logo
Advertisement

শিক্ষা সংস্কারে প্রযুক্তির সঙ্গে প্রয়োজন বই পাঠের নীতিমালা

মুহম্মদ অবেদুল্লাহ
মুহম্মদ অবেদুল্লাহ
শিক্ষা সংস্কারে প্রযুক্তির সঙ্গে প্রয়োজন বই পাঠের নীতিমালা
প্রভাষক মুহম্মদ অবেদুল্লাহ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

১.

Advertisement

বই মানবসভ্যতার দীর্ঘতম সংলাপ। এক প্রজন্মের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, সাফল্য এবং প্রজ্ঞা বইয়ের মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যায়। সভ্যতার ধারাবাহিকতা রক্ষায় বইয়ের যে ভূমিকা, অন্য কোনো মাধ্যম এখনো সেই স্থান দখল করতে পারেনি। ফ্রান্সিস বেকনের বিখ্যাত উক্তি ‘Reading maketh a full man’ শতাব্দী ধরে উদ্ধৃত হয়ে আসছে।

নিয়মিত বই পাঠের মাধ্যমে একজন মানুষ বিশ্লেষণ করতে শেখেন। দীর্ঘদিনের পাঠাভ্যাস তাকে মতের ভিন্নতা বুঝতে শেখায়, তার বিচারক্ষমতাকে পরিণত করে। শিক্ষা কোনো নির্দিষ্ট বয়সে শেষ হয় না, কোনো সনদ অর্জনের মধ্যেও শেষ হয় না। শেখা মানুষের সারাজীবনের কাজ, আর বই সেই দীর্ঘ যাত্রার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযাত্রী।

বর্তমান পৃথিবীতে তথ্যের অভাব নেই; বরং তথ্যের প্রাচুর্যই এখন একটি বড় বাস্তবতা। একটি মোবাইল ফোন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে হাজার হাজার তথ্য সামনে হাজির করতে পারে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও মুহূর্তের মধ্যে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে। এই পরিবর্তন মানবসভ্যতার জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে, একই সঙ্গে নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে। তথ্যের সহজলভ্যতা অনেক সময় মানুষকে জ্ঞানের গভীরতার ভ্রমে ফেলে দেয়। তথ্য সংগ্রহ সহজ হয়েছে, কিন্তু চিন্তা করা সহজ হয়নি, বিশ্লেষণের কাজও সহজ হয়নি। সেই কাজের জন্য এখনো মনোযোগী পাঠের প্রয়োজন হয়, আর বই সেই মনোযোগ তৈরির সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম। এই কারণেই ইউনেস্কো শিক্ষাকে আজীবন শেখার ধারাবাহিক প্রক্রিয়া মনে করে। কেবল উন্নত অবকাঠামো মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারে না। তা নির্ভর করে জ্ঞানচর্চার সংস্কৃতির ওপর, আর সেই সংস্কৃতির কেন্দ্র বই পাঠ।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত পাঠ্যক্রম, প্রযুক্তি, অবকাঠামো এবং মূল্যায়ন পদ্ধতির গুরুত্ব অবশ্যই আছে। তবে এই সবকিছুর কার্যকারিতা শেষ পর্যন্ত একজন শিক্ষকের জ্ঞান, দক্ষতা এবং বৌদ্ধিক প্রস্তুতির ওপর নির্ভর করে। একজন দক্ষ শিক্ষক সীমিত সম্পদ নিয়েও ভালো শিক্ষা দিতে পারেন; একজন অপ্রস্তুত শিক্ষক উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করেও কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করতে পারবেন কি না, তা প্রশ্ন থেকে যায়। জ্ঞানের পরিধি প্রতিদিন বিস্তৃত হচ্ছে, গবেষণার নতুন ক্ষেত্র প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে। সমাজের মূল্যবোধ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং শিক্ষার্থীর শেখার ধরনও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য একজন শিক্ষককে প্রতিনিয়ত নিজের জ্ঞান নবায়ন করতে হয়, আর বই সেই নবায়নের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম।

একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীর কৌতূহল জাগিয়ে তোলেন, প্রশ্ন করতে শেখান, তথ্যকে জ্ঞানে রূপান্তর করার পথ দেখান। এই কাজের জন্য কেবল পাঠ্যবই পাঠ করা যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন বিস্তৃত পাঠ। সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান এবং সমকালীন সমাজ নিয়ে নিয়মিত পড়াশোনা একজন শিক্ষককে সমৃদ্ধ করে তোলে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের নিয়মিত বই পাঠের অভ্যাস খুবই সীমিত। শিক্ষকতা এ দেশে এখনো মূলত পাঠ্যবই-কেন্দ্রিক ও পরীক্ষা-উত্তীর্ণ করানোর একটি কারিগরি কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়; ব্যাপক পাঠ ও চিন্তাচর্চাকে পেশাগত যোগ্যতার অংশ হিসেবে দেখার সংস্কৃতি এখনো গড়ে ওঠেনি।

২.

বর্তমান সরকার শিক্ষা ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করতে বেশ কিছু বিষয়ে নজর দিয়েছে। শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠনের আগ্রহের পাশাপাশি সরকারি বিদ্যালয়ে ইন্টারনেট সংযোগ সম্প্রসারণ, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষার প্রসার, প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদান এবং শিক্ষকদের জন্য ডিজিটাল সহায়তা বৃদ্ধির পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত ও সময়েরও দাবি। প্রযুক্তির গুরুত্ব নিয়ে আজ কোনো বিতর্ক নেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রবেশ করেছে, ডিজিটাল কনটেন্ট পাঠদানকে আরও আকর্ষণীয় করেছে, অনলাইন গ্রন্থাগার জ্ঞানের পরিধি বাড়িয়েছে। ভার্চুয়াল ল্যাব এবং ইন্টারঅ্যাকটিভ শিক্ষাসামগ্রী শেখার নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। শিক্ষার্থীর মূল্যায়নও প্রযুক্তির মাধ্যমে দ্রুত ও নির্ভুলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে। আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় এই পরিবর্তনগুলোকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। প্রযুক্তি এখন শিক্ষার একটি অপরিহার্য অবকাঠামো।

তবে এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন, প্রযুক্তি কার হাতে যাবে? প্রযুক্তি ব্যবহার করবেন কে? প্রযুক্তির কার্যকারিতা নির্ভর করবে কোন শক্তির ওপর? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর একটিই— শিক্ষক। একজন শিক্ষক প্রযুক্তিকে শিক্ষার উপযোগী করে জ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত করবেন। তাই প্রযুক্তির মান যত গুরুত্বপূর্ণ, প্রযুক্তি ব্যবহারকারী শিক্ষকের বৌদ্ধিক প্রস্তুতিও তত গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি একটি হাতিয়ার মাত্র; হাতিয়ারের গুণমান নির্ভর করে তা যিনি চালাচ্ছেন তার দক্ষতা ও বিচারবুদ্ধির ওপর। শ্রেণিকক্ষে একটি ভালো স্মার্ট বোর্ড বা চমৎকার শিক্ষাসফটওয়্যার নিজে থেকে কোনো শিক্ষার্থীকে শেখাতে পারে না; শিক্ষকই তাকে অর্থবহ করে তোলেন।

এই বাস্তবতায় একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে। শিক্ষা সংস্কারের আলোচনায় প্রযুক্তি আছে, অবকাঠামো আছে, কারিকুলাম আছে, মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তনও আছে। কিন্তু শিক্ষকদের নিয়মিত বই পাঠের বিষয়টি কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। শিক্ষককে বছরে কতটি বই পড়তে হবে, সে বিষয়ে কোনো নীতিমালা নেই। পেশাগত বই পাঠকে ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়নের অংশ হিসেবে যুক্ত করার কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগও নেই। শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদ্যমান কর্মশালা ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি মূলত পাঠ্যক্রম বাস্তবায়ন, পাঠদান কৌশল ও মূল্যায়ন পদ্ধতির প্রায়োগিক দিকেই সীমাবদ্ধ। বিস্তৃত পাঠ, বিশ্লেষণী চিন্তা বা জ্ঞানচর্চার সংস্কৃতি গড়ে তোলার কোনো কাঠামোবদ্ধ পরিকল্পনা তার সঙ্গে যুক্ত নয়।

এই অনুপস্থিতি আমাদের ভাবনার উদ্রেক হওয়া উচিত। কারণ শিক্ষা সংস্কারের স্থায়িত্ব শেষ পর্যন্ত শিক্ষকের জ্ঞানচর্চার ওপরই নির্ভর করবে। প্রযুক্তি প্রতিস্থাপনযোগ্য— কিন্তু শিক্ষকের অন্তর্গত জ্ঞান, বিশ্লেষণক্ষমতা ও যুক্তিবোধ রাতারাতি তৈরি করা যায় না; তা দীর্ঘমেয়াদি চর্চার ফল। তাই যে সংস্কার-পরিকল্পনায় প্রযুক্তির অবকাঠামো নির্মাণের জন্য নির্দিষ্ট বাজেট, সময়সীমা ও লক্ষ্যমাত্রা থাকে, সেই একই পরিকল্পনায় শিক্ষকের পাঠচর্চা ও জ্ঞানচর্চার জন্যও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা, বাজেট বরাদ্দ ও মূল্যায়ন-কাঠামো থাকা প্রয়োজন। যেমন— বিদ্যালয়ভিত্তিক শিক্ষক-গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা, বার্ষিক ন্যূনতম পাঠ-লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ, সহকর্মীদের সঙ্গে পঠিত বইয়ের ওপর নিয়মিত আলোচনাচক্র আয়োজন এবং পেশাগত উন্নয়ন মূল্যায়নে পাঠাভ্যাসকে একটি নির্ণায়ক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।

সিইও ওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিনের সর্বশেষ বৈশ্বিক জরিপে ১০২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৭তম। জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের একজন মানুষ বছরে গড়ে মাত্র ২.৭৫টি বই পড়েন এবং বই পড়ার পেছনে ব্যয় করেন মাত্র ৬২ ঘণ্টা। অর্থাৎ, বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে বইপাঠের অভ্যাস উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল। এই পরিসংখ্যান কেবল পাঠাভ্যাসের সংকটই নয়, জ্ঞানচর্চা, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং পাঠসংস্কৃতির সামগ্রিক অবক্ষয়ের চিত্র স্পষ্ট করেছে। প্রমথ চৌধুরী বলেছেন, ‘শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য মানুষের মনকে জাগানো।’ শিক্ষার্থীদের মনকে জাগানোর জন্য জ্ঞানচর্চায় শিক্ষকদের বই পাঠের কোনো বিকল্প নেই।

প্রযুক্তি ও বই পরস্পরবিরোধী নয়, পরিপূরক। প্রযুক্তি তথ্যের গতি বাড়ায়, বই সেই তথ্যকে প্রজ্ঞায় রূপান্তর করে। শিক্ষাব্যবস্থায় যদি কেবল প্রযুক্তিকে সামনে রেখে শিক্ষকের পাঠচর্চাকে উপেক্ষা করা হয়, তাহলে তা দ্রুতগতির অবকাঠামো তৈরি করবে ঠিকই, কিন্তু সেই অবকাঠামো চালনার জন্য প্রয়োজনীয় বৌদ্ধিক জ্বালানির সরবরাহ অনিশ্চিত থেকে যাবে।

লেখক পরিচিতি

মুহম্মদ অবেদুল্লাহ ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ প্রভাষক।

[প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের প্রতিফলন। এগুলো এশিয়া পোস্টের সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সঙ্গে সর্বদা মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখায় উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব; এ বিষয়ে এশিয়া পোস্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ।]