logo

ইরানের হামলা ও মধ্যপ্রাচ্যের নীরবতা: আবেগ, বাস্তবতা নাকি কৌশলগত অবস্থান?

ইরানের হামলা ও মধ্যপ্রাচ্যের নীরবতা: আবেগ, বাস্তবতা নাকি কৌশলগত অবস্থান?

আমরা জানি, গল্পের দুটি দিক থাকে। কেউ কেউ বলেন, গল্পের দুই দিকের বাইরেও আরও গল্প থাকে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি সত্যিই সেই দুই দিক শুনি? শোনার সুযোগ পাই? নাকি শোনার আগেই অবস্থান ঠিক করে ফেলি?

বাংলাদেশের বাইরে বিশ্বের বহু মুসলিম দেশের জনগণ এবং তাদের সরকার ইরানের প্রতি ইসরায়েল-আমেরিকার এই হামলাকে নীরব সমর্থন দিচ্ছে।  আবার একই সময়ে হাজার হাজার মুসলিম, এমনকি শিয়া সম্প্রদায়ের মানুষও খামেনি হত্যার খবরে খুশির মিছিল করেছে, নিজ দেশে বা প্রবাসে। কিন্তু কেন?

এর উত্তর কি প্রতিক্রিয়ায় নাকি বাস্তবতায়, নাকি আমাদের বোঝার সরলীকরণে? 

যদি শুধু ‘আমেরিকার দালাল’ অজুহাতে সব ব্যাখ্যা খুঁজতে যান, তাহলে বুঝতে হবে, এটা বিশ্লেষণ না, এটা অবস্থান। আমরা বাঙালিরা এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বড় হয়েছি, যেখানে একই ইস্যুতে একদল বলে শতভাগ সত্য, আরেকদল বলে শতভাগ মিথ্যা। আমার দল মানেই খাঁটি, প্রতিপক্ষ মানেই ভেজাল। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও যদি সেই একই দলীয় চশমা পরে দেখি, তাহলে প্রশ্ন হারিয়ে যায়, থেকে যায় শুধু স্লোগান।

গত দুই দিনে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকজন নাগরিকের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের বিশ্লেষণ শুনে নিজের আবেগকেই অনেক পাতলা মনে হয়েছে। তারা বিষয়টিকে শুধু ইরান বনাম আমেরিকা হিসেবে দেখছে না। তাদের আলোচনায় এসেছে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য, নিরাপত্তা ঝুঁকি, ফিলিস্তিন প্রশ্ন, পশ্চিমা সামরিক হস্তক্ষেপের দীর্ঘ ইতিহাস কিংবা ভবিষ্যৎ অস্থিরতার আশঙ্কার বাহিরেও অনেক গল্প, অনেক ইতিহাস, অনেক আবেগ।

আমরা যেটাকে নৈতিকতার প্রশ্ন ভাবছি, তারা সেটাকে অস্তিত্বের প্রশ্ন হিসেবে দেখছে অনেকে। আমরা যেটাকে ধর্মের দায়িত্ব হিসেবে দেখছি, তারা সেটাকে অধর্মের ভার হিসেবে দেখছে।

এখানে ইতিহাসের একটি উদাহরণ টানা যেতে পারে। নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে আমরা একভাবে চিনি, একজন নির্দোষ, প্রায় ট্র্যাজিক নায়ক হিসেবে। কিন্তু পশ্চিমা লেখকদের বর্ণনায় দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র; সেখানে তাকে অদক্ষ, খামখেয়ালি, এমনকি রাজনৈতিকভাবে অপরিণত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ ইতিহাস একমুখী নয়। বিজয়ী যেমন লেখে, পরাজিতও লেখে এবং প্রত্যেকেই নিজের প্রয়োজন, দৃষ্টিভঙ্গি ও স্বার্থ অনুযায়ী বয়ানের কাঠামো নির্মাণ করে।

সমসাময়িক রাজনীতিও তেমনই বর্ণনানির্ভর। একই ঘটনার সংবাদ আলজাজিরা, ইরানি রাষ্ট্রীয় মিডিয়া, সিএনএন বা ফক্স নিউজে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাষ্যে, ভিন্ন কাঠামোয় এবং ভিন্ন নৈতিক ব্যাখ্যায় উপস্থাপিত হতে পারে। কোন তথ্যটি সামনে আনা হবে, কোন শব্দ ব্যবহার করা হবে, কাদের উদ্ধৃতি দেওয়া হবে, এই নির্বাচনের মধ্য দিয়েই ‘সত্য’ নতুন করে নির্মিত হয়।

আমরা যে নিউজ-ফিড দেখি, যাদের অনুসরণ করি, যে অ্যালগরিদম আমাদের সামনে খবর সাজিয়ে দেয়, সেখানেই গল্পের মেরুদণ্ড তৈরি হয়। আমরা মনে করি—আমরা স্বাধীনভাবে মত গঠন করছি, অথচ অনেক সময় নির্দিষ্ট এক কাঠামোর ভেতরেই আমাদের চিন্তা সীমাবদ্ধ থাকে। তাই প্রয়োজন অন্তত দুটি পার্সপেক্টিভ জানা। সমর্থন যেদিকেই থাকুক, বোঝাপড়া যেন একমুখী না হয়। আবেগ থাকতেই পারে, কিন্তু বিশ্লেষণ যেন আবেগকে অতিক্রম করার সাহস রাখে।

রাষ্ট্র কখনো আবেগ দিয়ে চলে না; চলে নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল দিয়ে। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি ‘কে কার বন্ধু’ দিয়ে বোঝা যায় না। আজকের প্রতিপক্ষ কালকের কৌশলগত অংশীদার হতে পারে। অনেক দেশ একই সঙ্গে আমেরিকার নিরাপত্তা মিত্র, চীনের বাণিজ্য অংশীদার, রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি সমন্বয়কারী—এটাই বাস্তবতা। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক একরৈখিক নয়।

বাংলাদেশের মতো, হয় ভারত অথবা পাকিস্তান এই ধরনের স্থায়ী সমীকরণ বা মেরুকরণে নয়, বরং সময়ের সঙ্গে কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তন করে এরা।

আন্তর্জাতিক কূটনীতি দালালি আর বিরোধিতার মাঝখানে আটকে থাকে না, সেটা স্বার্থের জটিল সমীকরণে চলে। এই সমীকরণে সহজ তত্ত্ব নেই, আবেগের মানদণ্ডে বিচারও নেই।

গত চার দিনে ফেসবুকে দেখলাম—সৌদি আরব, কাতার, আরব আমিরাত, কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব দেশকে বাঙালিরা একলাইনে ধুয়ে দিচ্ছে। কিন্তু এসব দেশের রাজনৈতিক অবস্থান আমাদের জ্ঞানের সীমার বাইরেও হতে পারে। রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের পেছনে যে গোয়েন্দা তথ্য, যে নিরাপত্তা ঝুঁকি, যে আঞ্চলিক গোপন সমঝোতা, যে কৌশলগত হিসাব কাজ করে, সেগুলো ফেসবুকের টাইমলাইনে ভেসে ওঠে না। আমরা যে তথ্য পাই, তা নির্বাচিত, কাঠামোবদ্ধ।

আরেকটা বাস্তবতা ভুলে গেলে চলবে না, মধ্যপ্রাচ্যের এসব রাষ্ট্রে লাখো বাঙালি রুটি-রুজি খুঁজে পায়। সেই রাষ্ট্রগুলোর ভূ-রাজনীতিকে একলাইনে গাল দিয়ে শেষ করা সহজ; বোঝা কঠিন। 

আমার এই লেখার উদ্দেশ্য ইরানের এই হামলার প্রতি কোনো সমর্থন গড়ে তোলা নয়, বরং একমুখী আবেগের বাইরে গিয়ে বহুমাত্রিক বাস্তবতাকে বোঝার আহ্বান। আন্তর্জাতিক রাজনীতি স্লোগানে চলে না; চলে নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের জটিল সমীকরণে। সেখানে আছে শত বছরের ইতিহাসের দীর্ঘ ছায়া, আছে বর্তমানের শক্তির ভারসাম্য, আছে ভবিষ্যতের ঝুঁকির হিসাব। সবশেষে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়।

সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগরিদম আমাদের পছন্দের মতামতই আমাদের সামনে তুলে ধরে। ফলে আমরা ভাবি—‘সবাই একই কথা বলছে ।’
আসলেই?

লেখক: জিয়াউল হক জিয়া, ডেনিশ-বাংলাদেশি নাগরিক, সিইও-লেমন কক্স গ্রুপ।

[প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের প্রতিফলন। এগুলো এশিয়া পোস্টের সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সঙ্গে সর্বদা মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখায় উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব; এ বিষয়ে এশিয়া পোস্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ।]