logo

গবেষণায় ও জ্ঞান বিনিময়ে এআই: সম্ভাবনা, সংকট ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

গবেষণায় ও জ্ঞান বিনিময়ে এআই: সম্ভাবনা, সংকট ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (Artificial Intelligence) হলো বর্তমান সময়ের প্রযুক্তিগত বিপ্লবের এক বিস্ময়কর উদ্ভাবন। এটি মূলত কম্পিউটারের এমন একটি কৃত্রিম ক্ষমতা, যার মাধ্যমে যন্ত্র মানুষের মতো যৌক্তিক চিন্তা করতে, অভিজ্ঞতা থেকে শিখতে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

বর্তমানে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি স্তরে—ইন্টারনেটে তথ্য খোঁজা থেকে শুরু করে অনলাইন কেনাকাটা এবং জটিল বৈজ্ঞানিক গবেষণায়—এআই-এর ব্যবহার এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। এটি কেবল মানুষের কাজের গতি বাড়ায় না, বরং মানুষের সীমাবদ্ধতাগুলোকে অতিক্রম করে তথ্যের নিখুঁত বিশ্লেষণ নিশ্চিত করে।

তাত্ত্বিকভাবে বললে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হলো এমন একটি প্রযুক্তিগত পরিমন্ডল যেখানে মানুষের জ্ঞানীয় ক্ষমতাকে (Cognitive Abilities) অনুকরণ করার চেষ্টা করা হয়। এ বিশাল ক্ষেত্রের একটি অবিচ্ছেদ্য এবং শক্তিশালী শাখা হলো মেশিন লার্নিং (ML)।

মেশিন লার্নিং মূলত এমন এক পদ্ধতি, যা পূর্বনির্ধারিত হার্ড-কোড প্রোগ্রামিং ছাড়াই ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শিক্ষা গ্রহণের সামর্থ্য রাখে। বৈশ্বিক প্রযুক্তি জায়ান্ট যেমন—Microsoft Azure এবং Amazon Web Services (AWS)-এর সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণের উদ্দেশ্যে এআই বাস্তবায়নের সবচেয়ে প্রায়োগিক কৌশলই হলো মেশিন লার্নিং। অর্থাৎ, এআই হলো একটি বড় ছাতা, যার নিচে মেশিন লার্নিং একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। এটি এখন আর সায়েন্স ফিকশন বা বিলাসিতা নয়, বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্মার্ট কৃষি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণায় টেকসই উন্নয়ন ও জাতীয় সমৃদ্ধি অর্জনের এক অপরিহার্য ও বৈশ্বিক চালিকাশক্তি।

এ প্রবন্ধে গবেষণা ও জ্ঞান বিনিময়ে (scholarly communication) এআই-এর দ্বিমুখী ভূমিকা—আবিষ্কারের অনুঘটক এবং নৈতিক নিরাপত্তার ঝুঁকি—উভয় দিকই সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ এবং বাংলাদেশে আমাদের করণীয় সম্পর্কে আমার নিজস্ব মতামত উপস্থাপন করছি।

গবেষণায় নতুন বিপ্লব ও তথ্যের মহাসমুদ্র

বিশ্বজুড়ে গবেষণার জগৎ বর্তমানে এক আমূল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনকে অনেকে বিশ শতকের ইন্টারনেটের উদ্ভাবন বা ব্যক্তিগত কম্পিউটারের প্রসারের সাথে তুলনা করছেন। বিশেষ করে চ্যাটজিপিটির মতো 'জেনারেটিভ মডেল' এবং 'লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল' (LLMs) এখন কেবল কম্পিউটার বিজ্ঞানের চার দেয়ালের মাঝে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন ইতিহাস, সাহিত্য, জীববিজ্ঞান ও জীবপ্রযুক্তি, চিকিৎসা এবং প্রকৌশলের মতো প্রতিটি একাডেমিক শাখার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ২০২৫ সালের শেষনাগাদ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৬০ শতাংশেরও বেশি গবেষক তাদের পেশাগত কাজে নিয়মিত কোনো না কোনো এআই টুল ব্যবহার করছেন, যা মাত্র এক বছর আগেও ছিল ৪৫ শতাংশ।

এই দ্রুত রূপান্তরের মূল চালিকাশক্তি হলো 'দক্ষতা'। আমরা এমন এক যুগে বাস করছি যেখানে বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভান্ডার প্রতি কয়েক বছরে জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়ে দ্বিগুণ হচ্ছে। একজন মানুষের পক্ষে এই বিশাল তথ্যসমুদ্র থেকে প্রয়োজনীয় অংশটুকু খুঁজে বের করে বিশ্লেষণ করা প্রায় অসম্ভব। এআই এই 'তথ্য বিস্ফোরণ' সামাল দেওয়ার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তবে এর অবারিত প্রয়োগ নিয়ে বিশ্বজুড়ে একাডেমিক মহলে বিতর্কও কম নয়। 

লেখনী ও গবেষণার খসড়া প্রস্তুতিতে এআই

গবেষণার প্রাথমিক ধাপগুলোতে অর্থাৎ সৃজনশীল আইডিয়া তৈরি এবং খসড়া লেখনীর ক্ষেত্রে বর্তমানে চ্যাটজিপিটি (ChatGPT) বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে জনপ্রিয় টুল। এটি মূলত গবেষণার প্রাথমিক রূপরেখা বা আউটলাইন সাজানো এবং জটিল তাত্ত্বিক বিষয়গুলোকে সাধারণের বোধগম্য ভাষায় রূপান্তর করতে সহায়তা করে। অন্যদিকে, গুগলের জেমিনি (Gemini) সরাসরি ইন্টারনেটের বিশাল ডেটাসেটের সাথে সংযুক্ত থাকায় এটি সাম্প্রতিকতম সংবাদ, পরিসংখ্যান এবং গবেষণার উপাত্ত খুঁজে পেতে গবেষকদের বিশেষ সুবিধা দেয়। দীর্ঘ গবেষণাপত্র বিশ্লেষণ এবং অত্যন্ত মার্জিত ও পেশাদার ভাষায় সারসংক্ষেপ তৈরির জন্য ক্লড (Claude) বর্তমানে গবেষকদের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে। ক্লডের বিশেষত্ব হলো এর মানুষের মতো সংবেদনশীল ও সাবলীল লেখার ধরণ।

লিটারেচার রিভিউ ও বিশেষায়িত টুলের ব্যবহার

তথ্য অনুসন্ধান এবং পূর্ববর্তী গবেষণাপত্র পর্যালোচনার ক্ষেত্রে এলিসিট (Elicit) একটি বিশেষজ্ঞ এআই সহকারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এটি সরাসরি নির্ভরযোগ্য একাডেমিক ডেটাবেস থেকে প্রাসঙ্গিক পেপার খুঁজে বের করে তার সারসংক্ষেপ প্রদান করে। সিম্যানটিক স্কলার (Semantic Scholar) ব্যবহার করে গবেষকরা লক্ষ লক্ষ পেপারের মধ্যে সংযোগ স্থাপন এবং সবচেয়ে সাইটেশন সমৃদ্ধ পেপারগুলো দ্রুত খুঁজে পেতে পারেন। তথ্যের নির্ভুলতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে পারপ্লেক্সিটি এআই (Perplexity AI) একটি নির্ভরযোগ্য সার্চ ইঞ্জিন, কারণ এটি প্রতিটি উত্তরের সাথে মূল উৎসের (Citation) লিংক প্রদান করে, যা তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে। এ ছাড়া নোটবুক এলএম (NotebookLM) গবেষকের নিজস্ব আপলোড করা ডকুমেন্ট থেকে স্বয়ংক্রিয় নোট তৈরি এবং প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রে এক অনন্য ভূমিকা পালন করছে।
এআই এখন অনেকের কাছে একজন অপরিহার্য 'সহ-লেখক'। এটি অ্যাবস্ট্রাক্ট লেখা, মেথডোলজি সাজানো এবং উপযুক্ত কারিগরি শব্দচয়নে অভাবনীয় সহায়তা করে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর গবেষকদের জন্য এটি একটি বড় আশীর্বাদ। অতীতে অনেক উচ্চমানের গবেষণা কেবল দুর্বল ইংরেজি ব্যবহারের কারণে আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রত্যাখ্যাত হতো। এআই এখন সেই ভাষাগত ব্যবধান ঘুচিয়ে দিচ্ছে, ফলে প্রান্তিক পর্যায়ের গবেষকরাও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সমানভাবে নিজেদের মেধা প্রমাণ করতে পারছেন।

ভাষা সংশোধন ও রূপান্তর

গবেষণাপত্রের ভাষাগত ত্রুটি সংশোধনে গ্রামারলি (Grammarly) দীর্ঘকাল ধরে গবেষকদের আস্থার প্রতীক। এটি কেবল ব্যাকরণ নয়, বাক্যের টোন বা ভাবধারা ঠিক করতেও সাহায্য করে। কুইলবট (Quillbot) প্যারাফ্রেজিংয়ের মাধ্যমে লেখাকে আরও সুসংগত করে তোলে। বৈজ্ঞানিক লেখার জন্য ট্রিঙ্কা (Trinka) বিশেষভাবে তৈরি, যা কারিগরি ভুল শনাক্ত করতে পারদর্শী। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সুখবর হলো, 'এআই রাইটার বাংলা' এবং 'অনুবাদিনী'-র মতো টুলগুলোর উন্নয়ন। এর ফলে বাংলা ভাষায় উচ্চতর গবেষণা যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি ইংরেজি গবেষণাপত্রগুলো নির্ভুলভাবে বাংলায় অনুবাদ করে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।

বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও স্বাস্থ্য গবেষণায় বিপ্লব

বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিদ্যায় বর্তমানে তথ্যের পরিমাণ মানুষের ধারণক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। এআই অগোছালো তথ্য থেকে সুনির্দিষ্ট প্যাটার্ন বা নকশা খুঁজে বের করতে অত্যন্ত দক্ষ। জ্যোতির্বিজ্ঞানে গ্রহের অবস্থান শনাক্ত করা থেকে শুরু করে জনস্বাস্থ্য গবেষণায় মহামারির পূর্বাভাস দেওয়া—সবক্ষেত্রেই এআই মানুষের বছরের কাজকে কয়েক ঘণ্টায় নামিয়ে এনেছে।

২০২৬ সালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মেশিন লার্নিং কম্পিউটেশনাল বায়োলজি ও বায়োইনফরমেটিক্সের পরীক্ষামূলক পর্যায় পেরিয়ে একটি মৌলিক অবকাঠামোতে পরিণত হয়েছে। কম্পিউটেশনাল বায়োলজিতে এআই এখন 'ভুল থেকে শিক্ষা' বা ট্রায়াল-এন্ড-এরর পদ্ধতির পরিবর্তে প্রকৌশল-চালিত (Engineering-driven) উদ্ভাবনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। জেনারেটিভ এআই মডেলগুলো এখন রক্ত-মস্তিষ্কের বাধা (Blood-brain barrier) অতিক্রম করতে সক্ষম এমন জটিল ওষুধ বা মাল্টি-স্পেসিফিক অ্যান্টিবডি ডিজাইন করছে। বায়োইনফরমেটিক্সে এআই এখন ভিন্নধর্মী ডেটাসেটগুলোর মধ্যে সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করছে। সাশ্রয়ী 'লং-রিড সিকোয়েন্সিং'-এর মাধ্যমে প্রাপ্ত বিপুল পরিমাণ জেনোমিক ডেটা বিশ্লেষণ করে প্রতিটি রোগীর জন্য একটি 'Digital Twin' বা ডিজিটাল প্রতিচ্ছবি তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে, যা সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা বা প্রিসিশন মেডিসিনকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।   

জীববিজ্ঞানে জীবের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের নিয়ন্ত্রক জেনেটিক কোড বা জিন উদঘাটন এবং জিন প্রকৌশলে মেশিন লার্নিং এবং এআই এর ব‍্যবহার আবশ‍্যক। এমনকি জিন প্রকৌশল বা জিন এডিটিংয়ের ফলাফল কী হবে তা এআই দ্বারা প্রেডিক্ট বা প্রাক অনুমান করা যায়। এআই এবং মেশিন লার্নিং এর ব‍্যাপক প্রয়োগের মাধ‍্যমে বিগ ডেটা বিশ্লেষনে লক্ষ‍্যে ‘ডেটা সাইন্স’ এখন এক বিকাশমান বিজ্ঞান ।

জনস্বাস্থ্য ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা

জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে ২০২৬ সালের মূল কৌশল হলো 'আগে থেকে অনুমান এবং প্রতিরোধ'। এআই সিস্টেমগুলো এখন ইলেকট্রনিক হেলথ রেকর্ড, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং এনভায়রনমেন্টাল সেন্সর বিশ্লেষণ করে কোনো এলাকায় মহামারির আগাম সতর্কবার্তা দিচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) EIOS সিস্টেম মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে রিয়েল-টাইমে স্বাস্থ্যঝুঁকি শনাক্ত করছে। পূর্ব আফ্রিকার মতো স্বাস্থ্যকর্মী সংকটে থাকা অঞ্চলে এআই-চালিত ডায়াগনস্টিক টুলগুলো ৯০ শতাংশের বেশি নির্ভুলভাবে ক্লিনিক্যাল অ্যাসেসমেন্ট প্রদান করছে। 'ফেডারেটেড লার্নিং' (Federated Learning) এর মতো কৌশলের মাধ্যমে ডেটার গোপনীয়তা বজায় রেখেই উন্নত মডেল তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে, যা স্বাস্থ্য সেবাকে আরও নিরাপদ ও সমৃদ্ধ করছে। 

সংকট ও নৈতিক চ্যালেঞ্জ: মুদ্রার উল্টো পিঠ

এআইয়ের ব্যবহারে গবেষণার গতি বাড়লেও কিছু মারাত্মক ঝুঁকি বিজ্ঞানের মৌলিক ভিত্তিকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো 'হ্যালুসিনেশন' বা ভ্রান্ত তথ্য উৎপাদন। এআই মাঝে মাঝে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুল তথ্য বা সম্পূর্ণ কাল্পনিক রেফারেন্স তৈরি করে। কোনো গবেষক যদি যথাযথভাবে যাচাই না করে এই তথ্যগুলো ব্যবহার করেন, তবে ভুল বিজ্ঞান সমাজে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।

পাশাপাশি, এআই-এর সহজলভ্যতা 'পেপার মিল'-এর মতো অসাধু চক্রগুলোকে আরও শক্তিশালী করেছে। এই চক্রগুলো এআই ব্যবহার করে ভুয়া ডেটা ও তথ্য সাজিয়ে হুবহু আসল মনে হয় এমন গবেষণাপত্র তৈরি ও বিক্রি করছে, যা একাডেমিক সততাকে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে। এ ছাড়া পিয়ার রিভিউ প্রক্রিয়াও এখন সংকটের মুখে। অনেক পরীক্ষক নিজের মেধা প্রয়োগের বদলে এআই দিয়ে রিভিউ রিপোর্ট তৈরি করছেন, যা গবেষণার গোপনীয়তা নষ্ট করছে এবং প্রকৃত মেধা যাচাইয়ের প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করছে। একে বলা হচ্ছে 'অভিজাতদের ত্বরণ'—অর্থাৎ যারা প্রযুক্তিতে এগিয়ে, তারা দ্রুত কাজ শেষ করে সুবিধা পাচ্ছেন, কিন্তু বিজ্ঞানের গুণগত মান তাতে কতটা রক্ষিত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: সম্ভাবনা বনাম বাস্তবতা

বাংলাদেশের জন্য এআই এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। এআই এবং মেশিন লার্নিং এর বৈপ্লবিক প্রভাবের সুফল পেতে হলে স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সকল স্তরের পাঠক্রমে এআই সন্নিবেশ করা প্রয়োজন। ফলে এআই এর যথার্থ ব‍্যবহার এবং অপব‍্যবহারে সচেতন হবে।

আমাদের সীমিত ল্যাবরেটরি সুবিধা এবং বিশাল তথ্য বিশ্লেষণের অভাব এআই পূরণ করতে পারে। কৃষি গবেষণায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিশ্লেষণ বা দুর্যোগ মোকাবিলায় পূর্বাভাস দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের গবেষকরা এআই-কে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। ভাষাগত বাধা দূর হওয়ায় বাংলাদেশি গবেষকদের আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশের হার ভবিষ্যতে আরও বাড়বে।

তবে বড় চ্যালেঞ্জ হলো 'প্রযুক্তিগত বিভাজন'। উন্নত বিশ্বের প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে প্রিমিয়াম এআই টুল থাকলেও আমাদের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষকদের সেই সামর্থ্য নেই। এছাড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে 'কগনিটিভ অফলোডিং' বা চিন্তাশক্তি যন্ত্রের ওপর ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। ক্যালকুলেটর যেমন আমাদের গাণিতিক দক্ষতা কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে, এআই-এর ওপর অতি-নির্ভরতা আমাদের মৌলিক গবেষণার বিশ্লেষণাত্মক ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।

দায়িত্বশীল এআই ব্যবহারের নীতিমালা

এআই যাতে বিজ্ঞানের ক্ষতি না করে সহায়কের ভূমিকা পালন করে, সেজন্য কিছু পদক্ষেপ জরুরি: ১. স্বচ্ছতা: প্রতিটি গবেষণায় এআই-এর কতটুকু এবং কোন ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়েছে, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। ২. মানবিক যাচাই (Human-in-the-loop): এআই খসড়া তৈরি করতে পারে, কিন্তু তথ্যের সত্যতার চূড়ান্ত দায়ভার গবেষককেই নিতে হবে। ৩. প্রাতিষ্ঠানিক সচেতনতা: বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উচ্চতর গবেষণার শুরুতেই 'এআই নীতিশাস্ত্র' বা এথিকস কোর্স বাধ্যতামূলক করা উচিত।

এআই-এর সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো—এটি মানুষের মতো ‘সত্য’ (Fact), ‘বিশ্বাস’ (Belief) এবং ‘উপলব্ধি’ (Perception)-এর মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না। এটি কেবল পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে উত্তর দেয়। ফলে অনেক সময় এটি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে ভুল তথ্য বা ‘হ্যালুসিনেশন’ তৈরি করে। যদি কোনো এআই মডেলকে ভুল বা পক্ষপাতদুষ্ট তথ্য দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, তবে তার ফলাফলও হবে বৈষম্যমূলক ও বিভ্রান্তিকর। বিজ্ঞানের ছাত্র বা গবেষকদের জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এআই কখনো মানুষের নৈতিক মূল্যবোধ বা ইনটুইশন (Intuition) ধারণ করতে পারে না। তাই এআই-এর দেওয়া তথ্যের ওপর অন্ধভাবে নির্ভর করা বিজ্ঞানের বিশুদ্ধতাকে বিপন্ন করতে পারে।

সম্প্রতি গবেষণায় চৌর্যবৃত্তি বা অনৈতিক তৎপরতা এ দেশে উদ্বেগের কারণ হিসেবে আলোচিত ও সমালোচিত বিষয়। আর এ নৈতিক স্খলনের কারণে আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত এদেশের গবেষকগণের অনেক প্রকাশিত প্রবন্ধ রিট্রাক্ট বা প্রত্যাহার করা হচ্ছে। এটি খুবই অনৈতিক বা শাস্তিযোগ‍্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হলেও আমাদের দেশে নির্লজ্জভাবে এ অপরাধের কারণে গবেষকের শাস্তির নজির বিরল। ফলে ক্রমশ প্রকাশিত প্রবন্ধের রিট্রাক্ট হার দিন দিন বেড়ে চলেছে। এ বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং দেশের ভাবমূর্তির জন্য এক বিরাট হুমকি, যা আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশন করতে ইচ্ছুক বাংলাদেশের প্রকৃত গবেষকদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এ বিষয়ে আমাদের একাডেমিক এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ জরুরি।

গবেষণায় এআই-এর ব্যবহার কোনো সাময়িক ফ্যাশন নয়। এটি এক চিরস্থায়ী বিবর্তন। বর্তমানে এআই জলবায়ু পরিবর্তন থেকে শুরু করে মরণব্যাধি—পৃথিবীর জটিল সব সমস্যার সমাধান দ্রুততর করতে এটি আমাদের পথ দেখাচ্ছে। তবে এই গতির মূল্য যেন বিজ্ঞানের সততা ও নির্ভরযোগ্যতা দিয়ে মেটাতে না হয়। ভবিষ্যতের গবেষণা কেবল 'মানুষ বনাম এআই' নয়, বরং হবে 'মানুষ এবং এআই-এর সুসংগত মেলবন্ধন'। আমাদের মেধা, কৌতূহল এবং নৈতিকতাকে অটুট রেখে এআই-কে কেবল একটি টুল হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। বিজ্ঞানীরা এখন মানুষের মস্তিষ্কের ৮৬ বিলিয়ন স্নায়ুকোষের নেটওয়ার্ক ও মিথস্ক্রিয়ার মাধ‍্যমে প্রতিক্রিয়া ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডকে উদ্ঘাটনে (decode human connectome) ব‍্যাপক গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে,যা অদূর ভবিষ্যতে এআই কে আরআই (real intelligence) এ উন্নীত করবে । নিঃসন্দেহে এআই এবং আরআই এর ব‍্যাপক প্রয়োগ মানব সভ‍্যতার বিবর্তনে প‍্যারাডাইম শিফট বয়ে আনবে। তবে ২১ শতকের এই প্রযুক্তিকে সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য আমাদের নিজস্ব বিচারবুদ্ধি ও মানবিক প্রজ্ঞাই হবে শেষ ভরসা। 

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, ডিন, গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজ অনুষদ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ফেলো, বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি। 

[ প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের প্রতিফলন। এগুলো এশিয়া পোস্টের সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সঙ্গে সর্বদা মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখায় উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব; এ বিষয়ে এশিয়া পোস্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ। ]