দ্য গার্ডিয়ানের কলাম/ধনীদের শিক্ষা দিতে মামদানিকে অনুসরণ করছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী?

এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রে আয়কর জমা দেওয়ার দিন উপলক্ষে একটি বিশেষ ভিডিও বার্তা দিয়েছেন নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি। ভিডিওটি ধারণ করা হয়েছে সেন্ট্রাল পার্কের ঠিক দক্ষিণে অবস্থিত ‘বিলিয়নিয়ার্স রো’ এলাকায়। জায়গাটি মূলত নিউইয়র্কের আকাশচুম্বী বিলাসবহুল ভবনগুলোর এলাকা হিসেবে পরিচিত। মেয়র নির্বাচিত হওয়ার আগে মামদানি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি ধনীদের ওপর কর বসাবেন। এবার হেজ ফান্ড বিলিয়নিয়ার কেন গ্রিফিনের ২৩ কোটি ৮০ লাখ ডলারের পেন্টহাউসের সামনে দাঁড়িয়ে মামদানি সেই অঙ্গীকার রক্ষার ঘোষণা দিয়েছেন।
ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে তিনি বলেন, ‘আজ আমরা ধনীদের ওপর কর বসাচ্ছি।’ এটি ছিল ‘হ্যাপি ট্যাক্স ডে, নিউইয়র্ক’ শিরোনামের একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের শুরু।
মেয়র মামদানি তার এই পরিকল্পনার সপক্ষে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্তও তুলে ধরেছেন। নিউইয়র্ক শহরের কম্পট্রোলার মার্ক লেভিনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শহরে প্রায় ১১ হাজার ২০০টি বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে যা মালিকদের দ্বিতীয় আবাসন হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এসব বাড়ির ওপর বিশেষ কর (পিয়াড-আ-তেয়ার ট্যাক্স) বসিয়ে বছরে প্রায় ৫০ কোটি ডলার বাড়তি আয় করা সম্ভব।
মামদানির এই কর নীতির প্রচারণার রাজনৈতিক কৌশল বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভিডিওটির মাধ্যমে তিনি সরাসরি ধনীদের লক্ষ্য করে কড়া বার্তা দিয়েছেন। অনেকের কাছে এটি আশ্চর্যের মনে হতে পারে যে, আটলান্টিকের ওপারে যুক্তরাজ্যেও একই ধরনের নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। কিয়ার স্টারমার এবং র্যাচেল রিভস অনেকটা নীরবেই বিলাসবহুল বাড়ির মালিকদের লক্ষ্য করে নিজস্ব নীতি নিয়ে কাজ করছেন। মূলত যুক্তরাজ্যে সাধারণ মানুষের আবাসন খরচ বেড়ে যাওয়ার পেছনে এসব অতি-ধনী মালিকদের দায়ী করা হয়।
নিউ ইয়র্কের ‘পিয়াড-আ-তেয়ার’ করের মতো লন্ডনের গত বাজেটে ঘোষিত দ্বিতীয় বাড়ির ওপর নতুন কর এবং ‘ম্যানশন ট্যাক্স’ মূলত শহরের অভিজাত এলাকাগুলোকে লক্ষ্য করে করা হয়েছে।
নিউ ইয়র্ক এবং ইংল্যান্ডের এই কর ব্যবস্থা সঠিক দিশায় একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে কেবল এই কর দিয়ে আবাসন সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। এই সংকটের মূলে রয়েছে রিয়েল এস্টেট খাতের ব্যাপক বাণিজ্যিকীকরণ এবং ২০০৮ সালের মন্দার পরবর্তী মুদ্রাস্ফীতি নীতি। এসব কারণে নিজের একটি বাড়ি কেনার স্বপ্ন এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে।
তবে এই নীতিগুলো সরকারের রাজস্ব বাড়াতে বেশ কার্যকর। এর মাধ্যমে রাজনীতিবিদরা সমাজে সম্পদের প্রভাব নিয়ে আলোচনার সুযোগ পাচ্ছেন। নিউ ইয়র্কের আকাশচুম্বী বিলাসবহুল ভবনগুলোকে এখন ‘ঘোস্ট টাওয়ার’ বা ভুতুড়ে ভবন বলা হয়। কারণ, এসব ভবনে প্রায় কেউই থাকেন না এবং সেখানে আলোও জ্বলে না।
পরিচয় গোপন রাখা ধনী বিনিয়োগকারীরা এই বাড়িগুলোকে স্রেফ তাদের কোটি কোটি টাকা নিরাপদে রাখার বাক্স বা ‘সেফটি ডিপোজিট বক্স’ হিসেবে ব্যবহার করছেন বলে সমালোচনা করা হচ্ছে।
২০২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, লন্ডনের ওয়েবস্টমিনিস্টার ও কেনসিংটনের মতো এলাকার এক-চতুর্থাংশেরও বেশি বাড়ি খালি পড়ে আছে। এর ফলে পুরো শহরের সম্পত্তির দাম সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। অতি-ধনীরা যখন বিলাসবহুল এলাকা দখল করেন, তখন সেখানকার বাসিন্দারা অপেক্ষাকৃত সস্তা এলাকায় ভিড় করেন। এভাবেই সব এলাকায় আবাসনের দাম বাড়তে থাকে।
আগামী ১ জুলাই থেকে নিউ ইয়র্কে এই নতুন কর ব্যবস্থা কার্যকর হবে। মূলত অতি-ধনী অনিবাসীদের লক্ষ্য করেই এই নীতি নেওয়া হয়েছে। এই কর থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে জরুরি সরকারি সেবাগুলোর খরচ মেটানো হবে। নিউইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হচুল এই নীতি সমর্থন করেছেন। তিনিও এ বিষয়ে বেশ কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। ক্যাথি হচুল বলেন, আপনি যদি ৫০ লাখ ডলার খরচ করে একটি দ্বিতীয় বাড়ি কিনতে পারেন যা বছরের বেশির ভাগ সময় খালিই পড়ে থাকে, তবে অন্য সাধারণ নিউইয়র্কবাসীর মতো আপনারও কর দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে।
কিয়ার স্টারমার তার কর নীতিগুলো এভাবে প্রচার করতে কিছুটা ইতস্তত করছেন। কারণ, তিনি হয়তো প্রভাবশালী ধনীদের চটিয়ে দিতে চান না।
নিউইয়র্কেও জোহরান মামদানি একই ধরনের সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। তবে তিনি পিছিয়ে না গিয়ে সাহসীভাবে এর মোকাবিলা করেছেন এবং নিজের অবস্থান আরও জোরালো করেছেন।
নির্বাচনের সময় এমন এক প্রচার চালানো হয়েছিল যে, কর বাড়ালে বিলিয়নিয়াররা ফ্লোরিডায় পালিয়ে যাবে এবং শহরটি ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে এমন কিছুই ঘটেনি।
বিলিয়নিয়ার কেন গ্রিফিন অবশ্য এই পুরোনো যুক্তিই আঁকড়ে ধরেছেন। তিনি দাবি করেন, নিউইয়র্ক সফল ব্যক্তিদের স্বাগত জানাতে জানে না। তিনি এখন মিয়ামিতে নিজের ব্যবসা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেওয়ার কথা বলছেন। গ্রিফিন মামদানির ভিডিওটিকে ‘ভীতিকর ও অদ্ভুত’ বলে নিন্দা জানিয়েছেন।
এমনকি এতে তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। তবে গ্রিফিন শহর ছাড়লেও তার এই পথ অন্য ধনীরা অনুসরণ করছেন—এমন কোনো প্রমাণ নেই। বরং ‘ফিসকাল পলিসি ইনস্টিটিউট’ তাদের গবেষণায় দেখেছে যে, শীর্ষ ১ শতাংশ ধনীরাই নিউইয়র্ক শহর ছাড়ার ব্যাপারে সবচেয়ে কম আগ্রহী।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য বলছে, প্রগতিশীল কর ব্যবস্থার কারণে কোটিপতিরা পালিয়ে যান—এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। বরং যেসব রাজ্যে এমন কর ব্যবস্থা আছে, সেখানেই ধনীদের আনাগোনা বেশি দেখা যায়।
নিউইয়র্কের জন্য এখন আসল হুমকি হলো কর্মজীবী ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর শহর ছেড়ে চলে যাওয়া। জীবনযাত্রার আকাশচুম্বী খরচ মেটানোর ক্ষমতা তাদের আর নেই।
যুক্তরাজ্যেও ‘নন-ডম’ (অনিবাসী) মর্যাদা বাতিলের সময় একই ধরনের বিতর্ক হয়েছিল। তবে সরকারি তথ্য অনুযায়ী, করের ভয়ে ধনীরা দলে দলে দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে—এমন কোনো প্রমাণ মেলেনি।
যদি দেখা যায় যে সম্পদ কর কার্যকর হচ্ছে এবং এর ফলে ধনীরা চলেও যাচ্ছে না, তবে স্টারমার কেন এই নীতি নিয়ে আরও সরব হচ্ছেন না? কর দেওয়া হয়তো জনপ্রিয় কোনো বিষয় নয়, কিন্তু সমাজে ‘ন্যায্যতা’ প্রতিষ্ঠার গল্পটি মানুষের কাছে সব সময়ই গ্রহণযোগ্য।
মামদানির এই কর ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হতে পারে এটি সম্পদ নিয়ে চলমান বিতর্কের পটভূমি বদলে দেবে। আমাদের সমাজে বিপুল সম্পদের মালিকদের প্রভাব কেবল আবাসন খাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থাতেও তাদের বিশাল প্রভাব রয়েছে। এমনকি পৃথিবীর পরিবেশের ক্ষতি করে তারা অতিরিক্ত ভোগবিলাসে মত্ত থাকেন এবং সমাজে বিভাজন তৈরি করেন। তাই এই কর ব্যবস্থা হওয়া উচিত কেবল একটি শুরু, সামনে আরও বহু পথ পাড়ি দেওয়া বাকি।
আলজাজিরা থেকে অনূদিত
লেখক: আনা মিনটন, ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট লন্ডনের স্থাপত্যবিদ্যার রিডার। আগামী বছর পেঙ্গুইন থেকে তার নতুন বই ‘সুপারপ্রাইম: দ্য স্টেরিলাইজেশন অব দ্য সিটি’ প্রকাশিত হবে।
.png)



