নীতির আলো আর বাস্তবের অন্ধকার: ডে-কেয়ার সংকটে সুশাসনের প্রশ্ন

বাংলাদেশে নারী ও শিশুর কল্যাণ নিয়ে নীতিনির্ধারণী বক্তব্যে আজকাল একধরনের আলোকোজ্জ্বল ভাষা শোনা যায়—‘সুশাসন’, ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন’, ‘কেয়ার ইকোনমি’। কিন্তু এই আলো যদি বাস্তবের অন্ধকারে পৌঁছাতে না পারে, তবে তা কেবল শব্দের আতশবাজিই হয়ে থাকে।
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদ ইত্তেফাকে (৬ জানুয়ারি ২০২৬) বলেছেন, ‘সুশাসনই আমাদের লক্ষ্য’ এবং প্রকৃত ভাতাভোগীদের ডাটাবেজ তৈরির কাজ প্রায় ৮০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। একইভাবে গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর আগারগাঁওয়ের পরিসংখ্যান ভবনে তিনি নারীর অবৈতনিক যত্নমূলক কাজের স্বীকৃতি দিতে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়কাঠামোর কথা বলেন—যেখানে রাজস্ব, শ্রম ও সামাজিক সুরক্ষা নীতিতে লিঙ্গ-সংবেদনশীল পরিকল্পনার আহ্বান জানানো হয়।
নীতির দিক থেকে এই বক্তব্যগুলো নিঃসন্দেহে প্রগতিশীল। কিন্তু বাস্তবতা যেন অন্য গল্প বলে।
সরকারি তথ্যানুযায়ী, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে বর্তমানে ১১৯টি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে, যার মধ্যে ৪৩টি রাজস্ব বাজেটের আওতায় এবং এর মধ্যে ২৫টি ঢাকায়। পাশাপাশি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় পরিচালনা করছে আরও ২০টি কেন্দ্র, যেখানে ৫ থেকে ৯ বছর বয়সী শিশুদের সেবা দেওয়া হয়। এই সংখ্যাগুলো যেন এক বিশাল বৃক্ষের পরিসংখ্যান। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই বৃক্ষের শিকড়ে কি পানি পৌঁছাচ্ছে?
ঢাকার বেশ কয়েকটি ডে-কেয়ার সেন্টারে কর্মরত কেয়ারগিভাররা ২০২৫ সালের জুলাই থেকে নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন না। প্রায় ৯ মাস ধরে বেতনহীন অবস্থায় তারা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন; যা কেবল অর্থনৈতিক নয়, মানসিকভাবেও একটি চরম চাপের পরিস্থিতি।
একজন ডে-কেয়ার কর্মকর্তা বলেন, ‘নানা প্রতিকূলতায় আমরা সেন্টার চালিয়ে নিচ্ছিলাম, কিন্তু দীর্ঘ সময় অর্থাৎ প্রায় ৯ মাসের মত বেতন না পাওয়ায় সকলের মনোবল ধরে রাখাটা আমাদের জন্যে একটু জটিল হয়ে দাড়াচ্ছে। আশা করব মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল মহল দ্রুত সুদৃষ্টি রাখবে।’
এই বক্তব্য যেন একটি নিভু নিভু প্রদীপের আর্তি—যে আলো জ্বালিয়ে রাখতে চায়, কিন্তু তেলের অভাবে ক্রমেই নিভে যাওয়ার পথে।
ডে-কেয়ারগুলোর সচল থাকা নারী কর্মসংস্থানের জন্য কতটা জরুরি, সেটা বুঝতে আইনস্টাইন হওয়া প্রয়োজন নেই। শুধু কর্মসংস্থানই নয়, অপ্রতুল খেলার পরিবেশ এবং ঘরকুনো আত্মকেন্দ্রিকতা ছেড়ে বাচ্চাদের একটা আনন্দময় পরিবেশ নিশ্চিত করতে ডে-কেয়ারের চমৎকার অবদান রয়েছে।
কথা হচ্ছিল সমবায় ভবনে অবস্থিত ডে-কেয়ার থেকে সেবা নেওয়া একজন মা ডা. সাদিয়া রহমানের সঙ্গে। বাসায় সন্তানকে পর্যাপ্ত দেখভাল করার মানুষ থাকলেও বাচ্চাদের সঙ্গে মিশতে দেওয়ার পরিবেশ তৈরি করতেই তিনি ছেলেকে দুই বছর ডে-কেয়ারে রাখেন। অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে মিশলে এই বয়সে বাচ্চার সামাজিকীকরণে যথেষ্ট প্রভাব রাখে, যেটার তীব্র অভাব এই সমাজে দেখা যাচ্ছে।
যখন একদিকে ‘কেয়ার ইকোনমি’ নিয়ে নীতিগত আলোচনা হয়, তখন অন্যদিকে সেই কেয়ারের মূল চালিকাশক্তি—কেয়ারগিভাররাই যদি বেতন না পান, তবে তা যেন একধরনের বৈপরীত্যের চিত্র হয়ে দাঁড়ায়। এ যেন এমন একটি নদী, যার উৎসে পানি নেই—কিন্তু মানচিত্রে তাকে এখনো প্রবহমান দেখানো হচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় দেড় বছর দায়িত্ব পালন করেছে। এই সময়ে নীতিগত আলোচনা, সেমিনার ও মানবাধিকার বিষয়ক বক্তব্যের অভাব ছিল না। কিন্তু ডে-কেয়ার সেন্টারের মতো একটি মৌলিক খাতে—যেখানে শিশু ও কর্মজীবী মায়ের ভবিষ্যৎ জড়িয়ে—সেখানে বেতন নিশ্চিত করার মতো একটি বেসিক প্রশাসনিক কাজও সম্পন্ন না হওয়া গভীর প্রশ্নের জন্ম দেয়। রাষ্ট্রযন্ত্র তখনই কার্যকর, যখন তার সবচেয়ে ছোট অংশটিও সচল থাকে। একটি ঘড়ির কাঁটার মতো—একটি ছোট গিয়ার থেমে গেলে পুরো যন্ত্রই থমকে যায়।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ।’ কিন্তু যখন একজন কেয়ারগিভার মাসের পর মাস বেতন না পেয়ে কাজ চালিয়ে যান, তখন রাষ্ট্র কি সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রাখছে?
কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়, ‘আমি চিরদুর্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস’—এই শক্তি যদি নীতিনির্ধারণে থাকত, তবে হয়তো এই অবহেলার দেয়াল এত উঁচু হয়ে উঠত না।
সুশাসন কেবল নীতির ভাষায় নয়—এটি প্রতিফলিত হয় মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায়।
যেখানে কেয়ারগিভার তার প্রাপ্য বেতন পায়, যেখানে একটি শিশু নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠে, যেখানে একজন মা নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারেন। ডে-কেয়ার সেন্টারগুলো সেই সমাজের প্রতিচ্ছবি, যেখানে রাষ্ট্র তার ভবিষ্যৎকে লালন করে। যদি সেই প্রতিচ্ছবিই ঝাপসা হয়ে যায়, তবে সুশাসনের আলো কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
এখন সময়—নীতিকে মাটিতে নামানোর।
লেখক : সহকারী রেজিষ্ট্রার, জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিটিউট ও হাসপাতাল, ঢাকা
[প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের প্রতিফলন। এগুলো এশিয়া পোস্টের সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সঙ্গে সর্বদা মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখায় উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব; এ বিষয়ে এশিয়া পোস্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ।]