয়। ফিদান আশ্বস্ত করে বলেন, ‘আমরা আশা করি মিসর এই চুক্তির অফিশিয়াল অংশীদার হবে এবং এই চার শক্তির জোট তাদের কাজ চালিয়ে যাবে।’

নিরাপত্তা ও সমাধান। ওয়াশিংটনের চোখে এই দুই জোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে মূলত একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত গভীরতাসম্পন্ন জোট এবং একটি তাৎক্ষণিক লেনদেনভিত্তিক জোটের মধ্যে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক কর্মকর্তা থিওডোর সিঙ্গার মিডল ইস্ট আই-কে বলেন, ‘আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে ইসরায়েল-ইউএই জোট বেশি কার্যকর, তবে দীর্ঘমেয়াদে মক্কা চুক্তিই পুরো মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন অনবে এবং এটি কোনো সাধারণ ব্যবসায়িক চুক্তি নয়।’

অনেকেই সৌদি আরবকে মুসলিম বিশ্বের হৃদস্পন্দন বলে মনে করেন। সেই তুলনায় ইসরায়েল এবং তাদের দোসররা এই অঞ্চলের নিরাপত্তা মানচিত্রে সম্পূর্ণ নতুন এবং বহিরাগত শক্তি মাত্র। মার্কিন সহায়তার কারণে ইসরায়েলের সামরিক শক্তি বেশি থাকতে পারে, তবে পুরো অঞ্চলে গ্রহণযোগ্যতার চরম অভাব রয়েছে তাদের। তা ছাড়া, এই যুদ্ধগুলো তাদের কোনো সামরিক লক্ষ্যই পূরণ করতে পারছে না।

নেতানিয়াহু এবং ট্রাম্প পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছেন। যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল স্থবির হয়ে পড়েছে। ড. আলতুওয়াইজেরি বলেন, ‘ট্রাম্প এখন ফাঁদে পড়েছেন। তিনি যদি ইরানের সঙ্গে চুক্তি করতে যান, তবে তাকে ইরানের শর্তেই তা করতে হবে। আর তিনি যদি যুদ্ধ চালিয়ে যান, তবে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ বিরোধ তাঁর পরবর্তী নির্বাচনকে নিশ্চিতভাবে ধ্বংস করবে।’

গাজা এবং দক্ষিণ লেবানন—উভয় অঞ্চলেই ইসরায়েল নিজেদের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান নিশ্চিত করতে বড় ধরনের স্থায়ী অবকাঠামো তৈরি করছে। কোনো ফ্রন্ট থেকেই তাদের পিছু হটার লক্ষণ নেই। হামাস ও হিজবুল্লাহকে নির্মূল করতে না পেরে ব্যর্থ হওয়া ইসরায়েল এখন ট্রাম্পের নির্দেশে যুদ্ধ থামানোর ভান করে সেখানে ঘাঁটি গেড়ে বসছে। এই পরিস্থিতিতে পুরো আরব বিশ্ব এখন নিরাপত্তা ও সমাধানের জন্য এই ‘মক্কা জোটের’ দিকে চেয়ে থাকবে।


লেখক পরিচিতি: ডেভিড হার্স্ট ‘মিডল ইস্ট আই’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক। এর আগে তিনি ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর প্রধান বিদেশি সংবাদদাতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি মধ্যপ্রাচ্য ও আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি বিষয়ক অভিজ্ঞ বিশ্লেষক।