logo

ইরানে পারমাণবিক বোমা ব্যবহারের সম্ভাবনা নাকচ ট্রাম্পের, কেন বিষয়টি এত গুরুত্বপূর্ণ

মাজিয়ার মোহামেদি
মাজিয়ার মোহামেদি
ইরানে পারমাণবিক বোমা ব্যবহারের সম্ভাবনা নাকচ ট্রাম্পের, কেন বিষয়টি এত গুরুত্বপূর্ণ
২০০৩ সালের মার্কিন বিমান বাহিনীর একটি ছবিতে জিবিইউ-৪৩/বি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট বোমার প্রোটোটাইপটিকে একটি অজ্ঞাত স্থানে আঘাত হানার ঠিক আগের মুহূর্তে দেখা যাচ্ছে। ছবি: এএফপি

ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কোনো অবস্থাতেই পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবে না বলে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একটি সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে তিনি পারমাণবিক বোমার ব্যবহারকে সম্পূর্ণ ‘পাগলামি’ এবং ‘অপ্রয়োজনীয়’ বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, প্রচলিত সামরিক শক্তি দিয়েই ওয়াশিংটন তার লক্ষ্য পূরণ করতে সক্ষম, তাই পারমাণবিক বিকল্পের কোনো প্রয়োজন নেই।

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করে। এরপর থেকেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহলে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি নিয়ে তীব্র উদ্বেগ দেখা দিয়েছিল। বিশেষ করে ইরানের অত্যন্ত সুরক্ষিত ও ভূগর্ভস্থ পরমাণু স্থাপনাগুলো ধ্বংস করতে পেন্টাগন ক্ষুদ্রাকৃতির কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই সরাসরি বক্তব্য সেই সব জল্পনার অবসান ঘটাল।

কেন পারমাণবিক বোমার প্রসঙ্গ উঠেছিল

ইরানের নাতানজ এবং কোম শহরের কাছে পাহাড়ের গভীরে তৈরি ফোরদো পারমাণবিক কেন্দ্র মাটির বহু নিচে অবস্থিত। অনেক সামরিক বিশেষজ্ঞ মনে করছিলেন যে সাধারণ প্রচলিত বোমা দিয়ে এই সুড়ঙ্গঘেরা শক্ত ঘাঁটি ধ্বংস করা কঠিন।

একই সময়ে ওয়াশিংটনের কিছু উগ্রপন্থী রাজনীতিবিদ এবং ইসরায়েলের ডানপন্থী নেতারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিরোশিমা ও নাগাসাকির উদাহরণ টেনে দ্রুত যুদ্ধ শেষ করার জন্য চরম ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের অতীতের খামখেয়ালি সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা এই আশঙ্কাকে আরও উসকে দিয়েছিল। এর ফলে উপসাগরীয় দেশগুলো এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে পরমাণু যুদ্ধের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল।

প্রচলিত অস্ত্রের সক্ষমতা ও তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি

মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনের শীর্ষ কর্মকর্তারা অবশ্য শুরু থেকেই পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের বিপক্ষে ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের হাতে রয়েছে ৩০ হাজার পাউন্ড ওজনের বিশেষ বাংকার বাস্টার বোমা ‘ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স পেনিট্রেটর’ (এমওপি)। এই ধরনের আধুনিক প্রচলিত বোমা মাটির ২০০ ফুট নিচে গিয়ে শক্ত কংক্রিট ভেদ করতে পারে।

সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, ইরানে যেকোনো ধরনের পারমাণবিক হামলা চালানো হলে ১৯৪৫ সালের পর থেকে চলে আসা আন্তর্জাতিক পরমাণু নিষেধাজ্ঞা বা রীতি ভেঙে পড়ত।

এ ছাড়া পারমাণবিক বিস্ফোরণের মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছিল অনিবার্য। তেজস্ক্রিয় ধূলিকণা বাতাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ত পার্শ্ববর্তী সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে। এই তেজস্ক্রিয়তার কারণে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের সমুদ্রের পানি মিষ্টি করার প্ল্যান্টগুলো স্থায়ীভাবে দূষিত হয়ে যেত। এর ফলে লাখ লাখ মানুষের জীবন ধ্বংসের মুখে পড়ত এবং ওয়াশিংটন তার ঘনিষ্ঠ আরব মিত্রদের বিরাগভাজন হতো।

ইরানের পরমাণু নীতিতে এর প্রভাব

ট্রাম্পের এই অবস্থান ইরানের ভেতরে পরমাণু বোমা তৈরির পক্ষে থাকা কট্টরপন্থীদের ওপর একটি বড় ধাক্কা। ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির একটি ধর্মীয় অনুশাসন বা ফতোয়া রয়েছে, যেখানে পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন, মজুত ও ব্যবহারকে ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল।

তবে ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরানের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক শীর্ষ উপদেষ্টারা প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে দেশটির অস্তিত্ব কিংবা শীর্ষ নেতৃত্ব যদি ধ্বংসের মুখে পড়ে, তবে তারা তাদের সামরিক নীতি পরিবর্তন করতে বাধ্য হবে। সে ক্ষেত্রে ফতোয়া পুনর্বিবেচনা করে তেহরান পারমাণবিক বোমা তৈরি করবে।

ইরানের হাতে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা ইউরেনিয়ামের বিশাল মজুত ছিল, যা মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে ৯০ শতাংশ বা অস্ত্র তৈরির স্তরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। ট্রাম্পের পারমাণবিক আঘাতের সম্ভাবনা বাতিলের মাধ্যমে ইরানকে একটি জরুরি পরমাণু পরীক্ষা চালানো বা তড়িঘড়ি বোমা বানানোর অজুহাত থেকে দূরে রাখা গেল।

আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও চলমান কূটনীতি

এই ঘোষণা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে কিছুটা স্বস্তি নিয়ে এসেছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকা এবং তেলের স্থাপনাগুলোতে ড্রোন হামলার কারণে বিশ্বজুড়ে যে তেলের বাজার অস্থিতিশীল হয়েছিল, তা আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে রক্ষা পেল।

একই সঙ্গে এই পদক্ষেপ ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক আলোচনাকেও বাঁচিয়ে রাখল। গত জুন মাসে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই দেশ সংঘাতের তীব্রতা কমাতে একটি প্রাথমিক রূপরেখা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল।

যদিও ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে প্রচলিত যুদ্ধ এখনো অব্যাহত রয়েছে এবং বিপুল প্রাণহানি ঘটছে, তবে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা বাতিল হওয়ায় পরিস্থিতি সর্বাত্মক ধ্বংসযজ্ঞের হাত থেকে কিছুটা নিরাপদ দূরত্বে থাকল। ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের ফলে ধ্বংসের একটি সুস্পষ্ট সীমা নির্ধারণ করা সম্ভব হলো, যা সংকট সমাধানে কূটনৈতিক আলোচনার পথ কিছুটা হলেও উন্মুক্ত রাখবে।


লেখক পরিচিতি:

মাজিয়ার মোতামেদি আল–জাজিরার একজন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। তিনি দীর্ঘদিন ধরে তেহরান থেকে ইরানের পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি, মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সংঘাত এবং পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে কাজ করছেন।

[প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের প্রতিফলন। এগুলো এশিয়া পোস্টের সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সঙ্গে সর্বদা মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখায় উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব; এ বিষয়ে এশিয়া পোস্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ।]