logo

সিএনএন-এর বিশেষ প্রতিবেদন/যুক্তরাষ্ট্র কি তবে ফ্রান্সের পথেই হাঁটছে?

ডেভিড গোল্ডম্যান
ডেভিড গোল্ডম্যান
যুক্তরাষ্ট্র কি তবে ফ্রান্সের পথেই হাঁটছে?
প্যারিসে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে দেশব্যাপী বিক্ষোভের অংশ হিসেবে চলা সংঘর্ষের মধ্যে আইফেল টাওয়ারের পাশে এক নারী সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছেন। ছবি: রয়টার্স

ফ্রান্স এখন একরকম অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়া দেশটি মার্কিন নাগরিকদের পরিচিত এক আশঙ্কার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।

দেশটি এখন একটি চরম আর্থিক সংকটের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। কারণ, দেশটি তাদের আয়ের চেয়ে অনেক বেশি খরচ করেছে। বিগত কয়েক মাসে জ্বালানি খরচের ঊর্ধ্বগতির কারণে বন্ডের সুদের হার লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। ফলে হিসাব মেটানোর সময় দ্রুত চলে এসেছে। এই সমস্যার সম্ভাব্য সমাধানের মধ্যে রয়েছে কর বৃদ্ধি এবং সরকারি খরচ কমানো। কিন্তু এ ধরনের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে বেশ অজনপ্রিয়। ইতোমধ্যে ক্ষুব্ধ হয়ে থাকা সাধারণ জনগণকে এসব সিদ্ধান্ত আরও বেশি উত্তেজিত করে তুলতে পারে। তীব্র বিভাজিত সরকারের অনিশ্চিত বাজেট লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যেকোনো কার্যকরী সমাধান বের করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কথাটি কি পরিচিত শোনাচ্ছে?

ফ্রান্সের মতো এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে আরও বেশ কয়েকটি দেশ। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। দ্রুত বাড়তে থাকা ঋণ, সেই ঋণ শোধ করতে চড়াও হওয়া খরচ এবং সমস্যা সমাধানের কঠিন সিদ্ধান্তগুলো নেওয়ার মতো যথেষ্ট রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবই বর্তমান পশ্চিমা অর্থনীতির মূল গল্প। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও এর বাইরে নয়।

তবে সব দেশের সাদৃশ্য সবসময় এক হয় না।

ফ্রান্সের আর্থিক সংকটটি অত্যন্ত তীব্র। তবে পুরো ইউরোপে এই সংকট ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বেশ কম। যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ফ্রান্সের বিশাল সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী সরকারি খরচের অনেক বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে। তাছাড়া মার্কিন অর্থনীতির অনন্য গতিপ্রকৃতির কারণে যুক্তরাষ্ট্র খুব দ্রুত ফ্রান্সের মতো পরিস্থিতির মুখে পড়ছে না; এমন কোনো আসন্ন বিপদ নেই।

আসল সমস্যা

এগুলো নতুন কোনো সমস্যা নয়। ইউরোপের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা দীর্ঘ দশক ধরে এক টেকসইহীন পথের ওপর দিয়ে চলছে। অর্থনীতিবিদেরা এবং কিছু রাজনীতিক বছরের পর বছর ধরে সতর্ক করে আসছেন যে, এই বিল বা খরচের হিসাব একদিন না একদিন পরিশোধ করতেই হবে।

কিন্তু পরিস্থিতি দিন দিন আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। ইরানের যুদ্ধ পশ্চিমা দেশগুলোর আর্থিক সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) গত সপ্তাহের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি থেকে জি-৭ভুক্ত দেশগুলোর ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের গড় সুদহার ১ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। বিগত প্রায় ২০ বছরের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ স্তর।

আইএমএফ পূর্বাভাস দিয়েছে যে, চলতি দশকের শেষ নাগাদ এই সাতটি দেশের মোট সরকারি ঋণ তাদের অর্থনৈতিক উৎপাদনের পরিমাণকেও ছাড়িয়ে যাবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম এমন ঘটনা ঘটতে চলেছে।

ফ্রান্সের সরকারি ঋণ তাদের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১১৯ শতাংশ, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্ধারিত লক্ষ্যের দ্বিগুণ। এছাড়া দেশটির বার্ষিক বাজেট ঘাটতি তাদের জিডিপির ৫.৪ শতাংশ।

যুক্তরাজ্যের কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক নীতির অধ্যাপক পিটার টেলর-গুবির মতে, ‘ইউরোপে মানুষ এখন বন্ড বাজার এবং সরকারের ঋণ নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সুদের হার নিয়ে ক্রমবর্ধমানভাবে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, চাইলেও আর এটি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। যদি আমরা এখন কিছু না করি, তবে আমরা এক মারাত্মক সংকটের মুখে পড়ব।’

কাগজে-কলমে যুক্তরাষ্ট্রকেও খুব আলাদা দেখায় না। দেশটির ৩২ ট্রিলিয়ন ডলারের সরকারি ঋণ মার্কিন বার্ষিক জিডিপির প্রায় সমান। এছাড়া সম্প্রতি যে ২ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজেট ঘাটতির হিসাব চূড়ান্ত করা হয়েছে, তা জিডিপির ৬ শতাংশের বেশি। মার্কিন সরকারি ঋণ পরিশোধের খরচ এইমাত্র বছরে ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এটি মোট ফেডারেল বাজেটের অবিশ্বাস্য ১৪ শতাংশ।

অন্য কথায়, সরকারের সংগৃহীত প্রতি সাত ডলার করের এক ডলারই কেবল যুক্তরাষ্ট্রের নেওয়া ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে।

কিন্তু ইউরোপে খরচ কমানো এবং কর বাড়ানো নিয়ে যে জোরালো আলোচনা চলছে, যুক্তরাষ্ট্রে তার ধারেকাছেও কিছু দেখা যাচ্ছে না। তাহলে প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র কেন ফ্রান্সের মতো সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে না?

যুক্তরাষ্ট্রে কেন এমনটি ঘটবে না… এখনই নয়

যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, তারা বিশ্বের রিজার্ভ কারেন্সি বা প্রধান মুদ্রার নোট ছাপে। তেল ও সোনার মতো প্রধান পণ্যসহ বৈশ্বিক লেনদেনের সিংহভাগই মার্কিন ডলারে সম্পাদিত হয়।

ডলারের প্রতি এই চাহিদা এখনও প্রবল। কারণ, এগুলোকে নিরাপদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। স্বচ্ছতা এবং আইনের শাসনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি ডলারকে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে টিকিয়ে রেখেছে; যদিও গত এক দশকে এর কিছু উজ্জ্বলতা কিছুটা ম্লান হয়েছে।

এই বিষয়টি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের চাহিদাকেও চাঙ্গা রাখে। মার্কিন ট্রেজারি বন্ডগুলোকে সর্বসম্মতভাবে সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বৈশ্বিক সরকারি বন্ড বিক্রির হিরিকের মধ্যেও মার্কিন বন্ডের সুদের হার অন্যান্য পশ্চিমা অর্থনীতির তুলনায় কম রয়েছে। গত সপ্তাহে যখন শেয়ারবাজারে ধস নামে, তখন বিনিয়োগকারীরা ঐতিহ্যগত নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছোটেন। এর ফলে ট্রেজারি ইয়েল্ড বা সুদের হার দ্রুত কমে যায়।

তবে ফ্রান্স এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার আসল পার্থক্যটি নিহিত রয়েছে কেবল একটি বিষয়ের ওপর। যেমনটি জেমস কারভিল বলেছিলেন, ‘এটি অর্থনীতি, বোকা!’

যুক্তরাষ্ট্রের একটি অত্যন্ত বিশাল ও বৈচিত্র্যময় অর্থনীতি রয়েছে, যা এর অনেক ছোট ছোট সমকক্ষ দেশের তুলনায় যেকোনো ধাক্কা সামলাতে অনেক বেশি সক্ষম। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) খাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এক বিশাল বিনিয়োগের জোয়ার তৈরি হয়েছে। যখন অন্য অনেক খাত স্থবির বা পতনের মুখে, তখন এই এআই খাতই অর্থনীতিকে টেনে তুলছে।

বাজেট ঘাটতিকে কম গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার প্রধান উপায় হলো অর্থনীতির শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা। এর ফলে তখন ঋণগুলোকে তুলনামূলকভাবে অনেক ছোট বা নগণ্য মনে হয়।

মুডিস অ্যানালিটিক্সের প্রধান অর্থনীতিবিদ মার্ক জন্দি উল্লেখ করেছেন, ‘ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্য বেশ কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে এআই-এর অবদান আমাদের ঋণগুলোকে আরও সহজে সামাল দিতে এবং পরিস্থিতি সুন্দরভাবে মোকাবিলা করতে সাহায্য করবে।’

অর্থনীতিবিদদের সতর্কবার্তা হলো যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন কোনো ঋণ সংকটের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না বলে এটিকে রাজকোষের সুশাসন বা আর্থিক দায়িত্বশীলতা ভেবে ভুল করা যাবে না। মূল বিষয় হলো, ফ্রান্স বা যুক্তরাজ্যের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্র এই সমস্যাটি অনেক ভালোভাবে সামলাতে পারে।

জন্দি আরও বলেন, ‘এর মানে এই নয় যে আমাদের এতে স্বস্তি পাওয়ার কিছু আছে। আমরা কেবল একটি ভিন্ন অবস্থানে রয়েছি।’

অন্য কোথাও কি এটি ঘটতে পারে?

ইউরোপের কোনো দেশ যখনই আর্থিক সমস্যায় পড়ে, তখন তা পুরো মহাদেশে সংকট ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি করে। তবে অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন, ফ্রান্সের সমস্যাগুলো দেশটির নিজের সীমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংক সংকেত দিয়েছে যে, ফ্রান্সের আর্থিক পরিস্থিতিতে তাদের সরাসরি হস্তক্ষেপ করার প্রয়োজন নেই। ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের ইউরোপীয় প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যান্ড্রু ক্যানিংহ্যাম উল্লেখ করেছেন, যদি প্রয়োজন হয় তবে ব্যাংকটি তা করতে পারে। সম্ভাব্য কোনো সংকট ছড়িয়ে পড়া রোধ করতে নিজ সদস্য দেশগুলোর বন্ড কিনে নেওয়ার মতো ভালো অবস্থানে রয়েছে তারা।

তুলনামূলকভাবে ইউরোপের অন্যান্য অর্থনীতির বাজেট ঘাটতিও অনেক কম। এমনকি কিছু দেশ চলতি বছর উদ্বৃত্ত বাজেট নিয়ে চলার আশা করছে।

এছাড়া ফ্রান্সের বাম ও ডানপন্থী উভয় রাজনৈতিক দলই, যার মধ্যে রয়েছে কট্টর ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী মারিন ল্য পেনও, ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার কথা জানিয়েছে। অথচ এই ল্য পেনই একসময় ‘ফ্রেক্সিটের’ (ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ফ্রান্সের বেরিয়ে যাওয়া) পক্ষে সোচ্চার ছিলেন, তবে পরবর্তীতে তিনি সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছেন। ক্যানিংহ্যাম উল্লেখ করেছেন যে, জার্মানির এএফডি দল ইইউ ত্যাগের পক্ষে মত দিলেও তারা সরকার গঠনের কাছাকাছিও নেই।

তবে একটি অজানা বা এক্স ফ্যাক্টর ফ্রান্সের বাইরেও ঋণ সংকট তৈরি করতে পারে। সেটি হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘এক্স ডেট’ বা ঋণসীমার দিন। আগামী বছরের কোনো এক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে আবারও তাদের ঋণের সর্বোচ্চ সীমার মুখোমুখি হতে হবে। নতুন কংগ্রেসকে তখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা করে এই সীমা বাড়াতে হবে। ল্যামা ডাক (মেয়াদোত্তীর্ণ বা বিদায়ী) প্রেসিডেন্ট এবং ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত হতে যাওয়া কংগ্রেসের জন্য এই দরকষাকষি বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়াতে পারে। ঋণসীমা বাড়াতে ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র বাধ্য হয়ে নিজেদের ঋণের ক্ষেত্রে এক কৃত্রিম খেলাপি পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, যদিও অন্যথায় তাদের পরিশোধ করার সামর্থ্য থাকত।

মার্ক জন্দি সতর্ক করে বলেন, ‘এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে যেখানে আমরা আগামী বছর হ্যালোইনের আগেই ঋণসীমা লঙ্ঘন করে বসতে পারি। আর তখনই নানা ধরনের নতুন সমস্যার শুরু হবে।’


লেখক পরিচিতি:

ডেভিড গোল্ডম্যান সিএনএন-এর অর্থনীতি বিষয়ক সংবাদ দলের সাংবাদিক ও বিশ্লেষকেরা। আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি, বৈশ্বিক অর্থনীতি, সরকারি ঋণ সংকট এবং মার্কিন বা ইউরোপীয় বাজারের গতিপ্রকৃতি নিয়ে নিয়মিত কাজ করেন তারা।

[প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের প্রতিফলন। এগুলো এশিয়া পোস্টের সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সঙ্গে সর্বদা মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখায় উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব; এ বিষয়ে এশিয়া পোস্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ।]