logo

যুক্তরাষ্ট্রকে হারানো সম্ভব না, তবুও জিততে পারে ইরান

যুক্তরাষ্ট্রকে হারানো সম্ভব না, তবুও জিততে পারে ইরান

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান গত সপ্তাহে জেনেভায় ওমান মধ্যস্থতায় আরেক দফা আলোচনা করলেন। ফলাফল অবশ্য স্পষ্ট নয়। ইরান বলছে ‘ভালো অগ্রগতি’ হয়েছে, অন্যদিকে আমেরিকা জানিয়েছে, অগ্রগতি হয়েছে ‘সামান্যই’। একই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও ইরানে হামলার হুমকি দিলেন।

গত কয়েক সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বিপুল পরিমাণে বাড়ানো হয়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, আসন্ন হামলার জন্যই এই প্রস্তুতি। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে—বর্তমান আলোচনা কি আসলে সময় কেনার একটা কৌশলমাত্র, অনিবার্য যুদ্ধের জন্য আরও ভালোভাবে তৈরি হওয়ার একটা ফন্দি?

মার্কিন সামরিক শক্তির মুখে কারও কারও মতে, ইরানের একমাত্র পথ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করা, তা যতই অন্যায্য হোক না কেন। বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামরিক বাজেটের দেশটির সামনে ইরানের টিকে থাকার ক্ষমতা নেই। কিন্তু তারপরেও, এমন একটি চুক্তি তেহরানের পক্ষে মেনে নেওয়া কষ্টকর যা চাইলেই ওয়াশিংটন আবার ভেঙেও দিতে পারে।

ইরানের সামনে আরেকটি পথও আছে, যেখানে মার্কিন হুমকির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে জিতে যেতে পারে।

অতীতের আলোচনার পরিণতি

চলমান ইরান-মার্কিন আলোচনাকে আলাদা করে দেখা যাবে না। ইরানের দৃষ্টিতে, আমেরিকার সঙ্গে যে কোনো কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর ছায়া আছে জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশনের (জেসিপিওএ) ইতিহাস।

২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই চুক্তিতে ইরানের পরমাণু কর্মসূচির সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের কথা ছিল। চুক্তিটিতে কিছু অন্যায্য শর্ত সত্ত্বেও তেহরান এই চুক্তি মেনে নেয়, যার মধ্যে কিছু মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকাও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

এরপরেও ইরান তাদের প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি পালন করেছে, যা বারবার আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাও (আইএইএ) স্বীকার করেছে।

কিন্তু বিনিময়ে চুক্তির স্বাক্ষরকারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের দায়িত্ব পালন করেনি। ২০১৮ সালে ট্রাম্প একতরফাভাবে জেসিপিও থেকে সরে আসেন। ইরানের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়ার জন্য সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ করতে আবারও নিষেধাজ্ঞা দেন।

এটা একটা স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, মার্কিন প্রতিশ্রুতি কখনো চূড়ান্ত নয়। ‘আমেরিকা প্রথম’ নীতির জন্য যিনি আমেরিকার মিত্রদের স্বার্থেরও তোয়াক্কা করেন না, সেই ট্রাম্পের কাছে শত্রুদের স্বার্থের কী মূল্য থাকতে পারে?

তবে, এমনকি যদি কোনো ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট ক্ষমতায় থাকতেন, তাহলেও জেসিপিও টিকবে এমন কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বাস্তবতায়, একজন প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর শুধু পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্তই বৈধ।

আমেরিকার জন্য, আলোচনা শুধু প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করে নিরাপত্তা দেওয়ার মিথ্যা অনুভূতি দেওয়ার কৌশল ছাড়া কিছু না। গত বছর, যখন ওমানে ইরান ও মার্কিন প্রতিনিধিদের আরেক দফা বৈঠকের কথা ছিল, ঠিক তখনই আমেরিকার প্রধান মিত্র ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে ব্যাপক সামরিক অভিযান চালায়।

আমেরিকা সরাসরি সম্পৃক্ততা অস্বীকার করলেও তারা জানিয়েছিল যে তাদের আগেই খবর দেওয়া হয়েছিল। দুই দেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা মাথায় রাখলে, এই ‘আগে খবর’ পাওয়ার অর্থ দাঁড়ায় যে আমেরিকা ইসরায়েলের বিমান হামলায় নীরব সম্মতি দিয়েছিল।

এখন ইরান আবারও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসেছে। ইরানকে আরও অন্যায্য চুক্তি মেনে নেওয়ার চাপ দেওয়া হচ্ছে। যদি তারা পিছিয়ে যায় এবং মার্কিন দাবির কাছে মাথা নত করে, তবে অন্যের দুর্বলতার সুযোগ খোঁজা ট্রাম্প শর্ত পাল্টে দেবেন। আজকের দাবি হয়তো পরমাণু কর্মসূচি, কালকে তা হবে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, আর পরশু দিন হবে সরকার পতন।

ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ সম্পর্কের কারণেই মূলত ইসরায়েলকে শত্রু বলে মানা ইরান সরকারের প্রতি ওয়াশিংটনের মৌলিক শত্রুতা রয়েছে। ফলে ট্রাম্পের লক্ষ্য কোনো স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানো নয়, বরং ইরান যেন কখনোই তার শর্ত পুরোপুরি মেনে চলতে না পারে তা নিশ্চিত করা, যাতে করে সর্বোচ্চ চাপ ও শত্রুতার একটা স্থায়ী অভিযান চালিয়ে যাওয়া যায়।

এই প্রেক্ষাপটে এবং সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যাচ্ছে, ইরানের পক্ষে মার্কিন প্রতিশ্রুতি বা চুক্তির ওপর ভরসা করা নির্বুদ্ধিতা ছাড়া কিছুই না।

প্রতিবেশীরা যে শক্তি জোগাতে পারে

বর্তমান ইরান-মার্কিন সংঘাত এক উচ্চ-ঝুঁকির খেলা, যার সম্ভাব্য পরিণতি একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্র প্রথম দিকে বিপুল সামরিক শক্তি দিয়ে হয়তো জয়ী হতে পারে, কিন্তু ইরানের পাহাড়ি এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী গেরিলা যুদ্ধে আটকে পড়ে তারও সমস্যায় পড়তে পারে।

অন্যদিকে ইরান শেষ পর্যন্ত আগ্রাসন প্রতিহত করতে পারলেও যেভাবে আফগানরা পেরেছিল ততদিনে দেশটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে।

তার মানে এই নয় যে ইরানের পিছিয়ে যাওয়া উচিত। গ্রিনল্যান্ড সংকট আর চীন-মার্কিন বাণিজ্যযুদ্ধ দেখিয়েছে, ট্রাম্প যতই শক্তি দেখাতে পছন্দ করেন, ততই তিনি ক্ষতি এড়াতেও সচেষ্ট থাকেন। ইউরোপ আর চীন যেখানে ইরানের চেয়ে বহুগুণ শক্তিশালী, সেখানে স্পষ্টভাবে প্রতিরোধের ইঙ্গিত দিলে ট্রাম্প হয়তো পিছু হঠতে পারেন।

আর এই প্রতিরোধে তেহরানের একা থাকার প্রয়োজন নেই। তার প্রতিবেশী অঞ্চলে এমন বড় খেলোয়াড় আছে, যারা জানে যে আরেকটি মার্কিন-নেতৃত্বাধীন বিধ্বংসী যুদ্ধ তাদের স্বার্থে নয়। ইরান স্থিতিশীলতার জন্য আঞ্চলিক আকাঙ্ক্ষাকে কাজে লাগাতে পারে এবং তার তা করা উচিত।

ইরান একা নয়। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশই যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন আরেকটি বিধ্বংসী যুদ্ধ চায় না। দীর্ঘদিন মুখোমুখি অবস্থান নেওয়ার পর ২০২৩ সালে ইরান ও সৌদি আরব সম্পর্ক স্বাভাবিক করে—চীনের মধ্যস্থতায় একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা হয়। চীন, ওমান ও ইরাকের মধ্যস্থতায় আসা এই সাফল্য পরে অন্যান্য আরব দেশের সঙ্গেও সম্পর্ক তৈরির পথ খুলে দেয়।

তিন বছর পরে, সেই সিদ্ধান্ত এখন সুফল দিচ্ছে। বিশেষ করে সৌদি আরব, ওমান, তুরস্ক ও কাতার এখন ট্রাম্পকে সংযম দেখানোর জন্য লবিং করছে। এই প্রতিবেশী কূটনীতিকে শক্তিশালী করা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে দেখা—এটাই হয়তো ইরানের সবচেয়ে কার্যকর কৌশল।

শান্তির সবচেয়ে বড় পথ এবং মার্কিন ‘গানবোট কূটনীতি’ ঠেকানোর একমাত্র হাতিয়ার সঙ্গে দেশটির সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানো নয় (সেই লড়াইয়ে ইরান হেরে যাবে নিশ্চিত)। আসল পথ হলো প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে নিজের জাতীয় নিরাপত্তার অঙ্গীকার হিসেবে মেনে নেওয়া।

লেখক: হরাইজন ইনসাইটস সেন্টারের গবেষক।