logo

মিডলইস্ট আইয়ের কলাম/চীনের সঙ্গে মিশরের উষ্ণ সম্পর্ককে ‘যুক্তরাষ্ট্র-চীন দ্বন্দ্বের’ চশমায় দেখা ভুল কেন

মিডল ইস্ট আই
মিডল ইস্ট আই
চীনের সঙ্গে মিশরের উষ্ণ সম্পর্ককে ‘যুক্তরাষ্ট্র-চীন দ্বন্দ্বের’ চশমায় দেখা ভুল কেন
কায়রোর একটি রাস্তায় মিশরীয় রাষ্ট্রপতি আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি এবং চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর প্রতিকৃতি। (ছবি: এএফপি)

চীন ও মিশরের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৭০ বছর পূর্ণ হয়েছে। এ উপলক্ষে সম্প্রতি মিশরে এক ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় সফর করেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। পশ্চিমা বিশ্লেষকেরা বরাবরের মতোই এই সফরকে চেনা চশমায় দেখেছেন। তাঁদের মতে, ওয়াশিংটনের প্রভাব খর্ব করে অঞ্চলে নিজেদের আধিপত্য বাড়াতেই বেইজিংয়ের এই সুকৌশলী পদক্ষেপ।

তবে ভূরাজনীতির এই সমীকরণ চীন-মিশর সম্পর্কের মূল বাস্তবতাকে এড়িয়ে যায়। পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার প্রতিযোগিতার কারণে এই সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। বরং দশকের পর দশক ধরে চলা অর্থনৈতিক সহযোগিতাই এর মূল ভিত্তি। এই সহযোগিতা সরাসরি মিশরের অভ্যন্তরীণ উন্নয়নের লক্ষ্য পূরণে কাজ করছে।

শি জিনপিংয়ের এই সফরকে কেবলই ‘চীন-যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্বের’ কাঠামোতে ফেলা ঠিক নয়। এটি শিল্প, অবকাঠামো ও প্রযুক্তি খাতে চীন-মিশরের বাস্তব অগ্রগতিকে অস্বীকার করে। একই সঙ্গে এটি বৈশ্বিক অংশীদারি বহুমুখী করতে কায়রোর নিজস্ব অর্থনৈতিক কৌশলকেও বাতিল করে দেয়।

মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার (মেনা) কূটনীতিতে সাধারণত লেনদেনভিত্তিক ভূরাজনৈতিক জোটই বেশি দেখা যায়। তবে বেইজিংয়ের হিসাব আলাদা। তারা মিশরের সঙ্গে সম্পর্ককে দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবমুখী অর্থনৈতিক সহযোগিতা হিসেবেই দেখে। এই সহযোগিতা মিশরের জরুরি উন্নয়ন চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো ‘টেডা সুয়েজ ইকোনমিক অ্যান্ড ট্রেড কো-অপারেশন জোন’। এটি মেনা অঞ্চলে চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগের অন্যতম সফল শিল্পকেন্দ্র। টানা কয়েক বছর ধরে এই অঞ্চলের সম্প্রসারণ হয়েছে। বর্তমানে এখানে উৎপাদন, নতুন উপকরণ, বস্ত্র ও লজিস্টিকস খাতের প্রায় ২০০টি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। এখানে বিনিয়োগের পরিমাণ ৩৮০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই শিল্পাঞ্চল ১০ হাজার মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থান তৈরি করেছে। পাশাপাশি মিশরের শিল্প ও সেবা খাতে পরোক্ষভাবে আরও ৮০ হাজারের বেশি মানুষের কাজের সুযোগ হয়েছে। এর ফলে জাতীয় কোষাগারে নিয়মিত করের টাকাও জমা হচ্ছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই শিল্পাঞ্চল কোনো নামমাত্র রাজনৈতিক প্রকল্প নয়। এটি মিশরকে নিজস্ব শিল্প সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে। এর ফলে আমদানি করা পণ্যের ওপর তাদের নির্ভরতা কমেছে। একই সঙ্গে আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে তাদের রপ্তানি সক্ষমতাও বেড়েছে।

কাঠামোগত শূন্যতা পূরণ

পরিবহন ও নগর অবকাঠামো খাতের সহযোগিতাও সমানভাবে বড় পরিবর্তন এনেছে। ‘টেনথ অব রমজান লাইট রেল’ প্রকল্প চীন ও মিশরের অন্যতম যৌথ উদ্যোগ। এটি মধ্য কায়রোর সঙ্গে নতুন প্রশাসনিক রাজধানী ও পূর্ব শহরতলির শিল্পাঞ্চলগুলোকে যুক্ত করেছে। এই রেললাইন শহরের ভয়াবহ যানজট কমিয়েছে। লাখ লাখ মানুষের যাতায়াতের সময় বাঁচিয়েছে। পাশাপাশি মিশরের নতুন রাজধানী এলাকার পরিকল্পিত সম্প্রসারণেও এটি বড় ভূমিকা রাখছে।

পশ্চিমাদের দীর্ঘদিনের নজর ছিল মূলত নিরাপত্তাকেন্দ্রিক সহায়তার দিকে। ফলে অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিকটি অবহেলিতই ছিল। চীনের এই বিনিয়োগ এখন সেই শূন্যতা পূরণ করছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই সহযোগিতা ভবিষ্যৎমুখী ও উচ্চ প্রবৃদ্ধির খাতগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে। এটি দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্কের একটি নতুন ভিত্তি তৈরি করেছে।

এমন একটি প্রকল্পের নাম ‘ওবেলিস্ক সোলার-স্টোরেজ ইন্টিগ্রেটেড প্রজেক্ট’। এটি মিশরের সবচেয়ে বড় সৌরবিদ্যুৎ ও শক্তি সঞ্চয়কেন্দ্র। এটি বর্তমানে স্থানীয় প্রায় ১৬ লাখ পরিবারকে পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। মিশরের রুক্ষ মরুভূমির জলবায়ুর সঙ্গে মানানসই প্রযুক্তি ব্যবহার করে এটি তৈরি করা হয়েছে। এই প্রকল্প দেশটির নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত চাপ থাকা জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডকে স্থিতিশীল করতেও সাহায্য করছে।

ডিজিটাল ও হাই-টেক শিল্পেও দুই দেশ পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক সই করেছে। এর মধ্যে রয়েছে অপটিক্যাল কেবল তৈরি, সফটওয়্যার আউটসোর্সিং, সেমিকন্ডাক্টর গবেষণা ও ডেটা সেন্টার নির্মাণ। পাশাপাশি ৩০ কোটি ডলারের একটি প্রযুক্তি বিনিয়োগ তহবিলও গঠন করা হয়েছে। এসব চুক্তি মিশরকে নিজস্ব ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। একই সঙ্গে তাদের হাই-টেক শিল্প খাতকেও আধুনিক করবে।

এমনকি কৌশলগত বড় প্রকল্পগুলোর উদ্দেশ্যও ভূরাজনৈতিক নয়, বরং স্পষ্টতই অর্থনৈতিক। চীনের কারিগরি সহায়তায় ২০২৩ সালে ‘ইজিপ্টস্যাট-২’ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করে মিশর। এর মাধ্যমে তারা নিজস্ব উচ্চক্ষমতার রিমোট সেন্সিং সুবিধা পেয়েছে। এই প্রযুক্তি দেশটির কৃষির পরিকল্পনা, নগর নির্মাণ, দুর্যোগ প্রতিরোধ ও সম্পদ ব্যবস্থাপনায় সাহায্য করছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক ডেটা অবকাঠামোয় মিশর এখন আরও স্বাবলম্বী।

এসব প্রযুক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি ২০০ কোটি ডলারের একটি ‘বাণিজ্য শহর’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে চীন ও মিশরের। কয়েক লাখ বর্গমিটার এলাকাজুড়ে একটি সমন্বিত বাণিজ্যিক ও লজিস্টিকস কেন্দ্র নির্মাণের কথা ভাবা হচ্ছে। এটি বাস্তবায়ন হলে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরেশিয়াকে যুক্তকারী আঞ্চলিক বাণিজ্যদ্বার হিসেবে মিশরের গুরুত্ব আরও বাড়বে।

ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি

চীনের এই বাস্তবমুখী অর্থনৈতিক পদক্ষেপগুলোর দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়। আর তা হলো, ‘যুক্তরাষ্ট্র-চীন দ্বন্দ্বের’ তত্ত্ব কেন এখানকার স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।

মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের চিরাচরিত নীতি মূলত সামরিক অংশীদারি, নিরাপত্তা সহায়তা ও ভূরাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত। তাদের কাছে অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রায়ই দ্বিতীয় সারির বিষয়। এ ছাড়া তা রাজনৈতিক আনুগত্যের শর্তে দেওয়া হয়। অন্যদিকে, মিশরে চীনের বিনিয়োগ পুরোপুরি উন্নয়নকেন্দ্রিক। এখানে আদর্শিক কোনো শর্ত বা জোটগত রাজনীতির চাপ নেই।

মিশর সরকারের নিজস্ব কিছু অগ্রাধিকারের জায়গা রয়েছে। এর মধ্যে আছে স্থানীয় শিল্পের বিকাশ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার, নগরের আধুনিকায়ন এবং ডিজিটাল অর্থনীতির উন্নয়ন। দুই দেশের প্রতিটি বড় যৌথ প্রকল্প এসব অগ্রাধিকার মেনেই বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

কায়রোর ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতিও পক্ষ নেওয়ার এই ধারণাকে নাকচ করে দেয়। পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতায় জড়াতে মিশর বরাবরই অস্বীকৃতি জানিয়ে এসেছে। তারা পশ্চিমাদের সঙ্গে বিদ্যমান সম্পর্কের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী বিকল্প হিসেবে চীনের সঙ্গে এই অংশীদারিকে দেখে না। বরং একে একটি পরিপূরক সংযোজন হিসেবেই মনে করে।

পশ্চিমা পুঁজি সাধারণত জ্বালানি ও আর্থিক খাতগুলোকে বেশি গুরুত্ব দেয়। তৃণমূল পর্যায়ের উৎপাদন ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন তাদের কাছে উপেক্ষিতই থেকে যায়। ফলে কাঠামোগত একধরনের শূন্যতা তৈরি হয়। চীনের শিল্প খাতের বিনিয়োগ সেই শূন্যতা পূরণ করছে। চীন ও মিশরের এই গভীর অর্থনৈতিক সহযোগিতা মূলত মিশরের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকেই শক্তিশালী করছে। এটি মিশরকে একটি বহুমুখী ও টেকসই জাতীয় অর্থনীতি গড়ে তুলতে সহায়তা করছে। ফলে স্বাধীন নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে তাদের সক্ষমতা আরও বাড়ছে।

মিশরে চীনের এই ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক পদচারণা অবশ্য কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও তৈরি করছে। এর মধ্যে রয়েছে স্থানীয় শিল্পের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, প্রযুক্তি হস্তান্তরের প্রত্যাশা ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনার সমন্বয়হীনতা। তবে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারদের মধ্যে এ ধরনের কারিগরি ও বাণিজ্যিক ঘাত-প্রতিঘাত খুবই স্বাভাবিক। এগুলো কোনোভাবেই পরাশক্তিগুলোর দ্বন্দ্বের লক্ষণ নয়। বরং দ্বিপক্ষীয় ওয়ার্কিং গ্রুপ এবং প্রকল্পগুলোর প্রয়োজনীয় সংশোধনের মাধ্যমেই এসব সমস্যার সমাধান করা হয়।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সফরের আগে মূল আলোচ্য বিষয় ছিল নিঃসন্দেহে অর্থনীতি। এই সফরে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমন্বয়ের বিষয়ে যা-ই আলোচনা হোক না কেন, তার চূড়ান্ত লক্ষ্য স্থিতিশীল উন্নয়ন। কারণ, টেকসই অর্থনৈতিক বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির জন্য আঞ্চলিক শান্তি থাকাটা জরুরি।

চীন-মিশরের ৭০ বছরের কূটনৈতিক সম্পর্ক এখন কেবল রাজনৈতিক বন্ধুত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং তা একটি শক্তিশালী ও জনমুখী অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতায় রূপ নিয়েছে। প্রেসিডেন্টের এই সফরকে ‘যুক্তরাষ্ট্র-চীনের প্রতিযোগিতা’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া দুই দেশের কৌশলগত অবস্থানের প্রতি অবিচার। পাশাপাশি, এটি মিশরের জনগণের বছরের পর বছর ধরে পাওয়া দৃশ্যমান উন্নয়নের সুফলগুলোকেও অস্বীকার করে।

এই সফরের উদ্দেশ্য কোনো দ্বন্দ্ব বা আধিপত্য বিস্তার নয়। বরং এটি একটি প্রমাণিত ও বাস্তবমুখী অর্থনৈতিক অংশীদারি আরও সুদৃঢ় করার উদ্যোগ। মিশরের আধুনিকায়নের লক্ষ্যকে সমর্থন করা এবং পরাশক্তিগুলোর আধিপত্য বিস্তারের হিসাবনিকাশ থেকে বেরিয়ে এসে একটি স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ আঞ্চলিক অর্থনীতি গড়ে তোলাই এর মূল লক্ষ্য।


লেখক পরিচিতি: নেলসং ওং চীনের ‘সাংহাই সেন্টার ফর রিমপ্যাক স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’-এর প্রেসিডেন্ট। একই সঙ্গে তিনি বৈশ্বিক ব্যবসা ও বিনিয়োগবিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘এসিএন ওয়ার্ল্ডওয়াইড’-এর পরিচালক। লেখাটি মিডল ইস্ট আই থেকে সংক্ষেপিত ও অনুবাদ করা হয়েছে।

[প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের প্রতিফলন। এগুলো এশিয়া পোস্টের সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সঙ্গে সর্বদা মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখায় উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব; এ বিষয়ে এশিয়া পোস্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ।]