logo
Advertisement

গার্ডিয়ানের কলাম/নেপালের বন্যা: জলবায়ুর বিপর্যয় আমাদের সবাইকে প্রভাবিত করবে

নেপালের বন্যা: জলবায়ুর বিপর্যয় আমাদের সবাইকে প্রভাবিত করবে
নেপালের নুয়াকোট জেলায় আকস্মিক বন্যার তাণ্ডব পরবর্তী পরিস্থিতি। ছবি: এএফপি

একই পৃথিবীতে জলবায়ু বিপর্যয় দুটি ভিন্ন রূপে আঘাত হানছে। একদিকে ধনী দেশগুলোতে এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কেবল অস্বস্তি বাড়াচ্ছে এবং দাবানলের মতো সাময়িক ক্ষতি করছে; অন্যদিকে দরিদ্র দেশগুলোতে এটি সরাসরি চরম ধ্বংসযজ্ঞ নিয়ে আসছে। যেমন ইউরোপ যখন রেকর্ড গরমে পুড়ছে, নেপালে তখন বন্যা ও কাদার তোড়ে ৭৫০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।

Advertisement

দুর্যোগ সামাল দেওয়ার ক্ষমতার পেছনে রয়েছে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ব্যবধান। ইউরোপের মতো ধনী দেশগুলো তাদের বিপুল সম্পদ দিয়ে দুর্যোগের ধাক্কা সহজেই সামলে নিতে পারে। যেমন ফ্রান্স সরকার দাবানলে ক্ষতিগ্রস্তদের করছাড় ও পুনর্বাসনের সাহায্য দিয়েছে এবং যুক্তরাজ্য গ্রীষ্ম শুরুর আগেই প্রতিরোধ ব্যবস্থা বাড়াতে প্রায় ১০০ মিলিয়ন পাউন্ড বরাদ্দ করেছে।

উন্নত প্রযুক্তি এবং বিমা ব্যবস্থার কারণে ধনী দেশগুলো এক ধরনের সুরক্ষাকবচ পায়। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে দাবানলের ঝুঁকি ও বিমা নির্ধারণ করা হয়। উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের বাইরে এই ধরনের কোনো সুরক্ষা ব্যবস্থা নেই বললেই চলে, যা বৈশ্বিক জলবায়ু বৈষম্যকে আরও প্রকট করে তুলছে।

ক্ষয়ক্ষতির বিশালতা দরিদ্র দেশগুলোর অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেয়। যেমন নেপালের বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতেই তাদের পুরো অর্থনীতির প্রায় দশ ভাগের এক ভাগ (প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার) প্রয়োজন হতে পারে, যেখানে প্রয়োজনীয় বিদেশি কারিগরি সহায়তা বা সরঞ্জামের হিসাব এখনও বাদই রয়ে গেছে। উন্নত প্রযুক্তি ও সম্পদের এই বিশাল ব্যবধানের কারণে চরম দুর্যোগের মুখে দরিদ্র দেশগুলোর টিকে থাকার ক্ষমতা খুবই সীমিত।

সমুদ্রের পানি গরম ও অম্লীয় হয়ে ওঠায় প্রবাল প্রাচীর বা কোরাল রিফ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, যা ক্যারিবীয় উপকূলের মানুষের জীবিকা ও সুরক্ষাকে বিপন্ন করছে। এই কোরালগুলো প্রাকৃতিকভাবে শক্তিশালী ঝড় ও বন্যার ঢেউ আটকে উপকূলকে রক্ষা করত। এগুলো ধ্বংস হওয়ায় এবং সমুদ্রের পানি উত্তপ্ত হওয়ায় ক্যারিবীয় অঞ্চলের দেশগুলো একদিকে তীব্র হারিকেনের কবলে পড়ছে, অন্যদিকে মাছ ও সামুদ্রিক জীবন কমে যাওয়ায় তাদের আয়ের মূল উৎস নষ্ট হচ্ছে (যেমন জ্যামাইকার ৯০% অর্থনৈতিক আয় আসে তাদের উপকূলভাগ থেকে), যার ফলে চরম দুর্যোগ থেকে তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা হারিয়ে যাচ্ছে।

চরম তাপপ্রবাহ এখন অপেক্ষাকৃত গরম দেশগুলোতে মানুষের মৃত্যুর বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন ভারতে তীব্র গরমের কারণে মাত্র এক দিনে অতিরিক্ত ৩,৪০০ জন এবং টানা পাঁচ দিনের গরমে ৩০,০০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এমনকি এ বছরের এপ্রিলে বিশ্বের সবচেয়ে উষ্ণ ৫০টি শহরের সবকটিই ছিল ভারতে, যা বিশ্ব আবহাওয়ার আধুনিক ইতিহাসে সম্পূর্ণ নজিরবিহীন।

মাথা গোঁজার ঠাঁই, কুলিং সিস্টেম বা পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি ছাড়া দরিদ্র মানুষেরা জলবায়ু পরিবর্তনের দ্বিগুণ ক্ষতিকর প্রভাবে পিষ্ট হচ্ছে। সুদানের মতো চরম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় যুদ্ধ ও খাদ্য সংকটের মধ্যেই এল নিনোর প্রভাবে বৃষ্টিপাত পিছিয়ে গেছে। এর ফলে সেখানকার শুষ্ক মাটি ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে, নীল নদ শুকিয়ে যাচ্ছে এবং ক্ষুধার্ত মানুষের সামনে দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি চরম আকার ধারণ করেছে।

জলবায়ুর এই চরম বৈষম্য প্রাকৃতিক নিয়মে ঘটেনি, বরং এটি মানুষেরই তৈরি। দরিদ্র ও জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলো ধনী দেশগুলোর অতিরিক্ত গ্যাস নির্গমনের মাশুল গুনছে, অথচ ধনী রাষ্ট্রগুলো তাদের বিপুল সম্পদ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ বা সাহায্য দিচ্ছে না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিবেশের চরম অবনতি, বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের নীতি, জলবায়ু সুবিচারের লড়াইকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

সমস্যাটি কেবল অতীতের ব্যর্থতার নয়, বরং ধনী ও ক্ষমতাধর দেশগুলোর চরম অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার বহিঃপ্রকাশ। একদিকে যুদ্ধবিগ্রহের মতো মানবসৃষ্ট সংকট এবং অন্যদিকে এল নিনোর মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংমিশ্রণ দরিদ্র দেশগুলোকে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বিশ্ব সহযোগিতার যে ন্যূনতম নিয়মশৃঙ্খলা ছিল, তা এখন পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। আমেরিকার প্যারিস চুক্তি থেকে প্রত্যাহার এবং ইউএসএআইডি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বরাদ্দ শত কোটি ডলারের তহবিল চিরতরে বন্ধ করে দিয়েছে।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় পরাশক্তি জলবায়ু প্রতিশ্রুতির হাত ধুয়ে ফেলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে এক মারাত্মক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। আমেরিকা বিশ্বকে এই বার্তাই দিচ্ছে যে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে ভাবার কোনো প্রয়োজন নেই, যার ফলে বৈশ্বিক জলবায়ু লড়াই বজায় রাখার পুরো চাপটি এখন অন্যান্য দেশের ওপর এসে পড়ছে। এই চরম দায়িত্বহীন রাজনৈতিক বাস্তবতার মাঝেও বাকি দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধভাবে একটি সমন্বিত প্রতিক্রিয়া বজায় রাখার উপায় খুঁজে নিতে হচ্ছে।

হিমবাহ গলে যাওয়া, বন্যা বা দুর্ভিক্ষ অনেক দূরে কোথাও ঘটছে বলে একে এড়িয়ে যাওয়া চরম বোকামি ও সংকীর্ণতা। এই চরম সংকটের পরোক্ষ প্রভাব হিসেবে যে বৈশ্বিক খাদ্য সংকট এবং রাজনৈতিক বা শরণার্থী সমস্যা তৈরি হবে, তা থেকে কোনো দেশেরই রেহাই পাওয়ার সুযোগ নেই। আমরা আপাতদৃষ্টিতে আলাদা আলাদা পরিস্থিতিতে বা ভিন্ন জগতে বাস করছি বলে মনে হলেও, শেষ পর্যন্ত আমরা সবাই একই গ্রহে আটকা পড়ে আছি।


লেখক পরিচয়: নেসরাইন মালিক দ্য গার্ডিয়ানের একজন কলামিস্ট এবং ‘উই নিড নিউ স্টোরিজ: চ্যালেঞ্জিং দ্য টক্সিক মিথস বিহাইন্ড আওয়ার এজ অফ ডিসকন্টেন্ট’ বইটির লেখক।