Advertisement

খালেদা জিয়া: বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্রের প্রতিচ্ছবি

এশিয়া পোস্ট নিউজ
খালেদা জিয়া: বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্রের প্রতিচ্ছবি

খালেদা জিয়া শুধু একজন রাজনৈতিক নেত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্রের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। মহাকবি শেকসপিয়ারের সেই বহুল উদ্ধৃত উক্তি-‘Some are born great, some achieve greatness, and some have greatness thrust upon them’ যদি কারও জীবনে প্রযোজ্য হয়, তবে তিনি খালেদা জিয়া। জন্মসূত্রে রাজনীতির কোনো প্রস্তুতি না থাকলেও ইতিহাস, দায়িত্ব ও নিয়তির অনিবার্য টানে তিনি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিজেকে রূপান্তরিত করেন এক অনন্য নেতৃত্বে।

Advertisement

১৯৮১ সালের ৩০ মে এক নির্মম সামরিক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শাহাদতবরণ করলে ইতিহাসের মোড় ঘুরে যায়। দেশ, দল ও আদর্শ এক গভীর সংকটে পতিত হয়। সেই সংকটময় মুহূর্তে বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে খালেদা জিয়া রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। এটি কোনো ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা থেকে নয়, বরং দায়িত্ববোধ ও আদর্শিক উত্তরাধিকারের চাপ থেকেই। 

এরপর শুরু হয় এক দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ রাজনৈতিক যাত্রা। সামরিক শাসক এরশাদের বিরুদ্ধে আপসহীন আন্দোলনে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন গণতন্ত্রের প্রতীক হিসাবে। আট বছরের স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনে তার দৃঢ়তা, সাহস ও নেতৃত্ব বিএনপিকে পুনর্গঠিত করে একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক শক্তিতে রূপ দেয়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে তার নেতৃত্বেই বিএনপি ক্ষমতায় আসে এবং তিনি হন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী-মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তার প্রথম মেয়াদের সবচেয়ে ঐতিহাসিক অবদান ছিল সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন। ক্ষমতার কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে বহুদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল তার রাজনৈতিক দর্শনের স্পষ্ট প্রতিফলন-ক্ষমতা নয়, দায়িত্বই রাজনীতির মূল কথা।

১৯৯৬ ও ২০০১-২০০৬ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তার সরকার নানা বিতর্ক, সমালোচনা ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। দুর্নীতি, সুশাসন ও নিরাপত্তা প্রশ্নে তার সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, যা ইতিহাসের অংশ হিসাবেই মূল্যায়িত হবে। তবে এটিও সত্য যে, এ সময়ে বিএনপি দেশের ডানপন্থি ও মধ্যপন্থি রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে একত্রিত করে একটি বিস্তৃত গণভিত্তি তৈরি করতে সক্ষম হয়।

ক্ষমতার বাইরে থাকাকালেও বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন রাজনীতির প্রধান নির্ধারক শক্তি। তার রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ-ভূখণ্ডকেন্দ্রিক জাতীয় পরিচয়, ধর্মীয় মূল্যবোধ, সামাজিক ন্যায়বিচার, উৎপাদন ও সুষম বণ্টন। তিনি রাজনীতিকে কখনোই কেবল ক্ষমতার লড়াই হিসাবে দেখেননি। ব্যক্তির ঊর্ধ্বে দল, দলের ঊর্ধ্বে দেশ-এ দর্শন তিনি আজীবন ধারণ করেছেন। তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, দীর্ঘদিনের বিরোধীদলীয় নেতা, আপসহীন আন্দোলনের প্রতীক—এসব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে খালেদা জিয়া হয়ে উঠেছিলেন একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। তার নেতৃত্বে বিএনপি কেবল একটি দল নয়, বরং গণতন্ত্র, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থের প্রতীক হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে।

আজ তার প্রয়াণে বাংলাদেশ হারাল এক দৃঢ়চেতা নেতৃত্বকে। ইতিহাস তাকে বিচার করবে তার সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা-উভয়ের আলোকে। কিন্তু একথা অস্বীকার করার উপায় নেই, খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের জাতিরাষ্ট্র নির্মাণ ও রক্ষার সংগ্রামে এক অনিবার্য নাম। 

তিনি ছিলেন দেশনেত্রী। কারণ, তিনি দেশকে নিজের ঊর্ধ্বে রেখেছিলেন। তিনি ছিলেন ইতিহাস। কারণ, ইতিহাস তাকে এড়িয়ে যেতে পারে না। ‘এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ, মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান’।

লেখক: সাবেক অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

[ প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের প্রতিফলন। এগুলো এশিয়া পোস্টের সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সঙ্গে সর্বদা মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখায় উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব; এ বিষয়ে এশিয়া পোস্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ। ]