বর্ষবরণে নিখোঁজ বাংলা বর্ষ!

বাংলা নববর্ষের শুরু বৈশাখ মাস দিয়ে। সে হিসেবে বৈশাখ মাসের প্রথম দিনই বাংলা নতুন বর্ষকে বরণ করা হয়। যার প্রধান উদ্দেশ্য হলো–বাংলা বর্ষপঞ্জিকে পরিচিত করা। কিন্তু আজ পুরো বর্ষবরণে আমি বাংলা বর্ষটাকেই খুঁজে পাইনি!
বাংলা বর্ষ ১২ মাসে। আমাদের ১২টি মাসের আছে ১২টি স্বতন্ত্র রূপ। এই বর্ষপঞ্জির প্রতিটি মাসের সঙ্গে আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও অর্থনীতি জড়িত। মোটাদাগে বললে, আমাদের পুরো জীবনই জড়িত। যেমন ধরুন–বৈশাখ মাস দিয়ে গ্রীষ্ম ঋতুর শুরু হয়। এই মাসে সন্ধ্যা বেলায় মাঝে মাঝে কালবৈশাখী ঝড় ওঠে। ঝড়ে আম পড়ে, বজ্রপাতে মানুষ মরে। এ সময় বোরো ধানে সেচ দিতে হয়। গাছে কাঁচা আমসহ বিভিন্ন ফল খাওয়ার উপযুক্ত হয়। এ মাসে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজা-পর্বনসহ নানা ধর্মীয় উৎসব থাকে।
বাংলা বর্ষপঞ্জির দ্বিতীয় মাস জ্যৈষ্ঠ আসে ফলের ঘ্রাণ নিয়ে। তীব্র গরমে হাঁসফাঁস হয় জনজীবনে। আবার সেই গরমই পাকায় ফল। সেই ফল নিয়ে চলে নানা উৎসব-আনন্দ। তার পরের মাস আষাঢ় নিয়ে আসে টানা বর্ষা। শ্রাবণ পর্যন্ত চলে অঝোর ধারায় বৃষ্টি। মাঠে-ঘাটে চলে মৎস্য শিকার।
পঞ্চম মাস ভাদ্র আসে শরৎকাল নিয়ে। এই ঋতু চলে ষষ্ঠ মাস আশ্বিনের শেষ পর্যন্ত। বর্ষার পর শান্ত-স্নিগ্ধ রূপ নিয়ে আসা এই ঋতুতে নীল আকাশে শুভ্র মেঘের ভেলা এবং নদী তীরে কাশবনের অপূর্ব দৃশ্য দেখা যায়। এই সময়ে রাত তাড়াতাড়ি আসে এবং আবহাওয়া ঠাণ্ডা হতে থাকে। ঝরতে থাকে গাছের পাতা। শিউলি, কাশফুল, শাপলা, মাধবীসহ নানা ফুল ফোটে। এ সময় হিন্দুদের প্রধান উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা এই ঋতুতে অনুষ্ঠিত হয়। পাকা তাল দিয়ে ঘরে ঘরে চলে পিঠা, পুলি, পায়েস উৎসব৷ ক্ষেতে ক্ষেতে বেড়ে উঠতে থাকে আমন ধানের চারা।
বাংলা বর্ষের সপ্তম মাস কার্তিকের হাত ধরে আসে ঋতুকন্যা হেমন্ত। কার্তিকের শুরুতেই প্রকৃতিতে ঠান্ডার আবহ আসে। ভোরের আকাশে হালকা কুয়াশা ও শিশিরে ভেজা ঘাস থাকে। এ সময় মাঠ ভরা থাকে সোনালি ধানে। চারদিকে ছড়িয়ে যায় পাকা ধানের মৌ মৌ গন্ধ। ফলের গোছে পাকে কামরাঙা, চালতা, আমলকী ও ডালিমের মতো ফলগুলো। ঘরে ঘরে পড়ে চালতা, আমলকী, জলপাই আর কামরাঙার আচার তৈরির ধুম। সনাতন ধর্মে কার্তিক মাসকে শ্রেষ্ঠ মাস বলে মনে করা হয়, এই সময় বিষ্ণু ও লক্ষ্মীর আরাধনা করা হয়।
কৃষিপ্রধান বাংলায় অষ্টম মাস অগ্রহায়ণকে ফসলের মাস বলা হয়। এই মাসটি মূলত ধান কাটার উৎসব বা নবান্ন, হালকা শীতের আমেজ এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত। অগ্রহায়ণে মাঠ থেকে সোনালি ধান কেটে ঘরে তোলার ধুম পড়ে। কৃষক পরিবারে নতুন ধান দিয়ে চলে নবান্ন উৎসব। প্রকৃতিতে খুব বেশি ঠান্ডা বা গরম থাকে না, যা খুব আরামদায়ক হয়। সনাতন ধর্মে অগ্রহায়ণ মাসকে অত্যন্ত পবিত্র ধরা হয়। ফসল উত্তোলনের কারণে এই মাস কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতেও বড় গুরুত্বপূর্ণ হয়।
নবম মাস পৌষ আসে শীত নিয়ে। পৌষ মাসে শীতের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়। সকালের আবহাওয়া থাকে কুয়াশাচ্ছন্ন। এ সময় আমন ধান কাটা ও ঘরে তোলার ধুম পড়ে যায়। নতুন ধানে ঘরে ঘরে চলে শীতের পিঠা, পায়েস এবং খেজুরের গুড় ও পাটালি দিয়ে ঐতিহ্যবাহী পিঠা উৎসব।
দশম মাস মাঘ হলো তীব্র শীতের মাস। এই সময় নিয়ে ‘মাঘের শীতে বাঘ পালায়’ বলে একটি প্রবাদ প্রচলন আছে। তবে এই মাসের শেষে শীত কমে প্রকৃতির আমেজ বসন্তের দিকে মোড় নেয় । মাঘ মাসে আম গাছে মুকুল আসতে শুরু করে। প্রকৃতিতে শুকনো পাতার ঝরে পড়া ও নতুন পাতার কুঁড়ি দেখা যায়।
বাংলা সনের একাদশ মাস ফাল্গুনের আগমন ঘটে ঋতুরাজ বসন্তকে নিয়ে। এ সময় শীতের জীর্ণতা কাটিয়ে গাছে নতুন পাতা গজায়, গাছে গাছে শিমুল-পলাশসহ নানা রঙের ফুল ফোটে। এ মাসে হোলি বা দোল উৎসব উদযাপিত হয়। শেষ মাস চৈত্র আসে তীব্র দাবদাহ নিয়ে। তীব্র গরমে মাঠ-ঘাট শুকিয়ে চৌচির হয়ে যায়। এতে প্রকৃতির রূপ হয়ে যায় রুক্ষ। গ্রামের মানুষ এ সময় পুরোনো ধান শেষ করে নতুন ফসলের অপেক্ষায় থাকে। চৈত্র মাসকে শাস্ত্রমতে ‘খর মাস’ বা অশুভ সময় মনে করা হয়। এ মাসে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা পূজা, নীল পূজা, শিবের গাজন ও চৈত্রসংক্রান্তির উৎসব পালন করে।
গতকাল মঙ্গলবার দেশজুড়ে পহেলা বৈশাখ উদযাপন হয়েছে। নেচে-গেয়ে সবাই উৎসব করেছে। আমি দিনভর উদযাপনের অসংখ্য ছবি দেখেছি, গণমাধ্যমে সংবাদ দেখেছি। কিন্তু কেন যেন বর্ষবরণের এই আয়োজনে বাংলা বর্ষটাকেই খুঁজে পাইনি। এটা আমার দেখার ব্যর্থতা নাকি আয়োজনই এমন হয়তো বোদ্ধারা বলতে পারবেন। আমি সারাদিন যা দেখেছি, তাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ করে দেখানো হয়েছে শোভাযাত্রাটিকে। যেখানে মোরগ, হাতি, পায়রা, দোতারা ও ঘোড়ার প্রতীক বা মোটিফ প্রদর্শন করা হয়েছে।
এবারের মোটিফগুলো আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে মোটামোটি সম্পৃক্ত ছিল। এটা আমার কাছে ইতিবাচক মনে হয়েছে। অন্তত বাংলা বর্ষবরণের নামে বিদ্বেষ ছড়ানো কোনো মোটিফ আনা হয়নি। কিন্তু যেভাবে শুধু এই শোভাযাত্রা এবং মোটিফকেই বাংলা নববর্ষের প্রধান কর্মসূচি হিসেবে দেখানো হয়েছে আমি এর কারণ বুঝতে পারছি না। এটাকে অনেকে অনেকভাবে বিশ্লেষণ করতে পারেন। কিন্তু আমি কেন পারছি না তার জবাব উপরের ১২টি মাসের চরিত্রই বলে দিচ্ছে। বাংলা বর্ষবরণ যদি বাংলা সনকে পরিচিত করার জন্য হয়ে থাকে তাহলে এগুলো বাংলা বর্ষের স্বরূপ বা পরিচিতি বহন করে?
শোভাযাত্রা হোক তাতে আমার কোনো বিতর্ক নেই। এই মোটিফ দিয়ে হতেও আমার আপত্তি নেই। কিন্তু এটিকেই বাংলা বর্ষবরণের প্রধান বা একমাত্র সংস্কৃতি হিসেবে তুলে ধরতে আমার আপত্তি আছে। আমি মনে করি, বাংলা বর্ষপূর্তির আয়োজন এমন হওয়া উচিত যেখানে আমাদের ৬টি ঋতু ও ১২ মাসের ঋতুবৈচিত্র্য ও সংস্কৃতি ফুটে উঠবে। যেখানে থাকবে আমার কৃষির প্রমোশন। যেখানে আমাদের আগামী প্রজন্ম জানবে বৈশাখ মাস কেমন, আষাঢ় কেমন, পৌষ কেমন বা চৈত্র কেমন। জানবে এসব মাসের কোনটির আবহাওয়া কেমন, এ সময়ের খাবার কেমন। জানবে কৃষক কীভাবে কষ্ট করে ফসল ফলায় বলে আমরা শহরের বাসায় বসে খেতে পাই। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, কখনোই এমন আয়োজন দেখি না। পুরো বর্ষবরণের আয়োজনের মধ্যে বাংলা বর্ষটাকেই খুঁজে পাই না।
আজ টেলিভিশনগুলোতে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে গানের অনুষ্ঠান দেখেছি। কিন্তু এ অঞ্চলের ঐতিহ্য জারি, সারি, ভাটিয়ারী, ভাওয়াইয়া, মরমী, গম্ভীরা বা বাউল গান কোথাও চালাতে দেখিনি। সবখানে দেখেছি পিয়ানো, গিটার, ড্রামসসহ পশ্চিমা বাদ্যযন্ত্রের সংমিশ্রণে আধুনিক গানের আসর। যা দেখে নিজেকে বাঙালিয়ানা দাবি করতেই আফসোস হচ্ছিল।
বাংলার ঐতিহ্যগুলো তুলে ধরার আয়োজন একেবারেই যে হয় না তা কিন্তু নয়। হয়তো কিছু আয়োজন হয়, কিন্তু আমাদের গণমাধ্যম কেন যেন সেটি তুলে ধরতে চরম কার্পণ্য করে। ফলে আমরা জানতে পারি না, দেখতে পাই না। যেমন আজ দু-একজনের ফেসবুকে দেখেছি ইনকিলাব মঞ্চ কিছুটা চেষ্টা করেছে বাংলাদেশের মানুষের মাছ ধরা, কৃষকের লাঙল-মাথালসহ কৃষি যন্ত্রপাতি, সুপারির খোল নিয়ে শিশুদের গাড়ি বানানোর মতো হারাতে বসা ঐতিহ্যগুলো প্রদর্শন করতে। যদিও সেটা আমাদের মূল ধারার গণমাধ্যমে চিত্রায়িত হয়নি।
আমার মনে হয়, বাংলা বর্ষবরণ নিয়ে যত কন্ট্রোভার্সি তার মূল কারণ এটি। অথচ যদি বর্ষবরণ আয়োজনে হিন্দু-মুসলিম, পাহাড়ি-বাঙালি সব মানুষের সারা বছরের সংস্কৃতি তুলে ধরা হতো, যদি হারাতে বসা বাঙালির চিরাচরিত চিত্রগুলো এখানে উঠে আসত তাহলে এই বর্ষবরণ নিয়ে কারও আপত্তি থাকার কথা না।
লেখক : সিনিয়র রিপোর্টার, বাংলাভিশন
[ প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের প্রতিফলন। এগুলো এশিয়া পোস্টের সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সঙ্গে সর্বদা মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখায় উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব; এ বিষয়ে এশিয়া পোস্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ। ]