Advertisement

দ্য হিন্দুর কলাম/পিছু হটতে নারাজ যে ‘তেলাপোকারা’

পিছু হটতে নারাজ যে ‘তেলাপোকারা’
‘নিট’ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভকারীরা। ছবি: সংগৃহীত

লাঠি, কাঁদানে গ্যাস, এমনকি ছররা গুলিও তাদের থামাতে পারেনি। ২০ জুলাই হাজার হাজার মানুষের (মূলত শিক্ষার্থী) ওপর চড়াও হয়েছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর তিন দিন পর, ২৩ জুলাই তাদের অনেকেই আবার দিল্লির নির্ধারিত বিক্ষোভস্থল যন্তর মন্তরে ফিরে আসেন। তারা কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি জানান। বিক্ষোভস্থলজুড়ে তাদের স্লোগান প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল, ‘লজ্জা করো, লজ্জা করো; ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করো’।

বিক্ষোভকারীদের এই জনসমুদ্রে একটি দল টানা ৩৪ দিন ধরে অবস্থান করছে। তারা মূলত ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) সমর্থক। ভারতের প্রধান বিচারপতি বেকার তরুণদের ‘তেলাপোকা’ (ককরোচ) বলে মন্তব্য করেছিলেন। এর জবাবে অনলাইনে ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদ হিসেবে অভিজিৎ দীপকে এই সিজেপি গঠন করেন।

আগের দুই দিনের মতো সেদিনও বিকেল পাঁচটার মধ্যে এলাকাটি লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। কড়া নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয় পুরো এলাকা। রাস্তায় বসানো হয় ধাতব ব্যারিকেড। কড়া নজর রাখছিলেন নিরাপত্তাকর্মীরা। এর মধ্যেই মূলত ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিক্ষোভকারীরা ভিড় জমান। তাদের অনেকেই ছিলেন বেশ সাহসী ও বেপরোয়া।

তারা পতাকা ওড়াচ্ছিলেন, স্লোগান দিচ্ছিলেন এবং নিজেদের ফোনে ঘটনার ভিডিও ধারণ করছিলেন। তাদের প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘আরআইপি ডেমোক্রেসি (গণতন্ত্রের শান্তিকামনায়)’ এবং ‘প্রশ্নফাঁস? মোদি থাকলে সবই সম্ভব’।

কমলা রঙের টি-শার্ট ও নীল ব্যাকপ্যাক পরা ৩৪ বছর বয়সী প্রীতি মিশ্রকে ভিড়ের মধ্যে সহজেই চোখে পড়ছিল। তিনি পাওয়ার ব্যাংকভর্তি একটি কার্ডবোর্ডের বাক্স নিয়ে ঘুরছিলেন। তিনি বিক্ষোভস্থলের এক তাঁবু থেকে অন্য তাঁবুতে গিয়ে সেগুলো বিলি করছিলেন। দুই বছর বয়সী এক ছেলের মা প্রীতি গত ২০ জুলাইও এখানে ছিলেন। সেদিন সিজেপির নেতৃত্বে ‘চলো সংসদ’ (সংসদ অভিমুখে যাত্রা) কর্মসূচি পালিত হয়েছিল।

প্রীতি বলেন, ‘আমরা সংসদের দিকে মিছিল নিয়ে যাচ্ছিলাম। পুলিশ প্রথম দুটি ব্যারিকেডে দাঁড়িয়ে থাকলেও আমাদের আটকানোর চেষ্টা করেনি। কিন্তু পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানার কাছের ব্যারিকেডে পৌঁছানো মাত্রই তারা হঠাৎ আমাদের ওপর লাঠিপেটা শুরু করে।’

এতে তিনিসহ অনেকেই পড়ে যান। প্রীতি বলেন, ‘আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু অপরিচিত কয়েকজন আমার ও অন্যান্য নারীদের চারপাশে গোল হয়ে দাঁড়ান। তারা আমাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন।’

সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে ইনস্টাগ্রাম ঘাঁটতেই প্রীতি এমন শত শত ঘটনার কথা জানতে পারেন। অনেক ঘটনা তার চেয়েও ভয়াবহ ছিল। ভিডিওতে দেখা যায়, সাদা পোশাকের পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ল্যাং মেরে ফেলে দিচ্ছে, নারীদের লাঠি দিয়ে পেটাচ্ছে এবং ইউনিফর্ম পরা এক পুলিশ কর্মকর্তা এক নারী বিক্ষোভকারীকে চড় মারছেন।

এসব দেখে মর্মাহত হন প্রীতি। তিনি বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের কাছ থেকে ৪০ হাজার রুপি সংগ্রহ করেন। এরপর ৪০টি পাওয়ার ব্যাংক কিনে বিক্ষোভস্থলে বিলি করেন, যাতে বিক্ষোভকারীরা একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন না হন।

তরুণদের নেতৃত্বে পরিচালিত সিজেপির এই বিক্ষোভ গত কয়েক বছরের মধ্যে ভারতের অন্যতম বড় ছাত্র-জমায়েতে পরিণত হয়েছে। গত মে মাসে মেডিকেল কলেজে ভর্তির নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। এতে ২২ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হন। আর্থিক অনটনের কারণে অনেকেই ভয় পাচ্ছিলেন যে তারা হয়তো আর পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাবেন না। এই ক্ষোভই এক প্রজন্মের তরুণদের দিল্লির রাস্তায় নামতে বাধ্য করেছে।

বর্তমান বিক্ষোভটি ২০ জুন শুরু হলেও, অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুক ২৮ জুন আমরণ অনশনে বসলে এটি আরও জোরদার হয়। সংসদ অভিমুখে যাত্রার ডাক দেওয়ার আগে, ১৮ জুলাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ওয়াংচুককে জোর করে বিক্ষোভস্থল থেকে সরিয়ে দেয়।

এতে আন্দোলন আরও বেগবান হয়। সিজেপির আন্দোলন এখন ভারতের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। বেঙ্গালুরু, চেন্নাই, মুম্বাই, পাটনা, কোচি, কলকাতা, গুয়াহাটিসহ বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভকারীরা ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি জানাচ্ছেন। একই সঙ্গে প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে যেসব শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন, তাঁদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে মামলা না করার দাবিও জানাচ্ছেন তারা।

দমন-পীড়ন শেষে ঘুরে দাঁড়ানো

গত ২০ জুলাই দিল্লিতে বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়ন চালানো হয়। নিরাপত্তাকর্মীরা তাঁবু ভেঙে ফেলেন, মূল মঞ্চের অংশবিশেষ গুঁড়িয়ে দেন এবং বিক্ষোভস্থল প্রায় ফাঁকা করে দেন। অনেকেই ভেবেছিলেন, এই আন্দোলন আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না।

কিন্তু পুলিশের নৃশংসতার ভিডিও ভাইরাল হলে তরুণেরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। ২১ বছর বয়সী এক নারী বিক্ষোভে আহত হয়ে ভেন্টিলেটর সাপোর্টে ছিলেন। সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্সের বিশেষ দাঙ্গাবিরোধী ইউনিট র‍্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের ছোঁড়া ছররা গুলিতে অন্তত দুজন আহত হন। কাছ থেকে ছুঁড়লে ছররা গুলি মারাত্মক আঘাত এমনকি মৃত্যুরও কারণ হতে পারে।

বিক্ষোভের সময় পুলিশের ন্যূনতম বলপ্রয়োগ করার নিয়ম রয়েছে। প্রতিটি ধাপে সতর্কবাণীও দিতে হয়। তবে অনেকেই বলছেন, এবার তেমনটি ঘটেনি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার ব্যাটনও ব্যবহার করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে, দিল্লি পুলিশের দাবি, বিক্ষোভকারীদের হামলায় তাদের ১১৮ জন কর্মকর্তা আহত হয়েছেন। আর আহত বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ৬০।

গত ২০ জুলাই পুলিশের এক আনুষ্ঠানিক বার্তায় বলা হয়, ‘কিছু সংবাদমাধ্যম যন্তর মন্তরে বিক্ষিপ্ত সহিংসতা ও আটকের কথা উল্লেখ করেছে। কিন্তু এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি এবং পেশাদারিত্বের সঙ্গেই পরিস্থিতি সামলানো হচ্ছে।’

পুলিশের এসব কথায় জনমনে ক্ষোভ আরও বাড়ে। ২০ জুলাই রাতেই যন্তর মন্তরে মানুষ আবার জড়ো হতে শুরু করে। পরদিন দুপুরের মধ্যে সেই সংখ্যা হাজারে গিয়ে পৌঁছায়।

১৯ বছর বয়সী বিশ্বমোহিনী দিল্লির একজন স্নাতক শ্রেণির ছাত্রী। অনলাইনে ভিডিও দেখেই তিনি বিক্ষোভে এসেছেন বলে জানান। বিশ্বমোহিনী বলেন, ‘আমি এই প্রথম কোনো বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছি। নিটের মতো পরীক্ষাগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এগুলো শিক্ষার্থীদের নিজেদের প্রমাণের সুযোগ দেয়। বাল্যবিবাহ থেকে বাঁচতে এবং জীবনে এগিয়ে যেতে অনেক নারীরই এই সুযোগগুলোর দরকার। তাদের কাছ থেকে সেই অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।’

তাঁর বান্ধবী ১৯ বছর বয়সী অনুমেহা বলেন, বাড়িতে বসে অন্য শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা হতে দেখে তিনি অপরাধবোধে ভুগছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম আপনারা (সরকার) এখানে এসে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলুন। কিন্তু আপনারা তা করেননি। এখন আমাদের সবাইকে বাধ্য হয়ে এখানে আসতে হয়েছে।’

অনুমেহার বাবা ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) একজন সমর্থক। অনুমেহা বলেন, ‘বাবা আমাকে বিক্ষোভে যেতে নিষেধ করেছিলেন। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ নয় বলে নয় বরং লাঠিপেটার শিকার হতে পারি বা আমার নামে মামলা হতে পারে এই ভয়ে। এতে আমার ভবিষ্যৎ নষ্ট হতে পারে। তবে তিনিও জানেন যে আমরা সঠিক কারণেই আন্দোলন করছি।’

বিক্ষোভ এলাকার আশপাশের অন্তত ১৬টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ করে দেওয়া হয়। অন্তত ২ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে ইন্টারনেট সেবা ব্যাহত হয়। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় ও জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের যন্তর মন্তর ও এর আশপাশের বিক্ষোভে অংশ না নেওয়ার পরামর্শ দেয়। অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়ান ইউনিভার্সিটিসও শিক্ষার্থীদের ‘পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখতে’ কাউন্সেলিং করার জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান জানায়।

বৃহত্তর শিক্ষাসংকট

অন্যান্য রাজ্য থেকে আসা বহু মানুষ কয়েক দিন ধরেই যন্তর মন্তরে অবস্থান করছেন। বিহার থেকে আসা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ২১ বছর বয়সী ছাত্র রিপু গিরি ভোজপুরি ভাষায় লেখা একটি প্ল্যাকার্ড ধরে ছিলেন। তাতে লেখা ছিল, ‘বিহারের মানুষ এসে গেছে, এবার ভিন্ন কিছু হবে ভাই।’ এটি মূলত জনপ্রিয় টিভি সিরিজ ‘পঞ্চায়েত’-এর একটি সংলাপ। এর নিচে লেখা ছিল তার জেলা কোড ‘বিআর-২৪’। বিহারের অন্য ছাত্ররাও এই কোড ব্যবহার করে একে অপরকে আপন করে ডাকছিলেন।

পাটনার ২১ বছর বয়সী হর্ষ রাজ কুমার বলেন, ‘আমাদের মুখ্যমন্ত্রীর শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন আছে। প্রায় প্রতিবছরই প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে। কোনো চাকরি নেই। বিহারের শিক্ষার্থীদের চাকরির খোঁজে অন্য শহরে ছুটতে হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাজনৈতিক নেতারা যখন অন্য শহরে যান, তখন তারা সাধারণ মানুষের উন্নয়ন ও অগ্রগতির কথা বলেন। কিন্তু বিহারে এলে তারা মদ ও পুরোনো কেলেঙ্কারি নিয়ে কথা বলেন। যেন এই রাজ্যের শিক্ষার্থীরা শিক্ষা ও উন্নয়নের যোগ্যই নয়।’

উত্তরপ্রদেশের কানপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তরের ছাত্র রজনীশ সিং (২৩) তার রাজ্যে সরকারি স্কুলে শিক্ষকের অভাব নিয়ে আক্ষেপ করেন। তিনি বলেন, ‘প্রায় ৮০ হাজার শিক্ষকের পদ ফাঁকা। বাচ্চারা সাধারণ পড়া ও লেখা শিখতেও হিমশিম খায়।’

বামপন্থী ছাত্রসংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সর্বভারতীয় সভাপতি নেহা ২৩ দিন ধরে অনশন করছিলেন। শিক্ষাক্ষেত্রে আরও নানা সমস্যা ও ২০২০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতির ত্রুটিগুলো থাকা সত্ত্বেও কেন নিট পরীক্ষাই এই বিক্ষোভের মূল কেন্দ্র হয়ে উঠল, তার ব্যাখ্যা দেন তিনি।

নেহা দাবি করেন, ‘ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি শিক্ষাব্যবস্থায় দুর্নীতির মূল মুখ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটির কাজ ছিল প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করা। উল্টো তারাই এটি সহজ করে দিয়েছে।’

২০১৪ সাল থেকে কেন্দ্রে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর মতে, গত ১০ বছরে ১৫২ বার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে।

যেখানে লড়াইয়ের শুরু

এখান থেকে ২ হাজার কিলোমিটার দূরে চেন্নাইয়েও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ২০ জুলাই টি.নগরের পানাগাল পার্কের কাছে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি-সমর্থিত স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ার সঙ্গে মিলে একটি বিক্ষোভ করে সিজেপির তামিলনাড়ু শাখা। এরপর তারা রাজ্য কার্যালয় বালান ইল্লামে অবস্থান ধর্মঘট শুরু করে। এক দশক আগে তামিলনাড়ুই প্রথম নিট পরীক্ষার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিল।

২৩ জুলাই তাদের অবস্থান ধর্মঘট চতুর্থ দিনে গড়ায়। নানা শ্রেণি-পেশার তরুণরা সেখানে যোগ দিতে থাকেন। সিজেপি-তামিলনাড়ুর রাজ্য সাংগঠনিক সম্পাদক আকমল কবির বলেন, উপস্থিতির হার আয়োজকদের প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গেছে। কারণ পার্শ্ববর্তী কেরালা ও অন্ধ্রপ্রদেশ থেকেও বিক্ষোভকারীরা এসেছেন।

নিটের বিরোধিতা করতে অনেক শিক্ষার্থী র‍্যাপ গান, নাটক, দৃশ্যকলা ও গল্প বলার আশ্রয় নেন। তাঁদেরই একজন চেন্নাইয়ের এক কলেজের ছাত্র অরবিন্দ ই.। ওল্ড ওয়াশারম্যানপেটের বাসিন্দা অরবিন্দ দুই দিন এই অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেন এবং এক রাত সেখানে কাটান।

তিনি বলেন, ‘শুরুতে মাত্র কয়েকজন শিক্ষার্থী নিয়ে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। কিন্তু বুধবারের (২২ জুলাই) মধ্যে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ মানুষ এতে যোগ দেন। এরপর থেকে আরও অনেক শিক্ষার্থী এখানে আসতে থাকেন। এই বিক্ষোভ শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে, অনেকেই তাদের উদ্বেগের কথা জানাচ্ছেন।’

অরবিন্দ বলেন, নিট পরীক্ষা ঘিরে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এই পরীক্ষা দেওয়াটা অনেক শিক্ষার্থীর জন্যই দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। বছরের পর বছর ধরে অনেক শিক্ষার্থী প্রাণ হারিয়েছেন। আরও অনেকেই চরম মানসিক চাপের শিকার হয়েছেন।

একজন অংশগ্রহণকারী আমাদের বলেছেন, তিনি ৪ থেকে ৫ বছর ধরে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, কিন্তু তবু পাস করতে পারেননি। নিট পরীক্ষা বাতিল করা উচিত।’

অরবিন্দ আরও বলেন, চেন্নাইয়ের মতো শহরেই যখন এত বৈষম্য, তখন গ্রামের শিক্ষার্থীদের কতটা কষ্ট করতে হয়, তা সহজেই অনুমেয়। তিনি বলেন, ‘কোচিং করার জন্য ওল্ড ওয়াশারম্যানপেট থেকে আন্না নগরে যাতায়াত করা আমার পক্ষে সম্ভব বলে মনে হয় না। কোচিংয়ের সুযোগ পেতে হলেও বিশেষ সুবিধার প্রয়োজন হয়।’

তামিলনাড়ু স্টুডেন্টস ইয়ুথ ফেডারেশন ২০টি ছাত্র সংগঠনের একটি জোট। তারা রাজ্যজুড়ে বিক্ষোভের আয়োজন শুরু করেছে। জোটের প্রধান সমন্বয়ক এস. ইলাইয়ারাজা বলেন, ‘আগে আমরা দেখতাম, আর্থিকভাবে দুর্বল ও গ্রামের ছেলেমেয়েরাও ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখত। নিট তাদের অনেক স্বপ্নই ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।’

ইলাইয়ারাজা জানান, অন্যান্য রাজ্য চুপ থাকলেও ১০ বছর আগেই তামিলনাড়ু নিট পরীক্ষাকে ‘কেলেঙ্কারি’ বলে আখ্যা দিয়েছিল। তিনি বলেন, ‘আমরা অন্যদের অনেক আগেই নিট-সংক্রান্ত সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেছিলাম। আজ তামিলনাড়ু গণতান্ত্রিক বিক্ষোভের মাধ্যমে সেই দাবি বাঁচিয়ে রেখেছে।’

চলতি সপ্তাহে শহরের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করার চেষ্টাকালে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী ও যুবকর্মীকে পুলিশ আটক করে। পরে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

পুলিশের কথিত বাড়াবাড়ি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন ইলাইয়ারাজা। তিনি অভিযোগ করেন, কলেজগুলোর বাইরে পুলিশ মোতায়েন করা হচ্ছে এবং বিক্ষোভে পরিচয়পত্র ছাড়া পুলিশ সদস্যদের কাজে লাগানো হচ্ছে। দিল্লির বিক্ষোভের সঙ্গে এই পরিস্থিতির তুলনা করে তিনি বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ একটি ‘পুলিশি রাষ্ট্র’ হয়ে ওঠারই ইঙ্গিত দেয়।

বৃষ্টি উপেক্ষা করেই প্রতিরোধ

মুম্বাইয়ে এই সপ্তাহে বৃষ্টিও হাজার হাজার মানুষকে বিক্ষোভ থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারেনি। ২২ জুলাই দাদারের একটি ব্যস্ত রাস্তায় হুডি পরা ২৭ বছর বয়সী রিয়া যাদব পুলিশের ভ্যানের সামনে এসে দাঁড়ান। এই ঘটনাটি যে তাঁকে রাতারাতি শহরের প্রতিরোধের মুখ করে তুলবে, তা তিনি ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি। তাঁর ওই সাহসী কাজের একটি ছবি মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায়।

মডেল, নৃত্যশিল্পী, চিত্রনাট্যকার ও ব্যবসায়ী রিয়ার বাবা একজন সেনাসদস্য। রিয়া জানান, নয়াদিল্লিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হওয়া হামলায় তিনি ক্ষুব্ধ ছিলেন। তিনি যখন বুঝতে পারেন যে তরুণদের আটক করার কোনো পরোয়ানা পুলিশের কাছে নেই, তখন তিনি ভ্যানটি আটকানোর চেষ্টা করেন।

রিয়া বলেন, ‘ব্যবস্থাটি ভেঙে পড়েছে। আমরা এখানে এসেছি সেটি ঠিক করতে এবং টিকিয়ে রাখতে।’ এখনো পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোনো এফআইআর দায়ের করা হয়নি। তাঁকে কোনো নোটিশও দেওয়া হয়নি।

তবে বাকিরা এত ভাগ্যবান ছিলেন না। ২৯ বছর বয়সী স্কুলশিক্ষিকা শ্রেয়া সুব্রামানিয়াম বলেন, পুলিশ তাকে ‘গুন্ডা’র মতো রাস্তা দিয়ে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গেছে। তিনি দক্ষিণ মুম্বাইয়ের আজাদ ময়দানের বিক্ষোভে যোগ দিয়েছিলেন।

তিনি জানান, একটি মেট্রো স্টেশনের বাইরে থেকে অন্য তরুণদের সঙ্গে তাকেও আটক করা হয়। তিনি বলেন, ‘তারা আমাদের সবার পা ধরে টানতে থাকে। আমরা পিঠের ওপর পড়ে যাই এবং মেরুদণ্ডে ব্যথা পাই।’ ব্যথায় ইয়োলোগেট থানায় শ্রেয়া জ্ঞান হারান এবং পরে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় বলে তিনি দাবি করেন।

কিন্তু এমন অভিজ্ঞতার পরও তিনি টানা তিন দিন বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভে অংশ নেন। এক রাতে, ভোর ৩টা ৪৫ মিনিটে তার ফোন বেজে ওঠে। মুম্বাই পুলিশ তাকে একটি ডিজিটাল নোটিশ পাঠায়। পরদিন সকালে তাঁকে থানায় হাজিরা দিতে বলা হয়।

অনেক তরুণ দাবি করেছেন, তারা ভোররাতে ডিজিটাল নোটিশ পেয়েছেন। কেউ কেউ দাবি করেন, পুলিশ তাদের লাইভ লোকেশন পাঠাতে বলেছে। কারও মতে, তাদের বিনা অনুমতিতে ফোন বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। আবার কয়েকজন জানিয়েছেন, তাদের সম্মতি ছাড়াই ডিভাইসে প্রবেশ করেছে পুলিশ।

শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে আইনি সহায়তা দেওয়া আইনজীবী কল্যাণী মানিকরাও মানগাবে বলেন, ‘এটি বেআইনি নজরদারি ছাড়া আর কিছুই নয়। যেদিন থেকে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে, আমরা অন্তত এক হাজার কল পেয়েছি। এসব কলে এ ধরনের বেআইনি কর্মকাণ্ডের অভিযোগ জানানো হয়েছে।’

তবে মুম্বাই পুলিশ কোনো ধরনের অন্যায় করার কথা অস্বীকার করেছে। তারা দাবি করেছে, অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গেই তারা বিক্ষোভ ও বিক্ষোভকারীদের সামলেছে। ৪০০-এর বেশি মানুষের বিরুদ্ধে ১৩টি এফআইআর দায়ের করেছে পুলিশ। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেকই ২৫ বছরের কম বয়সী তরুণ এবং প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নারী।

পরের ঘটনা

লেহ অ্যাপেক্স বডি জানিয়েছে, ২৩ জুলাই রাতে দুজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর উপস্থিতিতে ওয়াংচুক তার অনশন ভাঙেন। সরকার লিখিতভাবে আশ্বাস দেয় যে, শিক্ষার্থীরা সহিংসতা না চালিয়ে থাকলে তাদের বিরুদ্ধে করা মামলাগুলো প্রত্যাহার করা হবে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে কঠোর আইন প্রণয়নের জন্য একটি বিল এবং জালিয়াতির ঘটনাগুলোর বিচারের জন্য দ্রুত বিচার আদালত গঠনের ঘোষণা দেন। প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের না করার বিষয়েও সরকার রাজি হয়।

তা সত্ত্বেও বিক্ষোভ কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ২৪ জুলাই দুজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর সিজেপির মুখপাত্র সৌরভ দাস গণমাধ্যমকে বলেন, ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হবে অথবা তাঁকে মন্ত্রিসভা থেকে বরখাস্ত করতে হবে।

মুম্বাইয়ের ১৯ বছর বয়সী এক তরুণ সেই দাবির প্রতিধ্বনি করে বলেন, ‘সোনম স্যার তার প্রতিবাদ প্রত্যাহার করেছেন, কিন্তু আমরা আমাদের আন্দোলন চালিয়ে যাব। আমরা শুধু প্রধানের পদত্যাগ এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ের জবাবদিহি চাই। তা না হওয়া পর্যন্ত আমরা ছাড় দেব না।’


[প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের প্রতিফলন। এগুলো এশিয়া পোস্টের সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সঙ্গে সর্বদা মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখায় উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব; এ বিষয়ে এশিয়া পোস্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ।]