মিডল ইস্ট আইয়ের কলাম/কাবুলের পতনের ৫ বছর পর ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের’ ভূত এখন পশ্চিমাদেরই ঘরে

বাগরাম থেকে ক্যাম্প বুকা পর্যন্ত পশ্চিমারা নিষ্ঠুর সব বন্দিশালা তৈরি করেছিল। এসব বন্দিশালাই অবচেতনভাবে এমন এক নেতৃত্ব তৈরি করেছে, যা শেষ পর্যন্ত পশ্চিমা সাম্রাজ্যের পতন ঘটিয়েছে।
পাঁচ বছর আগের কথা। বিশ্ববাসী তখন হতবাক হয়ে একটি দৃশ্য দেখেছিল। আমেরিকার সর্বশেষ সামরিক বিমানটি কাবুল ছেড়ে যাচ্ছিল। এর মধ্য দিয়ে ২০ বছরের দখলদারির এক বিশৃঙ্খল ও অপমানজনক সমাপ্তি ঘটে।
আফগান রাজধানী ছেড়ে যাওয়া মার্কিন সামরিক বিমানের গা বেয়ে মরিয়া মানুষ ঝুলে ছিল। এই ছবিগুলো ১৯৭৫ সালের সাইগনের আতঙ্কের কথাই মনে করিয়ে দেয়। সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের এক দৃশ্যমান উত্তরাধিকার হিসেবে এই চিত্র মানুষের মনে স্থায়ী হয়ে গেছে।
পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলো ক্যামেরার লেন্স প্রায় একচেটিয়াভাবে হামিদ কারজাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ের দিকে তাক করে রেখেছিল। সেখানে মানুষের উন্মাদনার ওপর অতিরিক্ত জোর দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে একটি সম্পূর্ণ ও ধ্বংসাত্মক পতনের গল্প তৈরি করার চেষ্টা হয়েছিল।
তবে বিমানবন্দরের গেটের বাইরে পা রাখলে কাবুলের রাস্তার বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক গল্প শোনায়। ভারী কামানের শব্দ বা রক্তক্ষয়ী নগরযুদ্ধের মধ্য দিয়ে কাবুলের পতন হয়নি। বরং ইসলামি আমিরাতের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের এই প্রক্রিয়াটি ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে সুশৃঙ্খল এবং শান্তিপূর্ণ।
আমার কাছে এই শান্ত পালাবদলটি ছিল ইতিহাসের এক চূড়ান্ত সমাপ্তি। ২০০১ সালে পরিবারসহ আফগানিস্তান ছাড়তে বাধ্য হই। তখন এমন এক দেশ থেকে পালিয়েছিলাম, যা পশ্চিমা সামরিক শক্তির ভয়ংকর চাপে কাঁপছিল। টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে দেশটি ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। বি-৫২ বোমারু বিমান অবিরাম বোমাবর্ষণ করছিল। আর ১৫ হাজার পাউন্ডের ‘ডেইজি কাটার’ বোমার ধ্বংসাত্মক কম্পন দেশটিকে প্রবলভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
বিশ্বের সবচেয়ে অত্যাধুনিক অস্ত্রের লক্ষ্যবস্তু হওয়া মানুষদের কাছেই শেষমেশ শহরটি ফিরে আসে। কোনো রক্তক্ষয়ী অবরোধের মধ্য দিয়ে এটি ঘটেনি। বরং এমন এক প্রশান্তির মধ্য দিয়ে ঘটেছে, যা দশকের পর দশক ধরে চলা পশ্চিমা অপপ্রচারকে মিথ্যা প্রমাণ করেছে। এটি নিছক সামরিক শক্তি প্রয়োগের সীমাবদ্ধতার এক গভীর প্রমাণ।
পশ্চিমাদের জন্য এটি ছিল এক ঐতিহাসিক মাত্রার কৌশলগত ব্যর্থতা। তবে ভেতর থেকে বিশ্বব্যাপী ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের’ বাস্তবতা দেখার কারণে এই পরিণতি অনুমেয়ই ছিল। আফগান প্রতিরোধ যোদ্ধারা সেটাই করেছে, যা চিরকাল করে এসেছে। আগ্রাসী পরাশক্তিকে সময়ের পরীক্ষায় পরাজিত করেছে।
ঐতিহাসিক অপমান
পশ্চিমা শক্তিগুলো নিজেদের ইতিহাসের বই পড়ার সামান্য কষ্টটুকু করলে এই সর্বশেষ পরাজয় পুরোপুরি এড়াতে পারত।
হিন্দুকুশ পর্বতমালার বুকে কোনো বৈশ্বিক সাম্রাজ্যের পতন এবারই প্রথম নয়। ১৮৩৯ থেকে ১৯১৯ সালের মধ্যে আফগানিস্তানে ব্রিটেন তিনটি বিপর্যয়কর যুদ্ধ শুরু করেছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষায় প্রচুর রক্ত ঝরেছিল। এই কোম্পানিটিকে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্র-সমর্থিত মাদক চক্র বলা যেতে পারে। জোরপূর্বক আফিম বাণিজ্য করে বিপুল সম্পদ লুটেছিল।
ওই হামলাগুলোর প্রতিটির সমাপ্তি ঘটেছিল ব্রিটিশদের পশ্চাদপসরণ, গণহত্যা এবং ভূ-রাজনৈতিক অপমানের মধ্য দিয়ে। তারপরও ইতিহাস থেকে কোনো শিক্ষা নেওয়া হয়নি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পশ্চিমা যুদ্ধের কারিগররা অহংকারে অন্ধ থেকেছে। বিশ্বাস করেছে, এমন এক জাতিকে বশীভূত করতে পারবে, যার আত্মপরিচয়ই গড়ে উঠেছে বিদেশি শাসনের প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে।
এমনকি আধুনিক সামরিক এলিটরাও চেনা করপোরেট ভাষার আড়ালে লুকাতে পারে না। শীর্ষস্থানীয় কিছু কর্মকর্তা ‘রণক্ষেত্রে কখনো পরাজিত হইনি’ বলে গল্প সাজানোর চেষ্টা করে। তবে ব্রিটেনের হাউস অব কমন্সের প্রতিরক্ষা কমিটি এবং জেনারেল স্যার রিচার্ড ব্যারন্সের মতো সাবেক জ্যেষ্ঠ কমান্ডাররা রূঢ় বাস্তবতা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন। মেনে নিয়েছেন, তালেবান জিতেছে। পশ্চিমারা সম্পূর্ণ কৌশলগত ব্যর্থতার শিকার হয়েছে। আর পুরো ২০ বছরের এই প্রকল্প চূড়ান্ত পরাজয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে।
আধুনিক পশ্চিমা গল্পের সবচেয়ে বড় পরিহাস হলো প্রতিরোধ ধারণাটির ব্যাপারে স্বল্প স্মৃতিশক্তি। বর্তমানে পশ্চিমারা জিহাদ এবং মুজাহিদীনের মতো শব্দগুলোকে দানবীয় রূপ দেয়। এগুলোকে বিকৃত করে বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসের সমার্থক শব্দে পরিণত করে। অথচ আফগান মুজাহিদীনদের বিশাল ও অবিস্মরণীয় আত্মত্যাগই সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটিয়েছিল।
পুরো আশির দশকজুড়ে এই যোদ্ধারা পশ্চিমাদের চূড়ান্ত স্নায়ুযুদ্ধের প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। রেড আর্মিকে ভাঙতে অকল্পনীয় নিষ্ঠুরতা সহ্য করেছিল। সেই সময় পশ্চিমা নেতারা তাঁদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রশংসা করেছিলেন।
তবে আত্মত্যাগ একবার পশ্চিমা ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ পূরণ করার পরপরই গল্পটি বদলে যায়। নাইন-ইলেভেন পরবর্তী আগ্রাসনকে বৈধতা দিতে ন্যায়সংগত সংগ্রামের মূল ধারণাকেই অপরাধী বানানো হয়।
পরবর্তী দখলদারি পুরোপুরি শোষণ এবং ছুড়ে ফেলার একটি চক্রের ওপর ভিত্তি করে চলেছিল। এই চক্র আজও অব্যাহত রয়েছে। আফগান রিলোকেশনস অ্যান্ড অ্যাসিসট্যান্স পলিসির অধীনে যেসব আফগান একসময় ব্রিটিশ বাহিনীর পাশে লড়াই করেছিল, পশ্চিমা বিশ্লেষকরা ওই হাজার হাজার আশ্রয় আবেদনের দিকে অতিরিক্ত মনোযোগ দেয়। এই দেশত্যাগকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে চলমান সংকটের একটি ছবি আঁকতে চায়।
কিন্তু এই গল্প একটি সত্য এড়িয়ে যায়। ইসলামি আমিরাত প্রথম দিন থেকেই সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিল। পশ্চিমা গোয়েন্দারা ব্যাপক প্রতিশোধমূলক রক্তপাতের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল। কিন্তু ইসলামি আমিরাত সচেতনভাবেই দেশটিকে সেই পথ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। এটি একটি গভীর অর্থনৈতিক সত্যকেও আড়াল করে। দেশ ছাড়ার এই মরিয়া চেষ্টার পেছনে মূলত পশ্চিমাদের অর্থনৈতিক অবরোধ দায়ী। অবরোধের কারণে তৈরি হওয়া ধ্বংসাত্মক ও কৃত্রিম দারিদ্র্যই মানুষকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করছে।
এক রূঢ় বাস্তবতা
হাজার হাজার মানুষ যখন এই দুর্ভিক্ষপীড়িত অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে, তখন সাবেক প্রভুদের কাছ থেকে চূড়ান্ত অপমানের শিকার হচ্ছে। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় নিয়মিতভাবে সাবেক স্থানীয় সহযোগীদের ছুড়ে ফেলেছে। ব্রিটিশ রাজমুকুটের জন্য রক্ত দেওয়া হাজার হাজার এলিট আফগান কমান্ডোর আবেদন আমলাতান্ত্রিক কারণ দেখিয়ে ঢালাওভাবে বাতিল করে দিয়েছে।
এই বিশ্বাসঘাতকতা আরও তীব্র হয়, যখন খুব সামান্য অংশই পশ্চিমা উপকূলে পৌঁছাতে সক্ষম হয়। সেখানে চরম উগ্র-ডানপন্থী এবং অভিবাসীবিরোধী গভীর ঘৃণার মুখোমুখি হতে হয়। একসময় পশ্চিমা সামরিক বাহিনীর হয়ে লড়াই করলেও আজ ব্রিটেনের রাস্তায় অপমানিত হতে হচ্ছে। আশ্রয়ের বাইরে বর্ণবাদী উন্মত্ত জনতা জড়ো হয়ে আক্ষরিক অর্থেই পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করছে। এই তিক্ত পরিহাসটি সবার জন্যই একটি কঠোর সতর্কবার্তা হওয়া উচিত।
এটি একটি রূঢ় বাস্তবতা মনে করিয়ে দেয়। সাম্রাজ্য এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার চোখে স্থানীয় সহযোগীদের কেবল ব্যবহার করে ছুড়ে ফেলা যায়। প্রথমে বিদেশে কামানের গোলা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তারপর উপযোগিতা শেষ হলে ঘরের মাঠে সহিংস ফ্যাসিবাদের দয়ার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়।
আফগানিস্তানের সঙ্গে আমার সম্পর্ক অত্যন্ত ব্যক্তিগত। ২০০১ সালের আগ্রাসনের আগে পরিবার নিয়ে কাবুলে থাকতাম। সংঘাত-বিপর্যস্ত একটি সমাজের জন্য স্কুল তৈরি ও পানির পাম্প বসানোর কাজ করতাম। যখন বোমা পড়তে শুরু করে, তখন জীবন পুরোপুরি ওলটপালট হয়ে যায়।
পরে পাকিস্তান থেকে অপহরণ করা হয়। মাথায় হুড পরিয়ে, শিকল পরিয়ে মার্কিন সামরিক বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। বাগরাম থিয়েটার ইন্টার্নমেন্ট ফ্যাসিলিটিতে একটি ভয়ংকর বছর কাটাই। এটি ছিল সোভিয়েতদের তৈরি একটি গুদামঘর, যেটিকে নির্যাতনের পরীক্ষাগারে পরিণত করা হয়েছিল। এরপর গুয়ান্তানামো বে-তে স্থানান্তর করা হয়। নিজের চোখে দেখেছি, ‘জাতীয় নিরাপত্তার’ আড়ালে পশ্চিমা দেশগুলো কতটা নিচে নামতে পারে।
আজ যখন কাবুলে ফিরে যাই, তখন ঐতিহাসিক এক চমৎকার পরিহাসের কারণে সফরগুলো অনেক সহজ হয়ে যায়। বর্তমান আফগান সরকার পরিচালনাকারী অনেক জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীই গুয়ান্তানামোতে সহবন্দী ছিলেন। গুয়ান্তানামো বে-তে আটক সবচেয়ে বড় জাতীয় গোষ্ঠীটি ছিল আফগানদের। সেখানে বছরের পর বছর আইনবহির্ভূত আটকাদেশ সহ্য করতে হয়েছে।
আজ যারা একসময় আমেরিকার খাঁচায় কমলা রঙের জাম্পসুট পরত, তারাই জাতির ভাগ্য নির্ধারণ করছে।
আমাদের ওপর নির্যাতনের সেই জায়গাগুলো এখন পুরোপুরি নতুন রূপ পেয়েছে। বাগরাম বিমানঘাঁটি একসময় মার্কিন সামরিক শক্তির স্নায়ুকেন্দ্র ছিল। এখানেই ছিল সেই বেআইনি বন্দিশালা, যেখানে পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল। সেই বাগরাম আজ বিদেশি পরাজয়ের এক স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। কর্তৃপক্ষ এর অন্ধকার কক্ষগুলো খুলে দিয়েছে। আর বন্দীরাও অনেক আগেই মুক্তি পেয়েছে।
প্রতি গ্রীষ্মে সরকার এখন এই রানওয়েগুলো ব্যবহার করে সামরিক সরঞ্জামের প্রদর্শনী করে। আমেরিকার প্রত্যাহারের বর্ষপূর্তি উদযাপনের কুচকাওয়াজ হিসেবে এটি করা হয়। অথচ একসময় এই রানওয়েগুলো থেকেই ধ্বংসাত্মক ড্রোন হামলা চালানো হতো।
লড়াই চলছে
দেশের শাসনব্যবস্থা নিয়ে চলমান আলোচনায় উভয় পক্ষের সামনেই কঠিন সত্য বলার সদিচ্ছা থাকা প্রয়োজন। আফগানিস্তানে নারীদের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার ওপর যে ক্ষতিকর বাধা দেওয়া হয়েছে, তার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করি। এই নীতি একটি সমাজের প্রকৃত সম্ভাবনাকে সংকুচিত করে দেয়। তবে এই বিষয়টি নিয়ে পশ্চিমাদের আঙুল তোলার পেছনে যে চরম ভণ্ডামি লুকিয়ে আছে, সেটাও খুব ভালো করেই জানি।
দখলদার বাহিনীগুলো এখন আফগান নারীদের রক্ষক হিসেবে নিজেদের তুলে ধরে। অথচ হাজার হাজার পুরুষকে হত্যা করার পর লাখ লাখ নারীকে সম্পূর্ণ নিঃস্ব অবস্থায় ফেলে যেতে দিব্যি খুশি ছিল। ওইসব পুরুষদের অনেককেই বাগরামের মতো বন্দিশালার খাঁচায় গুম করে ফেলা হয়েছিল।
নারীর ডিগ্রির অধিকারের জন্য মায়াকান্না করা সাম্রাজ্যবাদী প্রতারণার চূড়ান্ত রূপ। কারণ এরাই পদ্ধতিগতভাবে পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে বা আটকে রেখেছে। তারপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে সন্তানদের অনাহারে রেখেছে।
এই বছরের শুরুতে কাবুলে সাম্প্রতিক বেশ কয়েকটি সফরের মধ্যে একটিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলাম। যারা ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে’ পেছনে পড়ে আছে, তাদের জন্য সত্য উদ্ঘাটন এবং ন্যায়বিচার দাবি করাই ছিল লক্ষ্য। আফিয়া সিদ্দিকীর চলমান মর্মান্তিক ঘটনার তদন্তের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত আছি। পাশাপাশি মুহাম্মদ রহিম ও নাশওয়ান আল-তামিরসহ গুয়ান্তানামোতে ধুঁকতে থাকা বাকি বন্দীদের মুক্তির জন্যও কাজ করছি।
ওই বেআইনি বিদেশি বন্দিশালাটি বন্ধ করার লড়াই এখনো অনেক বাকি। শেষ শিকারদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার সংগ্রাম এখনো শেষ হয়নি।
দখলদারি-পরবর্তী এই বাস্তবতার ভৌগোলিক ব্যাপ্তি সম্প্রতি একটি সফরে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ধরা দেয়। যেদিন সকালে কাবুল ছাড়ি, সেদিন বিকেলেই দামেস্কে পৌঁছাই। সেখানে সিরিয়ায় আরেকটি দেশের বুক চিরে হেঁটেছি। দেশটি সম্প্রতি এমন মানুষদের মাধ্যমে স্বাধীন হয়েছে, যারা একসময় ইরাকের মার্কিন নির্যাতন সেলে বন্দী ছিল।
এই মিলগুলো উপেক্ষা করা অসম্ভব। বাগরাম থেকে ক্যাম্প বুকা পর্যন্ত পশ্চিমারা নিষ্ঠুর সব বন্দিশালা তৈরি করেছিল। এসব বন্দিশালাই অবচেতনভাবে এমন এক নেতৃত্ব তৈরি করেছে, যা শেষ পর্যন্ত সাম্রাজ্যবাদী উপস্থিতির পতন ঘটিয়েছে।
সিরিয়ায় থাকাকালীন সেদনায়া কারাগার এবং কুখ্যাত প্যালেস্টাইন ব্রাঞ্চ পরিদর্শন করি। বহু বছর আগে বাগরামে সিআইএ এজেন্টরা হুমকি দিয়েছিল যে, সহযোগিতা না করলে ঠিক এই জায়গাগুলোতেই পাঠিয়ে দেওয়া হবে।
তবে সামরিকভাবে এসব যুদ্ধে হেরে গেলেও যুক্তরাষ্ট্র এবং মিত্ররা এখনো অর্থনৈতিক যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।
আফগান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শত শত কোটি ডলারের সম্পদ আটকে দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি ব্যাপক নিষেধাজ্ঞাও চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এভাবে পশ্চিমারা সম্মিলিতভাবে লাখ লাখ সাধারণ নাগরিককে শাস্তি দিচ্ছে। মানুষকে কৃত্রিম দারিদ্র্য ও অনাহারে থাকতে বাধ্য করছে। একদিকে সক্রিয়ভাবে অর্থনৈতিক বিপর্যয় তৈরি করে শিশুদের খাবার ও ওষুধ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে, অন্যদিকে এসব দেশকে মানবাধিকারের ছবক দেওয়া হচ্ছে। এটি ভণ্ডামির চরম সীমা।
আফগানিস্তান থেকে পশ্চিমাদের প্রত্যাহারের এই পঞ্চম বার্ষিকী দূরবর্তী কোনো ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণের মুহূর্ত হওয়া উচিত নয়। এটি অবশ্যই জবাবদিহির একটি মুহূর্ত হতে হবে। প্রকৃত ন্যায়বিচারের স্বার্থে পশ্চিমাদের উচিত আয়নায় নিজেদের মুখ দেখা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যে মানসিক ক্ষত তৈরি হয়েছে, তা স্বীকার করা উচিত। অবশ্যই শাস্তিমূলক নিষেধাজ্ঞাগুলো তুলে নিতে হবে। আর এই স্বাধীন দেশগুলোকে শ্বাস নিতে, পুনর্গঠন করতে এবং নিজস্ব ভাগ্য নির্ধারণ করতে সুযোগ দেওয়া উচিত।
লেখক পরিচিতি: মোয়াজ্জাম বেগ গুয়ান্তানামো বের সাবেক বন্দী ও ‘এনিমি কমব্যাট্যান্ট’ বইয়ের লেখক।



