সুন্দরবন উপকূলের মানুষের নিরাপদ পানির অধিকার কোথায়?

খুলনার কয়রা উপজেলার মানুষের কাছে সুপেয় পানি এক অনিশ্চয়তার নাম। বর্ষাকালে জীবন কিছুটা স্বস্তি পায়। সেসময় বৃষ্টির পানি ধরে রাখা যায়, পুকুরেও পানি থাকে। কিন্তু বর্ষা শেষ হওয়ার কয়েক মাস পর থেকেই শুরু হয় পানির জন্য নতুন করে ছুটে চলা। অনেক গ্রামের নারীদের কাঁকে কলসি কিংবা হাতে জার নিয়ে এক-দুই কিলোমিটার, কোথাও তারও বেশি পথ পাড়ি দিতে হয়। একটি পরিবারের দিনের শুরু যদি হয় নিরাপদ পানি সংগ্রহের চিন্তা দিয়ে, তাহলে সেই পরিবারকে উন্নয়নের মূলধারায় আছে বলা কতটা যৌক্তিক—এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
কয়রা সদর উপজেলার গোবরা গ্রামের নার্গিস সুলতানার অভিজ্ঞতা এমনই। তার ভাষায়, বর্ষার সময় কিছুটা স্বস্তি থাকে। বৃষ্টির পানি ধরে রাখা যায়, পুকুরেও পানি থাকে। কিন্তু বর্ষা শেষ হলে জীবনে নেমে আসে বিপর্যয়। প্রতিদিন ছুটতে হয় মিঠা পানি সন্ধানে। পাড়ি দিতে হয় বহু দূরের পথ।
মহেশ্বরীপুর, মহারাজপুর, কয়রা সদর, বাগালী ও উত্তর বেদকাশীসহ সুন্দরবনসংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় বছরের পর বছর ধরে নিরাপদ পানির সংকট চলছে। কোথাও কখনো একটি মাত্র নলকূপে মিঠা পানি পাওয়া যায়। তখন আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষও সেই উৎসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। পানির উৎসের কাছে তৈরি হয় দীর্ঘ লাইন। এক কলসি পানি সংগ্রহ করতে কেটে যায় বহু সময়।
বিভিন্ন গবেষণায়ও এই সংকট ও সমস্যার ভয়াবহতা উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় কয়রার পানির ৫৫ দশমিক ৩ শতাংশ উৎসে লবণাক্ততা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ পানির অর্ধেকেরও বেশি উৎস কোনো না কোনোভাবে লবণাক্ততার সমস্যায় আক্রান্ত। অনেক এলাকায় অগভীর নলকূপের পানি পানযোগ্য নয়। কোথাও গভীর নলকূপেও মিঠা পানি পাওয়া যায় না। ফলে মানুষকে পুকুর, বৃষ্টির পানি এবং হাতে গোনা কয়েকটি মিঠা পানির উৎসের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
পানির এই সংকটের সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করছেন নারীরা। ভোরে ঘুম থেকে উঠে সংসারের অন্যান্য কাজ শুরুর আগেই তাদের পানি সংগ্রহে বের হতে হয়। পুরুষেরা জীবিকার প্রয়োজনে বাইরে থাকায় পরিবারের পানি সংগ্রহের দায়িত্ব অনেকাংশেই নারীদের ওপর পড়ে। ফলে পানির সংকট তাদের সময় ও শ্রম কেড়ে নিচ্ছে। শিক্ষা, আয়মূলক কাজ, সন্তানদের যত্ন কিংবা নিজের বিশ্রামের জন্য যে সময়টুকু থাকার কথা, তার একটি বড় অংশ ব্যয় হচ্ছে এক কলসি পানির পেছনে।
কয়রার পানির সংকটকে শুধু পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি নারীর শ্রম, সময়, স্বাস্থ্য এবং মর্যাদার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।
লবণাক্ততার সমস্যাটি এখন আর শুধু পানির স্বাদ বা ব্যবহারের অস্বস্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। উপকূলীয় এলাকায় পানির লবণাক্ততা ও অতিরিক্ত সোডিয়ামের সঙ্গে বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা হচ্ছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় উপকূলীয় নারীদের পানীয় জলের সোডিয়াম মাত্রা ও রক্তচাপের মধ্যে সম্পর্কের কথাও উঠে এসেছে। বেশি সোডিয়ামযুক্ত পানি পানকারী নারীদের ডায়াস্টোলিক রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা তুলনামূলক বেশি পাওয়া গেছে। আগের গবেষণাগুলোতেও উপকূলীয় বাংলাদেশের পানির লবণাক্ততা ও উচ্চ রক্তচাপের মধ্যে সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত লবণাক্ত পানি গ্রহণের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ ও প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়ার ঝুঁকির সম্পর্ক নিয়েও গবেষণা হয়েছে।
তবে কয়রার মানুষের ক্ষেত্রে পানির লবণাক্ততার সঙ্গে নির্দিষ্ট রোগের সরাসরি সম্পর্ক কতটা, তা নিশ্চিতভাবে জানতে নিয়মিত পানির মান পরীক্ষা এবং স্বাস্থ্যতথ্য নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন। কারণ অনুমান দিয়ে জনস্বাস্থ্যের পরিকল্পনা করা যায় না। প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য তথ্য, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত।
কয়রার মানুষের কাছে বৃষ্টির পানি শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, বরং কয়েক মাসের বেঁচে থাকার অবলম্বন। বাড়ির টিনের চাল থেকে পাইপের মাধ্যমে বৃষ্টির পানি ট্যাংকে ধরে রাখা হয়। সেই পানি দিয়ে পান করা, রান্নাসহ নানা প্রয়োজন মেটানো হয়। কিন্তু ছোট ধারণক্ষমতার ট্যাংকে কয়েক মাসের বেশি পানি ধরে রাখা কঠিন। বর্ষা শেষ হলে ট্যাংকের পানি দ্রুত কমতে থাকে। পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
এখানে আমাদের পরিকল্পনার একটি বড় ঘাটতি স্পষ্ট। বর্ষায় যে বিপুল পরিমাণ পানি পাওয়া যায়, সেটি কেন শুষ্ক মৌসুম পর্যন্ত নিরাপদে ধরে রাখা যাবে না? শুধু একটি ট্যাংক বসিয়ে প্রকল্প শেষ করার বদলে স্থানীয় মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত ধারণক্ষমতার পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার। একই সঙ্গে ট্যাংকের রক্ষণাবেক্ষণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করতে হবে।
কয়রায় পুকুরও মিঠা পানির গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কিন্তু সব পুকুর সারা বছর নিরাপদ থাকে না। লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়া, দূষণ, পলি জমা এবং নিয়মিত পরিচর্যার অভাবে অনেক পুকুরের পানির মান নষ্ট হয়। কোথাও পুকুর স্যান্ড ফিল্টার বা পিএসএফ স্থাপন করা হয়েছে। শুরুতে এসব ব্যবস্থা মানুষের উপকারেও এসেছে। কিন্তু নিয়মিত পরিষ্কার, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ না হলে একসময় তা অকেজো হয়ে পড়ে।
এখানেই উন্নয়ন প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে আসে—একটি প্রকল্প স্থাপন করাই কি সাফল্য, নাকি পাঁচ বছর, দশ বছর পরও সেটি সচল রাখা সাফল্য?
সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন এনজিও ও উন্নয়ন সংস্থা কয়রায় দীর্ঘদিন ধরে পানি নিয়ে কাজ করছে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ট্যাংক, পুকুর খনন ও সংরক্ষণ, পিএসএফ, কমিউনিটি পানি সরবরাহ ব্যবস্থা—বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের ফলে অনেক পরিবার উপকৃত হয়েছে, এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কী ঘটে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কয়রা উপজেলা সদরের মদিনাবাদ ও দেয়াড়া এলাকায় স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বললে এমন প্রকল্পের কথাও শোনা যায়, যেগুলো একসময় সচল থাকলেও এখন আগের মতো কার্যকর নয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্প চালুর সময় যে নজরদারি থাকে, পরে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
কয়রার পানি সংকটকে দেশের অন্য এলাকার সাধারণ পানি সমস্যার সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ নেই। এটি একটি জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় এলাকার বিশেষ সংকট। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার চাপ এখানকার জীবনকে প্রতিনিয়ত বদলে দিচ্ছে। তাই প্রয়োজন কয়রার জন্য আলাদা, দীর্ঘমেয়াদি এবং এলাকাভিত্তিক নিরাপদ পানি পরিকল্পনা।
প্রথমেই প্রয়োজন ইউনিয়ন ও গ্রামভিত্তিক পানির মানচিত্র। কোন এলাকার পানিতে কতটা লবণাক্ততা, কোথায় সারা বছর মিঠা পানি পাওয়া যায়, কোন পুকুর সংরক্ষণযোগ্য, কোথায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ বেশি কার্যকর এবং কোথায় ভূগর্ভস্থ মিঠা পানির সম্ভাবনা রয়েছে—এসব তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে। পরিকল্পনা হতে হবে তথ্যভিত্তিক, অনুমাননির্ভর নয়।
প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ গ্রামে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে বড় ধারণক্ষমতার ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। নিরাপদ পুকুরগুলোকে কমিউনিটি পানির উৎস হিসেবে সংরক্ষণ করতে হবে। পিএসএফ বা অন্য কোনো প্রযুক্তি স্থাপন করার পাশাপাশি নিয়মিত পরিষ্কার, মেরামত ও পানির মান পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু অবকাঠামো তৈরি নয়, অবকাঠামো সচল রাখার জন্যও অর্থ ও জনবল বরাদ্দ থাকতে হবে।
পানি ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ পানি সংগ্রহের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব যারা বহন করেন, পানি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতাও তাদের সবচেয়ে বেশি। তাদের অংশগ্রহণ যদি শুধু কমিটিতে নাম রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সেটি অর্থবহ অংশগ্রহণ হবে না।
কয়রার মানুষ কোনো দয়া চান না। তারা তাদের মৌলিক অধিকার চান। একজন নারী যেন প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার হেঁটে এক কলসি পানি সংগ্রহ করতে বাধ্য না হন। একটি শিশুকে যেন লবণাক্ত বা অনিরাপদ পানি পান করতে না হয়। বর্ষা শেষ হলে একটি পরিবার যেন নিরাপদ পানির জন্য অনিশ্চয়তায় না পড়েন।
কয়রার মানুষ বছরের পর বছর জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত বহন করছেন। বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের জন্য তাদের দায় সামান্য, কিন্তু ক্ষতির বোঝা তাদের ওপরই তুলনামূলক বেশি। তাই পানি সংকট মোকাবিলায় বিনিয়োগকে শুধু উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে দেখলে হবে না; এটিকে জলবায়ু ন্যায়বিচারের অংশ হিসেবেও দেখতে হবে।
কয়রা উপজেলার চারপাশে পানি আছে, কিন্তু সেই পানি লবণাক্ত। বর্ষায় পানি আছে, কিন্তু তা ধরে রাখার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। পুকুর আছে, কিন্তু সব পুকুর নিরাপদ নয়। প্রকল্প আছে, কিন্তু সব প্রকল্প টেকসই নয়। এই বৈপরীত্যই কয়রার পানি সংকটের সবচেয়ে নির্মম চিত্র।
সমুদ্রের লবণাক্ত পানি কতটা ভেতরে ঢুকবে, ঘূর্ণিঝড় কখন আসবে, জলোচ্ছ্বাস কতটা ভয়াবহ হবে—সবকিছু হয়তো আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। কিন্তু মানুষের ঘরে নিরাপদ পানি পৌঁছে দেওয়া, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা, নিরাপদ পুকুর রক্ষা করা এবং স্থাপিত পানি প্রকল্পগুলো সচল রাখার দায়িত্ব আমাদের হাতেই।
যে জনপদের মানুষ চারদিকে পানি দেখেও এক কলসি মিঠা পানির জন্য কিলোমিটারের পর কিলোমিটার পথ হাঁটেন, সেখানে সমস্যাটি শুধু পানির অভাবের নয়—সমস্যাটি আমাদের পরিকল্পনার, ব্যবস্থাপনার এবং অগ্রাধিকারের। এখন প্রশ্ন একটাই—বর্ষা ফুরিয়ে গেলে কয়রার মানুষের তৃষ্ণা মেটানোর দায়িত্ব কে নেবে?
লেখক: সাংবাদিক ও প্রধান সমন্বয়ক সুন্দরবন ইকো-রিজিলিয়েন্স ইনিশিয়েটিভ
[প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের প্রতিফলন। এগুলো এশিয়া পোস্টের সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সঙ্গে সর্বদা মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখায় উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব; এ বিষয়ে এশিয়া পোস্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ।]




