logo

অনলাইন ক্লাস নয় মর্নিং স্কুল দিন, দিনের আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার করুন

অনলাইন ক্লাস নয় মর্নিং স্কুল দিন, দিনের আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার করুন

বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক ও বৈশ্বিক সংকটের মুখোমুখি। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দামের অস্থিরতা এবং সরবরাহ শিকলে যে টানাপড়েন তৈরি হয়েছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে আমাদের ওপর। এই সংকট মোকাবিলায় সরকার সাশ্রয়ী হওয়ার নানাবিধ কৌশল গ্রহণ করেছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে গৃহীত একটি সিদ্ধান্ত-সপ্তাহে তিন দিন সশরীরে, তিন দিন অনলাইনে পাঠদানের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যা জনমনে তীব্র বিস্ময় ও ক্ষোভের সঞ্চার করেছে।

শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন গণমধ্যমকে জানিয়েছেন, তিনি একটি জরিপ করে জানতে পেরেছেন দেশের ৫৫ ভাগ অভিভাবক চাচ্ছেন অনলাইনে ক্লাস। যদিও এই জরিপ কার্যক্রম কবে থেকে এবং কীভাবে পরিচালনা করা হয়েছে, কতজন অভিভাবক মতামত দিয়েছেন তা তিনি বলেননি। 

নীতিনির্ধারকদের এহেন সিদ্ধান্ত দেখে আজ সাধারণ মানুষের মনে একটিই প্রশ্ন জাগছে, ‘এই অবাস্তব ও জনকল্যাণবিমুখ বুদ্ধিখানা সরকারকে আসলে দেয় কারা?’ তারা কি বাংলাদেশের বাস্তব প্রেক্ষাপট, গ্রামীণ জনপদ এবং কয়েক কোটি শিক্ষার্থীর পরিবারের আর্থিক সক্ষমতা সম্পর্কে আদৌ কি ধারণা রাখেন?

গাণিতিক হিসাবেও অনলাইন ক্লাস অবাস্তব

জ্বালানি সংকটের এই সময়ে নীতিনির্ধারকদের প্রধান যুক্তি হলো বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ কমানো। কিন্তু গাণিতিক বিশ্লেষণ বলছে, অনলাইন ক্লাস আসলে বিদ্যুতের চাহিদাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ১৩ বছরের এক শিক্ষার্থীকে নিজের শ্রেণিকক্ষের একটি হিসাব তুলে ধরতে আমরা দেখেছি। সে জানিয়েছে,তার শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৬০ জন। শ্রেণিকক্ষে বৈদ্যুতিক পাখা আছে ৫টি। কিন্তু তাদের যদি এখন বাড়িতে বসে অনলাইনে ক্লাস করতে হয়, তাহলে ৬০ জন শিক্ষার্থী ৬০টি বাড়িতে বসে ৬০টি বৈদ্যুতিক পাখা চালাতে বাধ্য হবে। অর্থাৎ, যে ৬০ জন শিক্ষার্থীর জন্য স্কুলে মাত্র ৫টি পাখা চলত, এখন সেই ৬০ জনের জন্য ৬০টি বাড়িতে ৬০টি পাখা সচল থাকবে। অর্থাৎ সরকারের এই সিদ্ধান্ত বিদ্যুৎ খরচ যে আরও বাড়াবে-তা ১৩ বছরের বাচ্চাটি বুঝতে পারলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয় বুঝতে পারছে না। 

গাণিতিক হিসাব দেখলে আরও চমকে উঠতে হয়। পদার্থ বিজ্ঞানের তথ্য বিশ্লেষণ করলে আমরা সাধারণভাবে যা দেখি, তা হলো একটি সাধারণ সিলিং ফ্যান প্রতি ঘণ্টায় গড়ে প্রায় ৭৫ ওয়াট বিদ্যুৎ খরচ করে। অর্থাৎ স্কুলের ৫টি পাখা টানা ৬ ঘণ্টা চললে দিনে বিদ্যুৎ খরচ হবে মাত্র ২.২৫ ইউনিট। কিন্তু অনলাইন ক্লাসের কারণে ৬০টি বাড়িতে ৬০টি ফ্যান চললে বিদ্যুৎ খরচ বেড়ে হবে প্রায় ২৭ ইউনিট। যা সশরীরে ক্লাসের বিদ্যুৎ খরচের চেয়ে ১২ গুণ বেশি। এর সঙ্গে যদি ৬০টি স্মার্টফোন চার্জিং খরচ এবং ইন্টারনেট রাউটারের বিদ্যুৎ ব্যয় যোগ করা হয়, তবে এই খরচ কোথায় গিয়ে ঠেকছে, তা আমরা চিন্তা করছি? অথচ এই হিসাব শুধুমাত্র একটি শ্রেণিকক্ষের। স্কুলটির সবগুলো শ্রেণির গাণিতিক হিসাব কষলে জ্বালানি সাশ্রয়ের দাবিটি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। আর এই হিসেবে আপনি যখন পুরো দেশের প্রেক্ষাপটে দেখবেন, তখন যে চিত্র ফুটে উঠবে তা রীতিমতো চমকে ওঠার মতো।

বাংলাদেশে বর্তমানে প্রাক-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি ২৭ লাখ। এই বিশালসংখ্যক শিক্ষার্থীর অর্ধেকও যদি প্রতিদিন বাড়িতে বসে এভাবে বিদ্যুৎ খরচ করে, তবে জ্বালানি সংকট কমবে নাকি বাড়বে? এটা বুঝার জন্য কি বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন আছে?

ডিজিটাল আসক্তিতে আগামী প্রজন্ম 

করোনা মহামারির সময় আমরা নিরুপায় হয়ে শিশুদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দিয়েছিলাম। তার ফলাফল আজ ঘরে ঘরে হাহাকার। ১২-১৩ বছরের বাচ্চারা ইন্টারনেটের গহিন অরণ্যে হারিয়ে যাচ্ছে। অনলাইন ক্লাসের দোহাই দিয়ে তারা ভিডিও গেম, টিকটক, রিলস এবং বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় অভিশাপ ‘অনলাইন জুয়ায়’ আসক্ত হয়ে পড়ছে।

বিখ্যাত আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী ও গবেষক জিন টুয়েঞ্জ তার দীর্ঘ গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, দিনে দুই ঘণ্টার বেশি ডিজিটাল পর্দার সামনে থাকা শিশুদের মধ্যে বিষণ্নতা, একাকিত্ব এবং আত্মহত্যার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। আর বিশ্ববিখ্যাত আমেরিকান শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. দিমিত্রি ক্রিস্টাকিস সতর্ক করে বলেছেন, ‘অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশুদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক গঠন ব্যাহত করে, যা তাদের দীর্ঘক্ষণ কোনো বিষয়ে মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা স্থায়ীভাবে নষ্ট করে দেয়।’

একটি ১২ বছরের শিশু যখন স্কুল ড্রেস পরে সহপাঠীদের সঙ্গে মাঠে দৌড়াদৌড়ি করার কথা, তখন সে ঘরের কোণে একা মোবাইল হাতে বসে থাকছে। এটি তাদের সামাজিকীকরণেও বাধা দেবে। 

অন্যদিকে, বাংলাদেশে প্রায় ৪ কোটির বেশি শিক্ষার্থীর একটি বিশাল অংশ বাস করে গ্রামে। সেখানে লোডশেডিংয়ের সমস্যা যেমন প্রকট, তেমনি অধিকাংশ স্কুলেই পর্যাপ্ত বৈদ্যুতিক পাখা পর্যন্ত নেই। সেই সব এলাকায় অনলাইন ক্লাসের চিন্তা করা মানে হলো উপহাস করা। 

সমাধান যেখানে

জ্বালানি সংকটের এই ক্রান্তিকালে আমাদের নীতিনির্ধারকরা যখন প্রযুক্তির ভুল ব্যবহার করে কৃত্রিম সমাধানের পেছনে ছুটছেন, তখন প্রকৃতির বুকেই লুকিয়ে আছে এর সবচেয়ে কার্যকর ও সাশ্রয়ী সমাধান। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও ঋতুচক্রের বাস্তবতায় ‘অনলাইন ক্লাস’ নয়, বরং ‘মর্নিং স্কুল’ বা প্রভাতি শিক্ষাক্রম হতে পারতো এই সংকট উত্তরণের প্রধান চাবিকাঠি। 

বাংলাদেশে সূর্যোদয় হয় খুব ভোরে। সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত সময়টাতে গ্রীষ্মকালেও আবহাওয়া তুলনামূলকভাবে স্নিগ্ধ ও শীতল থাকে। যদি সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সকাল ৭টায় ক্লাস শুরু করা যায়, তবে এই ৫ ঘণ্টা সময়ের মধ্যে দেশের সিংহভাগ শ্রেণিকক্ষেই বৈদ্যুতিক পাখা চালানোরও প্রয়োজন পড়বে না। সকালের স্নিগ্ধ পরিবেশে শিক্ষার্থীরা যখন পাঠগ্রহণ করবে, তখন তাদের মনোযোগ যেমন : বাড়বে, তেমনি হবে বিদ্যুতের সাশ্রয় হবে।

উন্নত বিশ্বও আজ ‘ডে-লাইট সেভিংস’ নিয়ে গবেষণা করছে, আর আমরা দিনের আলোকে অবহেলা করছি। যদি স্কুল এবং সরকারি অফিসগুলো সকাল ৭টা থেকে শুরু করে দুপুর ১টা বা ২টার মধ্যে শেষ করা যায়, তবে দিনের আলোর শতভাগ ব্যবহার নিশ্চিত হয়। এতে করে বিকেল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত যে ‘পিক আওয়ার’ বা বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদার সময়, তার ওপর চাপ অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব। বর্তমানের ৯টা-৪টা অফিস সূচির কারণে মানুষ যখন ৪টায় বের হয়, তখন তারা যানজটে আটকা পড়ে সন্ধ্যার অন্ধকার নামা পর্যন্ত তেলের অপচয় করে। মর্নিং শিফট চালু করলে মানুষ দিনের আলো থাকতেই ঘরে ফিরতে পারবে, ফলে রাস্তাঘাটে হেডলাইটের ব্যবহার এবং ঘরে ফেরার পর অতিরিক্ত বাতি জ্বালানোর প্রয়োজনীয়তাও কমবে। 

বৈশ্বিক অবস্থা

জ্বালানি সংকট বিশ্বব্যাপী একটি রূঢ় বাস্তবতা হলেও কোনো দেশই ঢালাওভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে শিশুদের ডিজিটাল ডিভাইসের দিকে ঠেলে দেয়নি। আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলো এবং সমপর্যায়ের অর্থনীতিগুলো অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও অংশগ্রহণমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এরমধ্যে আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী ভারত জ্বালানি সংকট ও মুদ্রাস্ফীতি মোকাবিলায় অত্যন্ত পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছে। তারা সংকট শুরুর পরপরই একটি সর্বদলীয় বৈঠক আহ্বান করেছে, যেখানে সব রাজনৈতিক দল ও বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে জাতীয় ঐক্য তৈরি করা হয়েছে। এ ছাড়া ভারত সরকার একটি বিশেষ জ্বালানি স্থায়িত্ব তহবিলও গঠন করেছে, যা থেকে ভর্তুকি দিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির চাপ কমানো হচ্ছে। তারা পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ও বৈদ্যুতিক যানবাহনের ওপর জোর দিলেও স্কুল বন্ধের মতো হঠকারী সিদ্ধান্ত নেয়নি।

শ্রীলঙ্কাও চরম সংকটের সময়ও শিক্ষা ব্যবস্থাকে সচল রেখেছে। তারা জ্বালানি রেশনিংয়ের মাধ্যমে গণপরিবহন ও অ্যাম্বুলেন্সকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, কিন্তু শিশুদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ করেনি।

জাপান তাদের ‘সেটসুডেন’ অভিযানের মাধ্যমে সরকারি অফিসে এসি ব্যবহার সীমিত করেছে এবং টাই বা ফরমাল কোট পড়ার বাধ্যবাধকতা শিথিল করেছে যাতে ফ্যান বা এসির ওপর চাপ কম পড়ে। ভিয়েতনাম তাদের কলকারখানার শিফটিং করে বিদ্যুতের লোড ব্যালেন্স করেছে, কিন্তু শিশুদের পড়াশোনা অনলাইনে ঠেলে দেয়নি। 

অথচ আমরা হাঁটছি বাস্তবতার ঠিক উল্টো দিকে। আমাদের মনে রাখা উচিত, শিক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি জাতির মেরুদণ্ড। তেল সাশ্রয়ের জন্য মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার কোনো মানে হয় না। যারা এসি রুমে বসে এ জাতীয় পরামর্শ দেন, তারা কি জানেন- গ্রামের কত শতাংশ শিক্ষার্থীর ঘরে স্মার্টফোন আছে? নিম্নবিত্ত বাবা-মা কি সন্তানের ইন্টারনেট প্যাকেজ কিনে দেওয়ার সামর্থ্য রাখেন? স্মার্টফোনের চার্জ দিতে যে বিদ্যুৎ খরচ হয়, তার হিসাব কী গ্রিড ম্যানেজমেন্টে যুক্ত হয়েছে?

জ্বালানি সংকট সমাধানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা কোনো বুদ্ধিদীপ্ত পথ নয়; বরং লাগাম টানতে হবে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের ওপর। এ ছাড়া দেশের প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি অফিসের এসিতে বিশেষ সেন্সর বা ডিভাইস যুক্ত করা বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রির নিচে নামলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায়। পাশাপাশি গ্রীষ্মের এই দহনকালে কোট-টাইয়ের মতো পশ্চিমা পোশাকের বাধ্যবাধকতা তুলে দিয়ে আরামদায়ক দেশি পোশাক পরিধান এবং দিনের আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। 

আমাদের মনে রাখা উচিত, শিক্ষা একটি জাতির মেরুদণ্ড এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল খাত। সরকার যদি বাস্তবতার নিরিখে এই খাতে সঠিক ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয়, তবে একদিকে যেমন সরকারের প্রশাসনিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে, অন্যদিকে জাতি হিসেবেও আমরা অপূরণীয় মেধা ও অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হব। তাই হঠকারী ডিজিটাল বিলাসিতা নয়, বরং বাস্তবসম্মত ও প্রকৃতিবান্ধব সমাধানই পারে এই সংকট থেকে আমাদের উত্তরণ ঘটাতে।

লেখক: জুবায়ের আল মাহমুদ, শিক্ষা, সমাজ ও পরিবেশ উন্নয়ন বিশ্লেষক।

[ প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের প্রতিফলন। এগুলো এশিয়া পোস্টের সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সঙ্গে সর্বদা মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখায় উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব; এ বিষয়ে এশিয়া পোস্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ। ]