আলজাজিরার কলাম/ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর পদবি আছে, কিন্তু ক্ষমতা নেই

ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদির সাম্প্রতিক ওয়াশিংটন সফর বাগদাদের রাজনীতি, নিরাপত্তা ও অর্থনীতি পুনর্গঠনে মার্কিন চাপের বিষয়টিই প্রকাশ্যে এনেছে। গত মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন আলী আল-জাইদি। তিনি সেখানে ইরাকের প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই হাজির হয়েছিলেন। তার নামের পাশে প্রধানমন্ত্রীর পদবিটি থাকলেও ক্ষমতা যে ছিল অন্য কারও হাতে, তা বলাই বাহুল্য।
কয়েক মাসের রাজনৈতিক অচলাবস্থার পর মাত্র এগারো সপ্তাহ আগে শিয়া রাজনৈতিক জোট ‘কোঅর্ডিনেশন ফ্রেমওয়ার্ক’ নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনে বসেছিল। তারা মাত্র ২৫ মিনিটের মধ্যে আলী আল-জাইদিকে বেছে নেয়। ওয়াশিংটনের তীব্র চাপের মুখে পড়েই শিয়া জোটটি এত দ্রুত এই ঐকমত্যে পৌঁছাতে বাধ্য হয়।
সে সময় মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ইরাকের ডলারের লাইফলাইন বন্ধ করে দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি থেকে ইরাকের সেন্ট্রাল ব্যাংকে যে কার্গো বিমানে ডলার পাঠানো হতো, সেই নগদ ডলারের চালান স্থগিত করে দেয় ওয়াশিংটন।
ইরাকের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নুরি আল-মালিকি আবারও প্রধানমন্ত্রীর পদে ফিরতে চেয়েছিলেন। তিনি ছিলেন এই পদের প্রধান দাবিদার। কিন্তু ওয়াশিংটনের আপত্তির (ভেটো) কারণে শেষ পর্যন্ত তাঁকে নিজের পরিকল্পনা ত্যাগ করতে হয়।
এমন পরিস্থিতিতে কোনো রাজনৈতিক ভিত্তি না থাকা ৪০ বছর বয়সী ব্যাংকার আল-জাইদিই একমাত্র বিকল্প হিসেবে টিকে যান। তাঁর কোনো নিজস্ব রাজনৈতিক ভিত্তি বা দল না থাকাই ছিল ওয়াশিংটনের জন্য সবচেয়ে বড় সুবিধার বিষয়। বাগদাদের ব্যালট বাক্সের রায়ের চেয়ে ট্রাম্পের ট্রেজারি বিভাগের চাপই তাঁকে এই গদিতে বসাতে মূল ভূমিকা পালন করেছে।
তবে এই ব্যাংকারের নিজের অতীতও পুরোপুরি নিষ্কলঙ্ক নয়। ২০২৪ সালে ইরানের দিকে অবৈধ ডলারের প্রবাহ বন্ধ করার অংশ হিসেবে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছিল ইরাকের সেন্ট্রাল ব্যাংক। ওই সময় জাইদির নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ‘আল-জানুব ইসলামিক ব্যাংক’-কে মার্কিন ডলারে লেনদেন করা থেকে নিষিদ্ধ করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক কোনো অভিযোগ আনা হয়নি। এমনকি ওই ব্যাংক বা জাইদির ওপর বর্তমানে কোনো মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নেই।
তবে সেই ফাইলটি এখনো বন্ধ হয়ে যায়নি। আল-জাইদি কোনো বিষয়ে কালক্ষেপণ করলে বা অনীহা দেখালে ওয়াশিংটন এই ফাইলটিকে তার বিরুদ্ধে নতুন হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।
বাস্তবে বাগদাদের প্রকৃত ক্ষমতা এখন অন্য এক ব্যক্তির হাতে ন্যস্ত। টম বারাক একাই তিনটি পদের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। তিনি একই সঙ্গে তুরস্কে মার্কিন রাষ্ট্রদূত, সিরিয়ায় বিশেষ দূত এবং এখন ইরাকে মার্কিন বিশেষ দূতের দায়িত্ব পালন করছেন। তার এই অভূতপূর্ব প্রভাব কোনো কূটনৈতিক দক্ষতার ফল নয়; বাগদাদের ওপর ওয়াশিংটনের আর্থিক নিয়ন্ত্রণের কারণেই তিনি এই ক্ষমতার অধিকারী হয়েছেন।
ইরাকের তেলের পুরো রাজস্ব জমা থাকে নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের একটি অ্যাকাউন্টে। গত এপ্রিলে সেই রাজস্ব থেকে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের একটি নগদ অর্থ পাঠানোর প্রক্রিয়া স্থগিত করে দেয় ওয়াশিংটন। একই সঙ্গে তারা নিরাপত্তা সহযোগিতার বেশ কিছু অংশও বন্ধ করে দেয়। উল্লেখ্য, তেলের এই রাজস্ব থেকেই ইরাকের বাজেটের প্রায় ৯০ শতাংশ খরচ মেটানো হয়।
টম বারাককে ইরাকের ওপর নিজের কথা চাপিয়ে দেওয়ার জন্য কোনো সামরিক শক্তির হুমকি দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। কারণ তিনি যে মার্কিন প্রশাসনের প্রতিনিধিত্ব করছেন, তারা সরাসরি ইরাক রাষ্ট্রের লাইফলাইন বা আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারে।
সব সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সরকারি কাঠামোর অধীনে নিয়ে আসার জন্য ওয়াশিংটন যে দাবি জানিয়েছিল, তার সমাধান এখনো সুদূর পরাহত। গত মে মাসের শেষের দিকে শিয়া ধর্মীয় নেতা মুক্তাদা আল-সদর তাঁর ‘সারায়া আল-সালাম’ মিলিশিয়া বাহিনী বিলুপ্ত ঘোষণা করেন। এ ছাড়া ‘আসায়েব আহল আল-হক’ এবং ‘কাতিব ইমাম আলী’-র মতো অন্য কিছু মিলিশিয়া বাহিনীও তাদের অস্ত্র সমর্পণ বা সম্পূর্ণ সরকারি নিয়ন্ত্রণে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। নিঃসন্দেহে এটি একটি ইতিবাচক অগ্রগতি।
তবে তেহরানের সঙ্গে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা ‘কাতিব হিজবুল্লাহ’ এবং ‘হারাকাত আল-নুজাবা’ নামের দুটি কট্টরপন্থি দল পুরোপুরি অস্ত্র সমর্পণের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের নিজেদের ভাষায়, ‘আমাদের এই অস্ত্র কোনো দর কষাকষির বস্তু নয়।’ ওয়াশিংটনও অবশ্য তাদের এই কঠোর অবস্থানের উপযুক্ত জবাব দিয়েছে।
চলতি বসন্তকালে মার্কিন বিমান হামলায় ইরান-সমর্থিত পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস (পিএমএফ) বা হাশদ আল-শাবির কয়েক ডজন যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ নাম উল্লেখ করে সাতজন মিলিশিয়া কমান্ডারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
বাগদাদ সরকার অস্ত্র সমর্পণের জন্য আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে। একই দিনে ইরাক থেকে অবশিষ্ট মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের কথা রয়েছে। তবে ওই সময়ের মধ্যে কট্টরপন্থী দলগুলো নতি স্বীকার করবে কি না, তা নিয়ে ওয়াশিংটন এখনো কোনো স্পষ্ট উত্তর দিতে পারছে না।
এমনকি ইরাকের সবচেয়ে প্রভাবশালী শিয়া ধর্মগুরু গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ আলী আল-সিস্তানির কর্তৃত্বেরও একটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ২০১৪ সালে সিস্তানির জারি করা ফতোয়ার ওপর ভিত্তি করেই পিএমএফ গঠিত হয়েছিল। তবে তাঁর আহ্বান ছিল রাষ্ট্রীয় কমান্ডের অধীনে থেকে ইরাককে রক্ষা করা, কোনো স্বাধীন মিলিশিয়া বাহিনী গঠন করা নয়।
কিন্তু কট্টরপন্থি দলগুলো কখনোই নাজাফের নির্দেশ মানেনি। তারা কেবল তেহরানের নির্দেশ মেনে চলে। কারবালায় সিস্তানির নিজস্ব প্রতিনিধিও প্রকাশ্যে সমস্ত অস্ত্রের ওপর সরকারের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়েছেন। সিস্তানির ব্যক্তিগত প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী হলেও কট্টরপন্থী মিলিশিয়াগুলোর ওপর তাঁর কোনো সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কখনোই ছিল না। বর্তমান অচলাবস্থা এই নির্মম বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
বাগদাদ আগামী তিন বছরের মধ্যে তেলের উৎপাদন দৈনিক ৪৫ লাখ ব্যারেল থেকে ৭০ লাখ ব্যারেলে উন্নীত করতে চায়। তবে এ জন্য ওপেক-এর কাছ থেকে তেলের কোটা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে নিতে হবে। এ ছাড়া পশ্চিম ইরাকের বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস এখনো অব্যবহৃত রয়ে গেছে। এই সম্পদকে কাজে লাগাতে পারলে ইরাক একদিন অঞ্চলের প্রধান জ্বালানি শক্তি ও রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হতে পারে। ওয়াশিংটন যে আনুগত্যের দাবি করছে, তার বিনিময়ে এই বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকেই আল-জাইদির সামনে টোপ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
তবে এই নতুন ব্যবস্থায় কুর্দিস্তানের অবস্থান কী হবে, তা এখনো অস্পষ্ট। টম বারাক বাগদাদ ও আরবিলের মধ্যকার পুরোনো ফেডারেল ব্যবস্থাকে সরাসরি ‘বলকানাইজেশন’ বা খণ্ড-বিখণ্ড করার প্রক্রিয়া হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
তার মতে, এই দুর্বল কাঠামোর সুযোগ নিয়েই ইরান সেখানে প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছিল। তা সত্ত্বেও কুর্দিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মাসরুর বারজানিকে কুর্দি সংসদ সক্রিয় করতে এবং নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করতে জুন মাস জুড়ে চাপ দিয়েছেন বারাক। এই দ্বিমুখী অবস্থান একটি স্পষ্ট বার্তাই দেয়—ওয়াশিংটন কুর্দিস্তানকে তাদের নিজস্ব কক্ষপথে একটি সক্রিয় ও সহযোগী অঞ্চল হিসেবে দেখতে চায়, কোনো স্বাধীন খেলোয়াড় বা বাগদাদের শিয়া জোটের অনুগত হিসেবে নয়।
রিয়াদ, আবু ধাবি, মানামা, কুয়েত, দোহা বা মাসকটের মতো পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর শাসনতান্ত্রিক মডেল গড়ে উঠতে কয়েক দশক সময় লেগেছিল। কিন্তু ট্রাম্পের ওয়াশিংটন চায় ইরাকের শাসনব্যবস্থাকে স্রেফ একটি রাষ্ট্রপতির মেয়াদের মধ্যেই সেই ছাঁচে সংকুচিত করতে।
ওয়াশিংটনের এই অতি-চাপের মুখে বাগদাদ কি নিজের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে পারবে, নাকি তারা শুধু এক রাজধানীর বদলে অন্য রাজধানী বা ওয়াশিংটনের অনুগত দাসে পরিণত হবে—আল-জাইদির এই সফর সেই প্রধান প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেনি।
লেখক পরিচিতি:
জসিম আল-আজাবি একজন বিশিষ্ট বিশ্লেষক, সংবাদ উপস্থাপক ও সাংবাদিক। তিনি আল জাজিরার জনপ্রিয় সাপ্তাহিক অনুষ্ঠান ‘ইনসাইড ইরাক’ উপস্থাপনা করতেন।
.png)






