ইরান যুদ্ধের পেছনে ট্রাম্পের তেলের হিসাব

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বলছে, ইরানের বিরুদ্ধে তাদের সামরিক অভিযান মূলত পারমাণবিক বিস্তার ঠেকানো, প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে, এর পেছনে আরও পুরোনো একটি বাস্তবতা কাজ করছে। সেটি হলো বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রাণশক্তি হিসেবে বিবেচিত তেলের অবাধপ্রবাহ নিশ্চিত করা।
সম্প্রতি ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এই বিষয়টি স্পষ্ট করে। পারস্য উপসাগরের কাছে অবস্থিত এই দ্বীপটি হরমুজ প্রণালির খুব কাছাকাছি, যেখানে দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবহন হয়। এই রুটে কোনো বিঘ্ন ঘটলে বিশ্ববাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে।
তবে এই হামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক শুধু হামলা নয়, বরং কী আঘাত করা হয়নি সেটি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, দ্বীপটির সব সামরিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, তেলের অবকাঠামো ইচ্ছাকৃতভাবে অক্ষত রাখা হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের তাৎপর্য গভীর। খার্গ দ্বীপ থেকে ইরানের অধিকাংশ তেল রপ্তানি হয়। যদি এই অবকাঠামো ধ্বংস করা হতো, তাহলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটত এবং দাম হঠাৎ বেড়ে যেত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি কৌশল নিয়েছে, যাতে সামরিক ক্ষতি হয়েছে, কিন্তু জ্বালানি সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
এ থেকে বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক শক্তিকে দুর্বল করতে চাইলেও বিশ্ব অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ তেলপ্রবাহ বজায় রাখতে আগ্রহী।
ইতিহাস বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে জ্বালানি নিরাপত্তা সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ১৯৮০ সালের কার্টার ডকট্রিন অনুযায়ী, এই অঞ্চলের তেল সরবরাহকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণে ইরানের সম্ভাবনা এখনও বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি।
এই প্রেক্ষাপটে খার্গ দ্বীপে হামলাকে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের পদক্ষেপের চেয়ে একটি সতর্ক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইরানের সামরিক সক্ষমতা লক্ষ্যবস্তু হতে পারে, কিন্তু তেলের অবকাঠামো এখনো এক ধরনের সুরক্ষিত সম্পদ।
এই প্রবণতা শুধু ইরানেই সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক নীতিতে একই ধরনের ধারাবাহিকতা দেখা যায়।
উদাহরণ হিসেবে ভেনেজুয়েলার কথা বলা যায়। দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর ওপর চাপ বাড়িয়েছে। যদিও এটি গণতন্ত্র ও দুর্নীতির প্রশ্নে ব্যাখ্যা করা হয়, তবে ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল মজুত এই রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশ্লেষকদের মতে, দেশটির তেল খাতকে পশ্চিমা বাজারমুখী করার চেষ্টা দীর্ঘদিন ধরেই চলছে।
রাশিয়ার ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। রাজনৈতিক বিরোধিতা থাকা সত্ত্বেও বৈশ্বিক বাজার স্থিতিশীল রাখতে যুক্তরাষ্ট্র কিছু ক্ষেত্রে রাশিয়ান তেল রপ্তানির ওপর বিধিনিষেধ শিথিল করেছে। অর্থাৎ ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেও তেলের প্রবাহ সচল রাখা একটি বড় অগ্রাধিকার।
এই কৌশল এখন তেলের বাইরে গিয়েও বিস্তৃত হচ্ছে। ভবিষ্যতের জ্বালানি ও প্রযুক্তি খাতে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ নিয়েও প্রতিযোগিতা বাড়ছে। গ্রিনল্যান্ডে বিরল খনিজের সম্ভাবনা কিংবা ইউক্রেনের খনিজ সম্পদ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ সেই দিকেই ইঙ্গিত করে।
সব মিলিয়ে একটি সুস্পষ্ট ধারা দেখা যায়। বৈশ্বিক অর্থনীতিকে সচল রাখতে যে সম্পদ ও অবকাঠামো প্রয়োজন, তা নিয়ন্ত্রণে রাখাই বড় শক্তিগুলোর অন্যতম লক্ষ্য হয়ে উঠেছে।
আজও বিশ্ব জ্বালানির বড় অংশ আসে তেল ও গ্যাস থেকে। পরিবহন, শিল্প ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এই জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে পাইপলাইন, তেল টার্মিনাল, শিপিং রুট ও রিফাইনারি এখন কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
খার্গ দ্বীপে হামলা এই বাস্তবতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তু হয়েছে, কিন্তু তেলের অবকাঠামো অক্ষত রাখা হয়েছে। অর্থাৎ সংঘাত পরিচালনায় এমনভাবে ভারসাম্য রাখা হচ্ছে, যাতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত না হয়।
লেখক : টরন্টোর ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির ফ্যাকাল্টি অব এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড আরবান চেঞ্জে ক্রিটিক্যাল ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের অধ্যাপক। সাতটি বইয়ের লেখক, যেখানে মূলত উপনিবেশ-উত্তর তত্ত্ব ও রাজনীতি, মনঃসমীক্ষণভিত্তিক তত্ত্ব ও রাজনীতি এবং মতাদর্শ বিশ্লেষণ নিয়ে কাজ করেছেন।